

শিরোনাম লিখে হাসবো না কাঁদবো ঠিক ঠাহর করতে পারছি না। কারণ যিনি দেশেবিদেশে বৈষম্য কমানোর জন্য সোচ্চার ছিলেন এবং একাধিক বাস্তবতা ভিত্তিক পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, তিনি বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হন। আমি বাংলাদেশের সফল রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা বলছিলাম।
শেখ হাসিনা তার ৪০+ বছরের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করেন যে, সমাজে বৈষম্য না কমালে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তিনি বৈষম্য কমানোর জন্য একাধিক কর্মসূচি হাতে নেন।
তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা তাকে বৈষম্য দূর করার জন্য বার বার তাগদা দিতে থাকে। তাই তিনি ২০১১ সালে ধনী দরিদ্রের বৈষম্য, নারী পুরুষের বৈষম্য, দেশেবিদেশে বৈষম্য অর্থাৎ সামাজিক বৈষম্য কমানোর জন্য জাতিসংঘে জোরালো আওয়াজ তুলেন এবং একটি প্রস্তাব পেশ করেন। তাঁর প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ব্রাজিলের রিও+২০ সম্মেলনে এনিয়ে অনেক আলোচনা ও বিতর্ক হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালে তিনি দুটি প্রস্তাব জাতিসঙ্ঘে উত্থাপন করেন। তাঁর একটি হচ্ছে (১) পিপুলস এনপাওয়ারমেন্ট (মানুষের ক্ষমতায়ন) এবং অন্যটি হচ্ছে (২) অটোইজম এবং অন্য সব প্রতিবন্ধকতা (Autism and other disabilities)। এই দুটি প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বৈষম্য দূরীকরণ। তাছাড়াও তিনি ডিজিটাল ডিভাব (digital divide) দূর করার জন্যেও অর্থাৎ ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যে ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহারের বৈষম্য দূর করার জন্য জোরালো উদ্যোগ নেন।
তাঁর এই বৈষম্য দূরীকরণের প্রস্তাবের উপর অনেক অনেক আলোচনা হয়। অনেক ডিবেট হয়। শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের ১৯৩ টি দেশ তাঁর প্রস্তাবের যুক্তিকথা অনুধাবন করে তা ২০১২ সালের ডিসেম্বরে প্রথমতঃ সেকেন্ড কমিটিতে এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। কিন্তু বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, জাতিসংঘে এর আগে কোনো রিজোলিউশনে কোনো ব্যাক্তিবিশেষের নাম উল্লেখ করা কখনো হয়নি। তবে এই বৈষম্য বিরোধী প্রস্তাবে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম লিপিবদ্ধ আছে এবং এটা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।
জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি এক পর্যায়ে শেখ হাসিনার নাম বাদ দেয়ার জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তবে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির হস্তক্ষেপে পাকিস্তান তাদের আপত্তি তুলে নিলে দুনিয়া থেকে বৈষম্য মুছে ফেলার প্রস্তাবে শেখ হাসিনার নাম স্বর্ণালঙ্কারে লিখিত হয়। জাতিসংঘের এই বিষয়ক প্রস্তাবের নামকরণ হচ্ছে “People’s Empowerment: A Peace-centric Development Model” বা “মানুষের ক্ষমতায়ন: শান্তি কেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেল “। এটা জাতিসংঘের ৬৬তম অধিবেশনে গৃহীত হয় (A/RES/66/224, UN). এটা গৃহীত হবার পর জাতিসংঘে তৎকালীন বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আশাবাদ ব্যাক্ত করেন যে এপ্রস্তাব গৃহীত হওয়ার ফলে “millions of voiceless, marginalized and deprived people of the world” — পৃথিবীর লক্ষ কোটি বাকবন্ধী দরিদ্র মানুষ যারা উন্নয়নের যাত্রাপথ থেকে বঞ্চিত তাদের জীবনেও স্বস্তি ফিরে আসবে এবং তারা নিজেদের ক্ষমতায়নের জন্য আগামীতে শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করতে সক্ষম হবে।
