শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬, ০৩:৫৬ পূর্বাহ্ন

প্রধানমন্ত্রী ভারত যাচ্ছেন আজ: আলোচনার টেবিল প্রস্তুত

সংবাদদাতার নাম :
  • খবর আপডেট সময় : সোমবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২
  • ১৮৭ এই পর্যন্ত দেখেছেন

স্টাফ রিপোর্টার: চারদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে আজ সোমবার ভারত যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে শেখ হাসিনার এই সফর নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বোঝাপড়া, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতি, বাংলাদেশ ও ভারতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, যুদ্ধ-সংঘাতের কারণে জ্বালানিসহ নিত্যপণ্যের সরবরাহে সৃষ্ট বৈশ্বিক সংকট প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বাড়তি মাত্রা যুক্ত করেছে। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর এবারের ভারত সফরে গুরুত্ব পাচ্ছে বাণিজ্য, জ্বালানি, পানিবণ্টন, কানেক্টিভিটি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো ইস্যু। এ ছাড়া উভয় দেশের মধ্যে সই হবে বেশকিছু সমঝোতা স্মারক।

টানা ক্ষমতার তৃতীয় মেয়াদে দ্বিতীয়বারের মতো ভারত সফরে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। এর আগে ২০১৯ সালে শেষবার ভারতে গিয়েছিলেন তিনি। গতকাল রবিবার প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম জানান, প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ভিভিআইপি চার্টার্ড ফ্লাইট সোমবার সকাল ১০টায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করবে। ফ্লাইটটির দুপুর ১২টায় (বাংলাদেশ সময়) নয়াদিল্লির পালাম বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে ভারতের রেল ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী দর্শনা বিক্রম এবং দেশটিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার মুহাম্মদ ইমরান অভ্যর্থনা জানাবেন। এ সময়

শেখ হাসিনাকে বিমানবন্দরে দেওয়া হবে লাল গালিচা সংবর্ধনা। এদিন বিকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার হোটেলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাক্ষাতের কথা রয়েছে।

সফরের দ্বিতীয় দিন কাল মঙ্গলবার নয়াদিল্লির হায়দারাবাদ হাউজে আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি। সূত্র জানায়, দুই দেশের সরকারপ্রধানের শীর্ষ বৈঠকে সম্পর্কের সব ইস্যু আবারও পর্যালোচনা করবে ঢাকা ও নয়াদিল্লি। তবে এই সফরেও খুলছে না বহু প্রত্যাশিত তিস্তার পানিবণ্টনের জট। তবে কুশিয়ারা নদীর পানি নিয়ে সমঝোতার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত। সূত্র বলছে, শীর্ষ বৈঠকে পানিবণ্টন ও তিস্তা চুক্তির প্রয়োজনীয়তার বার্তা দেবে ঢাকা। গতকাল ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও শেখ হাসিনা বলেছেন, পানিবণ্টন ইসু্যুতে ভারতের আরও উদারতা দেখানো উচিত। তাতে দুই দেশই উপকৃত হবে। আশ্রিত মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্য একটি ‘বড় বোঝা’। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। একই সঙ্গে ভারত এ সমস্যা সমাধানে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করে ঢাকা। দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে এ বিষয়ে বার্তা দেবেন শেখ হাসিনা। এ ছাড়া বৈঠকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধপরবর্তী বাস্তবতায় জ্বালানি সংকট নিরসনে কীভাবে এক সঙ্গে কাজ করা যায়, সে প্রসঙ্গেও কথা বলবেন দুই প্রধানমন্ত্রী। দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি যেমন- দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতে সহযোগিতা, জনযোগাযোগ, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, নদীর অববাহিকাভিত্তিক পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত সুরক্ষা, নিরাপত্তা সহযোগিতা, মাদক চোরাচালান ও মানবপাচার রোধ প্রভৃতি অধিক গুরুত্ব পাবে।

জানা গেছে, মেরিটাইম সিকিউরিটির জন্য ভারত থেকে রাডার ক্রয় ও উপ-আঞ্চলিক এনার্জি হাব গঠন নিয়ে কথা হবে উভয় প্রধানমন্ত্রীর। উপ-আঞ্চলিক এনার্জি হাব হলো বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটানকে নিয়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এর নেতৃত্বে রয়েছে ভারত। বাংলাদেশ নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আনতে চায়। একই সঙ্গে এই অঞ্চলে জ্বালানি নিরাপত্তা কানেকটিভিটি বিষয়টি নিয়ে যৌথভাবে কাজ করতে চায় বাংলাদেশ। এ জন্য ভারতের ভূমি ব্যবহার করে নেপাল ভুটান যাতায়াত চায় বাংলাদেশ। এর সঙ্গে বাংলাদেশ এন্টি ডাম্পিং নীতি নিয়েও কথা বলবে। ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিককালে মার্কিন-চীন বলয়ের প্রতিযোগিতার প্রসঙ্গটি আলোচনায় উঠতে পারে। সূত্র জানায়, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে জোর দেবে বাংলাদেশ। বিশেষ করে সংকটকালে পেঁয়াজ, গমসহ জরুরি খাদ্যশস্য যাতে সময়মতো পাওয়া যায়, সেদিকে জোর দেওয়া হবে। ভারত ২০০৬ সাল থেকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের বিশেষ কর্মসূচির আওতায় বৃত্তি দিয়ে আসছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি সফরের সময় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ভারতীয়দের সম্মান জানাতে মুজিব স্কলারশিপ ফর ওয়ার ভেটারেনস ফ্যামিলি নামের বৃত্তি চালুর ঘোষণা দেবেন। ৭ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কয়েকজনের হাতে এ বৃত্তি তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।

ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক গৌতম লাহিড়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর নিয়ে আমাদের সময়কে বলেন, শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির মধ্যে প্রধান আলোচ্য বিষয়-প্রাথমিকভাবে যেগুলো রয়েছে সেগুলো হলো জলসম্পদ বণ্টন এবং তার ব্যবস্থাপনা। দ্বিতীয়ত নিরাপত্তার বিষয়ে একটা সবঝোতায় আসা। তৃতীয়ত দুদেশের যোগাযোগ বাড়ানো। বাংলাদেশও চায় যে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও ভালো হোক। কিন্তু সেই বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মনে করে কতগুলো অত্যাবশকীয় পণ্য- যেগুলোর নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত। কারণ কখনো কখনো এগুলোর সরবরাহ আচমকা বন্ধ হয়ে যায়। পেঁয়াজ বা গমের মতো বিষয়গুলো। এ ছাড়া ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত দেশে রূপান্তরিত হতে দুদেশের একে ওপরকে প্রয়োজন। সুতরাং আর্থিক সম্পর্ক বৃদ্ধিটা প্রধান আলোচ্য বিষয়। এখানে কোনো আর্থিক চুক্তি সই না হলেও চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার লক্ষ্যে একটা রোডম্যাপ তৈরি হবে। যাতে আগামী ২৫ বছরের একটা রূপরেখা তৈরি হয়। আর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রূপসা নদীর ওপর ভারতের ঋণের টাকায় যে সেতু তৈরি হয়েছে, সেটা হস্তান্তর হবে। পুরানো কয়েকটা চুক্তি নবায়ন করা হতে পারে। কিছ চুক্তি রয়েছে যেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে এসেছে। সেগুলোর নবায়ন হবে। মূলত বাংলাদেশে অবস্থিত রোহিঙ্গা বিষয়ে আলোচনা হবে। এ ছাড়া বর্তমানে আন্তর্জাতিক যে পরিস্থিতি বিশেষ করে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে উভয় দেশে যে সংকটে পড়েছে- এ সংকটে একে অপরের পাশে কিভাবে দাঁড়ানো যায় সে বিষয়েও আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এদিকে গতকাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে সাতটি চুক্তি নিয়ে কাজ চলছে এবং এর সংখ্যা বাড়তে পারে। দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে বৈঠক শেষে বেশ কয়েকটি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক পানি ব্যবস্থাপনা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, রেলওয়ে, আইন, তথ্য ও সম্প্রচার প্রভৃতি ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্পর্কিত। অনুষ্ঠান শেষে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করবে।

মোমেন বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান সুসম্পর্ক গভীর হওয়াসহ সার্বিকভাবে এই সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে নতুন নতুন উদ্যোগ গৃহীত হবে। এই সফর বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি ও বিদ্যমান গতিশীল সম্পর্ককে আরও সুসংহত করবে বলে আশা করা যায়। সফরের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে আব্দুল মোমেন বলেন, চলমান কোভিড মহামারি, ইউক্রেন সংকট এবং বিশ্বমন্দার প্রেক্ষাপটে এই সফর দুই দেশের পারস্পরিক সমঝোতা ও সাহায্যের মাধ্যমে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বা নীতিনির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে প্রতীয়মান হয়। বেশ কয়েকটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে এবং এর সংখ্যা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সকালে নয়াদিল্লি পৌঁছাবেন। বিকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হোটেলে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ৬ সেপ্টেম্বর সকালে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে গার্ড অব অনার দেওয়া হবে।

এরপর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রাজঘাটে গিয়ে মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতির প্রতি শ্রা জানাবেন। পরে দিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একান্তে এবং প্রতিনিধি পর্যায়ে বৈঠক করবেন। এরপর দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে তালিকায় থাকা সমঝোতা স্মারক সই হবে। একই দিন ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন শেখ হাসিনা।

ভারতের উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনকড়ের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন। আগামী ৭ সেপ্টেম্বর ভারতের বিভিন্ন কোম্পানির সিইও এবং ব্যবসায়ী কমিউনিটির সঙ্গে বৈঠক করবেন। ওইদিন দুপুরে প্রধানমন্ত্রী দিল্লি থেকে রাজস্থানে আজমির শরিফ দরগাহে যাবেন। সেখানে মাজার জিয়ারত শেষে পরদিন ৮ সেপ্টেম্বর সকালে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন।

ইউকেবিডিটিভি/ বিডি / এমএসএম

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102