

ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ মঙ্গলবার বিএনপির পক্ষে গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দেশের অর্থনৈতিক চাল-চিত্র তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি।’
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিদ্যুৎ-জ্বালানি-পরিবহন-খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারের ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতিতে জনগণের ত্রাহি অবস্থা, জনজীবন বিপর্যস্ত। সামষ্টিক অর্থনীতির প্রায় সবকয়টি সূচকই আরও দুর্বল ও প্রকট হয়ে উঠেছে। এক কথায় দেশের অর্থনীতি এক মহাসংকটে নিমজ্জিত।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘গত আগস্টে সরকারি হিসেবে মূল্যস্ফীতি দেখানো হয়েছে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। বর্তমান মূল্যস্ফীতি কমছে দেখানো হলেও খাদ্যবর্হিভূত মূল্যস্ফীতি এখনো প্রায় দুই অঙ্কের কাছাকাছি রয়েছে। জানুয়ারি মাসে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে। অথচ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সাধারণ মূল্যস্ফীতি দেখাচ্ছে ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ আর খাদ্য মূলস্ফীতি ৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এর সঠিকতা নিয়ে খোদ অর্থনীতিবিদরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বারবার মূল্য বৃদ্ধি, আদানি গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি, দেশের রিজার্ভ তলানি নেমে আসা, নজিরবিহীন ডলার সংকট, ডলারের বিনিময়ে টাকার অভূতপূর্ব অবমূল্যায়ন, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে অব্যবস্থাপনা, অপরিনামদর্শী ভ্রান্তনীতি, লাগামহীন দুর্নীতি, বিদেশে অর্থ পাচার, ঋণ খেলাপি বৃদ্ধি পাওয়া, ঋণ প্রাপ্তির অপর্যাপ্ততা, অর্থনৈতিক আয় বৈষম্য, সুশাসনের অভাব এবং গণতন্ত্র না থাকার কারণে দেশে অর্থনৈতিক নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আইএমএফের কাছে পাঠানো পত্রে সরকার বিরাজমান অর্থনৈতিক দুর্যোগের কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কঠিন শর্তে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছে। বলতে গেলে তারা এখন ব্যাংক থেকে ধার করে এবং আইএমএফের ঋণের ওপর ভর করেই চলছে।
দেশের অর্থনৈতিক সংকট সরকার কেনো স্বীকার করছে না জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘সরকারের না দেখার প্রধান কারণ হচ্ছে এই সরকারের কোনো জবাবদিহিতা নেই। এই অনির্বাচিত সরকার সবসময় মিথ্যা প্রচারণা, ভয়-ভীতি-ত্রাস সৃষ্টি, গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে তারা সার্বক্ষনিকভাবে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে গোয়েলবসের মতো। যারা ফ্যাসিস্ট হয়, ডিক্টেটর হয় তাদের জন্য এই প্রচারণা জরুরি হয়। একটা মিথ্যা ধারণার মধ্যে জনগনকে রাখতে চায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান ব্যবস্থায় লাভবান হচ্ছে এই সরকারের সঙ্গে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত ব্যবসা-বাণিজ্যে করছে এবং সো-কল্ড পলিটিশিয়ান। সাধারণ ও খেটে খাওয়া মানুষ ভুক্তভোগীই থেকে যাচ্ছে।’
এই অবস্থায় সরকারকে কী পরামর্শ দেবেন জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এই সরকারকে সরে যেতে হবে। এই সরকার সরে গিয়ে দেশে যে ট্রাষ্ট- এটা সৃষ্টি হবে। তখন এইগুলো সমস্যা সমাধানের জন্য যোগ্য যারা ব্যক্তি কাজ করতে পারেন তাদের নিয়ে এসে সমস্যা সমাধান অত্যন্ত দ্রুত করা সম্ভব হবে।
আইএমএফ থেকে নেওয়া ঋণের প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে দেশের অবস্থা আজ এমন শোচনীয় অবস্থায় যেতো না। অনেকে মনে করেন, আইএমএফের ঋণে সংকট কাটবে না। এই ঋণ বরং পেটে যাবে, কষ্ট বাড়বে সাধারণ জনগনের। ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতের সংস্কার এবং নীতি সংস্কার করে খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার না করলে, শক্তভাবে দুর্নীতি ও অর্থ পাচার রোধে ব্যর্থ হলে যে সূত্র হতেই ঋণের টাকা আসুন নানা কৌশলে শেষ পর্যন্ত তা লুণ্ঠন করবে।
সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য আর্থিক খাতে সংস্কার, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার উন্নতি, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালীকরণ, কর শুল্ক, আর্থিক খাত, ব্যাংকিং সেক্টর, বাজেট ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য নীতির সংস্কার করা আবশ্যক বলে মনে করেন বিএনপি মহাসচিব।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এখন প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্ত আইনের শাসন এবং প্রকৃত অর্থেই জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি গণতান্ত্রিক সরকার। বিএনপি আশা করে বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আর্থিকথাতে কার্যকর সংস্কার সাধণে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য আইএমএফ বিশেষ সহযোগিতার হাত বাড়াবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সরকার পরিবর্তনে ১০ দফা দাবি আদায়ে আন্দোলন করছি, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সমগ্র জনগণ নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ২৭ দফা বাস্তবায়নে কাংখিত জাতীয় সরকার গঠন করবে। আমরা বিশ্বাস করি, বিএনপির নেতৃত্বে চলমান আন্দোলনে বিজয়ের মাধ্যমে আগামী দিনে দেশের চলমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট দুরীভূত করা সম্ভব হবে, ইনশাল্লাহ।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘প্রশ্ন হল রিজার্ভ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিক্রি হচ্ছে অথচ খাদ্য, ভোজ্য তেল, চিনি এমনকি ওষুধ শিল্পের কাঁচামালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির এলসি খুলতে ডলার দিতে পারছে না সরকার। ব্যাংকগুলো ডলারের অভাবে এলসি মূল্য পরিশোধ না করায় খাদ্য ও পণ্যবাহী জাহাজ প্রায় এক মাস ধরে সাগরে ভাসছে। পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। স্বনামধন্য একজন অর্থনীতিবিদ দেশে ডলার সংকটের চারটি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেনঃ (১) আমদানির ওভার ইনভয়েসিং, (২) রপ্তানির আন্ডার ইনভয়েসিং, (৩) রপ্তানি আয় দেশে ফিরিয়ে না আনা, (৪) ব্যাংক থেকে নেওয়া বিপুল পরিমাণ ঋণের অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হয়ে যাওয়া। ‘
তিনি বলেন, ডলার সংকটে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসহ জ্বালানি আমদানি প্রায় বন্ধ। অন্যান্য অবৈধ পন্থায় ডলার পাচার এলার্মিং পর্যায়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডলারের অভাবে আমদানি মূল্য পরিশোধ করতে না পারায় চিনি ও ভোজ্যতেল বোঝাই জাহাজ ১ মাসেরও অধিকাল সাগরে ভাসছে এবং পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না, যা রমজান উপলক্ষে আমদানি করা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের রোজা পালনের সময়ে ব্যাপক সরবারহ ঘাটতি সৃষ্টি করবে বলে বাজার ব্যবস্থাপকরা আশাংকা করছেন।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, এবারের হজ পালনকারীদের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে। হজ প্যাকেজের সর্বনিম্ন ব্যয় এক বছরে বেড়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৬১৮ টাকা। এদিকে ডলার সংকটে কয়লা আমদানি করতে না পারায় বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার মাত্র ২৭ দিনের মাথায় বন্ধ হয়ে গেছে বহুল আলোচিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। ডলার সংকটে এলসি খুলতে পারছে না পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ।’
