রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ১২:৪২ অপরাহ্ন

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর

প্রধান প্রকোশলীর দুর্নীতি ও অনিয়ম: তদন্ত কমিটিতে পার পেয়ে যায় অজানা রহস্যে

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • খবর আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৩
  • ১৭৬ এই পর্যন্ত দেখেছেন

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমানের দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রমান পাওয়ার পরও কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না তদন্ত কমিটি।  পিপিএ ২০০৬ এর ২৪ নং আইন ও পিপিআর ২০০৮ এর সংশ্লিষ্ট বিধি লঙ্ঘিত কমিটি গঠন হয়, তদন্তও হয় কিন্তু অজানা রহস্যে পার পেয়ে যায়।

কৌশলে অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের বা সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লাভবান হওয়ার বিষয়টি নতুন নয়। সরল দৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে সব ঠিকই আছে। কিন্তু সঠিক অনুসন্ধান করলেই প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসে। তবে অনেক সময় অনিয়ম তদন্তে কমিটি গঠন হয়, তদন্তও হয় কিন্তু অজানা রহস্যে পার পেয়ে যায় দুর্নীতিবাজরা। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এসব অনিয়ম-দুর্নীতি গণমাধ্যম চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও কী এক অজানা ক্ষমতায় বহাল তবিয়তে থাকছেন কতিপয় দাপুটে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারীরা। আর ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলে নানা অজুহাতে হয়রানী করছেন ন্যায় পরায়ন সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।

সারাদেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের (ডিপিএইচই) কাজ। আর এসব কাজের জন্য পাওয়া বিভিন্ন বরাদ্দ থেকে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কৌশলে সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী আত্মসাৎ করেছেন কোটি কোটি টাকা। শুধু অর্থ আত্মসাতই নয় সহকর্মীদের সাথে দুর্ব্যবহার ও হয়রানী, চাকরিতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে জালিয়াতি, চাকরির দেয়ার নামে যৌন লালসা পুরণ এবং অধীনস্থ নারী কর্মীদের যৌন হয়রানী, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শৌচাগার নির্মাণ প্রকল্পে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করে ৩৬০ কোটি টাকা আত্মসাৎ, কমিশন বাণিজ্যে, অবৈধ সম্পদ অর্জন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংস্থাটিতে তিনিই যেন অনিয়ম-দুর্নীতির নাটের গুরু। এরই মধ্যে ভুক্তভোগীরা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আলাদা আলাদাভাবে দিয়েছেন অভিযোগ। এরই ধারাবাহিকতায় একটি প্রকল্পের দরপত্রে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমানের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ণ ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ।

জানা গেছে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর কর্তৃক বাস্তবায়নাধিন ‘পানির গুনগতমান পরীক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পের আওতায় দুইটি দরপত্রে ‘স্টালিং মাল্টি টেকনোলজিস লিমিটেড’ নামের প্রতিষ্ঠান অনিয়মের অভিযোগে পুনর্মূল্যায়নের দাবি তোলে। এই প্রকল্পের আইডি দুটিতে মোট ৫৭ কোটি ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ৮’শ টাকার কাজ। এই দাবির প্রেক্ষিতে অভিযোগ তদন্তে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. খাইরুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অপর সদস্যরা হলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. জসিম উদ্দিন ও উপ-সচিব ড. মো. বেলাল হোসেন। অভিযোগকৃত প্রকল্পের দরপত্র দুটির আইডি নম্বর হলে ৬৪৬৯২৪ ও ৬৪৭২৭৮। এর মধ্যে ৬৪৬৯২৪ আইডি হলো ২৮ কোটি ৮৪ লাখ ১৫ হাজার ৪’শ টাকা এবং ৬৪৭২৭৮ আইডি হলো ২৮ কোটি ৮৪ লাখ ১৫ হাজার ৪’শ টাকার। তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, প্রধান প্রকৌশলী প্রকল্প দুটিতে অনিয়ম চলমান রেখেছেন কারন তিনি এই অনিয়মে জড়িত ছিলেন।

তিনি এ প্রকল্প দুটিতে গুরুতর অনিয়ম করেছেন। প্রধান প্রকৌশলীর খামখেয়ালিপনা, অসদাচরন ও অসচ্ছতার কারণে পিপিএ ২০০৬ এর ২৪ নং আইনের উদ্দেশ্য ব্যহত হয়েছে। এছাড়াও পিপিআর ২০০৮ এর সংশ্লিষ্ট বিধি লঙ্ঘিত হয়েছে। অপরদিকে প্রকল্প পরিচালক মুন্সি হাসানুজ্জামান তদন্তে স্বীকার করেছেন প্রকল্পের সকল কার্যক্রম ডিপিএইচই প্রধান প্রকৌশলীকে অবহিত করা হয়েছে এবং তার নির্দেশক্রমেই সম্পন্ন হয়েছে।

তদন্ত কমিটি তাদের ৫ দফা সুপারিশের চতুর্থ দফায় সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ) এর স্মারক নং ৫১৮, তারিখ-২০/০৭/২০২২ ইং বরাতে প্রধান প্রকৌশলী সহ তার কার্যালয়ের অস্বচ্ছতা, খামখেয়ালিপনার কারণে পিপিএ-২০০৬ এবং পিপিআর-২০০৮ এর বিধিসমুহ লংঘন হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে বলে সুপারিশ করেন। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমানের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকল্পের দরপত্র আইডি দুটির ব্যাপারে আমার কাছে যা জানতে চেয়েছে তা আমি লিখিত দিয়ে এসেছি। এর বাইরে আমি অন্য কিছু বলতে চাই না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে পদোন্নতি পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে সাইফুর রহমান অবিশ্বাস্যভাবে পেয়েছেন পদোন্নতি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের অধীন একটি প্রকল্পে সহকারী প্রকৌশলী পদে দৈনিক হাজিরা ভিত্তিতে ১৯৮৯ সালে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে তাঁর চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তর হয়।

ফাউন্ডেশন ট্রেনিং ও বিভাগীয় পদোন্নতি পরীক্ষা না দিয়েই ২০১৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সহকারী প্রকৌশলী (ক্যাডার) পদে ক্যাডারভুক্ত হন। আর সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে ক্যাডারভুক্ত হয়ে মাত্র তিন মাসের মাথায় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পান। এরপর মাত্র সাত মাসের মধ্যে ২০১৮ সালের জুলাই মাসে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান।

আর মাত্র ১২ দিনের মধ্যে ওই বছরের ৮ আগস্ট অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্ব পান তিনি। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে দায়িত্ব পাওয়ার মাত্র তিন মাসের মধ্যে প্রধান প্রকৌশলী পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পান মো. সাইফুর রহমান। এভাবে পদোন্নতি পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সূত্র মতে, এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে একাধিকবার প্রধান প্রকৌশলীর সংশ্লিষ্টতা পেলেও অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তিনি সর্বদাই রয়ে গেছেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

নিউজ/এম.এস.এম

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102