মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:২১ পূর্বাহ্ন

ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়াতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে

সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন এর বিবৃতি

নয়াদিল্লী সংবাদদাতা
  • খবর আপডেট সময় : সোমবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬
  • ৬ এই পর্যন্ত দেখেছেন

ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া, নয়াদিল্লিকে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে  সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি প্রফেসর . . কে. আব্দুল মোমেন এর বিবৃতি ইউকে বিডি টিভির পাঠকদের জন্য হুবহু নীচে তুলে ধরা হলো

সুধীবৃন্দ,

বাংলাদেশ যখন তার ইতিহাসের অন্যতম গুরুতর সংকটের মুখোমুখি, তখন এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানটিআয়োজন করার জন্য আমি আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই। আমাদের দেশ প্রফেসর মুহাম্মদইউনূসের নেতৃত্বাধীন একটি অসাংবিধানিক অবৈধ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ধুঁকছে। তিনিনামে নোবেল বিজয়ী হলেও বাস্তবে একজন অত্যন্ত সংকীর্ণমনা এবং বিভাজন সৃষ্টিকারী শাসক।

২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ অগ্রগতির এক সুস্পষ্ট পথে ছিল। শেখ হাসিনারগণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের অধীনে আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে একটি ক্ষুধামুক্ত জাতি এবং২০৪১ সালের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ ডিজিটাল অর্থনীতি হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছিলাম।

আমাদের অর্থনীতি ছিল প্রাণবন্ত, যা বৈশ্বিক দক্ষিণে (Global South) একটি রোল মডেল হিসেবেস্বীকৃত ছিল এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পারফরম্যান্সকারী অর্থনীতির তালিকায় স্থান পেয়েছিল। শেখহাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে আমরা গড়ে .% জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। একই সময়েআমরা দারিদ্র্য ৪২% থেকে ১৮%- নামিয়ে এনেছি, প্রায় ১০০% বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করেছি এবংপ্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১০০% ভর্তি নিশ্চিত করেছি। মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য ১৪,০০০কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমাদের সামাজিকসুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে সবচেয়ে দরিদ্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিধবা, গৃহহীন এবং নারীদের ক্ষমতায়ননিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছিলাম।

সুধীবৃন্দ,

একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসমর্থিত সরকারকে উৎখাত করারফলে সেই অগ্রযাত্রা হঠাৎ করে থমকে গেছে। এরপর থেকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক বিপর্যয়, আইনহীনতা এবং নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হয়েছে। যখন নিরাপত্তার পতন ঘটে, তখন সমাজের পতনঘটে এবং নৈরাজ্যই নিয়মে পরিণত হয়।

ইউনূস প্রশাসনের অধীনে মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনি, দুর্নীতি এবং উগ্র চরমপন্থা নিত্যনৈমিত্তিকঘটনায় পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষ নিহত হচ্ছে। ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং মানুষের জীবিকালুটপাট, ভাঙচুর অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে। ঐতিহাসিক স্থান, ধর্মীয় মাজার, মন্দির এবং জাতীয়স্মৃতিস্তম্ভ ধ্বংস করা হচ্ছে। অথচ রাষ্ট্র তার সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্বজনগণকে রক্ষা করাথেকেপিছু হটেছে। আজ বাংলাদেশে কেউ নিজেকে নিরাপদ বোধ করছে না।

প্রকৃতপক্ষে, ঘৃণা ছড়ানো এবং মিথ্যা বয়ান জাতির ঐক্যকে দুর্বল করে দিয়েছে। আমরা সবাই জানি, একটি বিভক্ত সমাজকে নিয়ন্ত্রণ এবং অস্থিতিশীল করা সহজ।

বর্তমান শাসনব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে তিনটি গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করেছে:

() দেশের বৃহত্তম প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সদস্য সমর্থক;

() যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী নাগরিক; এবং

() হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য।

নিরবচ্ছিন্ন অপপ্রচারের মাধ্যমে সরকার এই গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ঘৃণা অমানবিকীকরণ উসকেদিয়েছে। বিচারহীনভাবে হত্যাকাণ্ডের মতো চরম সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, অথচ কর্তৃপক্ষ নীরব দর্শকহয়ে আছে। নদী, জলাভূমি, রাস্তার পাশে এমনকি ব্যক্তিগত বাড়িতেও লাশ পাওয়া যাচ্ছে। যখন এইধরনের নৃশংসতা ঘটে, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা কোনো নিরপেক্ষতা নয়বরং তাঅপরাধের সহযোগী হওয়া।

