

নাজমুল হক ভুইয়াঃ ছবির এই ছিপ ছিপে শরীরের মাথায় কায়দা করে ওয়েস্টার্ন হ্যাট পরা স্টাইলিস তরুনটিকে দেখলে কি মনে হয় একাত্তর সালে এনার নামে চট্টগ্রামের বিহারি-রা জা কা র পাড়ায় বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খেতো!!
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছে ছিল এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম, দুর্ধর্ষ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা (Urban Guerrilla) অমল মিত্র। আমাদের অমল আঙ্কেল।
চট্টলবীর মরহুম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ভাষায়,”৭১ সালত্ অমল ঐ রাস্তাত আছে উনিলে পা কি স্তা নি সেনাঅল্ এই রাস্তা দি ন যাইতু।”
(৭১ সালে যে রাস্তায় অমল আছে বলে শুনতো, সেই রাস্তা দিয়ে পা কি স্তা নি সেনারাও চলাচল করত না।)
ছিলেন হাফলং ট্রেনিং ক্যাম্পের প্রথম ব্যাচ। ট্রেনিং শেষে চট্টগ্রামে প্রবেশ করা প্রথম বি এল এফ গ্রুপের গেরিলা সদস্য। আমার বাবা ফজলুল হক ভূইয়া ছিলেন এফ এফ-৮ গ্রুপের উপ দলনেতা। এফ এফ হলেও অধিকাংশ অপারেশন করেছিলেন বি এল এফের সাথে, ইঞ্জিনিয়ার হারুন আঙ্কেলের কমান্ডে। এবং সঙ্গী ছিলেন এই অমল আঙ্কেল।

বাবার মুখে শুনেছি, “নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বরের বিজয়ক্ষনের আগ পর্যন্ত এমন কোন দিন নাই যে আমি আর অমল, দুই-একজন রা জা কা র বা বিহারি মারি নাই৷ মেইন সিটি থেকে উঠিয়ে নিয়ে যেতাম দিনে দুপুরে। মেরে ফেলে রাখতাম জনশুন্য কোন স্থানে।”
চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধে “অমল মিত্র” নামটাই একটা ব্র্যান্ড।
চট্টগ্রাম শহরের যে কোন পাচটা বিখ্যাত গেরিলা অপারেশনের নাম রেন্ডমলি সিলেক্ট করুন। তার যে কোন দুইটাতে “অমল মিত্র” নামটা আসতে বাধ্য। দুর্ধর্ষ খেয়ালিপনা আর দুঃসাহসিক কর্মকান্ডের আরেক নাম যেন অমল মিত্র। গেরিলা যোদ্ধা, কিন্তু প্রতি নিয়ত বুড়ো আঙুল দেখিয়েছেন খোদ গেরিলা রুলস বুককে।
গেরিলারা কখনোই নিজের সেফ হাউজে থাকা অবস্থায় কোন রকম ঝামেলায় জড়ায় না। তাতে সকলের নজরে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা যেমন থাকে তেমনি গোপন ডেরার খবরও শত্রুর কাছে ফাঁস হয়ে যেতে পারে। হিট করার সাথে সাথে সেফ হওয়াটাও তাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর সেফ হওয়ার জন্য বাচিয়ে রাখতে হয় সেফ হাউজগুলো। প্রতিনিয়ত ঠিকানা পাল্টাতে হয় এক সেফ হাউজ থেকে আরেকটায়। তেমনি এক সেফ হাউজ ছিল হালিশহর রাস্তার কোল ঘেঁষে আগ্রাবাদ দফাদার বাড়ি। বাড়ির মালিক ছিলেন হাজি আবদুল মালেক দফাদার। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে একরাতে অমল মিত্রসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আশ্রয় নেন দফাদারের বাড়িতে।