শেখ হাসিনা বিশ্বাস করেন যে, সবাইকে নিয়ে উন্নয়ন করতে হবে এবং তা নাহলে উন্নয়ন ঠিকসই বা চিরস্থায়ী হবে না। বস্তুত তাঁর দিকদর্শন হচ্ছে উন্নয়নের পথযাত্রায় কাউকে বাদ দেয়া যাবে না— “no one is left behind”. তাঁর এই ফিলোসফি বা দর্শন জাতিসংঘ গ্রহণ করে। ২০১৫ সালে জাতিসংঘ যে ঠিকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে (SDGs বা Sustainable Development Goals) তাতে শেখ হাসিনার “No one is left behind “— সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এসডিজি রিজোলিউশনের প্রেমবল বা শুরুতেই তা উল্লেখ আছে।
তাছাড়া তৎকালীন বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি তাঁর মিশনে ৪টি পি (4Ps: protect, promote, peace, provide leadership) লক্ষ্য মাত্র নির্ধারণ করেন এবং জাতিসংঘের এসডিজি বিষয়ক কমিটি তাঁর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এস-ডি-জির প্রারম্ভিক লক্ষ্য হিসাবে ৫টি পি সংযোজন করে। এই ৫টি পি হচ্ছে — 5Ps: people, planet, peace, prosperity and partnership. ঠিকসই উন্নয়নের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে মানুষ, পৃথিবী, শান্তি, আর্থিক সমৃদ্ধি এবং পার্টনারশিপ বা সবার অংশ গ্রহণ। বস্তুত সবার অংশগ্রহণ ছাড়া (ধনী দরিদ্র সব দেশ) ঠিকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়।
শেখ হাসিনা মানুষের ক্ষমতায়ন বা people’s empowerment বাড়ানোর জন্য ৬টি অন্তর্ভুক্তিমূলক বিষয়ের উপর জোর দেন। এগুলো হচ্ছে — (১) ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূর করতে হবে, (২) বৈষম্য কমাতে হবে, (৩) বন্চিতদের অভিযোগ কমাতে, (৪) যারা ঝড়েপড়ে গেছে তাদেরও উন্নয়নের মহাযাত্রায় নিয়ে আসতে হবে, (৫) প্রত্যকের জন্য কর্মসংস্থান জোগাড় বা আয়ের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে, এবং (৬) সন্ত্রাস ও জংগীবাদ উৎখাত করতে হবে। অর্থাৎ মানুষের ক্ষমতায়নের জন্য (১) Eradicate hunger and poverty, (2) reduce inequality, (3) mitigate deprivation, (4) ensure jobs for all, (5) include the excluded people and (6) create a terrorist-free environment.
তিনি যারা অটোস্টিক বা প্রতিবন্ধী (autistic) তাদেরকে ও উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেন। তাই অটোইজমের উপর তাঁর আরেকটি মানবিক প্রস্তাব বিশ্ববাসী সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করে।
বিশ্ব থেকে সব ধরণের বৈষম্য দূরীকরণের জন্য শেখ হাসিনার পূর্বে কোনো রাস্ট্রনায়ক বাস্তব ধর্মী প্রস্তাব উত্থাপন করেননি বা গৃহীতও হয়নি। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, যিনি বিশ্ব থেকে বৈষম্য কমানোর জন্য অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন তাকেই বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়। এটা সত্যিই দুঃখজনক। তাঁর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ফলে বাংলাদেশীরা আরো অধিকতর বৈষম্যের শিকার হবেন, তাতে সন্দেহ নেই। আজ ধনী দরিদ্রের ফারাক বাড়ছে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ সংকটাপন্ন। অনেকই চাকরি হারিয়েছেন এবং বিশেষ করে নারীদের অবস্থান দিন দিন খারাপ হচ্ছে । বর্তমান সরকার নাকি শেখ হাসিনা কতৃক আইন দ্বিতীয় বিবাহের আগে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নিতে হবে সে বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দিচ্ছে। তাছাড়া জামাতে ইসলামের আমির বলেছেন যে, মহিলাদের ৫ ঘণ্টার বেশি ঘরের বাইরে কাজ বন্ধ করে দেয়া হবে। এতে বৈষম্য বাড়ার সম্ভাবনা অধিক ।