এই শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। অতীতের কর্তৃত্ববাদীশাসনব্যবস্থা যেভাবে ভিন্নমত দমনে ভয়ভীতি মবএর ওপর নির্ভর করত, আজ বাংলাদেশে সেইভয়ের সংস্কৃতির উত্থান ঘটছে।

সংস্কারের অজুহাতে বিচার বিভাগ, পুলিশ এবং আর্থিক খাতসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেপরিকল্পিতভাবে দুর্বল বা অকার্যকর করে ফেলা হয়েছে, যার ফলে নাগরিকদের বিচার জবাবদিহিতাপাওয়ার কোনো পথ খোলা নেই।

প্রিয় বন্ধুরা,

একটি জাতি দারিদ্র্য সইতে পারে, কিন্তু নৈরাজ্য, আইনহীনতা এবং সহিংসতা সইতে পারে না।

এর ফলাফল বিধ্বংসী। সংবাদমাধ্যম আক্রান্ত হয়েছে, সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার বা বরখাস্ত করা হয়েছেএবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করা হয়েছে। প্রায় ৩০ লাখ শ্রমিকযাদের বেশিরভাগই নারীচাকরি হারিয়েছেন। অল্প সময়ের মধ্যে দারিদ্র্য নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কোটি কোটি মানুষএখন ক্ষুধা অনাহারের হুমকির মুখে। ইউনূস সরকার তার বিষাক্ত অপপ্রচারের মাধ্যমে বন্ধু প্রতিবেশীদের শত্রুতে পরিণত করেছে। দেশটি একটি একঘরে রাষ্ট্রে (Pariah State) পরিণত হচ্ছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিচার ব্যবস্থাও মব বা গণনিয়ন্ত্রণের শিকারে পরিণত হয়েছে। একাডেমিকশৃঙ্খলা এবং শিক্ষার মান দ্রুত অবনতি ঘটছে, আর বিচার বিভাগ ন্যায়বিচারের পরিবর্তে ভয় দেখানোএবং চাঁদাবাজির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে আওয়ামীলীগসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে বাদ দিয়ে একটি পূর্বনির্ধারিত নির্বাচনের নাটক মঞ্চস্থ করারচেষ্টা করছে। অথচ গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী আওয়ামী লীগের জনসমর্থন প্রায় ৭০% এইধরনের প্রহসনের নির্বাচন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করবে না এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বা অর্থনৈতিকপুনরুদ্ধারও আনবে না।

এই পরিস্থিতিতে আমরা বিশ্ববিবেক, মানবাধিকার রক্ষাকারী, গণমাধ্যম এবং বিশ্বনেতাদের প্রতিআহ্বান জানাই যেন তারা কণ্ঠহীনদের পক্ষে কথা বলেন এবং বাংলাদেশে ন্যায়বিচার গণতন্ত্রেরপক্ষে দাঁড়ান। এটি কোনো দলীয় ইস্যু নয়, এটি বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন এবং দলমতনির্বিশেষে সকলকে সোচ্চার হতে হবে।

সুধীবৃন্দ,

বাংলাদেশকে যদি আরও চরমপন্থা সন্ত্রাসের দিকে ধাবিত হতে দেওয়া হয়, তবে এর পরিণামকেবল দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

সন্ত্রাসবাদের কোনো ধর্ম নেই, কোনো নৈতিকতা নেই এবং কোনো সীমানা নেই। আজকের উদাসীনতাআগামীকালের অস্থিতিশীলতা বিপদ ডেকে আনবে।

সমাধান পরিষ্কার। রাজনৈতিক সামাজিক স্থিতিশীলতা কেবল গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবংঅন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের মাধ্যমেই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। জনগণের ইচ্ছাকে সম্মান করলেই চরমপন্থাপরাজিত হতে পারে।

তাই, আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বর্তমান কর্তৃপক্ষের ওপর জোরালো চাপ প্রয়োগের জন্যঅনুরোধ করছি যেন নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত করা হয়:

() সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন;

() রাজনৈতিক দলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহার;

() নির্বাচনের আগে সকল রাজনৈতিক বন্দী সাংবাদিকদের মুক্তি;

() সকল মিথ্যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার; এবং

() পরিশেষে, একটি প্রকৃত নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা, যার জন্য অত্যন্তসংকীর্ণমনা এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে পদত্যাগ করতে হবে।

আসুন আমরা আশা করি এবং প্রার্থনা করি যে বাংলাদেশে আর দেরি না করে শিষ্টাচার, গণতন্ত্র এবংসুশাসন পুনরুদ্ধার হোক।

ধন্যবাদ।

জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102