

পাসপোর্টের মতোই জরুরি ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার চিন্তা করছে সরকার। সেক্ষেত্রে ড্রাইভিং পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ের আগে দেওয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে। বিধি অনুযায়ী, শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্স
আবেদনের দুই মাস পর পরীক্ষা নেওয়ার নিয়ম। আবেদনের চাপ থাকলে আরও পরে সুযোগ মেলে। তবে জরুরি প্রয়োজনে এ বাধ্যবাধকতা শিথিল করে যে কোনো সময়ে পরীক্ষা নেওয়া হবে। এ জন্য ১০ হাজার টাকা ফি নির্ধারণ করা হচ্ছে। এ সংক্রান্ত প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে প্রজ্ঞাপন জারি করা হতে পারে। এ অবস্থায় তদবির ঠেকাতে এই বিশেষ ফি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বিআরটিএ।
বর্তমানে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে ভোগান্তি রয়েছে। আবেদনের পর পরীক্ষা দেওয়া ও স্মার্ট কার্ড হাতে পাওয়াসহ নানা ধাপে দুর্ভোগ রয়েছে। চাকরির আবেদন ও বিদেশ গমনের স্বার্থে অনেকেই দ্রুত লাইসেন্স পেতে চান। কিন্তু বিদ্যমান ব্যবস্থাপনা ও আইনি জটিলতার কারণে বেগ পেতে হচ্ছে। কারণ শিক্ষানবিশ লাইসেন্স বা লার্নারের পর ন্যূনতম দুই মাস অপেক্ষা করতে হয় পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য। সময় এগিয়ে নিলে বিশেষ আবেদন করতে হয় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের (এডিএম) কাছে। কিন্তু এক্ষেত্রে ‘মাধ্যম’-এর সহায়তা নিতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হন সাধারণ আবেদনকারীরা।
অভিযোগ আসে অর্থ লেনদেনের। পরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করে জরুরি পরীক্ষা দেওয়া হচ্ছে। স্বচ্ছতার স্বার্থে চাকরির আবেদন ও বিদেশ গমনের প্রমাণপত্র দাখিল করতে হয়। কিন্তু সারাদেশের আবেদনকারীদের পক্ষে বিআরটিএ সদর দপ্তরে এসে এই জরুরি আবেদনের যৌক্তিকতা প্রদর্শন কঠিন।
এর মধ্যে অনেকেই ‘পরিচিত মাধ্যমের’ সহায়তা চান। কেউবা তদবির করার চেষ্টা করেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী পরীক্ষার তারিখ এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সংস্থাটি। বিদ্যমান সড়ক পরিবহন বিধিমালা ২০২২-এ জরুরি ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের নতুন খাতটি অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে সেই চিন্তা থেকেই। বিধিমালার তফসিল ১-এ ‘পরীক্ষার তারিখ অগ্রায়ন ফি’ শীর্ষক নতুন খাতে ১০ হাজার টাকা ফি উল্লেখ করা হতে পারে।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, সড়ক পরিবহন বিধিমালা ২০২২-এর বিধি ৬-এর উপবিধি ৮-এ বলা আছে- শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ দুই মাস অতিক্রান্ত না হলে কোনো প্রার্থী দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না। তবে চাকরির আবেদন ও বিদেশ গমনের প্রয়োজনে প্রমাণ দাখিলসাপেক্ষে সময়সীমার এই বাধ্যবাধকতা শিথিল করতে পারবে কর্তৃপক্ষ। সে হিসাবেই বিধিমালার ৬-এর উপবিধি ৮ সংশোধন করতে চাইছে বিআরটিএ।
একাধিক পরিবহনকর্মী বলছেন, বিধিমালায় যেহেতু বিশেষ প্রয়োজন তথা চাকরি বা বিদেশ গমনের প্রমাণ দাখিলসাপেক্ষে জরুরি পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে, সে জন্য নতুন করে ফি নির্ধারণের চিন্তাটি সাংঘর্ষিক। তবে জরুরি ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে ডেলিভারির দিনক্ষণ উল্লেখ করে বাড়তি ফি নির্ধারণ করা যেতে পারে। অবশ্য জরুরি প্রমাণপত্র দাখিলের পর বাড়তি ফি নির্ধারণ যৌক্তিক কিনা প্রশ্ন উঠতে পারে।
