বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬, ০৫:৫৯ অপরাহ্ন

একাত্তরের গণহত্যার সাতকাহন- গোলাম মাওলা রনি

গোলাম মাওলা রনি
  • খবর আপডেট সময় : বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬
  • ৯ এই পর্যন্ত দেখেছেন

এই নিবন্ধ যেদিন পাঠকের হাতে পৌঁছাবে সেদিনের কথা আমরা কতজন নিজেদের মন, মস্তিষ্ক এবং অস্থিমজ্জায় ধারণ করি। অথচ মাত্র এক রাতের কয়েক ঘণ্টার সামরিক অভিযানে যেভাবে নির্বিচারে ১০ হাজার নিরপরাধ সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী, আমলা, ছাত্র-ছাত্রী, পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনীসহ পথচারীদের হত্যা করা হয়েছে, তার নজির সভ্য দুনিয়াতে তো দূরের কথা—অসভ্য দুনিয়ার প্রাগৈতিহাসিক জামানায়ও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে আসলে কী হয়েছিল? কেন এবং কী কারণে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের নামে রাত ১১টা ৩০ মিনিটে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয়ে এসেছিল। মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা এবং মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর মাস্টারপ্ল্যানে সেনাবাহিনী রাজারবাগ পুলিশ ফাঁড়ি, ইপিআর বা পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের সদর দপ্তর পিলখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, রোকেয়া হল এবং ইকবাল হল, যার বর্তমান নাম সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালায়।

ঠিক একই কায়দায় তারা পুরান ঢাকায় তাণ্ডব চালায়। শুধু ঢাকা শহরে কয়েক ঘণ্টার তাণ্ডবে ১০ হাজার মানুষকে হত্যার পরও নরপশুরা থেমে থাকেনি। তারা তৎকালীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে হামলা চালিয়ে সব বিদেশি সাংবাদিকদের পত্রপাঠ বিদায় করে। ঘটনার সময় একমাত্র ব্রিটিশ সাংবাদিক সায়মন ড্রিং অতি কৌশলে হোটেলের মধ্যে পালিয়ে থাকেন এবং পরবর্তীতে পুরো ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করার পর সারা দুনিয়ায় তোলপাড় হয়ে যায়।

উল্লিখিত অবস্থায় বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয় এবং সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়ে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কালের বিবর্তনে আমরা এখন কত কথা বলি—কত গালগল্পে চায়ের টেবিলে ঝড় তুলি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব, রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের মাহাত্ম্য বর্ণনার জন্য গল্প-কবিতা লিখে নোবেল পুরস্কারের আশায় পীর ফকিরদের দরবারে শিরনি দিই। অথচ মাত্র ৫৫ বছর আগে গাঙ্গেয় বদ্বীপের বাসিন্দারা যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল—একজন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার বাঁশির সুরে মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিজেদের বুক, মাথা, শরীর হানাদারদের বুলেটে ঝাঁঝরা করার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল তা আমাদের ভূখণ্ডের কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসে যেমন ঘটেনি তেমনি পৃথিবীর অন্য কোনো দেশেও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

ভারত বিভাগ এবং পাকিস্তান আন্দোলনে বাঙালি মুসলমানদের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি।

লাহোর প্রস্তাব—নিখিল ভারত মুসলিম লীগ গঠন এবং মুসলমানদের জন্য আলাদা ভূমির চিন্তা প্রথম বাঙালির মাথায় এসেছিল। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, আবুল হাসিম, খাজা নাজিমুদ্দীন, নওয়াব আলী খান, কাজী আবুল ওয়াদুদ, মওলানা আকরম খাঁ, লিয়াকত আলী খান, মোহাম্মদ আলী, নওয়াব সলিমুল্লাহসহ অসংখ্য মুসলিম নেতৃবৃন্দ একটি বৃহত্তর বাংলার সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানকে একত্র করে যে রাষ্ট্রের কাঠামোর কথা বলছিলেন তা চূড়ান্ত রূপ পায় লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে।

মুসলমান নেতৃবৃন্দ যেভাবে বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেছিলেন এবং ব্রিটিশ সরকারকে বাধ্য করেছিলেন বাংলা ও আসাম নিয়ে একটি প্রদেশ তৈরি করার জন্য, যার রাজধানী ছিল ঢাকা। কিন্তু পশ্চিম বাংলার কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের বিরোধিতার কারণে ব্রিটিশরা বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসার পর পূর্ববঙ্গের মুসলিম নেতৃবৃন্দের মন-মস্তিষ্কে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র ভূমি এবং পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের স্বায়ত্তশাসনের যুক্তি প্রবল হতে থাকে। ফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য শেরেবাংলা যে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন সেখানে স্পষ্টতই পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের কথা ছিল।

