

সত্য চিরন্তন সত্য সত্যকে কখনো মিথ্যা দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না, সত্য চিরকালই সত্য থেকে যায় । মিথ্যা দিয়ে সাময়িক সত্যকে চাপা দিলেও যথা সময়ে সেই সত্য মিথ্যাকে ভেদ করে সত্য আরও বেশী করে বিকশিত হয় । আবার বাঙালি জাতি চির দুর্বার, চির দুর্মর। যুগে যুগে তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছে যার প্রমাণ ১/১১’র তে দেখিয়েছেন।
২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ভোরে ফখরুদ্দিন-মইনউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বঙ্গবন্ধুকন্যাকে ধানমন্ডির নিজ বাসভবন সুধাসদন থেকে গ্রেফতার করে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা রত্ন ম্যাদার অব ইউমিনিটি মমতাময়ী জননী, শেখ হাসিনা দীর্ঘ প্রায় ১১ মাস কারাভোগের পর ২০০৮ সালের ১১ জুন সংসদ ভবন চত্বরে স্থাপিত বিশেষ কারাগার থেকে মুক্তির মধ্য দিয়ে হয়েছিলো সত্যের জয়। ঐদিন ছিলো অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার দিন। জননেত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর সেই মুক্তি কেবল একজন নেত্রীর মুক্তি ছিল না, তা ছিল অবরুদ্ধ গণতন্ত্রের শৃঙ্খল মোচনের প্রতীক। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের হয়েছিলো মুক্তি।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন বাংলাদেশের সুশীল সমাজের তথাকথিত কিছু ব্যক্তি, কিছু সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠৈছিল। তারাই ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশে গুম, খুন ও হত্যার রাজনীতি করেছে। তারাই দেশকে টানা পাঁচ থেকে ছয় বার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করেছে। যারা নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা করেছিল, তারাই আবার নির্বাচনে বৈতরণী পার হওয়ার জন্য মানুষের কাছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বিতর্কিত করে নিজেদের পছন্দমতো ইয়াজউদ্দিন মার্কা সরকার গঠন করে আবার ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। বাংলার মানুষকে অত্যাচার নির্যাতন করে বাংলাদেশকে বার বার যারা দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করে, সেই সরকারের প্রধানকে প্রথমে গ্রেফতার করা হয়নি। অথচ যিনি গণতন্ত্রের জন্য, মানুষের ভাত ও কাপড়ের জন্য, মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই-সংগ্রাম করেছেন, সেই শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করে তারা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকেই গ্রেফতার করে।
সেনা সমর্থিত ১/১১’র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ভোরে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করে.।এদিন ভোরে তার ধানমণ্ডির বাসভবন থেকে যৌথবাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। প্রথমে তাকে ঢাকা মেট্রোপলিটন আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে সেখান থেকে সংসদ ভবন চত্বরে স্থাপিত বিশেষ কারাগারে নিয়ে আটক রাখা হয়।এদিকে জেলে বন্দি অবস্থায় শেখ হাসিনার সঙ্গে দীর্ঘদিন স্বজনদের সাক্ষাৎ বন্ধ রাখা হয়। ফলে তার চিকিৎসা প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। গ্রেনেড হামলায় আহত কান ও চোখ চিকিৎসার অভাবে আরো ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।
মানসিকভাবে শক্ত থাকলেও, শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তাকে স্লো-পয়জনিং করা হচ্ছে বলেও আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে ঘটতে, অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছালেও তার জন্য ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি। এরকম পরিস্থিতিতে, ২০০৮ সালের ৩১ মার্চ, আদালতে হাজিরা দিতে নেওয়া হলে আইনজীবীদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু পারেনি। এখন বিনাচিকিৎসায় মারার চেষ্টা করছে।’