সকালে বাড়ির সামনের একটি ঝুপরি চায়ের দোকানে গরম গরম ভাপা পিঠা দিয়ে নাস্তা করতে বসেন কয়েকজন গেরিলা। অমল আঙ্কেল, আমার বাবা ফজলুল হক ভূইয়া সাথে আরও ছিলেন ফখরুল ইসলাম মনি, আবু সাঈদ সরদার এবং ডা. মুলকুতুর রহমান। সবার পরনে স্থানীয় লোকদের মতই পোশাক আশাক। চেনার কোন উপায় নেই যে এরা বাইরের লোক। কথাও বলছেন সবাই স্থানীয় চিটাগং এর ভাষায়৷ হঠাৎ রাস্তার দিকে তাকিয়ে অমল আঙ্কেল দেখতে পেলেন সাদা পোশাক পরা লম্বা মতন এক লোক(রা জা কা র) তাদের আশ্রয় দাতা দফাদারের পিঠে রিভলবার ঠেকিয়ে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাচ্ছে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা জিপের দিকে। কর্তব্য স্থির করতে এক মুহুর্ত সময় নষ্ট করলেন না অমল মিত্র। কোমরে গোজা ছিল গেরিলা জীবনের সার্বক্ষনিক বিশ্বস্ত সঙ্গী পয়েন্ট থ্রি এইট রিভলবারটি। দলের আর কারো কাছে কোন অস্ত্র নেই। রা জা কা র টি দফাদারকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে বা সামনে কোন আর্মির পেট্রোল জীপ আছে কিনা সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। দেখা গেল দফাদরকে মুক্ত করতে আটত্রিশ হাতে আঙ্কেল যেয়ে পড়লেন এল এম জি লাগানো টহল জিপের সামনে। কিন্তু অতকিছু চিন্তা করার সময় কোথায় আঙ্কেলের? হতভম্ব সহযোদ্ধাদের সেফ হাউজ থেকে অস্ত্র নিয়ে আসার তাগাদা দিয়েই চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে একাই পিছু নিলেন রাজাকারের। ব্যাক আপ আসার জন্য বসে থাকা অর্থহীন। যে কোন মূল্যে বাচাতে হবে দফাদারকে, মাত্র গত রাতেই এই দরিদ্র গৃহকর্তা তার বাড়ির মুরগী জবাই করে খাইয়েছেন অভুক্ত গেরিলাদের। আর সকালেই তাকে চোখের সামনে মরতে দেখেও কিছু করবেন না, তাই কি হয়?!
কিছুদূর গিয়ে কোমর থেকে রিভলবার হাতে নিয়ে কক করেই হুংকার দিলেন,”হল্ট।” রাজাকার টি হুংকার শুনে পিছনে ফিরেই দেখলো রিভলবার হাতে স্বয়ং যমদূত দাঁড়িয়ে। এক ধাক্কায় দফাদারকে ছুড়ে ফেলে দিল ভোঁ-দৌড়। কিন্তু ছাড়ার পাত্র নন অমল আঙ্কেলও। পেছন পেছন দৌড়ে ছোটপোল থেকে ধাওয়া করতে করতে সুবিধাজনক পজিশনে পেলেন সিজিএস কলোনীর এক বিল্ডিং এর পেছনে গিয়ে। গর্জে উঠল হাতের রিভলবার। উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে গেল শিকার। কাছে গিয়ে জাপটে ধরে ছিনিয়ে নিলেন শত্রুর রিভলবারটি৷ পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জে মাথায় গুলি করে নিশ্চিত করলেন মৃত্যু। অন্যান্য মুক্তিযাদ্ধারা অস্ত্রসহ এরমাঝে পৌছান ঘটনাস্থলে। এসে দেখেন কাজ সেরে রা জা কা রে র রিভলবারটি দখলে নিয়ে একা বীরদর্পে দাঁড়িয়ে আছেন অমল মিত্র।পরে জানা যায় লোকটি ছিলো মেজর মর্যাদাসম্পন্ন পা কি স্তা ন বাহিনীর গোয়েন্দা কর্মকর্তা। এই ঘটনার পর হানাদার বাহিনী এসে এলাকার অনেককে ধরে নিয়ে যায়। আর গেরিলারা ছড়িয়ে পড়েন অন্য সেফ হাউজে।
আরেকবার বিভিন্ন সৃত্রে গেরিলারা জানতে পারলেন, আগ্রাবাদ এলাকার মির্জা বাবর নামের এক বিহারী আলবদর কমান্ডার ওয়ারলেস কলোনী এলাকায় বাঙালী মেয়েদের অটকে রেখে তাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালাচ্ছে। বাবর ছিল সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর পোষা গুন্ডা। নভেম্বরের শেষের দিকে পাকা খবর পেলেন বাবর একটি মাইক্রোবাস করে আগ্রাবাদের দিকে আসছে। মুহুর্তে তৈরি হয়ে গেলেন গেরিলারা৷ অমল মিত্র, আবু সাইদ সরদার এবং আমার বাবা ফজলুল হক ভূইয়া। ট্যাকসি নিয়ে এমবুশ বসালেন রাস্তায়। মাইক্রো কাছে আসতেই সেটি আটকিয়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে বাবরকে তুলে নিয়ে গেলেন মুহুরি পাড়ার এক গোপন আস্তানায়। গেরিলাদের টর্চারের মুখে মুখ খুলতে বাধ্য হয় বাবর। ওয়ারলেস কলোনীর ঠিকানা বলে দেয় যেখানে সে আটকে রেখেছে দুটি মেয়েকে। সাথে সাথে ট্যাকসিতে করে লোক পাঠিয়ে উদ্ধার করে আনা হয় মেয়ে দুটিকে। অমল আঙ্কেলের ভাষায়, “উদ্ধার করে নিয়ে আসা মেয়ে দুটি আমাদের জড়িয়ে ধরে তাদের ওপর নির্যাতনের যে কাহিনী বর্ণনা করেন তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ওদের কান্নায় আমরা নিজেরাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। ওরা ছিল চট্টগ্রামেরই বাঙালি মেয়ে। কিন্তু ওই পরিস্থিতিতে মনে হয়েছিল তাদের ভারতে পাঠিয়ে দেওয়াই সমীচীন। তাই খরচ যোগাড় করে তাদের ভারত যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম। তাদের পরিচয় যাচাই করার মতো সময় ক্ষেপণের কথা তখন চিন্তা করিনি।”
[মহান বিজয় দিবসে সেই নাম না জানা দুই বীরঙ্গনার প্রতি জানাই হাজার সালাম। মুক্তিযোদ্ধারা সেই হায়েনা রাজাকার বাবরকে অবশ্য সেদিন জীবিত ছাড়েন নি। মেরে ফেলে রাখে যান রাস্তার ধারে।]
অমল আঙ্কেলের অপারেশনগুলোর বর্ননা লিখতে গেলে গোটা একখানা কিতাব ছাড়া সম্ভব না। ইচ্ছা হয় সব লিখি। প্রতিটা মুহুর্তকে সেকেন্ডে ন্যানো সেকেন্ডে ভাগ করে করে স্লো মোশনে লিখি। কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও সম্ভব নয়। কয়টা অপারেশনের বর্ননা দিব?