কিন্তু পাকিস্তানি আমলা, কামলা ও রাজনীতিবিদরা মোনাফেকি ও ছলচাতুরী করে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি বাদ দেন। ফলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের শুরু থেকেই পূর্ববঙ্গকে বঞ্চিত করার নীলনকশা বাস্তবায়িত হতে থাকে।
পাকিস্তানি অপশাসন-বুর্জোয়া মনোভাব এবং সামন্ততান্ত্রিক বা ফিউডাল চিন্তা-চেতনার বিরুদ্ধে বাংলার প্রথম স্বীকৃত আন্দোলন ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। কিন্তু তারও আগে অর্থাৎ পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র তিন-চার মাসের মাথায় পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের বিরোধ তৈরি হয় পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়ে। স্বাধীন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের প্রথম পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র মোট ৮-৯টি ভাষায় ছাপা হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে আরবি, ফার্সি, হিন্দি, উর্দু, ওড়িয়া, বালুচ প্রভৃতি ভাষা ছিল। কিন্তু সাড়ে সাত কোটি বাঙালির ভাষা বাংলায় কোনো প্রশ্নপত্র ছিল না।

পূর্ব-পাকিস্তানের বিখ্যাত সাংস্কৃতিক সংগঠন তমদ্দুন মজলিস সর্বপ্রথম এই ঘটনার নিন্দা জানায় এবং তাদের মুখপত্র যা কিন্তু তৎকালীন জামানার সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল সেই সৈনিক পত্রিকায় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে বাংলা না থাকায় আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।

বাঙালি সেই ১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাস থেকে যেভাবে নিজেদের অধিকারের বিষয়ে অব্যাহত লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে এসেছিল, তারই ধারাবাহিকতায় আমরা ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৬২, ১৯৬৬ সালে একের পর এক ইতিহাস গড়তে থাকি। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৬ সাল অবধি দেশের মানুষের মন-মস্তিষ্কে যেভাবে গণতন্ত্রের বীজ বপন করতে থাকেন তা ১৯৬৯ সালে এসে একটি সফল গণ-অভ্যুত্থান রূপে বিস্ফোরিত হয়।

আমাদের স্বাধীনতাপূর্ব জাতীয় জীবনে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচন একটি মাইলস্টোন। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের ফলে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের পতন হয় এবং পাকিস্তানের রাজনীতিতে ইয়াহিয়া খানের অভ্যুদয় হয়। অন্যদিকে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলে স্বায়ত্তশাসনের জন্য আন্দোলনরত বাঙালি স্বাধীনতাযুদ্ধের দিকে এত দ্রুত ধাবিত হতে থাকে যে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার মাথা খারাপ করে দেয়। যে বাঙালি স্বায়ত্তশাসনের জন্য লড়াই করছিল এবং বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুকে যেখানে পাকিস্তানিরা এক প্রাদেশিক নেতা হিসেবে মূল্যায়ন করত সেই নেতা ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য জনরায় পেয়ে বসেন।

আলোচনার শুরুতেই বলেছি যে বর্তমান পাকিস্তান অর্থাৎ ১৯৭১ সালের পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে একটি ফিউডাল মনমানসিকতা রয়েছে এবং সেই কারণে তারা আমজনতাকে প্রজা এবং পূর্ব পাকিস্তানের লোকজনকে দ্বিতীয় শ্রেণির প্রজা মনে করত। ফলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় এবং বঙ্গবন্ধুর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিষয়টি সামন্ততান্ত্রিক পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আঁতে প্রচণ্ড আঘাত হানে। তারা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ছলচাতুরী এবং বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। ফলে পুরো বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করার জন্য চাপ দেয়। তারা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার নকশা তৈরি করে এবং ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ২ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করা হয়। ছাত্রদের দাবির মুখে বঙ্গবন্ধু পরের দিন অর্থাৎ মার্চের ৩ তারিখ তাঁর ৩২ নম্বর বাসভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করার পরই পাকিস্তানের সামরিক জান্তারা বুঝে নেয়—বাঙালি যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে। এরপর ৭ই মার্চের ভাষণ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তেজনা দমনের জন্য পাকিস্তান সরকার ২৫শে মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইট পরিচালনা করে এবং ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা ঘটায়। ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটিকে জাতীয় গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও ২০২৫ সালে ড. ইউনূস সরকার অজ্ঞাত কারণে দিনটিকে রীতিমতো উপেক্ষা করে মূলত মুক্তিযুদ্ধকে অপমান করেছে।

লেখক : গোলাম মাওলা রনি, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক সংসদ 

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102