বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ০৩:৫৭ পূর্বাহ্ন

শায়েস্তাগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী ট্রেনে অব্যবস্থাপনা

জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসে বিভীষিকাময় যাত্রার অভিজ্ঞতা

এম এ আহমদ আজাদ
  • খবর আপডেট সময় : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
  • ১৮ এই পর্যন্ত দেখেছেন

হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশন স্টেশনে সোমবার (১৮ মে) দুপুরের পর থেকেই ঢাকাগামী যাত্রীদের ভিড়ে সরগরম হয়ে ওঠে পুরোস্টেশন এলাকা। বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে আন্তঃনগর জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসপ্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতেই শুরু হয় চিরচেনা হুড়োহুড়ি। দরজার সামনেঠেলাঠেলি, জানালা দিয়ে ব্যাগ ছুড়ে সিট দখলের চেষ্টা, শিশুকোলেরমায়েদের অসহায় দৌড়ঝাঁপসব মিলিয়ে যেন এক বিশৃঙ্খল দৃশ্য।

এই প্রতিবেদক জেবগির শোভন চেয়ার ৫১ ৫২ নম্বর আসনের টিকিটনিয়ে ট্রেনে ওঠেন। কিন্তু বগির ভেতরে ঢুকেই চোখে পড়ে ভয়াবহ চিত্র।৫০ আসনের বগিতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। প্রতিটি সিট পূর্ণ। তারওপর অন্তত ২৫ জন যাত্রী দাঁড়িয়ে। কেউ সিটের মাঝখানে, কেউ দরজারসামনে, কেউ আবার টয়লেটের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন।

ট্রেন ছাড়ার কিছু সময়ের মধ্যেই দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সংখ্যা আরওবাড়ে। বগির ভেতরে এমন গাদাগাদি অবস্থা তৈরি হয় যে স্বাভাবিকভাবে নড়া চড়া করাও কঠিন হয়ে পড়ে। গরমে হাঁসফাঁস করতে দেখা যায়যাত্রীদের। শিশু বয়স্ক যাত্রীরা ছিলেন সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে। নিজের আসনে  বসতে যুদ্ধ করতে হয়েছে।

নির্ধারিত আসনের কাছে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বসে আছেন দুইব্যক্তি। অসুস্থতার কথা জানিয়ে অনুরোধ করলে একজন উঠে দাঁড়ান।কিন্তু আরেক যুবক সিট ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। তার যুক্তি—“সিটখালি যাবে কেন?”

বিতর্ক এড়িয়ে পরিস্থিতি মেনে নিলেও পুরো যাত্রাপথে ওই যুবক পাশেইব বসে ছিলেন এতে বৈধ টিকিটধারী যাত্রীদের অধিকার নিয়েও প্রশ্নউঠেছে। পা ঘণ্টায় একজন টিটিই চোখে পড়েনি

ট্রেনের ভেতরে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিলপুরো পাঁচ ঘণ্টার যাত্রায়একজন টিটিইকেও (Travelling Ticket Examiner) দেখা যায়নি।সাধারণত আন্তঃনগর ট্রেনে টিটিইদের দায়িত্ব থাকে যাত্রীদের টিকিটপরীক্ষা, আসন যাচাই, বিনা টিকিটে যাত্রী শনাক্ত জরিমানা আদায়করা। কিন্তু জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসের ওই বগিতে যেন কোনো নিয়ন্ত্রণই ছিলনা।

ফলে কারা বৈধ টিকিটধারী আর কারা অবৈধভাবে ট্রেনে উঠেছেন, তাবোঝার কোনো উপায় ছিল না। বগির ভেতরে কয়েকজন যাত্রীকে বলতেশোনা যায়, “টিটিই নাই বলেই সবাই উঠে পড়ে। কেউ দেখার নেই।যাত্রীদের অভিযোগ, নিয়মিত টিকিট চেকিং না থাকায় এখন অনেকেইটিকিট ছাড়াই বা অন্যের সিট দখল করে যাতায়াত করছেন।

বৈধ যাত্রীদের পাশাপাশি ছিলো হকাদের ও ভিক্ষুকদের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি। মনে হয়েছে প্রতি মিনিটে হকার না হয় ভিক্ষুক আসছেন। তাহলে ট্রে যাত্রার আরম কোথায়! ভিক্ষুকরা যেমন আসছে দলবে তেমনি হকাররা আসছে কের পর এক। সবাই নানা রকম গজল, গানের করি বলছে। হকাররা তাদের মালামালের বিজ্ঞাপন বলছেন। এটা বিচিত্র এক দৃশ্য !

