

মো. শাহজাহান মিয়া: প্রবাসী আয় বাড়াতে বাংলাদেশের রেমিটেন্স সিপাহসালার অগ্রণী ব্যাংকের শামস-উল ইসলাম। প্রবাসী আয় আহরণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে এখন শীর্ষে অগ্রণী ব্যাংক। আর দেশের সার্বিক ব্যাংকিং খাতে ব্যাংকটির অবস্থান দ্বিতীয়। রেমিট্যান্স বদলে দিয়েছে অগ্রণী ব্যাংকে। এর মূল কারিগর ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহম্মদ শামস-উল ইসলাম। বৈদেশিক মুদ্রায় অগ্রণী ব্যাংকের স্বাবলম্বী হয়ে ওঠা কিভাবে সম্ভব হলো তাই মোহম্মদ শামস-উল ইসলাম জানালেন, অনলাইন ইউকেবিডি টিভিকে দেয়া সাক্ষাতকারে।

নাগরিক টিভি’র ”বিজকাশন” পর্ব ৭৮ এ অগ্রণী ব্যাংক এর এমডি ও সিইও জানালেন গত অর্থবছরে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে অগ্রণী ব্যাংকে। দীপ আজাদের উপস্থাপনায় ওই পর্বে প্রবাসী আয়ের ব্যাংকের নানা উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। ”বিজকাশন” পর্ব সাক্ষাতকারে এমডি বলেন, করোনা নিয়ে আমরা এমনিই একটু শংকিত ছিলাম প্যানিকে ছিলাম। এরপর যখন আমার হলো তখন আমার মনোবলটা একটু শক্ত ছিল যে, আমারতো ভ্যাকসিন নেয়া আছে।

এটা বেশী এ্যাফেক্ট করবেনা। যাহোক আমি মনোবল নিয়ে কোয়ারেন্টিন থেকে কাজ করে যেতে থাকলাম। আমি জুমে মিটিং শুরু করে অফিশিয়াল সব যোগাযোগ, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মিটিং, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে মিটিং করেছি। আমাদের হাফ ইয়ারলির পরে ১১ ঘন্টা কনফারেন্স করেছি। আমি কাউকে বলিনি যে আমার কোভিড হয়েছে। পরে মিটিং শেষে বলেছি। সবাই তো তখন খুব সারপ্রাইজড হয়। সবাই হতবাক হয়ে বলে যে স্যার কোভিড নিয়ে এতক্ষণ জুমে কনফারেন্স করলেন, মিটিং করলেন কিন্তু বলেনতো নাই! আমার মনে হয় এটা আমাদের পার্ট অফ লাইফ, এটা নিয়েই চলতে হবে, আমরা চলব ইনশাআল্লাহ।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনাকালে অর্থনীতি চাঙ্গা রয়েছে প্রবাসী আয়ে। গত অর্থবছরে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে অগ্রণী ব্যাংকে।

প্রবাসী আয় বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছে ব্যাংকটি। এখানে সরকারি প্রণোদনার সঙ্গে আরও ১% বোনাস পান প্রবাসীরা। সব মিলিয়ে ৩% বোনাসের সুবিধা পেতে সারা বিশ্বের প্রবাসী বাংলাদেশীরা অগ্রণী ব্যাংকে রেমিটেন্স পাঠাতে শুরু করে। ৩% প্রণোদনায় বিশ্বে অগ্রণী ব্যাংক রেমিটেন্সে সাড়া ফেলে দেয়।করোনাকালে সারা বিশ্বে অর্থনীতির চাকা স্থবির হয়ে গেছে, সে অবস্থায় বাংলাদেশে অর্থনীতির চাকা সচল আছে প্রবাসী আয়ে।এ সম্পর্কে অগ্রণী ব্যাংক এমডি বলেন, প্রবাসীরা দু’হাত ভরে টাকা পাঠাচ্ছেন। যার কারণে আমাদের অর্থনীতি সচল রয়েছে। আমরা ধারনা করেছিলাম প্রবাসী আয়ে একটা ধাক্কা লাগবে। কিন্তু দেখা গেল উল্টোটা ঘটল।এর কারণ সম্পর্কে অগ্রণী ব্যাংক এমডি মোহম্মদ শামস-উল ইসলাম বললেন, বিশ্বে যারা অর্থনীতি নিয়ে কাজ করেন তাদের ধারণা ছিল প্যান্ডামিকে বড় ধরনের একটা ধাক্কা লাগবে। সারপ্রাইজিংলি ২০১৯ সালের চেয়ে ২০২০ সালে বাংলাদেশে রেমিটেন্স বেশী আসছে। গ্লোবালি রেমিটেন্স কিন্তু ৫৪০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে রেমিটেন্স কিন্তু রিবাউন্ড হয়েছে।
বাংলাদেশে কিন্তু এইটটিনথ পয়েন্ট ফোর পার্সেন্ট ইনক্রিস হয়েছে। এটা কিন্তু সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশে টুয়েন্টি ওয়ান পয়েন্ট সেভেন ফাইভ বিলিয়ন ডলার কিন্তু তারা (প্রবাসীরা) পাঠিয়েছে। আমরা যদি ইয়ার টু ইয়ার বেসিসে ধরি তাহলে সেখানে কিন্তু রেমিটেন্স এসেছে টুয়েন্টি ফোর বিলিয়ন ডলার। এটা কিন্তু বাংলাদেশের বিশাল একটা এচিভমেন্ট। এর পেছনে মূল একটা কারণ হচ্ছে যারা ইললিগ্যালি চ্যানেল, হুন্ডি, টাকা পাঠায় তারা মুভমেন্টে একটু রেস্ট্রিকটে ছিল। এটা একটা জিনিষ।

সবচেয়ে বড় যে বিষয়টা তা হলো আমাদের মটিভেশনাল ইমপ্লিমেন্ট; আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রী যে ডিক্লারেশন করেছেন, প্রথমবারের মত। যেটাতে মাননীয় অর্থমন্ত্রী রেমিটেন্সে টু পার্সেস্ট ইনসেনটিভ দিয়েছেন সেটাই কাজ করেছে রেমিটেন্সে। এটা একটা বড় ডিসিশন মেকিং এ কাজ হয়েছে বাংলাদেশে। যারা আগে ইললিগ্যালি টাকা পাঠিয়েছেন, কম টাকা পাঠিয়েছেন তারা কিন্তু এবার সবাই অফিশিয়ালি চ্যানেলে টাকা পাঠিয়েছেন। কারণ এবার তারা বেনিফিটেড হয়েছেন, টু পার্সেন্ট ইনসেনটিভ পেয়েছেন তারা। এর সঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের মত কিছু ব্যাংক এডিশনাল আরো ওয়ান পার্স্টেন্ট ইনসেনটিভ দিয়েছে। এই যে ফিনানশিয়াল ইনসেনটিভ এটাই কাজ করেছে। প্রবাসীরা অফিশিয়াল চ্যানেলে রেমিটেন্স পাঠিয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র, বন্ড, ওয়েজআর্নার বন্ড, ডলার বন্ড কেনার সুযোগ তারা পাচ্ছে।এসব বিভিন্ন কারণে প্যান্ডামিকের মধ্যে প্রবাসীরা দেশের অসহায় মানুষের জন্যে, রিসকিং দেয়ার লাইভ এর জন্যে টাকা পাঠিয়েছে। এটা বাঙ্গালীদের মহৎ একটা গুণ, বিশেষ করে দুঃখের সময়, অসহায়ের সময়, ঝড় ঝনঝাড় সময় তাদের সহমর্মীতা দেখা দেয়। এই সব মাল্টিপ্লান ইফেক্ট রেমিটেন্স প্রবাহে কাজ করেছে। এসব কারণে আমাদের ৪৬ বিলিয়ন রিজার্ভ অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করেছে।

আমাদের ব্যাংকিং চ্যানেলে যে পরিমান প্রবাসি আয় আসে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে। দেশে এত বেসরকারী ব্যাংক থাকতে প্রবাসীরা রাষ্ট্রাযত্ব ব্যাংকে কেন বেছে নিল ?এ সম্পর্কে মোহম্মদ শামস-উল ইসলাম বলেন, যারা বিদেশ থেকে টাকা পাঠায় তারা খুব সহজে তাড়াতাড়ি দেশে টাকা পাঠাতে পছন্দ করে। কত তারাতারি বেনিফিসিয়ারী টাকা পাবে সেটাই খোঁজে প্রবাসীরা। প্রবাসীরা আমাদের বেছে নেয়ার প্রথম ডিফারেন্সটাই কিন্তু এটা।আমরা অগ্রণী ব্যাংক গোরা থেকেই রেমিটেন্সে গুরুত্ব দিয়ে আসছি। অনেকে রেমিটেন্সটাকে ব্যাংকিং এর কাজ না বলে মনে করত। তারা চাইত এক্সপোর্ট করতে হবে ইমপোর্ট করতে হবে। রেমিটেন্সটা টোটালি তাদের কাছে গুরুত্ব পায়নি। আমরা কিন্তু প্রথম থেকেই টোটালি রেমিটেন্সটাকে গুরুত্ব দিয়ে আসছি। আমি নিজেও বাইরে ছিলাম, দেখিছি প্রবাসী ভাইয়েরা কিভাবে কষ্ঠ করে। তাই আমাদের নজর ছিল প্রবাসী ভাইয়েরা কিভাবে সহজে কম খরচে দেশে টাকা পাঠাতে পারে সেদিকে। আমরা ২০০৮-০৯ সালের দিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে আমরা তৃতীয় ছিলাম।আমি যখন ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে অগ্রণী ব্যাংকের আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগদান করি, তখন ব্যাংকের এমডি ছিলেন সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার। তিনি আমাকে একদিন বললেন, আপনি তো রেমিট্যান্সে ভালো, স্মার্ট। তাই এখানে কিভাবে আরো উন্নতি করা যায় দেখেন। এমডির নির্দেশনা পাওয়ার পর আমরা তখন অনেক ধরনের প্রোগ্রাম নিলাম। বিশেষ করে মানিগ্রামের সঙ্গে রেমিট্যান্স আনার চুক্তি করলাম। পরবর্তী সময় আরো অনেক কম্পানির সঙ্গে রেমিট্যান্স আনার চুক্তি করলাম। এতে রেমিট্যান্সে আশার আলো দেখতে পেলাম।২০০৯ সালের শেষের দিকেই আমরা রেমিট্যান্স আহরণে জনতা ব্যাংককে ক্রস করি। এর পরের বছরই আমরা সোনালী ব্যাংকে ক্রস করি। এখন সরকারি ব্যাংকের মধ্যে আমরা নাম্বার ওয়ান। আমাদের ৯৬০টি ব্রাঞ্চ। সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আমাদের নেটওয়ার্ক। আমাদের ৪০০টি এজেন্ট ব্যাংকিং আছে। আমাদের ৩৭৫ টা অগ্রণী রেমিট এ্যাপ পয়েন্ট আছে। এসবের মাধ্যমে দ্রুত টাকা এ্যাকাউন্টে দিতে পারে প্রবাসীরা। যেটা অন্যান্য ব্যাংকে নাই।মোহম্মদ শামস-উল ইসলাম জানান, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে জুন এই ছয় মাসে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স আসে সাত হাজার ২০০ কোটি টাকা। আর জুলাই মাসেই এসেছে তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসেরটা এসেছে এক মাসেই।

তিনি বলেন, ‘এটা একটা জাদুকরী কাজ ছিল। এটা সম্ভব হওয়ার পেছনে সরকারের ২ শতাংশ প্রণোদনার সঙ্গে অতিরিক্ত আরো ১ শতাংশ বাড়তি প্রণোদনা দিয়েছি আমরা। আমরা দেখলাম করোনার প্রাদুর্ভাব চলছে। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যেতে পারে। তাই এ সময় রেমিট্যান্স বাড়াতে কিছু একটা করতে হবে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, সরকারের ২ শতাংশ প্রণোদনার সঙ্গে অতিরিক্ত আরো ১ শতাংশ প্রণোদনা দেব। আর এটাতেই বাজিমাত হয়েছে।প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে এক কোটি দিচ্ছেন অগ্রণী ব্যাংকের এমডি মোহম্মদ শামস-উল ইসলামসহ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষআমরা আরেকটি কাজ করেছি। আর তা হলো, আমরা জাতির পিতার জন্মবার্ষিকীর দিন গত ১৭ মার্চ অগ্রণী ব্যাংক রেমিট্যান্স অ্যাপস চালু করি।

এটা যখন চালু করা হলো, তার পরই বিশ্বজুড়ে করোনা প্রাদুর্ভাব ও লকডাউন শুরু হলো। ফলে আমাদের প্রবাসী ভাইদের ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউসে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু করোনার সময়েও আমাদের ব্যাংকের অ্যাপস ডাউনলোড করে প্রবাসীরা ঘরে বসেই দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে পেরেছেন। এ ছাড়া করোনার কারণে কাকতালীয়ভাবে হুন্ডিও কমেছে। এতে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসা বেড়েছে। জুলাই ও আগস্টে আমাদের ১০টি শাখার প্রতিটি এক দিনে তিন কোটি টাকার বেশি রেমিট্যান্স আনতে সক্ষম হয়েছে। পুরস্কার হিসেবে এই ১০টি শাখার রেমিট্যান্স অফিসারকে আমরা ল্যাপটপ দিয়েছি। যেসব শাখায় দুবার বা ততধিক তিন কোটি টাকা বা তার বেশি রেমিট্যান্স এসেছে, সেসব শাখার ম্যানেজারকেও ল্যাপটপ দেওয়া হয়েছে।

৩ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ায় ব্যাংকের আয়ে প্রভাব পড়েছে কি না জানতে চাইলে বলেন, ‘লাভ-ক্ষতির একটা ব্যাপার তো অবশ্যই আছে। তবে সরকারি ব্যাংক হিসেবে মুনাফা করাই আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। দেশ ও গ্রাহকের সন্তুষ্টি অর্জনকেই আমরা প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তা ছাড়া এটা তো ছিল এক ধরনের ব্র্যান্ডিং। প্রবাসী যাঁরা রেমিট্যান্স পাঠান তাঁদের অনেকেই অগ্রণী ব্যাংককে চিনত না বা অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠাত না। কিন্তু অতিরিক্ত প্রণোদনা দেওয়ার কারণে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে তাঁরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও পাঠানোর সম্ভাবনা তৈরি হলো। তা ছাড়া আমাদের তো বৈদেশিক মুদ্রার দরকার ছিল।
আজকে যে রিজার্ভ ৩৯ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে, সেখানে রেমিট্যান্সের অবদান অনেক।’ রেমিট্যান্সের কারণেই অগ্রণী ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রায় স্বাবলম্বী উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা পদ্মা সেতু নির্মাণে ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার দিয়ে সহায়তা করেছি।

মোহম্মদ শামস-উল ইসলাম বলেন, একসময় হুন্ডিতেই ৩০-৪০ শতাংশ রেমিট্যান্স আসত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন পদক্ষেপে এখন হুন্ডি কমে গেছে। কভিড শুরু হওয়ার পর এটা ব্যাপকভাবে কমেছে। এতে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বেড়েছে। যাঁরা একবার ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানো শুরু করেছেন, তাঁদের যদি একটু ভালো সেবা দেওয়া যায়, তাঁরা ব্যাংকের মাধ্যমেই টাকা পাঠাবেন। ফের হুন্ডিতে ফিরবেন বলে মনে হয় না।