

অন্তরের শান্তি, ধর্মীয় অনুশাসন ও ঐতিহাসিক বোধের সন্ধানে ভারতের পবিত্র বৌদ্ধ তীর্থস্থানগুলোতে তীর্থযাত্রায় রওনা দিলেন চট্টগ্রামের ৭০ জন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর ) সকালে তারা যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ফেন্ছুঘোনা গ্রামের অলক বড়ুয়া বিটুর নেতৃত্বে তীর্থযাত্রীরা সকালে বেনাপোল ইমিগ্রেশন হয়ে ভারতের পেট্রাপোলে প্রবেশ করেন। বেনাপোল ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ জানান, প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে তাদের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়েছে।
তীর্থযাত্রীরা চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ, কেউ শিক্ষক, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ আবার তরুণ শিক্ষার্থী। সবার লক্ষ্য একটাই গৌতম বুদ্ধের পদচিহ্ন অনুসরণ করে জীবনের অন্তর্নিহিত শান্তি ও ধর্মীয় অনুপ্রেরণা খুঁজে পাওয়া।
তীর্থযাত্রীরা ভারতের বিহার রাজ্যের বুদ্ধগয়া, রাজগীর, নালন্দা এবং উত্তর প্রদেশের সাংনাথ, বৈশালী, কুশিনারা ও শ্রাবস্তীসহ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থানগুলো সফর করবেন বলে জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য বুদ্ধগয়া সেই স্থান যেখানে গৌতম বুদ্ধ বোধিবৃক্ষের নিচে বোধিলাভ করেছিলেন। রাজগীরে বুদ্ধ বহু গুরুত্বপূর্ণ ধর্মদেশনা প্রদান করেন এবং এখানেই প্রথম বৌদ্ধ সংঘের সভা অনুষ্ঠিত হয়। নালন্দা ছিল প্রাচীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ শিক্ষা কেন্দ্র, যেখানে শত শত বছর ধরে জ্ঞানচর্চা চলেছে।
উত্তর প্রদেশের সাংনাথ বৌদ্ধ ধর্মের জন্য ঐতিহাসিক কারণ, এখানেই বুদ্ধ প্রথম ধর্মচক্র প্রবর্তন করেন, অর্থাৎ ধর্ম প্রচারের সূচনা হয়। কুশিনারা হলো সেই পবিত্র স্থান যেখানে বুদ্ধ মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। শ্রাবস্তী ছিল তাঁর বহু ধর্মদেশনার কেন্দ্র। প্রায় ২০-২৫ দিনের এই সফরে তীর্থযাত্রীরা এসব স্থান পরিদর্শন করে ধর্মীয় আচার, প্রার্থনা ও ধ্যানের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির সাধনা করবেন।
বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছে তীর্থযাত্রা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি আত্মার পুনর্জাগরণের এক প্রয়াস। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য অঞ্চলের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী প্রতি বছরই ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার পবিত্র স্থানগুলোতে এই তীর্থযাত্রায় অংশ নেন।
তীর্থযাত্রী দলের নেতা অলক বড়ুয়া বিটু বলেন, এই সফর আমাদের আত্মিক শান্তি দেয়। আমরা গৌতম বুদ্ধের পদচিহ্ন অনুসরণ করে করুণাময় জীবনযাপনের শিক্ষা নিতে চাই। এই সফর কেবল আমাদের জন্য নয়, বরং সার্বজনীন শান্তি ও সহমর্মিতার প্রতীক।
চট্টগ্রামের পটিয়া থেকে আগত তীর্থযাত্রী কলেজশিক্ষক শুভ্র বড়ুয়া বলেন, বুদ্ধগয়া ও কুশিনগর বৌদ্ধদের জন্য আবেগের জায়গা। আমরা সেখানে প্রার্থনা করব যেন সমাজে সহমর্মিতা, সত্য ও অহিংসার চেতনা আরও ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর শত শত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে তীর্থযাত্রায় যান। স্থলবন্দরের সহজ যোগাযোগ, দ্রুত ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া এবং ভিসা সুবিধার কারণে এই পথটি দীর্ঘদিন ধরে বৌদ্ধ তীর্থযাত্রীদের অন্যতম প্রিয় রুট।
বেনাপোল ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ ইমতিয়াজ আহসানুল কাদের ভূঞা বলেন, তীর্থযাত্রীরা নিয়মিতভাবে এই পথে ভারত যান। আমরা প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে তাদের ইমিগ্রেশনের সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছি। তাদের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছি।
এদিকে বেনাপোল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক মো. সজীব নাজির জানান, ধর্মীয় সফর বা সাংস্কৃতিক ভ্রমণে আসা যাত্রীদের জন্য আমাদের আলাদা মনোযোগ থাকে। নিরাপত্তা ও সেবার দিক থেকে বেনাপোল এখন অনেক উন্নত। তীর্থযাত্রীরা যাতে নিরাপদে পারাপার হতে পারেন, সে ব্যবস্থা রাখা হয়।
বৌদ্ধ ধর্মে তীর্থযাত্রা মানে কেবল ধর্মীয় স্থান ভ্রমণ নয়, এটি আত্মবিশুদ্ধি ও সহানুভূতির এক জীবনদর্শন। গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা, নিজেকে জয় করতে পারাই সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয়, এই বার্তা নিয়েই চট্টগ্রামের এই তীর্থযাত্রীরা যাত্রা করেছেন পবিত্র ভারতের পথে। তাদের এই সফর যেন করুণা, সহমর্মিতা ও শান্তির আলো ছড়িয়ে দেয়, নিজেদের জীবনে, সমাজে এবং বিশ্বজুড়ে।