শেখ হাসিনা তার শাসনামলে দুটো বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে ছিলেন। এগুলো হচ্ছে (১) জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়ানো যাতে ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে উন্নত ও সমৃদ্ধশালী দেশ বা সোনার বাংলা এবং সেজন্য তিনি দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের বেসরকারি উন্নয়নের মডেল অনুসরণ করেন। জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়া পেনাসনিক, মিটসুবিসি, টয়োটা, মেরুবানী, হানডাই, কিয়া, ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা করে এবং এসমস্ত ব্যবসায়ী প্রতিস্ঠান জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখে।
শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশের ব্যাবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংক ঝণসহ বহুবিধ বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান করেন যারফলে বেক্সিমকো, ওয়ালটন, এস-আলম, বসুন্ধরা, পারটেক্স, ব্রেক, হামীম, গ্রামীণ, সামিট, সায়হাম, বিএসআরএম, প্রাণ, ইত্যাদি বহু কগলোমারেট গড়ে উঠে। দ্বিতীয়তঃ (২) তিনি দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য বহুমুখী উদ্যোগ নেন যার মধ্যে ছিল সামাজিক সুরক্ষাবাবদ বহুবিধ সহায়তা— বয়োস্ক ভাতা, বেকার ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, বিধবা ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, ছাত্রছাত্রীদের জন্য উপবৃত্তি, অতি দরিদ্রের জন্য বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ, স্বল্প আয়ের লোকদের জন্য সস্তায় খাদ্য বিতরণ, গৃহহীনদের জন্য বিনামূল্যে ঘর প্রদান, ইত্যাদি বহুবিধ কার্যক্রম ।
১৯৯৬ সালে তিনি সর্বপ্রথম ৬,০০০ হাজার কোটি টাকার সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম শুরু করেন এবং ২০২৪ সালে তা ২০ গুণ বাড়িয়ে ১,১৬,০০০ কোটি টাকায় উন্নীত করেন। তাঁর এসব কার্যক্রমের ফলে দারিদ্র্য ২০০৬ সালে যেখানে দারিদ্র সীমা ৪২% ছিল তা ২৯২২ সালে কমে গিয়ে ১৮%; শতাংশে নেমে আসে এবং অতি দরিদ্র ২৪% থেকে ৫.৬%:শতাংশে নেমে যায়। দুঃখের বিষয় যে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ইউনূসের ১৫ মাসে দারিদ্র্য সীমা বৃদ্ধি পেয়ে ২৫% থেকে ২৮%এ (বিভিন্ন তথ্য মতে) এবং অতি দরিদ্র ৯% শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার যা ছিল গড়ে ৬.৬% শতাংশ তা এখন ৩.৩% অর্থাৎ অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিগত ৩০ বছরের মধ্যে এ বৃদ্ধির হার সর্বনিম্ন। কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিস্টান জানিয়েছে যে আগামীতে বাংলাদেশের ৬২.৫ মিলিয়ন মানুষ দুবেলা খাবারের জন্য হাহাকার করবে।
শেখ হাসিনার অর্থনৈতিক দর্শনকে আমি “হাসিনা-নোমিক্স” হিসাবে আখ্যায়িত করি। তাঁর বৈষম্য বিরোধী দর্শন ও প্রচেষ্টা, তাঁর খাদ্য ঘাটতি কমানোর বহুবিধ উদ্যোগ, গরীবের মুখে দুবেলা ভাত প্রদানের নিশ্চয়তা, তাঁর প্রতিবন্ধী বিষয়ক প্রস্তাব, এবং তাঁর অর্থনৈতিক উন্নয়ন মডেলের প্রধান লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন এবং তাদের ক্ষমতায়ন বা মুক্তি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, যিনি বৈষম্য দূরীকরণে এতসব পদক্ষেপ ও উদ্যোগ নিলেন, তাঁকে তথাকথিত বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হতে হল। একেই কি বলে নিয়তি?
লেখকঃ অধ্যাপক ড. এ কে আব্দুল মোমেন, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি