

বর্ষায় জলাবদ্ধতা নিরসন, ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ, সেচের জন্য প্রাকৃতিক পকেট জলধার হিসাবে ব্যবহার, পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষা, এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান, এসকল উদ্দেশ্য বিবেচনা করেই খাল কাটাকে বর্তমান সরকার খুবই একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করেছে । সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্দিষ্ট করেছে । খাল কাটার সাথে একটি আবেগীয় ঐতিহাসিক সম্পর্ক যুক্ত থাকায় সরকার প্রধান আনুষ্ঠানিকভাবে ১৬ মার্চ ২০২৬ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় এই কর্মসূচি উদ্বোধন করেছেন ।
অর্থনীতিবিদরা খাল খননের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানকে সামাজিক নিরাপত্তার বলয়ের একটি প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করলেও পানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন খাল খনন ও নদী খনন একে অপরের পরিপূরক হওয়া উচিত; তবে কৌশলগতভাবে নদী খনন আগে প্রয়োজন । কারণ নদী পানি শুন্য থাকলে খাল খনন “রক্তহীন শরীরের শিরা তৈরি” এর মতো কাজ । নদী হল পানির প্রধান উৎস । উৎস সচল না করে শুধু খাল খনন করলে শুষ্ক মৌসুমে তাতে পানি পাওয়া যাবে না । অপরদিকে বর্ষার পানি নদীতে সহজে নামতে না পারলে খাল খনন করেও স্থানীয় জলবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয় । নদী খনন ও খালকাটা সমন্বিতভাবে করা গেলেই কেবল সুফল পাওয়া যাবে । নদী হচ্ছে বাংলাদেশের লাইফ লাইন ।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নদী খননের গুরুত্ব উপলব্ধি করে বিদেশ থেকে সাতটি ড্রেজার সংগ্রহ করেছিলেন । যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশে নেদারল্যান্ডস থেকে সহজ শর্তে ঋণ, অনুদান এবং কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের আওতায় এগুলো সংগ্রহ করেছিলেন । ১৯৭২ সালের সংগ্রহ করা কয়েকটি ড্রেজার এখনো সচল রয়েছে । ২০০৮ সাল পর্যন্ত সরকারি খাতে ড্রেজারের সংখ্যা দশটির নিচেই সীমাবদ্ধ ছিল । অর্থাৎ ১৯৭২ পরবর্তী ৩৫ বছরে বাংলাদেশে কোন ড্রেজার সংগ্রহ করা হয়নি । বর্তমানে বিআইডব্লিউটি এর হাতে ৮০ টি ড্রেজার রয়েছে । ২০২২ সালের মধ্যে ৭৩ টি নতুন ড্রেজার যুক্ত করা হয়েছে । নদী খননে বেসরকারি খাতও ভূমিকা রাখছে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাতে ১৭১ টি ড্রেজার রয়েছে। দেশের নদীগুলোতে প্রতিবছর ড্রেজিংয়ের যে চাহিদা (১৬৫.৫১ মিলিয়ন ঘনমিটার ), দেশের সরকারি বেসরকারি ড্রেজার মিলে তার অর্ধেক চাহিদা মেটানো সম্ভব ।
বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’ অনুযায়ী বড় নদীগুলো রক্ষা করাকে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা হিসাবে দেখা হয় । যার প্রেক্ষিতে ড্রেজারের একটি মেগা প্রকল্পের আওতায় ২০১৬ সালে ১১ টি নতুন ড্রেজার ক্রয় করা হয় । ২০২৪ সালেও ১০০ টি নদী খননের একটি প্রকল্প চালু ছিল । ৩৫ টি নতুন ড্রেজার ক্রয় সহ এই প্রকল্পের বাজেট ব্যয় ধরা ছিল ৪,৪৮৯ কোটি টাকা । শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষ কয়েক বছরে চীন থেকে নিজস্ব অর্থায়ন এবং সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট চুক্তির আওতায় ৩৫ টি ড্রেজার সংগ্রহ করেছিলেন (ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার ২% এরও কম, পাঁচ বছরের রেয়াদসহ ২০ বছরে পরিষদের শর্তে)। ‘ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’ এর আওতায় নেদারল্যান্ড প্রায় চার মিলিয়ন ইউরো অনুদান এবং সহায়তা দিয়েছিল, যার মধ্যে পানি ব্যবস্থাপনা অন্যতম ছিল।
নদী খননসহ পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে অধিকতর গুরুত্ব দিলেই কেবল খালকাটা কর্মসূচির সবকটি সুফল পাওয়া যাবে। এ ব্যাপারে সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে এই কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্বল্প সময়ের জন্য সামান্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বটে তবে দীর্ঘমেয়াদী সুফল পাওয়া যাবে না। এমনকি হাওরের ফসল বাঁচাতে হলেও ওই অঞ্চলের নদীগুলো দ্রুত খনন করতে হবে । হাওরে প্রতিবছর অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে ফসল রক্ষা করা যাবে না। কারণ পাহাড়ি পলি জমে নদীগুলোর তলদেশে অনেক উঁচু হয়ে গেছে । হাওরের চেয়ে নদী গভীর করা গেলেই হাওরে পানি ঢোকা বন্ধ হবে । নদীর পানি বহন ও ধারণ ক্ষমতা হ্রাস পেলে যত উঁচু বাঁধই দেয়া হোক না কেন বাঁধ ভেঙে নিচু হাওরে পানি ঢুকবেই । এটাই পানির ধর্ম।
লেখকঃ অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়