

২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ মনুমেন্ট তথা শহীদ মিনার নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে কার্ডিফ শহীদ মিনারে বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে ২০ ফেব্রুয়ারী রাত ১২টা ০১ মিনিটে কার্ডিফের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত বাংলাদেশীদের উপস্থিতিতে লোকে লোকারন্য হয়ে ওঠে কার্ডিফ শহীদ মিনার। ওয়েলস আওয়ামী লীগ, ওয়েলস ছাত্রলীগ, ওয়েলস যুবলীগ, গ্রেটার সিলেট কমিউনিটি ইউকে’র সাউথ ওয়েলস রিজিয়ন, গ্রেটার সিলেট কমিউনিটি ইউকে’র নিউপোর্ট শাখা, বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ওয়েলস বাংলাদেশ সোসাইটি, স্টার স্পোর্টস ইউকে, ওয়েলস বাংলাদেশ উইমেন্স এসোসিয়েশন, ওয়েলস বিএনপি নেতা মো: আশরাফ হোসেন এর নেতৃত্বে বিএনপি সহ দলমত নির্বিশেষে কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন স্তরের মানুষ প্রত্যেকেই ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে শহীদ মিনারের পাদদেশে সমবেত হয়ে ”আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি” গানটি গেয়ে গেয়ে পুষ্পস্তবক অর্পন করে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।
প্রথম পর্ব কার্ডিফের কাউন্সিলার দিলওয়ার আলী ও কাউন্সিলার জেসমিন চৌধূরী সহ ওয়েলস বাংলাদেশী কমিউনিটির নেতৃবৃন্দের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ও সহযোগিতায় শহীদ মিনার ফাউন্ডার্স ট্রাষ্ট কমিটির সেক্রেটারী ওয়েলস আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিশিষ্ট সাংবাদিক মকিস মনসুরের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হয়।
ঊল্লেখ্য যে, কার্ডিফে প্রতি বছরই ২১ শের অনুষ্ঠান দু’পর্বে অনুষ্ঠিত হয় । প্রথম পর্ব অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশী কমিউনিটির জন্য ২০ ফেব্রয়ারী রাতে এবং দ্বিতীয়টি অনুষ্ঠিত হয় পরের সপ্তাহে দিনের বেলায়। এতে বিভিন্ন কমিউনটির বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন স্কুল থেকে ছাত্র ছাত্রীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
অনুষ্ঠানে যুক্তরাজ্যস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের হাই কমিশনার হার এক্সেলেন্সি সাঈদা মুনা তাসনিম’কে আমন্ত্রণ জানানো হলে ঐদিন অন্যান্য প্রোগ্রাম থাকায় নির্ধারিত ২৭ ফেব্রুয়ারীর পরিবর্তে তিনি ২৬ ফেব্রুয়ারী কাার্ডিফ শহীদ মিনারে এসে পূষ্প স্তবক অর্পন করেন। এ সময় কমিউনিটির বিশিষ্ট নেতৃবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
হাই কমিশনার তাঁর বক্তব্যে কার্ডিফ শহীদ মিনার নির্মাণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানার অবদানের কথা সবার সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০১৯ সালের মে মাসে সেন্ট্রাল লন্ডনের তাজ হোটেলের করফারেন্স হলে আনুষ্ঠানিক ভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ৬৫ হাজার ৯শত ৮১ পাউন্ড ৭৬ পেন্স এর একটি চেক আমি হস্তান্তর করি। এ সময় লন্ডন এবং কার্ডিফের বাংলাদেশী কমিউনিটির বিশিষ্ট নেতৃবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
তিনি বলেন, ওয়েলসের এই শহীদ মিনারটি যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহীদ মিনার। আই এল এম ফাউন্ডার্স ট্রাষ্ট মেম্বার এবং কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ হার এক্সেলেন্সি সাঈদা মুনা তাসনিমকে প্রধানমন্ত্রীকে শহীদ মিনারটি পরিদর্শন করার অনুরোধ জানানো হলে তিনি বলেন, এই দাবি তিনি তাদের কাছে পৌঁছে
দিবেন।
২৭ ফেব্রুয়ারী কার্ডিফ ল্যান্ডফ নর্থ এর কাউন্সিলার দিলওয়ার আলীর সার্বিক তত্বাবধানে ও মাসুদা আলী এবং নাদিয়া ইসলামের যৌথ পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় পর্বের অনুষ্ঠান। উক্ত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আইএলএম ফাউন্ডার ট্রাষ্টের ট্রাষ্টি এবং প্রতিনিধিদের মধ্যে শাহ শাফি , আবুল কালাম মুমিন ও সেলিম আহমেদ , দা রাইট অনারেবল লর্ড মেয়র অব কার্ডিফ কাউন্সিলর ড. বাবলিন মল্লিক, হিজ এক্সেলেন্সি মোহাম্মদ আলীমুজ্জামান-বাংলাদেশ এসিস্ট্যান্ট হাই কমিশনার বার্মিংহাম, ডেপুটি লর্ড লেফট্যানান্ট অব সাউথ গ্লামারগন এম স্যু থমাস, দিও কলিয়েনড্রিস অনারারি কাউন্সেল অব রয়েল থাই, লিডার অব কার্ডিফ কাউন্সিল কাউন্সিলার হিউ থমাস, ডিপুটি মিনিষ্টার ফর সোশ্যাল সার্ভিসেস জুলি মরগান, মিনিষ্টার ফর জাষ্টিস জেইন হাট , হেড অব ল্যাঙ্গুয়েজ প্লানিং এট ওয়েলস গভর্ণমেন্ট জেষ্টিন ওয়েইন সহ কাউন্সিলারবৃন্দ, ৪টি স্কুলের শিক্ষক ও ছাত্র ছাত্রী এবং প্রতিনিধিবৃন্দ। অনুষ্ঠানে ৪টি স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন ভাষায় গান পরিবেশন ও কবিতা আবৃত্তি করে।
অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন: দি রাইট অনারেবল লর্ড মেয়র অব কার্ডিফ কাউন্সিলার ড. বাবলিন মল্লিক, কাউন্সিল লিডার কাউন্সিলার ফর জাস্টিস জেইন হাট, হিজ এক্সেলেন্সি মোহাম্মদ আলীমুজ্জামান, বাংলাদেশ হাই কমিশন, বার্মিংহাম।
লর্ড মেয়র তাঁর বক্তব্যে শহীদ দিবসের ঘটনাবলীর বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে বলেন, অনেক রক্তের বিনিময়ে আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে রক্ষা করতে পেরেছি। আমরা অন্যান্য ভাষারও যথাযোগ্য মর্য্যাদা দেই। একটি জাতির মাতৃভাষাই তার পরিচয়। তিনি শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।
কাউন্সিল লিডার কাউন্সিলার হিউ থমাস, ডেপুটি মিনিষ্টার ফর সোশ্যাল সার্ভিসেস জুলি মরগান, মিনিষ্টার ফর জাস্টিস জেইন হাট তাদের বক্তব্যে, বাঙালী জাতি তাদের মাতৃভাষা রক্ষার জন্য রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছে, শুধু তাদের মাতৃভাষাই নয় বরং বিশ্বের প্রতিটি জাতির মাতৃভাষা তাদের প্রাণের চেয়েও অধিক প্রিয়। একটি জাতি হিসেবে নিজের মাতৃভাষার উপর আঘাত আসলে প্রয়োজনে রক্তের বিনিময়ে হলেও তা প্রতিহত করতে হবে, বাংলাদেশের জনগণ তা-ই দেখিয়ে দিয়েছে। এরপর তারা শহীদ মিনারের পাদদেশে পূষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
অত:পর বার্মিংহামের বাংলাদেশ এসিস্ট্যান্ট হাই কমিশনার হিজ এক্সেলেন্সি মোহাম্মদ আলীমুজ্জামান তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের বাইরে যুক্তরাজ্যের ওয়েলসে এ দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহীদ মিনার নির্মাণ করতে যারা অকুন্ঠ পরিশ্রম করেছেন তাদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এই শহীদ মিনার নির্মাণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর্থিক অনুদান প্রদান করে সহযোগিতা করেছেন, যার ফলে সহজেই এই শহীদ মিনারটি ওয়েলসের মাটিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। এই শহীদ মিনার নির্মাণে ওয়েলস সহ বিভিন্ন এলাকার নেতৃবৃন্দ সহ সাধারণ জনগণ যে আর্থিক সহযোগিতা করেছেন, অনেক পরিশ্রম করেছেন সে জন্য তাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের যে অভ’তপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে এবং হচ্ছে তার বিস্তারিত বিবরণ তিনি সবার সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পর্য্যটন শিল্পকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের পর্য্যটন শিল্পের সাথে সামঞ্জস্য রেখে গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে অচিরেই বিদেশীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠবে বাংলাদেশ।
আমি বিস্মিত কার্ডিফের চারটি স্কুল থেকে আগত ছাত্র ছাত্রীদের গান এবং কবিতা আবৃত্তি শুনে। ভাষার উপর রচিত তাদের গান এবং কবিতা আবুত্তিগুলো ছিলো খুবই শ্রুতি মধুর। এদের মধ্যে মাত্র কিছু সংখ্যক ছিল বাংলাদেশী আর বাকিরা সবাই অন্যান্য কমিউনিটির। ভাষা শহীদ দিবসের এই অনুষ্ঠানে বাঙালী ছাত্র ছাত্রীদের অনুপস্থিতি আমাকে খুবই হতাশ করেছে। আমাদের অভিভাবকদের উচিৎ আমরা আজ বাংলায় কথায় বলছি, এই ভাষাকে রক্ষা করতে গিয়ে যারা প্রাণ দিয়েছে তাদের ইতিহাস তাদের ছেলে মেয়েদের জানতে দেয়া। এ কথা মনে রাখতে হবে, নিজের ভাষাকে যারা সম্মান করে না, তাদের সম্মান কোন জাতির কাছেই নেই। এ দেশে স্থায়ী ভাবে বসবাস করে আমরা যতই ব্রিটিশ সিটিজেন বলে দাবি করি না কেন, তাদের কাছে আমরা কালো, বিদেশী বলেই পরিচিত। বাংলাদেশী প্রবাসী জনগণের প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে, যদি আমাদের অভিভাবকরা তাদের স্থানীয় স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে লিখিত আবেদন করেন যাতে ঐ দিন হয়তো পুরো স্কুলের ছাত্র ছাত্রী অথবা অভিভাবকদের মাধ্যমে অংশ গ্রহণ করার সুযোগ তাদের দেয়া হয়। অন্তত: নিজের ঘরে বাচ্চাদের সাথে বাংলায় কথা বলুন, বাংলা শিখতে ছেলে মেয়েদের উৎসাহিত করুন, তাহলেই বাঙালী বলে আমরা প্রবাসীরা আজীবন দাবি করতে পারবো। আজকাল অনলাইনে বাংলা শিক্ষার অনেক প্রোগ্রাম পাওয়া যায়, তা থেকেও ছাত্রছাত্রীরা বাংলা শিখার সুযোগ রয়েছে।
আমরা বাঙালী, বাংলায় কথা বলি এটাই হোক আমারদের আত্ম -পরিচয়।