

স্টাফ রিপোর্টার: ধর্ষণের ঘটনায় সালিশ করা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে হাইকোর্টের জারি করা রুলের বিষয়ে শুনানি দুই সপ্তাহ পিছিয়ে আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর দিন ঠিক করা হয়েছে।
ধর্ষণের মামলা ১৮০ দিনে নিষ্পত্তি, বিচার শুরু থেকে নিষ্পত্তি পর্যন্ত টানা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশানা সংক্রান্ত বিষয়ে হাইকোর্টের বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লার সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল বেঞ্চ রোববার (২৯ আগস্ট) এ আদেশ দেন।
আদালতে এদিন রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার অনীক আর হক। তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মো. শাহীনুজ্জামান সৈয়দা নাসরিন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নওরোজ মো. রাসেল চৌধুরী ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল এম এম জি সরোয়ার পায়েল।
জানা গেছে, মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক রিট আবেদনে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) একটি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেছেন। এরপর বাকি বিবাদীদের মধ্যে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়,স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে শুনানির নির্ধারিত দিনে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে দুই সপ্তাহের সময় আবেদন করা হয়। সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন। ঐ দিন বাকিদের প্রতিবেদনের বিষয়ে তথ্য উপস্থাপন করা হবে আদালতে।
২০২০ সালের ১৩ অক্টোবর সংশ্লিষ্টদের প্রতি লিগ্যাল নোটিস পাঠানো হয়। লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর পরে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় ১৯ অক্টোবর মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এক রিট আবেদন করেন। ওই রিটের শুনাননি নিয়ে ২১ অক্টোবর হাইকোর্ট রুলসহ বিভিন্ন আদেশ দেন।
ধর্ষণের ঘটনায় সালিশ করা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে জারি করা রুলের শুনানি পিছিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ধর্ষণের ঘটনায় গত পাঁচ বছরে সারা দেশে থানায় কত মামলা হয়েছে এবং কতটা বিচারের জন্য আদালতে পাঠানো হয়েছে তার তথ্য জানাতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ধর্ষণের মামলা ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি, বিচার শুরু থেকে নিষ্পত্তি পর্যন্ত টানা বিচার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হাইকোর্টের দেওয়া আগের নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তিন মাসের মধ্যে এই প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
হাইকোর্টের বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মহি উদ্দিন শামীমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই আদেশ দেন। আইন, স্বরাষ্ট্র, সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
ওই দিন আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার অনীক আর হক, সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মো. শাহীনুজ্জামান ও অ্যাডভোকেট ইয়াদিয়া জামান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নওরোজ মো. রাসেল চৌধুরী ওসহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল এম এম জি সরোয়ার পায়েল।
ওই আদেশের পর গত ৩০ জুন পুলিশের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবেদন এবং দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে গত ৫ বছরে ৩০ হাজার ২৭২টি মামলা হয়েছে। এ হিসাব গত বছরের ২১ অক্টোবরের আগপর্যন্ত পাঁচ বছর সময়ের। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের পক্ষ থেকে পাঠানো এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য আসে।
এরপর হাইকোর্টের বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লার সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল বেঞ্চে সেদিন ওই প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এছাড়া পুলিশের মহাপরিদর্শকের পক্ষ থেকে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। আদালত সেটি ১৫ জুলাই শুনানির পরবর্তী দিন ঠিক করেন। তারই ধারাবাহিকতায় আদালতে বিষয়টি শুনানির জন্য আসে।