রিজার্ভ তলানিতে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) ১১২ কোটি ডলার পরিশোধের পর সরকারি হিসাব মতে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছিল ৩২ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ২৫৭ কোটি ডলার। কিন্তু আইএমএফের হিসাবে এর মধ্যে ৮ বিলিয়ন বা ৮০০ কোটি ডলার ব্যবহারযোগ্য নয় বিধায় রিজার্ভ দাঁড়ায় ২৪ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৪৫৭ কোটি ডলারে। বর্তমানে প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, ‘রিজার্ভের পরিমাণ সেটি বড় কথা নয়, রিজার্ভ একবার কমতে শুরু করলে সামাল দেওয়া কঠিন, এর প্রবণতাটা গুরুত্বপূর্ণ।’
ব্যাংকিং সেক্টরে নৈরাজ্য চলছে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, গত ৬ মাসে ব্যাংকের অতিরিক্ত ক্যাশ লিকুডিটি কমেছে ৫৭ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। ব্যাংকিং সেক্টরে নৈরাজ্য ও মালিক পক্ষের দৌরাত্বের সঙ্গে না পেরে উঠে সম্প্রতি বড় বড় ব্যাংকের এমডিদের পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে। যা আমানতকারিদের মনে আতংকের সৃষ্টি করেছে।
খেলাপি ঋণ বেড়েছে গত ১০ বছরে তিন গুণেরও বেশি এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে অব্যাহতভাবে অর্থ পাচার বাড়ছে বলে জানান বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, গত ৬ বছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। চীন ও রাশিয়া থেকে নেওয়া কঠিন শর্তের ঋণের গ্রেইস পিরিয়ড ২/৩ বছরের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে ২০২৪ সালে থেকেই ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বর্তমানের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে। সে সময় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন মির্জা ফখরুল।
তিনি বলেন, সরকার গত ১২ বছরে রাষ্ট্রের স্বার্থ বিকিয়ে গোষ্ঠী স্বার্থ চরিতার্থের হীন উদ্দেশ্যে নানা ধরনের আর্থিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। যার কুপ্রভাব এখন স্রেফ জনগণকে বহন করতে হচ্ছে। গোড্ডায় আদানি গ্রুপের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে মনে হয় ‘বাংলাদেশ গাড্ডায় পড়েছে’। কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও আদানিকে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে বছরে প্রায় সাড়ে ৪০০ মিলিয়ন ডলার দিতে হবে বাংলাদেশকে। আগামি ২৫ বছরে দিতে হবে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা।
মির্জা ফখরুল বলেন, দেশের পাইকারি বিদ্যুতের বাজার মূল্যের ৫ গুণেরও বেশি দামে আদানির বিদ্যুৎ কিনবে বাংলাদেশ। শেয়ার কারসাজির সঙ্গে সাথে আদানি গ্রুপ কয়লার দামেও কারসাজি শুরু করেছে বলে জানা যায়। জাহাজ ভাড়াসহ গোড্ডায় ব্যবহৃত কয়লার দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ২০০ ডলার হলেও তারা টন প্রতি ২০০ ডলার বাড়িয়ে বাংলাদেশের কাছে প্রতি টন ৪০০ ডলারে বিক্রির জন্য চিঠি দিয়েছে। আদানির সঙ্গে করা এই চুক্তিকে ‘অদ্ভুত’ আখ্যায়িত করে নতুন করে আবার আলোচনার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে বিদ্যুৎখাতে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে গত ১০ বছরে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা দলীয় ব্যবসায়ীদের পাইয়ে দিয়েছে সরকার।’
গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে থেকে যদি আর কোনো নতুন চুক্তি নাও করা হয় তবুও কুইক রেন্টাল চলবে ২০২৬ পর্যন্ত এবং ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে ২০৫১ পর্যন্ত। অন্যান্য মেগা প্রজেক্টেরর কথা নাই বা উল্লেখ করা হলো। সরকার বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকটের জন্য ইউক্রেন যুদ্ধ ও বৈশ্বিক রাজনীতিকে দায়ী করে থাকে- যা সত্য নয় বলে মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব।
নিউজ/এম.এস.এম