সড়ক পরিবহন-২০২২ বিধিমালাটি প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হয় গত ২৭ ডিসেম্বর। এর পরের সপ্তাহ থেকে ৫১ ধরনের সেবামূল্য বাড়তি হারে আদায় করা হচ্ছে। এখন নতুন করে ফি নির্ধারণে আরেকটি খাত অন্তর্র্ভুক্ত করতে চাইছে বিআরটিএ।
সদ্য প্রকাশিত সড়ক পরিবহন বিধিমালায় কিছু নতুন ফি ধার্য করা হয়েছে। যেমন- গণপরিবহন চালানোর জন্য চালককে লাইসেন্সের পাশাপাশি অনুমোদন নিতে হবে। দিতে হবে ৫শ টাকা। সড়ক আইন ভেঙে নম্বর কাটা গেলে পুনর্বিবেচনার জন্য ২শ টাকা দিয়ে আবেদন করা যাবে। যানবাহনে বিজ্ঞাপন প্রচার করলে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা ফি দিতে হবে। মোটরযান মেরামত কারখানা বা ওয়ার্কশপ, মোটর ড্রাইভিং স্কুলের নিবন্ধন নবায়ন, স্কুল পরিদর্শন, বিআরটিএ থেকে পরিচিতমূলক পুস্তিকা সংগ্রহ, কন্ডাক্টরের লাইসেন্সের প্রতিলিপি উত্তোলনে নতুন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। আর সেবা ফি বৃদ্ধির সর্বনিম্ন হার প্রায় ১৩, সর্বোচ্চ ৩০০। ১২টি সেবার মূল্য ১০০ শতাংশের বেশি বাড়ানো হয়েছে। আর ১০টি সেবার ক্ষেত্রে নতুন ফি আরোপ করা হয়েছে।
গাড়ি চালনায় ড্রাইভিং লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। শিক্ষানবিশ আবেদন বা লার্নার থেকে শুরু করে অপেশাদার লাইসেন্সের স্মার্ট কার্ড নিতে সাড়ে ৩ হাজার টাকার মতো লাগবে। আগে তা ছিল সাকল্যে ৩ হাজার টাকা। লাইসেন্সের আবেদন থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে ৯ ধরনের ফি রয়েছে- শিক্ষানবিশ লাইসেন্স, শিক্ষানবিশ লাইসেন্স নবায়ন, প্রতিবার দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা (অকৃতকার্য হলে), লাইসেন্স ইস্যু ফি, বার্ষিক লাইসেন্স ফি, বার্ষিক বিলম্ব ফি, ঠিকানা পরিবর্তন, শ্রেণি বা ধরন পরিবর্তন, প্রতিলিপি ফি ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে ব্যয় বেড়েছে ৩৩ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত। যানবাহনের নিবন্ধনের ফি ছাড়াও প্রতিবছর এর মালিকদের সড়ক কর, অগ্রিম আয়করসহ নানা কর দিতে হয়।
মাঝেমধ্যেই তা বাড়ানো হয়। ভাড়ায় চালিত যানবাহনের ক্ষেত্রে বাড়তি হিসেবে চলাচলের অনুমতিসহ বিভিন্ন খাতে বাড়তি খরচ করতে হয়। দেশে এতদিন ১ হাজার ৪শ সিসির (ইঞ্জিন ক্ষমতা) একটি সেডান কারের (প্রাইভেট কার) নিবন্ধন ফি ছিল ৪৯ হাজার টাকা, যা বাড়িয়ে ৬০ হাজার টাকা করা হয়েছে। ভাড়ায় চালিত যাত্রীবাহী ৫২ আসনের একটি বাসের নিবন্ধন ফি ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে, যা ছিল ১৭ হাজার ২৫০ টাকা। আন্তঃজেলা পরিবহনের ক্ষেত্রে চলাচলের অনুমতির ফি শ্রেণিভেদে ছিল বছরে ৫২০ থেকে ১ হাজার ৬৯০ টাকা। এখন তা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯শ থেকে ২ হাজার ৫শ টাকা। ব্যক্তিগত গাড়ি বা যানের মালিককে নিবন্ধনের বাইরেও সড়ক ব্যবহারের কর, আয়কর, মালিকানা বদলি, দলিলাদি হারিয়ে গেলে পুনরায় তোলা এবং ফিটনেস সনদের জন্য ফি দিতে হয়।
অন্যদিকে, ভাড়ায় চালিত যানবাহনের ক্ষেত্রে বাড়তি হিসেবে তাদের চলাচলের অনুমতিসহ বাড়তি খরচ করতে হয়। এর বাইরে বিধিমালা অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য তহবিল গঠনের লক্ষ্যে যানবাহন মালিকদের এককালীন অর্থ দিতে হবে। বাস-ট্রাকের জন্য তা ১ হাজার ৫শ টাকা, ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে ৫শ টাকা, তিন চাকার মোটরযানের ক্ষেত্রে ৩শ টাকা ও মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে ১ হাজার টাকা।
এ প্রসঙ্গে বিআরটিএর চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, সেবার ফি ২০১৪ সালের পর এবারই বাড়ল। যৌক্তিক কারণেই ফি বৃদ্ধি করা হয়েছে।
নিউজ /এমএসএম