এসময় শেখ হাসিনা আরো বলেন, ‘১৯৭১ সালে সন্তানসম্ভবা ছিলাম। পাকিস্তানিরা মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন কারো সাথে দেখা করতে দেয়নি। এখন এরা চিকিৎসাসেবা ও আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে দিচ্ছে না। আমার ওপর যে অবিচার করা হয়েছে, তার ভার আমি আল্লাহ ও জনগণের ওপর দিচ্ছি।’
জেলে তাকে সঠিক চিকিৎসা না দেওয়ায়, একপর্যায়ে তার অসুস্থতা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে চলে যায়। অবশেষে তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকরা টানা ২০ দিন চিকিৎসার পর তাকে আপাত স্বাভাবিক করে তোলেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও দেশ ও জনতার কথা ভুলে যাননি নেত্রী। ২০০৭ সালের জুলাই মাসে, তাকে যখন নির্জন কারাগারে ঢুকিয়ে মৃত্যুর ভয় দেখানো হচ্ছিলো, ঠিক তখনই, আগস্ট মাসে দেশজুড়ে তখন চলছিল ভয়াবহ বন্যা। গণমাধ্যমে এই খবর দেখে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশনা পাঠান তিনি। এমনকি সেই বছরের নভেম্বরে যখন সিডরের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় উপকূলবর্তী দেশের এক তৃতীয়াংশ অঞ্চল, তখনও দলমত নির্বিশেষে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আওয়ামী লীগের প্রতি নির্দেশ দেন তিনি।
পরবর্তীতে, সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণে, দেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি চরমে উঠলে, উষ্মা প্রকাশ করেন তিনি। ২০০৮ সালের মে মাসে আদালতে আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলার সময় দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন জননেত্রী। একইসঙ্গে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন।
শেখ হাসিনা সহ রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তারের মধ্যদিয়ে গণতন্ত্রকে অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এসময় বাংলাদেশে রাজনৈতিক কর্মকান্ড – নিষিদ্ধ থাকলে ও বিভিন্ন ভাবে শেখ হাসিনার মুক্তি দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলে আওয়ামীলীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো। রাজনৈতিক সহ বিভিন্ন দিক থেকেও শেখ হাসিনার মুক্তির দাবি ওঠে। বাংলাদেশের মাটিতে বিশেষ করে তৃনমূল নেতা-কমীদের আন্দোলনে ফলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য সহযোগী সংগঠন বিশেষ করে প্রবাসের মাটিতে আওয়ামীলীগ.ষুবলীগ.ছাত্রলীগের আন্দোলনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন করা ছাড়া ও প্রবাসী কমিউনিটি নেতাদের উদ্দোগে বিশেষ করে বৃটিশ এমপি. ইউরোপিয়ান পালামেন্ট মেম্বার.সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এর সাথে লবিং করা সহ ক্রমাগত চাপ, আপোষহীন মনোভাব ও অনড় দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
২০০৮ সালের এই দিনে দীর্ঘ ১১ মাস কারা ভোগের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংসদ ভবন চত্বরে স্থাপিত বিশেষ কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন.। তার মুক্তিতে সেদিন যেন মুক্তি পেয়েছিল গণতন্ত্র। ১১ জুন তাই গণতন্ত্রের মুক্তির দিন। অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার দিন।
মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উন্নত সমৃদ্ধ সুখী শান্তিময় সোনার বাংলাদেশ গড়বার জন্য পিতার মতই সততা, দেশপ্রেম, মানুষের জন্য ভালোবাসা, প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টি আর অসীম সাহস নিয়ে সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। ২০০৭ এর ১৬ জুলাই থেকে ২০০৮ এর ১১ জুন পর্যন্ত এগারো মাস কারারুদ্ধ জীবন কাটিয়ে জনতার নেত্রী জনতার মাঝে ফিরে এসেছিলেন। শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে, এমনকি পৃথিবী থেকেও চিরতরে সরিয়ে দেবার সব অপচেষ্টা করেও ষড়যন্ত্রকারীরা সেদিন জনতার চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল। সেনাসমর্থিত তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাধ্য হয়েছিল শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিতে।
নির্জন কারাবাসের দুঃসহ সে দিনগুলোতে শেখ হাসিনাকে দুর্বল করতে কিংবা তাঁর দৃঢ়তায় চির ধরাতে পারেনি কেউ। কোন ভয় ভীতি বা প্রলোভন দিয়ে তাঁকে পরাভূত করা যায়নি। তাই বিশেষ কারাগারের সে নির্জনতায় বাংলার জনগণের ওপর পিতার মতই অগাধ আস্হা, বিশ্বাস আর আকাশসম ভালোবাসা নিয়ে দেশ আর মানুষের কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের পথরেখা, আমাদের দিনবদলের সনদের, খসড়া প্রনয়ণ করেছেন।
তিনি সেদিন মুক্ত হয়ে ফিরে এসেছিলেন। সত্যি হয়েছিল সেদিন তাঁর অভয়বাণী – “আমাকে ওরা আটকে রাখতে পারবে না। বাংলার মানুষ আমাকে মুক্ত করবেই। ওরা নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে। বাংলার মানুষ আমাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে।
সঠিক ও যোগ্য ও ক্যারিসমেটিক নেতৃত্বই পারে একটি দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিতে। বঙ্গবন্ধু বিহীন বাংলাদেশে জগদ্দল পাথরের মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় চেপে বসা সামরিক স্বৈরশাসকদের মামলা-হামলা নির্যাতন নিপীড়নে দিশেহারা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও স্বাধীনতার স্বপক্ষের মানুষ প্রত্যক্ষ করতে থাকে নানা গোষ্ঠী দ্বন্দে বিভক্ত নেতৃত্ব, নেতৃত্বশূন্য দলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব প্রত্যাশীদের দ্বন্দ ও প্রতিযোগিতার অশুভ কার্যক্রম।
ঠিক এমনি এক পরিবেশে ১৯৮১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে বহুধা বিভক্ত দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা পূরণে ৩৩ বছর চার মাস ১৭দিন বয়সে দেশের সর্ববৃহৎ এবং প্রাচীনতম রাজনৈতিক দলটির সভাপতি নির্বাচিত হন জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনা। মানবতার জননী, নির্ভীক জননী আজকের প্রধানমন্ত্রী সফল রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। সভাপতি নির্বাচতি হওয়ার তিন মাস একদিন পর ১৯৮১ সালের ১৭ মে সম্পূর্ণ প্রতিকূল পরিবেশ জেনেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পিতা-মাতা ভাই বোন বিহীন দেশের জনগণের টানে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন’। আজকে প্রত্যাবর্তনের চার দশকে ব্যক্তি শেখ হাসিনাকে বরাবরেই দেখা গেছে কল্যাণমুখী মানসিকতায় যে কোন দুর্যোগ পরিস্থিতিতে সব সামলিয়ে নেওয়ার বলিষ্ট নেতৃত্বের ভূমিকায়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের জন্য সুকৌশলে তিনি নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। ১৯৮১ সালের এই দিনে তিনি ফিরে এসেছিলেন প্রিয় মাতৃভূমিতে ফলে তিনিই অসহায় মানুষের ত্রাণকর্তা। তিনি দিক নির্দেশক, অর্থনৈতিক মুক্তির অগ্রযাত্রার বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
আজ ১১ জুন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দিন।এই দিনটি কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রীর কারামুক্তির দিন নয, এটি গণতন্ত্রের মুক্তির দিবস।একজন গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনরুজ্জীবন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় গণতন্ত্রের মানসকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাই অপরিহার্য। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
লেখকঃ মোহাম্মদ মকিস মনসুর, কলামিস্ট ও সাংবাদিক,
সভাপতি, ইউকে ওয়েলস আওয়ামী লীগ, চেয়ারম্যান ইউকে বিডি টিভি।