আইস ফেক্টরি রোড, আগ্রাবাদ আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংক, আগ্রাবাদ ফায়ার ব্রিগেড অপারেশন, ঈদগার রাজাকার বাসা আক্রমণ,……….. ছোট বড় অসংখ্য অপারেশন।
যুদ্ধ শেষে রাজনীতি পাগল এই গেরিলা অস্ত্র জমা দিয়ে লেগে পড়েছিলেন দেশ গড়ার কাজে। হয়েছিলেন চট্টগ্রামের কিংবদন্তী রাজনীতিবীদ মুজিব আদর্শের এক জ্বলন্ত অগ্নিশিখা জহুর আহমেদ চৌধুরীর একনিষ্ঠ কর্মী।প্রচন্ড মুজিবভক্ত অমল আঙ্কেলের পাগলাটে স্বভাবের সাথে পরিচিত ছিলেন খোদ বঙ্গবন্ধু। একবার জহুর আহমদ চৌধুরীর সাথে ঢাকা গিয়েছিলেন অমল আঙ্কেল। দুপুরে বাসায় বসেছেন ভাত খেতে। এমন সময় এলো ফোন। রিসিভার উঠাতেই ও পাশ থেকে গমগমে গলায় বলে উঠলেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু, “জহুর তোর জন্য শুটকি রান্না করেছি, চলে আয়।” জহুর আহমদ চৌধুরী বললেন,
“বঙ্গবন্ধু আমিতো একা আসতে পারবো না, আমার সঙ্গে একজন মুক্তিযোদ্ধা আছে।”
“ওকেও নিয়ে আয়।”
জহুর আহমদ চৌধুরী অমল আঙ্কেলকে সঙ্গে নিয়ে চলে যান সোজা ৩২ নাম্বার। বঙ্গবন্ধু দোতলা থেকে দেখেই বলে উঠলেন, “এটা মুক্তি? এই মুক্তি-কেডারে?”
অমল আঙ্কেল নিচু স্বরে জবাব দিলেন, “স্যার আমি।” বঙ্গবন্ধু আঙ্কেলকে আগে থেকে চিনতেন। এর আগেও সংক্ষিপ্ত দেখা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু একবার চট্টগ্রাম আসলে গাড়ি বহরে উঠতে না পেরে আঙ্কেল মরিয়া হয়ে বঙ্গবন্ধুর গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। গাড়ি থামিয়ে সোহাস্যে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “এই পাগলারে নিয়ে নাও।” নেতা মনে রেখেছিলেন তার পাগলা কর্মীকে।
সবাইকে নিয়ে দোতলায় উঠে একসাথে বসলেন খাবার টেবিলে। জহুর আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে বিভিন্ন জরুরী কথা শেষ করে অমল মিত্রের কাছে মুক্তিযুদ্ধকালীন অপারেশনের গল্প শুনতে চাইলেন বঙ্গবন্ধু। অমল আঙ্কেল সিটি কলেজের সামনের সেই সাড়া জাগানো অপারেশনের গল্পটা বলা শুরু করলেন।
গল্পের মাঝখানে আবেক আপ্লূত বঙ্গবন্ধু বেগম মুজিবকে ডাক দিয়ে বললেন, “ও কামালের মা, শুনো এই ছেলের অপারেশনের কথা শোন।”
ডাক শুনে ভেতর থেকে চলে এলেন বঙ্গমাতা। এ যেন কোন রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ঘর নয়। আটপৌরে কোন মধ্যবিত্ত বাঙালীর ডাইনিং টেবিল। দুজনে বসে শুনলেন পুরো অপারেশনের গল্প। শুনে দুজনেই খুব খুশি হয়েছিলেন এবং প্রশংসাও করেছিলেন।
[সেই অপারেশনে শহীদ হয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিক। প্রচন্ড আহত অবস্থায় ধরা পড়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মরহুম শফিউল বশর। অমল আঙ্কেল, আমার বাবা এবং ভোলা নাথ আহত অবস্থায় গুলি ছুড়তে ছুড়তে একে অন্যের কাভার ফায়ারের আড়ালে পালাতে পেরেছিলেন। সেই অপারেশনের কথা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শুনেছেন, সহযোদ্ধা হিসেবে আমার বাবার নাম শুনেছেন বঙ্গমাতা এর চেয়ে গর্বের আর কি হতে পারে?!]
৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকান্ড কোনমতেই মেনে নিতে পারেননি অমল আঙ্কেল। দেশ ছেড়ে গিয়েছিলেন ভারতে। সাথে ছিলো আরও অনেক পোড় খাওয়া গেরিলা যোদ্ধা। উদ্দেশ্য ভারত সরকারের সাহায্য নিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নিবেন। ভারত সরকার প্রথম দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেও ইন্দিরা সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথেই মুখ ফিরিয়ে নেয়। এর পর শুরু হয় প্রচন্ড অমানবিক কষ্ট। সব সহ্য করে অমল আঙ্কেল, চট্টলবীর মহিউদ্দিন চৌধুরী সহ আরো অনেকেই দুঃসহ দিন কাটাতে থাকেন ভারতে৷ সে আরেক কাহিনী। মুজিব প্রেমের এমন উদাহরণ আর হয় না। অনেকেই বলেন বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর কেউ প্রতিবাদ করে নি। কথাটি যে সম্পূর্ন মিথ্যা এবং উদ্দেশ্য প্রনোদিত এর জীবন্ত প্রমান আমাদের অমল আঙ্কেল ছাড়া আর কি হতে পারে?? নিভৃতচারী এই বীর আজীবন মুজিব আদর্শের চর্চা করলেও কোন দিন পার্টির পদ-পদবীর জন্য লালায়িত হননি। যুদ্ধের পর পর বিহারি-রাজাকারদের বিতাড়িত করে তাদের অর্থ-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে চাইলেই হতে পারতেন অঢেল সম্পদের মালিক। সে সময় সারা চট্টগ্রাম শহরে তাদের সামনে এসে কেউ প্রতিবাদ করার সাহসও রাখত না। কিন্তু করেন নি। বঙ্গবন্ধুর এক নির্দেশে সমস্ত অস্ত্র-সস্ত্র ট্রাকে উঠিয়ে ঢাকায় পৌছে সমর্পন করেছিলেন জাতির পিতার পায়ে।
এইবার বিজয় মেলায় অনেকদিন পর দেখা হল আঙ্কেলের সাথে। সামনে গিয়ে সালাম দিতেই উত্তর দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। বয়স হয়ে গেছে। স্মরনশক্তি কমে গেছে। তার উপরে আমার সাথে দেখা হয়েছিল প্রায় দশ বারো বছর আগে। চিনতে পারার কথা না। শান্তুনু থামিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “বাবা চিনতে পেরেছো? ফজলু আঙ্কেলের ছেলে।”
সাথে সাথে যেন হাজার ভোল্টের বাতি জ্বলে উঠলো আঙ্কেলের চেহারায়। ঘুরে দাঁড়িয়ে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরলেন আমাকে। চশমার কাচে ঘেরা একজোড়া জ্বল জ্বলে চোখে রাজ্যের মায়া। আমি সেই মায়ায় হারালাম।
আমি কখনোই তেমন একটা ছবি তুলি না। আমার ছবি কখনোই ভালো আসে না। কিন্তু সেইদিন এই বীরের সাথে ছবি তোলার লোভটা আর সামলাতে পারলাম না। আংকেলের পাশে নিজের বিদঘুটে মুখখানা নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম।
আমার কাছে উনি একজন হিরো। জীবনে যে কেউ বিখ্যাত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অভিনেতা, রাজনীতিবীদ বা ধনকুবের হতে পারবে কিন্তু চাইলেই কেউ আর মুক্তিযোদ্ধা হতে পারবে না। অমল মিত্র হতে পারবে না। অমল মিত্ররা একবারই জন্মান। এটা আমার প্রজন্মের ব্যার্থতা আমরা সেটা জানি না।
[অমল আঙ্কেলের প্রথম ছবিটা আমাদের পারিবারিক ফটো এলবামে পাওয়া]

অমল আঙ্কেলের জীবনি নিয়ে সম্প্রতি সংক্ষিপ্ত আকারে একটি বই বেরিয়েছে, “একাত্তরের দুর্ধর্ষ গেরিলা অমল মিত্র”। লিখেছেন স্বনামধন্য সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক মুহাম্মদ শামসুল হক। বইটি বাতিঘরে পাওয়া যাচ্ছে। সংক্ষিপ্ত আকার হলেও লেখক মোটামুটি সবগুলো ক্ষেত্রই টাচ করতে পেরেছেন। বইটি বীর চট্টলার এই দুর্ধর্ষ গেরিলা যোদ্ধার জীবনকে নতুন প্রজন্মের চোখে স্মরনীয় করে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস।