

জুঁই ইসলাম: লাল সবুজ পতাকা ছিনিয়ে আনতে অবদান রেখেছেন এ দেশের নারী পুরুষ। গৌরবের সংগ্রামে যারা অংশ নিয়েছিলেন, তারা এদেশের খাটি দেশপ্রেমিক ছিলেন।
কথায় আছে ‘প্রেম না থাকলে কোন কিছু জয় করা যায় না’ আমাদের মুক্তিসেনাদের দেশপ্রেম ছিল বলেই তারা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, মা-বাবার আদর, স্নেহকে কোরবানী করে, প্রিয়তমা স্ত্রীকে ঘরে একা রেখে, যুদ্ধের ময়দানে অংশগ্রহণ করেছেন, কেবলমাত্র দেশকে শত্রুমুক্ত করার তাগিদে।
২৫ মার্চ থেকে শুরু হয়ে ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ প্রায় ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়, তা শুধুমাত্র পুরুষরা একা করেননি তার পিছনে অবশ্যই নারীরা ছিলেন জড়িত। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে। সকল নারীরা হয়তো রাইফেল হাতে নিয়ে যুদ্ধ করেন নি। কম কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে অবশ্যই সহযোগিতা করেছেন। নিজের জীবন বাজি রেখে।
মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের হাতে প্রায় ত্রিশ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন আর নির্যাতন হয়েছেন দুই লাখ নারী। এই দুই লাখ নারীর মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকার কিশোর-কিশোরী, তরুণী, বিবাহিত, অবিবাহিত নারীরা কিভাবে তখন তাদের ক্ষতবিক্ষত জীবন পার করেছেন, তা কল্পনা করলে আজও আমরা শিউরে উঠি। ঐ সময় আমাদের নারী সমাজ কতটুকু অসহায় ছিল, একজন নারী হিসেবে সেটা ভাবতেই শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়।
কত নির্মম ববরতার শিকার হয়েছেন নারীরা। তারপরও তারা মনোবল হারাননি। পিছ পা হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন উপায়ে সাহায্য করে গেছেন নিজ দায়িত্বে। তখনকার সময়ে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশ মুক্তির লড়াইয়ে। এসব নারীর মধ্যে দু- একজন অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন বাংলাদেশের ভেতর।
যুদ্ধাহত মুক্তিযুদ্ধাদের নার্স হিসেবে চিকিৎসা সেবা করেছেন আরও মুক্তিকামী নারীরা। শুধু যে চিকিৎসা সেবা করেছেন তা নয়, তারা অনেক নারী রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবি নেতাদের সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পৌঁছে দিয়েছেন জীবনবাজি রেখে।
পাকিস্তানিদের হাত থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁচানোর জন্য নিজের ঘরে লুকিয়ে রেখে খাইয়েছেন, পরিয়েছেন। কাজটি কত ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও নিজ সন্তান বা স্বামীর জীবন যাবে তারপরও তারা পিছ পা হয়নি। যারা ঘরে বসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য সহযোগিতা করেছেন, তাদের জীবন বাঁচিয়েছেন, ভেবে দেখুন কতটুকু দেশপ্রেম থাকলে এমন কাজ করা যায়।
উল্লেখযোগ্য নারী মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিথীকা দাস, শিশির কণা পাকিস্তানি সেনাদের গানবোটে গ্রেনেড মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন ইতিহাস থেকে তাই জানা যায়। বিথীকা তো এক রাজাকারকে নিজে একাই মেরেছেন আর ঐ লাশকে আরেক নারী মুক্তিযোদ্ধা সরিয়েছেন।
মৃণালিনী ওঝা নামে এক নারী রাজাকারের পরিবারের ভেতর থেকে তথ্য সংগ্রহ করতেন। গ্রামের সবাই যখন রাজাকারের ভয়ে পানিতে গলা ডুবিয়ে আছেন ঠিক তখন তাদের পরিবারের বাচ্চা শিশুটি কান্না শুরু করে। সবার প্রাণ যাবে ভেবে মা তার সন্তানকে পানিতে ডুবিেেয় ঐ সময় মেরে ফেলেন। এরাই ছিলেন খাঁটি আত্মত্যাগী মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধ পরিবর্তীকালে বিথীকা ও শিশির কণাকে পরিবার ও সমাজ গ্রহণ করেনি।
কোনো মুক্তিযোদ্ধা তাদের বিয়ে করতে চাননি (তথ্য সুত্র মতে)। ভারতে গিয়ে বিয়ে করেন বিথীকা। অনেক নারী মুক্তিযোদ্ধা লোকলজ্জার ভয়ে নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা এ কথা চেপে রাখতেন সমাজের কাছে। এমনও ঘটেছে যুদ্ধে অনেক নারীই হাত, পা হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।
কিন্তু পরিবারে বা স্বামীর কাছে ঐসব নারীরা নানা নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন, স্বামী দ্বিতীয় বিয়েও করে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন। কতটুকু নির্মম ছিল সমাজ ব্যবস্থা। মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা নামে একটি সংস্থা ছিল, যার বেশির ভাগ সদস্যরাই ছিলেন নারী এবং তারা মুক্তাঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করতে।
এ গ্রুপটিই পরিবর্তীকালে ‘মুক্তির গান’ চলচিত্রটি নির্মাণ করেছিল বলে জানা যায়। তখনকার সময়ে যুদ্ধাহত সৈনিকদের সেবা প্রদানের লক্ষ্যে মুজিবনগর সরকার একটি নাসিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করেন। এই হাসপাতালে ৩২ জন বাঙালি নারী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং তাদেরকে দেশের বিভিন্ন শিবিরে বা হাসপাতালে পাঠানো হয় শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধাদের সেবা প্রদানের জন্য। তারা দিন রাত সেবা করে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য ও সহযোগিতা করে উৎসাহ দিয়েছেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে এভাবেই নারীরা তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলার নারী সমাজ পাক সেনাদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন এবং স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত তাদের অবদান কোনো অংশে কমতি ছিল না। মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বৃদ্ধিতে তাদেরকে অনুপ্রাণিত করতে ১৯৭১ সালের সাংস্কৃতিক দলগুলোর ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা বিভিন্ন গানের মাধ্যমে যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ দিতেন তেমনি প্রতিবাদী কন্ঠে পাকিস্তানিদের হ্যানস্ত করতে দ্বিধাবোধ করতেন না।
মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদানের শেষ নেই। উল্লেখযোগ্যভাবে কয়েকজন নারীর নাম ইতিহাস সাক্ষী হয়ে আছে। তারা হলেন ডা. সিতারা বেগম ও তারা বানু বিবিকে(তারামন বিবি) বাংলাদেশ সরকার বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত করেছে। এছাড়া আরও আছেন নারী কর্মী বেনিলাল দাসগুপ্ত, শোভারানী মল, কাকন বিবি (খাসিয়া গোষ্ঠির সদস্য), শিরিন বানু, মিনারা বেগম ঝুনু, গ্রীতশ্রী চৌধুরী, আলেয়া বেগম, ফেরদৌস আরা বেগম, আশালতা বৈদ্য, রওশণ আরা বেগম,জিন্নাত আরা, করুণা বেগম, মেহেরুনেসা মিরা প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
নারী মুক্তিযোদ্ধা বেশিরভাগ সময়ে মুক্তিবাহিনীর অস্ত্র সংগ্রহ ও সরবরাহ করতেন এবং এসব করতে গিয়ে অনেক নারী তারা তাদের পরিবারের স্বজন হারিয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন জাহানারা ইমাম, বেগম সুফিয়া কামাল, মুসতারী শফী, শ্রীমতি মিনা বিশ্বাস।
তাছাড়া অনেক মায়েরা ছেলেদের যুদ্ধে যেতে উৎসাহ জুগিয়েছেন, আগ্রহ দেখিয়েছেন, খাদ্য দিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন এবং স্থানীয় পাকিস্তানী সেনা ও রাজাকার বাহিনীর খবর সংগ্রহ করে দিয়েছেন। আমরা নারী সমাজ আজ তাদের কাছে কৃতজ্ঞ।
১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম থেকেই দেশের প্রতিটি অঞ্চলে যে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় তাতে নারীদের বিশেষ করে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন যেসব নারী মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন তাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
উল্লেখযোগ্য প্রশিক্ষণগুলো ছিল গোবরা ও লেম্বুছড়া ক্যাম্প। নারী মুক্তিযোদ্ধা শাহনাজ বেগমের কন্ঠে ‘সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা, কল্যাণী ঘোষের পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, এমন অৎস্র গানের সুর শুনে মানুষ শিহরিত হয়েছে।
ঝাঁপিয়ে পড়েছে দেশ রক্ষার সংগ্রামে। প্রাণ বিপন্ন হতে পারে জেনেও যেসব স্ত্রী, মা, বোন, কন্যা নিজেদের আপনজন ছেড়ে দিয়েছেন যুদ্ধে, নিজেও যতটুকু পেরেছেন অংশ নিয়েছেন এই মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে। এইসবই ছিল তাদের দেশপ্রেম।
লেখক : কলামিস্ট, শেয়ার করুন।