ধর্ষণের মতো শাস্তিযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা, সালিশ বা মিসাংসা রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে এবং ইতিপূর্বে এ বিষয়ে দেওয়া তিনটি রায়ের নির্দেশনা বাস্তবায়ন চেয়ে গত বছরের ১৯ অক্টোবর আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পক্ষে একটি রিট আবেদন করা হয়। এর শুনানি নিয়ে গত বছরের ২১ অক্টোবর আদালত রুলসহ আদেশ দেন। ধর্ষণের ঘটনায় সালিশ বা মীমাংসা রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়ে সেদিন হাইকোর্ট ধর্ষণের ঘটনায় গত পাঁচ বছরে সারা দেশের থানা, আদালত ও ট্রাইব্যুনালে কতগুলো মামলা হয়েছে, তা জানিয়ে প্রতিবেদন দিতে বলেন। এর ধারাবাহিকতায় প্রতিবেদন জমা পড়ে।
ওই দিন রিটকারীর পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার আইনজীবী অনীক আর হক বলেছিলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের দাখিল করা প্রতিবেদনে এসেছে ধর্ষণের অভিযোগে গত ৫ বছরে ৩০ হাজার ২৭২টি মামলা আদালতে দায়ের হয়েছে। পুলিশের মহাপরিদর্শকের পক্ষ থেকে দাখিল করা প্রতিবেদনে ধর্ষণের ঘটনায় সালিস রোধে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে বলা হয়েছে। অপর বিবাদীদের পক্ষ থেকে প্রতিবেদন এখনো আসেনি। আইন সচিব, সমাজকল্যাণ সচিব এবং নারী ও শিশুবিষয়ক সচিবের পক্ষ থেকে প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে ওই দিন পরবর্তী শুনানির জন্য দিন রেখেছেন আদালত।’
রিটে তিনটি মামলায় ইতিপূর্বে উচ্চ আদালতের রায়ের নির্দেশনার প্রসঙ্গ উল্লেখ রয়েছে। ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের এক রায়ে বলা হয়, ধর্ষণ, যৌন হয়রানিসহ এমন প্রতিটি আমলযোগ্য অপরাধ যেখানেই ঘটুক না কেন, তার তথ্য থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) লিপিবদ্ধ করতে হবে। ১৮ দফা নির্দেশনাসংবলিত ওই রায়ের নির্দেশনায় বলা হয়, ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের সব ঘটনায় বাধ্যতামূলকভাবে ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে। ডিএনএ পরীক্ষা ও অন্যান্য পরীক্ষার নমুনা নির্ধারিত ফরেনসিক ল্যাব বা ডিএনএ প্রোফাইলিং সেন্টারে ঘটনার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পাঠাতে হবে।
ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর হাইকোর্ট আরেক রায়ে নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার বিচার শেষ না হলে জবাবদিহির বিধান অনুসরণ (ব্যাখ্যা দেওয়া) করতে ট্রাইব্যুনালের বিচারক, পাবলিক প্রসিকিউটর ও তদন্ত কর্মকর্তাকে (পুলিশ) নির্দেশ দেন।
এ বিধান যথাযথভাবে প্রতিপালন করা না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও বলা হয়। সর্বশেষ গত বছরের ১৮ জুলাই হাইকোর্ট এক রায়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ধর্ষণ এবং ধর্ষণ–পরবর্তী হত্যা মামলাগুলো আইনে নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ করতে মামলায় সাক্ষীর উপস্থিতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে তদারক কমিটি গঠন করা এবং জবাবদিহি নিশ্চিতে ছয় দফা নির্দেশনা দেন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের আইনজীবী মো. শাহীনুজ্জামান বলেন, ‘পুলিশের মহাপরিদর্শকের পক্ষ থেকে দাখিল করা প্রতিবেদনে জেলাভিত্তিক বর্ণনা উল্লেখ রয়েছে। খুলনা বিভাগের ১০টি জেলায় ২০১৬ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত এক হাজার ৮০২টি ধর্ষণ মামলা হয় বলে প্রতিবেদনে এসেছে। এর মধ্যে এক হাজার ৫৯৭টি বিচারাধীন, ১৮৪টি তদন্তাধীন ও ৩৬টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া টাকার বিনিময়ে কোনো ধর্ষণ মামলার মিমাংসা হয়নি উল্লেখ করে পটুয়াখালী ও পিরোজপুর জেলার (২০১৫-১৯) মামলার পরিসংখ্যান রয়েছে প্রতিবেদনে। টাকার বিনিময়ে যাতে ধর্ষণ মামলা নিষ্পত্তি না করা হয়, আদালতের রায় ও নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়ার কথা বলা রয়েছে প্রতিবেদনে। আদালতের নির্দেশনা যথাযথভাবে প্রতিপালন করা হচ্ছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নজরদারি অব্যাহত আছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।