

মো: শাহজাহান মিয়া: বাঘ রয়েছে এমন ১৩ দেশের নেতারা ২০১০ সালে মিলিত হয়েছিলেন রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে। সেই সময় তারা ১২ বছরের মধ্যে নিজ নিজ দেশে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। সেই অঙ্গীকারের নির্ধারিত সময়ে বিশ্বে বাংলাদেশের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা প্রত্যাশানুসারে বাড়েনি।
সর্বশেষ ২০১৯ সালের বাঘশুমারি অনুসারে- সুন্দরবনে বর্তমানে বাঘের সংখ্যা ১১৪টি। তার পাঁচ বছর আগে অর্থাৎ ২০১৪ সালের শুমারি অনুসারে বাঘ ছিল ১০৮টি। চলতি বছর শীতে আরেকটি শুমারি শুরু হওয়ার কথা, এর পর আর বাঘশুমারি হয়নি। এর মধ্যেই ‘বাঘ আমাদের অহঙ্কার, রক্ষার দায়িত্ব সবার’- এ প্রতিপাদ্যে আজ শুক্রবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব বাঘ দিবস।
বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন হচ্ছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল। বাঘ সুন্দরবনের ফ্ল্যাগশিপ স্পিসিজ হিসেবে কাজ করছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রতিবেশচক্রের প্রধান নিয়ন্ত্রকও বাঘ। বনভূমি উজাড়, অবৈধ চোরা শিকারসহ আরও নানা কারণে বাংলাদেশের জাতীয় পশু ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটিকে প্রতিনিধিত্ব করা বাঘ এখন মহা-বিপন্নের তালিকায় রয়েছে।
বাঘ সংরক্ষণে সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রণালয় তিন বছর মেয়াদী “সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প” নামে প্রকল্প গ্রহণ করেছে ২০১৮ সালে। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ কোটি ৯৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। প্রকল্পের আওতায় সুন্দরবনে ক্যামেরা ট্র্যাপিং এর মাধ্যমে বাঘ গণনা, বাঘের শিকার প্রাণি যেমন- হরিণ ও শূকরের সংখ্যা গণনা, সুন্দরবনের লোকালয় সংলগ্ন ৬০ কিলোমিটার এলাকায় নাইলনের ফেন্সিং বা বেষ্টনী তৈরিসহ বাঘ সংরক্ষণ সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী ইউকেবিডিটিভি.কমকে বলেন, সুন্দরবনে বাঘ বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। পর্যটকরাও বাঘ দেখতে পারছেন বলে জানাচ্ছেন। এটি আশার খবর। ২০১০ সালের অঙ্গীকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেই সময় আসলে বাঘ বৃদ্ধির বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনে বর্তমান পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুসারে বাঘের ধারণক্ষমতা ১৬৪টির মতো। আগামী শীতে শুমারি শুরু হবে। দুই মৌসুম ধরে এ কার্যক্রম চলবে। এর পরই বাঘের সংখ্যার বিষয়টি বলা যাবে।
তিনি আরো বলেন, বাঘের জন্য প্রধান হুমকি চোরা শিকার, যা আগের তুলনায় কমেছে। এ ছাড়া খাবারও পর্যাপ্ত। এ ক্ষেত্রে বাঘের সংখ্যা বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধান বন সংরক্ষক।
সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন ইউকেবিডিটিভি.কমকে বলেন, প্রকল্পের কাজ শুরু হচ্ছে। শুধু বাঘ সংরক্ষণ নয়, সুন্দরবন কেন্দ্রিক আরো অনেকগুলো কাজ হবে এই প্রকল্পের অধীন। সরকার সব সময় বাঘ সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে বাঘের বংশ বিস্তার প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ ফিরোজ জামান ইউকেবিডিটিভি.কমকে বলেন, এ পর্যন্ত বাঘ গণনা ও রক্ষার ওপরই জোরারোপ করা হয়েছে। এর সংখ্যা কীভাবে বৃদ্ধি করা যায়, তার সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতে হবে। খাবারের সংস্থানের উন্নতি হলে বাঘের সংখ্যাও স্বাভাবিকভাবে বাড়বে। বাঘের মূল খাবার হরিণ ও বন্য শূকর। এই হরিণ ও শূকরের খাবার নিশ্চিতে নজর দিতে হবে। খাবার নিশ্চিত হলে বাঘ বাড়বে।
