

মোঃ শাহজাহান মিয়া: বিধি অনুযায়ী একজন সরকারি কর্মকর্তা একাধিক প্রকল্পের পরিচালক হতে পারেন না। এমনকি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু সব আইন ও বিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের একজন নির্বাহী প্রকৌশলী একাই ২৫টি প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। আলোচিত এই কর্মকর্তার নাম মো. আবুল হাসেম সরদার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন ব্যক্তি যদি ২৫ প্রকল্পের পরিচালক হন, তখন প্রকল্পগুলো কাজের গতি হারায়। বেড়ে যায় দুর্নীতি। তবে একজন ব্যক্তির ২৫ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা অবিশ্বাস্য ও নজিরবিহীন।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন ভবন নির্মাণ, বিদ্যমান ভবনগুলোর সম্প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও সংস্কার এবং আসবাবপত্র সরবরাহের কাজ করে থাকে। এ ছাড়া মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, আইসিটি ল্যাব স্থাপন, ইন্টারনেট সংযোগ, আইসিটি সুবিধা সরবরাহের কাজও তারা করে থাকে। জানা যায়, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল হাসেম সরদার চলতি অর্থবছরের ২৫টি উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্বে রয়েছেন। প্রকল্পে তার সহযোগী হিসেবে আছেন সহকারী প্রকৌশলী মো. সিরাজুল ইসলাম, উপসহকারী প্রকৌশলৗ মো. জাফর আলী সিকদার, মো. শাহজাজান আলী এবং শাহ মো. রাকিব।
প্রকল্পগুলো হলো- ১. সুনামগঞ্জ জেলায় তিনটি বেসরকারি কলেজ উন্নয়ন; ২. বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ বিজিবি হেড কোয়ার্টার, ঢাকা-এর অবকাঠামো উন্নয়ন; ৩. গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও রাজবাড়ী জেলার তিনটি বেসরকারি কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন; ৪. মিলিটারি কলেজিয়েট স্কুল, খুলনার অবকাঠামো উন্নয়ন; ৫. নোয়াখালী ও ফেনী জেলার দুটি সরকারি ও একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন; ৬. শেখ রাসেল উচ্চ বিদ্যালয়, সদর গোপালগঞ্জ ও শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়, সূত্রাপুর, ঢাকার অবকাঠামো উন্নয়ন; ৭. রাজস্ব খাতের অধীনে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কার (৪৯৩১); ৮. রাজস্ব খাতের অধীনে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কার (৭০২৬); ৯. রাজস্ব খাতের অধীনে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আসবাবপত্র সরবরাহ; ১০. সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন; ১১. তিন পার্বত্য জেলায় বিদ্যমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আবাসিক ভবন নির্মাণ ও নতুন আবাসিক বিদ্যালয় স্থাপন; ১২. কলেজবিহীন পাঁচ উপজেলায় সরকারি কলেজ স্থাপন; ১৩. ১০০টি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ (টিএসসি) স্থাপন; ১৪. উপজেলা পর্যায়ে ৩২৯টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন (২য় পর্যায়); ১৫. কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরাধীন ৬৪টি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সক্ষমতা বৃদ্ধি; ১৬. সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে চারটি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন; ১৭. বাংলাদেশ ভূমি জরিপ শিক্ষার উন্নয়ন; ১৮. কুমিল্লা জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার লালমাই ডিগ্রি কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন; ১৯. নয়টি সরকারি কলেজ স্থাপন; ২০. অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিদ্যমান পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসমূহের অবকাঠামো উন্নয়ন; ২১. উপকূলীয় এলাকায় ভোলা জেলার তজুমউদ্দিন উপজেলায় নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জলবায়ু প্রভাব সহিষ্ণু অবকাঠামো নির্মাণ; ২২. ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলাধীন কুতকুড়া টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেজ ম্যানেজমেন্ট কলেজ জলবায়ু প্রভাব সহিষ্ণু অবকাঠামো নির্মাণ; ২৩. উপকূলীয় এলাকায় পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া ও ইন্দুকানি উপজেলায় নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জলবায়ু প্রভাব সহিষ্ণু অবকাঠামো নির্মাণ; ২৪. সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহের উন্নয়ন (৩২৩ সরকারি স্কুল); এবং ২৫. পাইকগাছা কৃষি কলেজ স্থাপন।
আইন অনুযায়ী সরকারি প্রকল্পে এক কর্মকর্তাকে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে নিয়োগের সুযোগ নেই। ২০০৯ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের ১৬(৩৬) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ৫০ কোটি টাকার বেশি প্রকল্পে একজন পূর্ণকালীন পিডি নিয়োগ করতে হবে। ১৬(৩৭) অনুচ্ছেদে বলা হয়, এক কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব দেয়া যাবে না।
এদিকে এক ব্যক্তিকে একাধিক প্রকল্পে দায়িত্ব না দিতে গত ২০ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক শামীম আহম্মেদের সই করা চিঠি সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, একজন কর্মকর্তার ১০-১৪টি প্রকল্পের দায়িত্ব পালনকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ভয়াবহ’ বলে মন্তব্য করেছেন। চিঠিতে যেসব কর্মকর্তা একাধিক প্রকল্পে পিডি আছেন, তাদের অতিরিক্ত প্রকল্পের দায়িত্ব ছেড়ে দিতে এ বছরের ২২ ফেব্রুয়ারির পর্যন্ত সময় দেয়া হয়।
জানতে চাইলে ২৫ প্রকল্পের পরিচালক ও প্রকৌশলী আবুল হাসেম সরদার বলেন, আমি ২৫টি প্রকল্পের দায়িত্বে না। আমার অধীনে ১০-১১টি প্রকল্প আছে। তবে এই অধিদফতরের আমার থেকেও বেশি প্রকল্পের পরিচালনা করছেন এমন কর্মকর্তাও আছেন। বিস্তারিত প্রধান প্রকৌশলী জানাবেন বলে তিনি আর কোনো কথা বলতে চাননি।
তবে অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, তিনি অন্তত ৫০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প পরিচালনা করছেন। যার মধ্যে দুটি প্রকল্প আছে যার অর্থমূল্য ৪০ হাজার কোটি টাকা।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একজনের হাতে এত প্রকল্প থাকা অস্বাভাবিক। বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় ইতোমধ্যে দুই থেকে তিনটি প্রকল্প থেকে তাকে সরানো হয়েছে।
২৫ প্রকল্পের দায়িত্বে একজন কর্মকর্তা থাকতে পারেন কি না, এমন প্রশ্নে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্বে) মো. আরিফুর রহমান বলেন, আমি কয়টি প্রকল্পের দায়িত্বে? অফিস প্রধান হিসেবে সব প্রকল্পের দায়িত্বেই তো আমি। আমার তো কাজ করাতে হবে। এ জন্য একজন কর্মকর্তা অনেকগুলো প্রকল্প দেখভাল করেন। অফিসে যারা আছে, তাদের মধ্যেই তো কাজগুলো ভাগ করে দিতে হবে। আগে তো কাজগুলো ভাগ করে দেয়া হতো না। এখন আমরা কাজগুলো ভাগ করে দিচ্ছি। এতে কাজের সুবিধা হচ্ছে।
এর আগে গত ২২ আগস্ট সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এসময় প্রকল্পের আর্থিক বিবৃতিও চাওয়া হয়। দুই মাসের মধ্যে কমিটিতে এই প্রতিবেদন জমা দেয়ার সুপারিশ করা হয়।
একজন কর্মকর্তার ২৫ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকাকে অস্বাভাবিক বলছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানও।
তিনি বলেন, বিষয়টি অবশ্যই অস্বাভাবিক। এটা কেমন করে সম্ভব হলো তা খতিয়ে দেখা দরকার। এতে কাজের দীর্ঘসূত্রতা বাড়বে। এ ছাড়া এর ফলে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে কি না, সেটাও দেখা দরকার।
এ বিষয়ে জানতে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে ফোন করা হলে তিনি ফোন কেটে প্রশ্ন এসএমএস করার বার্তা পাঠান। প্রশ্নের জবাবে তিনি লেখেন, উনার ব্যাপারে আপনারা খবর নেন। চিফ ইঞ্জিনিয়ার সাহেব ব্যাখা দেবে।