বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬, ০৫:২১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :

রাজনীতির সাতকাহন ও জনগণের আর্তনাদ !

গোলাম মাওলা রনি
  • খবর আপডেট সময় : বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬
  • ৬ এই পর্যন্ত দেখেছেন

নিজের দুঃখের কাহিনি দিয়েই আজকের নিবন্ধটি শুরু করছি। সম্প্রতি ঢাকার একটি আবাসিক এলাকার বাসিন্দা হয়েছি। ধানমণ্ডির চল্লিশ বছরের সুখস্মৃতিকে পেছনে ফেলে নতুন বাড়িতে বসবাসের স্বপ্ন কিভাবে সামান্য সিলিন্ডার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ধূলিসাৎ হতে চলেছে, সেই কাহিনি বললেই বুঝতে পারবেন কিভাবে চলছে—কিংবা যেই লাউ সেই কদু নাকি আগেই ভালো ছিলাম ইত্যাদি কথাবার্তার কোনটি আপনার জন্য প্রযোজ্য।

আমি যে এলাকার বাসিন্দা হয়েছি সেটি বর্তমানে দ্রুত বর্ধনশীল উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং ধনিক শ্রেণির আবাসিক এলাকা।

আজ থেকে ৩০-৩৫ বছর পূর্বে আমি ১০ কাঠা জমি কিনেছিলাম, যেখানে একটি আবাসন কম্পানি ১০ তলার একটি নতুন ভবন নির্মাণ করেছে, যার অধিকটা আমি পেয়েছি। আমাদের ভবনে যাঁরা ফ্ল্যাট কিনেছেন তাঁরা সবাই অতি ধনী এবং ঢাকায় একাধিক বাড়ি, গাড়ি ও ফ্ল্যাট রয়েছে। ফলে আবাসন কম্পানি যথাসময়ে ফ্ল্যাটগুলো হস্তান্তর করলেও গত তিন-চার মাসে আমার কোনো প্রতিবেশী তাঁদের ফ্ল্যাটে উঠেননি কিংবা ভাড়া দেওয়ার জন্যও তোড়জোড় করেননি। ফলে বিশাল ভবনটিতে আমরা বুড়াবুড়ি বলতে গেলে নিঃসঙ্গ অবস্থায় রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার দায়ে নিষ্পেষিত হয়ে চলেছি।

আবাসন কম্পানিটি ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব একটি সার্ভিস কম্পানিকে দিয়েছে। সেই কম্পানির পাঁচজন নর-নারী তাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। পাঁচজনের মধ্যে দুজন নারীকর্মী নিকটবর্তী বসুমতি এলাকায় থাকেন এবং সেখান থেকে এসে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। বাকি তিনজন ভবনেই থাকেন এবং নিজেরা রান্নাবান্না করে খান।

তাঁরা যখন আমাদের ভবনে প্রথম রান্নাবান্না শুরু করেছিলেন তখন তাঁদের কম্পানির পক্ষ থেকে একটি গ্যাস সিলিন্ডার কিনে দেওয়া হয়েছিল, যা গত দেড় মাস আগে তাঁরা দুই হাজার টাকা দিয়ে রিফিল করেছিলেন। তিন-চার দিন আগে তাঁদের সিলিন্ডারের গ্যাস শেষ হয়ে যায়। প্রথমত, তাঁরা শত চেষ্টা করেও রিফিল করতে পারেননি। দ্বিতীয়ত, রিফিল করতে চার হাজার ২০০ টাকা লাগবে এই কথা শুনে তাঁদের ঘুম হারাম হয়ে যায়।
বিষয়টি তাঁরা কম্পানিকে জানান।

কম্পানি আবার আবাসন কম্পানিকে জানায়, কিন্তু দরিদ্র দারোয়ান ও কেয়ারটেকারদের গ্যাস সিলিন্ডার কেনার বাড়তি পয়সা দেওয়া অথবা সিলিন্ডার জোগাড় করে দেওয়ার দায়িত্ব কেউ নিতে চান না। অধিকন্তু মাসের তৃতীয় সপ্তাহে যেভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর লোকজনের পকেট শূন্য থাকে সেভাবে আমাদের ভবনের সাহায্যকারীদের পকেটও শূন্য। এ অবস্থায় তাঁরা দুদিন অভুক্ত থেকে ভবনের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন।

উল্লিখিত ঘটনাটি আমার স্ত্রী যখন জানতে পারেন তখন তাদেরকে আমাদের বাসায় খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। নতুন এলাকার বাসিন্দা হওয়ার কারণে গৃহকর্মে সাহায্য করার জন্য একজন খণ্ডকালীন বুয়া ছাড়া অন্য কোনো সাহায্যকারী পাওয়া যাচ্ছে না—অথচ দুজন ড্রাইভার, তিনজন নিরাপত্তাকর্মী, একজন নার্স এবং পরিবারের ছয়জনসহ মোট ১২ জন মানুষের তিন বেলার আহার আয়োজন করতে গিয়ে আমার গৃহিণীকে যে কী পরিমাণ ধকল নিতে হচ্ছে তার দায় আমি কার ওপর দেব?

ঢাকা শহরে আমার ঘরসংসারের বয়স চল্লিশ বছরেরও বেশি। গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে অন্য সবার মতো ঢাকা শহরে আমার ঘরসংসার শুরুর প্রথম দিনগুলো রায় বাহাদুর কিংবা খানবাহাদুরদের মতো ছিল না। দীর্ঘ চল্লিশ বছরের মেহনত, লড়াই-সংগ্রাম, সফলতা, ব্যর্থতা এবং অর্জনের অভিজ্ঞতার আলোকে যদি অতীত নিয়ে চিন্তা করি, তবে দেখতে পাই যে চলমান সময়ের মতো এত দুর্বোধ্য, এত অনিশ্চয়তা, এত হাহাকার, অভাব-অভিযোগ, সন্ত্রাস, ভয়, আতঙ্ক ইত্যাদি অতীতে ছিল না। আমার পেশাগত বৈচিত্র্যের কারণে বাংলাদেশকে যেভাবে দেখার সুযোগ হয়েছে তেমনি পৃথিবীর গত চার দশকের পরিবর্তন বিবর্তন ইত্যাদি দেখারও সুযোগ হয়েছে। খুব কাছে থেকে রাজা-উজির, হাতি-ঘোড়া, পাইক-পেয়াদা, কোতোয়াল-জল্লাদদের দেখেছি। কিন্তু চলমান সময়ের মতো আলুভর্তা মার্কা বিধি-ব্যবস্থা, নিয়ম-কানুন, হাঁকডাক ইত্যাদি দেখেনি।

আমার পেশাগত পথ চলা শুরু হয় এরশাদ জামানার মাঝামাঝি সময়, অর্থাৎ ১৯৮৬ সালে যখন বাংলাদেশের সব কিছু নতুন করে ট্রান্সফর্মেশন হচ্ছিল। রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-সাহিত্য, কবিতা, রাষ্ট্রীয় শ্রেণিচরিত্র, আমলাতন্ত্রসহ আন্ডার ওয়ার্ল্ড বা অন্ধকার জগতের কারসাজির বনিয়াদ ওই সময়টিতে শুরু হয়েছিল। একদিকে নিত্যনতুন কাপোরেট হাউস, অন্যদিকে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং, কারওয়ান বাজারের চাঁদাবাজি, টানবাজারের পতিতাবৃত্তি, ধনীদের ক্লাবে মদ-জুয়ার আড্ডা, সংঘবদ্ধ চোরাচালানি, বিদেশে অর্থপাচার, রাজপথে গণতন্ত্রের আন্দোলন, বাংলাবাজারে সাহিত্য এবং প্রকাশনার রমরমা ব্যবসা। সারা দেশে কবি, গীতিকবি, জারি-সারি, যাত্রাপালার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে স্বৈরাচারী শাসনের দাপটের মধ্যেও জনজীবনে প্রাণের স্পন্দন ছিল। মানুষ টের পেত কখন বসন্ত আসছে। কিংবা রাতে ঘুমানোর আগে পরবর্তী দিবসের জন্য সুন্দর একটি স্বপ্ন চোখের পাতার ওপর বসিয়ে নিদ্রার কোলে ঢলে পড়ার জীবনচক্র মানুষকে নতুনভাবে বাঁচাতে শেখাত।

আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন রহিমআফরোজ কম্পানি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের স্বপ্ন দেখাত। প্রতিটি মানুষ তার জ্ঞান-বুদ্ধি, অর্থবিত্ত, শক্তি-সামর্থত, শ্রম-ঘাম এবং শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনে শরিক হতো। প্রাইভেট সেক্টরের ব্যবসা-বাণিজ্য, আমলাতন্ত্রের কার্যক্রম, রাজনীতি, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি পরস্পরের সঙ্গে সাহায্য-সহযোগিতার এক অপূর্ব সেতুবন্ধের যে জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল তা ২০০৯ সালে কেমন ছিল তার একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে আজকের নিবন্ধ শেষ করব।

ঘটনার দিন হোটেল সোনারগাঁওয়ের লবিতে ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হলো। বাংলাদেশের শীর্ষ কনস্ট্রাকশন কম্পানি আব্দুল মোনেম লিঃ-এর কর্ণধার জনাব মোনেমের জ্যেষ্ঠ সন্তান সেদিন আমাকে দেখেই দৌড়ে এলেন। তিনি আমাকে অবাক করা যে তথ্যটি সেদিন জানালেন, তা শুনে আমি নিজেও হতবাক হয়ে গেলাম। তিনি জানালেন যে নেহাত সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়েছিলেন। কথা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, রাষ্ট্রের কী কী কাজ করছ। ভদ্রলোক প্রকল্পগুলোর নাম বলতে গিয়ে হোটেল র‌্যাডিসনের কাছাকাছি নির্মিতব্য ক্যান্টনমেন্ট রেলক্রসিং ফ্লাইওভার প্রকল্পটির কথা বললেন। তাঁকে পাল্টা প্রশ্ন করা হলো, ফ্লাইওভারে কয়টি লেন? তিনি যখন জানালেন, একদিকে দুটো করে মোট চারটি লেন। তাঁর জবাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বললেন, ওখানে হিউজ ট্রাফিক জ্যাম। কাজেই চার লেন নয়, মোট ছয় লেন হবে। এরপর তিনি ফাইল তলব করলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রলোককে বললেন, যাও ছয় লেনের ফ্লাইওভার তৈরি করার নকশা প্রস্তুত করো।

উল্লিখিত ঘটনার মতো অসংখ্য ঘটনা এরশাদ জামানা এবং বেগম জিয়ার আমলেও ঘটেছে, কিন্তু গত সতেরো মাসে কী ঘটেছে তার কাহিনি আমি জানি না। আমি যা জানি তা হলো, কোনো নতুন প্রকল্প তো দূরের কথা, ধোয়ামোছা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজগুলোও ঠিকমতো হয়নি। উল্টো শুধু বিদ্যুৎ বিভাগে যে লোকসান হয়েছে তা দিয়ে আরেকটি পদ্মা সেতু তৈরি করা যেত। অন্যদিকে গত কয়েক মাসে এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাসের জোগান, সরবরাহ ও মূল্যবৃদ্ধিজনিত সমস্যার কারণে জনদুর্ভোগ কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে তার ছোট একটি ঘটনায় আমাদের আবাসস্থলে তিনজন দরিদ্র ও অভাবী মানুষকে দুদিন অভুক্ত থাকার যে দৃষ্টান্ত আমি নিজ চোখে দেখলাম, তা অতীতে কোনো জামানায় দেখার দুর্ভাগ্য হয়নি।

লেখক : গোলাম মাওলা রনি, সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102