প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবনের ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার অংশ বাংলাদেশের খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় পড়েছে। বাকিটা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলায়।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ বনে ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল, ১৩ প্রজাতির অর্কিড এবং ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী পাওয়া যায়। এই বিচিত্র প্রাণ সম্ভারের বড় স্বাতন্ত্র্য রয়েল বেঙ্গল টাইগার। একক জায়গা হিসেবে সুন্দরবনেই একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বাঘ ছিল। ২০০৪ সালে বন বিভাগের জরিপে পায়ের ‘ছাপ’ গণনা করে বলা হয়, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৪৪০। এর পর ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে ২০১৪ সালে করা শুমারিতে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা নেমে আসে ১০৬টিতে। ২০১৯ সালের শুমারিতে তা বেড়ে ১১৪টি হয়। এর মধ্যেই বাঘ রয়েছে এমন ১৩ দেশের নেতারা ২০১০ সালে মিলিত হয়েছিলেন রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবুর্গ শহরে। ১২ বছরের মধ্যে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকার এসেছিল সেই সম্মেলন থেকে। সেই সময় শেষ হতে হাতে আছে আর পাঁচ মাস। তবে অঙ্গীকার অনুযায়ী বাঘের সংখ্যা বাড়েনি।
তবে বন কর্মকর্তারা বলছেন, বাঘের সংখ্যা সেভাবে বাড়ানো না গেলেও পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে। সুন্দরবন এলাকায় বন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও তৎপরতা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি। স্থানীয়দের নিয়ে বিভিন্ন কমিটি করে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করছেন তারা। কর্মকর্তারা আরো জানান, অনেক সময় বাঘ লোকালয়ে চলে আসে। সেই বাঘ রক্ষায় ৪৯টি ‘ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম’ করা হয়েছে। বন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ টিম কাজ করছে। এ ছাড়া ১৭৬ কমিউনিটি পেট্রল গ্রুপ সীমান্ত এলাকায় কাজ করছে।
জানা গেছে, গত এক বছরে দুটি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। পরে পরীক্ষা করে মৃত্যুর কারণ হিসেবে বিষক্রিয়া কিংবা আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি জানিয়ে বন কর্মকর্তারা বলেন, বয়সের কারণে মৃত্যু হতে পারে বলে ধারণা করা যাচ্ছে।
পাহাড়েও বাঘের অভয়ারণ্য গড়ার সুপারিশ
দেশের পার্বত্য এলাকার বনাঞ্চলগুলোতে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ‘অভয়ারণ্য’ গড়ে তোলা যায় কিনা, তার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সুপারিশ করেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। গত মার্চে কমিটির বৈঠকে এ সুপারিশ করা হয়।
কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী ইউকেবিডিটিভি.কমকে বলেন, একসময় রয়েল বেঙ্গল টাইগার সারা বাংলাদেশেই ছিল। এখন কমতে কমতে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। আমাদের রয়েল বেঙ্গল টাইগার এখন কেবল সুন্দরবনে বসবাস করে। এ জন্য আমরা ভাবছি পার্বত্য এলাকায় এ বাঘের দ্বিতীয় হ্যাবিটেট তৈরি করতে পারি কিনা। মন্ত্রণালয় এ বিষয়টি দেখছে।
এদিকে বিশ্ব বাঘ দিবস উপলক্ষে আজ (শুক্রবার) রাজধানীর বন অধিদপ্তরে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে পরিবেশ,বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রীসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নিবেন।
ইউকেবিডিটিভি/ বিডি / এমএসএম