বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৪:৪৪ পূর্বাহ্ন

সমবয়সী সহযোদ্ধার শুভ জন্মদিনে: আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

সংবাদদাতার নাম :
  • খবর আপডেট সময় : রবিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২১
  • ৩৪৯ এই পর্যন্ত দেখেছেন

মোঃশাহজাহান মিয়া,ঢাকা:করোনার হামলায় আমার বন্ধু-বান্ধব প্রায় সবাই শেষ। চৈত্রের বৃক্ষের পাতার মতো তাঁদের মধ্যে একজন এখনো টিকে আছেন। তিনি তোয়াব খান। করোনার হামলায় তিনিও ঝরে পড়তে গিয়েছিলেন। কী জাদুমন্ত্রে বেঁচে গেছেন। তাতে তাঁরই বয়সী আমার মনেও আশা জাগছে—জীবন অফুরান। আজ ২৪ এপ্রিল তোয়াব খান ৮৮ বছর বয়সে পদার্পণ করবেন। আমি করব ডিসেম্বর মাসে। সংক্ষেপে একটা কথাই বলা চলে, আমরা সমবয়সী ও সহযোদ্ধা। সাংবাদিকতা আমাদের আজীবনের পেশা। বাংলাদেশে প্রকৃত সম্পাদক-প্রজাতি এখন বিলুপ্ত প্রায়। বাতিঘরের শেষ বাতি হিসেবে তোয়াব খান এখনো বেঁচে আছেন। তিনি শতবর্ষ পূর্ণ করুন—এই আমার প্রার্থনা।৮৮ বছর বয়সেও তিনি পত্রিকা সম্পাদনা করছেন। ঘরে রুগ্ণাবস্থায়ও তিনি এই কাজ থেকে অবসর নেননি। এটা যুদ্ধ ছাড়া আর কী! এই যুদ্ধ চালাচ্ছেন যৌবনের সেই প্রারম্ভিককাল থেকে। মানুষের জন্য যুদ্ধ। মানুষের খবর ছাপানোর জন্য যুদ্ধ। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ। তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন। একটি অসাম্প্রদায়িক সেক্যুলার বাংলাদেশ গড়ার জন্য লড়েছেন। এখনো লড়ছেন। এমন একজন লড়াকু সম্পাদক কোথায় পাওয়া যাবে?আমার গর্ব, আমি তাঁর সমবয়সী এবং সহযোদ্ধা হতে পেরেছি, কলম হাতে এখনো যুদ্ধের ময়দানে আছি। বাংলাদেশে এখন আবার সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার দানব মাথা তুলতে চাইছে। রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন—‘দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে/প্রস্তুত হতেছো ঘরে ঘরে।’ ঘরে ঘরে দানববিরোধী সংগ্রামের ময়দানে তোয়াব খান একজন দীপ্ত তীরন্দাজ। জেলে গেছেন। জীবননাশের হুমকি শুনেছেন। বয়সের ভারে কাতর। তবু যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত হননি।বাংলাদেশে মানিক মিয়া, জহুর হোসেন, আবদুস সালাম সম্পাদকতা ও সাংবাদিকতায় একটি সংগ্রামী ধারা সৃষ্টি করে গেছেন। সম্ভবত তোয়াব খান সেই ধারার একটি শেষ নক্ষত্র। অবিভক্ত বাংলাদেশে সেই ঈশ্বর গুপ্তের আমল থেকে একটি পেশাগত এবং প্রকৃত সম্পাদক-প্রজাতি গড়ে উঠেছিল। এখন বিভক্ত দুই বাংলাতেই সেই প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার মুখে। তোয়াব খান সম্ভবত সেই গর্বিত প্রজাতির শেষ প্রদীপ। তাঁর শুভ জন্মদিনে নীরোগ, নিরাপদ, সুস্থ এবং আরো দীর্ঘ জীবন কামনা করে শুভেচ্ছা জানাই।তোয়াব খানের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় সেই পঞ্চাশের দশকে। তিনি তখন দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক। আমি মাত্র সংবাদ ছেড়ে অনার্স পরীক্ষা দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে ফিরে গেছি। আমাদের পেশা ও নেশাও এক। পেশা সাংবাদিকতা, নেশা বাম ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা। তোয়াব খান এই পেশা ও নেশা এ দুটির ক্ষেত্রে নিষ্ঠতার পরিচয় দিয়েছেন। দেশের যখন দুর্দিন, বিএনপি ও জামায়াত যখন জনকণ্ঠ পত্রিকাটির কণ্ঠরোধে জবরদস্তি চালাচ্ছে, তখনো তোয়াব খান এই পত্রিকাটির লড়াকু উপদেষ্টা সম্পাদকের পদ আঁকড়ে ছিলেন। সচ্ছল কোনো পত্রিকায় বা সরকারি কোনো উচ্চপদে চলে যাননি।সরকারি চাকরিতে তিনি মাত্র একবারই ছিলেন। তা নিজের ইচ্ছায় নয়, জাতির পিতার ডাকে। তাও সাধারণ কোনো সরকারি পদ নয়, জাতির পিতার প্রেস সচিবের পদ। স্বাধীনতার পর তিনি ছিলেন অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলার সম্পাদক। এই সময় একটি অবাঞ্ছিত খবর ছাপানোর দায়ে পত্রিকাটির সম্পাদক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সবাই আশঙ্কা করেছিলেন, তোয়াব খান গ্রেপ্তার হবেন। তার বদলে তাঁকে বঙ্গবন্ধু একেবারে কাছে টেনে নেওয়ায় বোঝা গিয়েছিল, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুও তোয়াব খান ও তাঁর সাংবাদিকতাকে কতটা গুরুত্ব দিতেন।বঙ্গবন্ধু প্রেসসচিব থাকাকালেই তোয়াব খানের সঙ্গে আলজেরিয়ায় জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। আমি গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর সহগামী সম্পাদক টিমের সদস্য হয়ে। তার আগে পাকিস্তান আমলে তোয়াব খানের সঙ্গে রাওয়ালপিন্ডিতে গিয়েছিলাম। তখন পাকিস্তানে ইয়াহিয়া খানের সামরিক শাসনের শুরু। জাতীয় সংসদ বাতিল হয়ে গেছে। রাওয়ালপিন্ডিতে সাংবাদিকদের ডেকে দেশের বাজেট পেশ করা হয়েছিল। নওয়াব মুজাফ্ফর আলী খান কিজিলবাস ছিলেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর সংবাদ সম্মেলন শেষ করে অন্য সম্পাদকরা কী করেছিলেন জানি না। আমি আর তোয়াব খান সারা রাওয়ালপিন্ডি চষে বেড়িয়েছি। তোয়াব খান এক জোড়া কাবুলি স্যান্ডাল কিনবেন, সে জন্য রাওয়ালপিন্ডির জুতা বিক্রির পাড়ায় ঘুরেছি। ইসলামাবাদ শহর তখন মাত্র নির্মিত হচ্ছে। চারদিক ইট-কাঠে ভর্তি। দু-একটা চায়ের দোকান মাত্র হয়েছে। সেই দোকানে বসে চা গিলেছি। সেবার আমি খাইবারপাস পর্যন্ত ঘুরেছি। সে কাহিনি এখানে অপ্রাসঙ্গিক।জনকণ্ঠের জন্মলগ্ন থেকেই তোয়াব খান এই কাগজের উপদেষ্টা সম্পাদক। আসলে আছেন সার্বক্ষণিক সম্পাদক হয়ে। এই দুর্দান্ত করোনার বিস্তারের সময়েও অফিস কামাই করেননি। জিজ্ঞাসা করা হলে হেসে বলেছেন, ‘করোনা আমাকে এই বয়সে স্পর্শ করবে না।’ আমেরিকায় মেয়ে-জামাইয়ের বাড়িতে বেশ কয়েক মাসের জন্য বেড়াতে গিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশে ফিরে এসেই রোগে আক্রান্ত হন। কিন্তু ৯০ বছরের কাছাকাছি বয়সের এই মানুষটি এই যুদ্ধেও জয়ী হয়েছেন। তিনি আজ ৮৮ বছর বয়সে পা দিচ্ছেন। তাঁকে আমার সশ্রদ্ধচিত্তের বিনম্র অভিনন্দন।তাঁর কাছে আমার অসংখ্য ঋণের মধ্যে একটি ঋণের কথা আজ স্বীকার করব। সব কাগজের সম্পাদকই আমাকে তাঁদের কাগজে স্বাধীনভাবে লেখার অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু তোয়াব খান তাঁর কাগজে আমাকে দিয়েছেন কলম দ্বারা স্বৈরাচারী শাসকের মুখোশ উন্মোচনের সাহসী অধিকার। ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয় ঘটানোর জন্য দেশি-বিদেশি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি যে ষড়যন্ত্র ঘটিয়েছিল, তাতে রাষ্ট্রপতির পদে বসে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের যোগদানের যে ঘৃণ্য ইতিহাস তা নিয়ে সে কলাম লিখেছিলাম। তা ছাপাতে আমার নিয়মিত কলাম লেখার দৈনিকটির (এখন আর লিখি না সেই কাগজে) সম্পাদক যখন অস্বীকৃতি জানান, তখন জনকণ্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খান সাগ্রহে লেখাটি নিয়ে মাথার ওপর সরকারি রোষের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও তাঁর কাগজে ছেপেছিলেন। সারা দেশে লেখাটি চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। লেখাটির শিরোনাম ছিল ‘বঙ্গভবনে একজন ঈশ্বরের মৃত্যু।’ সম্রাট-সম্পাদক তোয়াব খানকে শুভেচ্ছা জানাই। তাঁর শতায়ু কামনা করি। সূত্র কালের কণ্ঠ

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102