দমবন্ধকর যাত্রা

আতঙ্কে নারী শিশুরা শায়েস্তাগঞ্জ থেকে ঢাকার পথেবগির ভেতরে মানুষের চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে কয়েকজন নারীযাত্রীকে শিশু কোলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বয়স্ক কয়েকজন যাত্রীকেদীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। অনেকেই বিরক্তি প্রকাশ করলেওপরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাউকে দেখা যায়নি।

বগির সংযোগস্থল টয়লেটের সামনেও যাত্রী দাঁড়িয়ে থাকায় চলাচলে সৃষ্টি হয় চরম ভোগান্তি। ভেতরের পরিবেশ ছিল গরম অস্বস্তিকর।

বিমানবন্দর স্টেশনে নেমেইগায়েব অর্ধেক যাত্রী

রাত ৮টা ১০ মিনিটেরদিকে ট্রেনটি ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশনে পৌঁছায়। এর কিছুক্ষণ আগেদাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের আবার গুনে দেখা যায় প্রায় ৩৫ জন। কিন্তুবিমানবন্দর স্টেশনে ট্রেন থামতেই মুহূর্তের মধ্যে অর্ধেকের বেশি যাত্রী ট্রেন থেকে নেমে যান। কয়েক মিনিট আগেও যেখানে দাঁড়িয়ে থাকার জায়গা ছিলনা, সেই বগিই হঠাৎ অনেকটা ফাঁকা হয়ে যায়। বেশ কয়েকটি সিটওখালি দেখা যায়।

এই দৃশ্য দেখে অনেক যাত্রী প্রশ্ন তুলেন যারা মাঝপথে নেমেগেলেন, তারা কি বৈধ টিকিটধারী ছিলেন? যদি ট্রেনে নিয়মিত টিকিটপরীক্ষা হতো, তাহলে কি এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো?

কমলাপুর স্টেশনে গিয়ে শুরু টিকিট চেকিং এরপর তেজগাঁও মগবাজার স্টেশনে  আরও কিছু যাত্রী নেমে যান। রাত সাড়ে ৮টার দিকে ট্রেনটি কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছায়। মজার বিষয় হলো, পুরো যাত্রাপথে ট্রেনে টিটিই না থাকলেও স্টেশনের গেটে দেখা যায় টিকিট কালেক্টরদের (টিসি) কড়াকড়ি। তারা যাত্রীদের টিকিট পরীক্ষা করছিলেন এবং কয়েকজনকে জরিমানা করছিলেন।

এই প্রতিবেদকের টিকিট দেখেও প্রথমে সন্দেহ প্রকাশ করেন এক টিসি।তিনি বলেন, “কালোবাজার থেকে টিকিট কিনছেন মনে হয়।

পরে টিকিটে নাম মিলিয়ে ভুল বুঝতে পেরে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।তবে সঙ্গে থাকা কয়েকজন যাত্রীকে নগদ ২০০ টাকা করে জরিমানা দিতে দেখা যায়।

যাত্রীদের প্রশ্নট্রেনের ভেতরে যদি কোনো তদারকি না থাকে, তাহলেশেষ স্টেশনে এসে এমন চেকিং করে আসলে কতটা লাভ হচ্ছে? কারণ আগেই অধিকাংশ অনিয়মকারী যাত্রী নেমে যাচ্ছেন।

রেলওয়ে পুলিশেরও দেখা নেই পুরো যাত্রাপথে ট্রেনের বগির ভেতরে রেলওয়ে পুলিশের কোনো সদস্যকে দেখা যায়নি। ফলে যাত্রী নিরাপত্তানিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

যাত্রীদের মতে, টিটিই রেলওয়ে পুলিশের নিয়মিত উপস্থিতি থাকলে আসন দখল, অতিরিক্ত যাত্রী, বিনা টিকিটে ভ্রমণ এবং সম্ভাব্য অপরাধঅনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো।

প্রশ্নের মুখে রেলের সেবা তদারকি

বাংলাদেশ রেলওয়ে যাত্রীসেবা উন্নয়ন রাজস্ব বৃদ্ধির নানা উদ্যোগের কথা বললেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে অতিরিক্ত যাত্রী, টিকিটহীন ভ্রমণ, আসন বিশৃঙ্খলা এবং তদারকির অভাব এখনি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

শায়েস্তাগঞ্জ থেকে কমলাপুর পর্যন্ত জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসের এই পাঁচ ঘণ্টারযাত্রা শেষে যাত্রীদের একটাই প্রশ্ন

ট্রেনের ভেতরে যদি দায়িত্বশীল কেউ না থাকে, তাহলে যাত্রী নিরাপত্তা শৃঙ্খলা নিশ্চিত করবে কে?” প্রতিবেদনে উঠে এসেছে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসের একটি বগির কথা। আর ১৫/২০ বগির অবস্থাকি তা  অবশ্যই চিন্তার বিষয়। এসব অনিয়মের বিষয়ে রেল মন্ত্রনালয়ের আশু সুদৃষ্টির প্রয়োজন।

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102