বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:২১ অপরাহ্ন

নির্লোভ আমৃত্যু দেশ প্রেমিক

স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মহসিন আলীর জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

মোহাম্মদ মকিস মনসুর
  • খবর আপডেট সময় : শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭৮ এই পর্যন্ত দেখেছেন

একসময়ের মৌলভীবাজার জেলার অবিসংবাদিত নেতা, গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী, ৭১ এর বীর মুক্তিযোদ্ধা, সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্ত, সাবেক সংসদ মরহুম সৈয়দ মহসিন আলীর জন্মদিন আজ ১২ই ডিসেম্বর।জন্মবার্ষিকীতে প্রবাস থেকে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানো সহ শুরুতেই উনার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

মরহুম সৈয়দ মহসীন আলী ছিলেন মৌলভীবাজার জেলা সহ সিলেট বিভাগ তথা বাংলাদেশের এক মহান নেতা. ছিলেন একাধারে জনপ্রিয় পৌর পিতা. সাবেক সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যান মন্ত্রী। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন অকুতোভয় সৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তিনি আমাদেরকে এনে দিয়েছেন একটি লাল সবুজের পতাকা, একটি দেশ, সকল প্রবাসীদের সাথে ছিলো উনার আত্মার আত্মীয়তা, উনার ইস্পাত কঠিন দেশপ্রেম, মানুষকে ভালবাসার অসীম ক্ষমতা, স্পষ্টবাদিতা, প্রশ্নহীন সততা নিয়ে তিনি আজীবন মানুষের জন্য মানবতার জন্য কাজ করে গেছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে কিছু নাম সময়ের স্রোত বেয়ে উঠে এসেছে এমনভাবে, যেন তারা কেবল কোনো দল বা প্রজন্মের নয়, সমস্ত মানুষের যৌথ হৃদয়ের অংশ। তাঁদের জীবনকথা কখনো কোনো সাধারণ জীবনী নয়; যেন উপন্যাসের পাতায় লেখা এক মানবিক মহাকাব্য। যে মানুষগুলো ক্ষমতার দাপট থেকে দূরে থেকেও মানুষের ভালোবাসায় রাজকীয় মহিমায় বেঁচে থাকেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মহসিন আলী ছিলেন তাঁদেরই একজন-এ দেশের রাজনীতিতে এক আলোকবর্তিকা। মৌলভীবাজারের মাটি ও মানুষের এক নিবেদিত সন্তান, যার জীবনযাত্রা আমাদের শেখায় সেবা কেমন করে জীবনব্যাপী এক দায়িত্বে পরিণত হতে পারে।সৈয়দ মহসীন আলী ছিলেন একজন সাদা মনের মানুষ. আমাদের প্রিয় অতি আপনজন. আজীবন জাতি উনাকে মনে রাখবে, তিনি থাকবেন চিরকাল আমাদের হৃদয়ের মাঝে চীরঅম্লান হয়ে।

সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মহসীন আলী’র জন্মদিন আজ। ১৯৪৮ সালের ১২ ডিসেম্বর সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্ব পুরুষ ছিলেন ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম ওলী শের সওয়ার চাবুকমার হজরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা বোগদাদী (র.)। ছাত্রলীগের একজন সদস্য হিসেবে সৈয়দ মহসীন আলী ছাত্রজীবনেই আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।

স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মহসীন আলী’নিজের শ্রম, মেধা, উদারতা, মানবিকতা, রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, সুদৃঢ় চিন্তাশক্তি, তুখোড় দেশ প্রেমের জন্য তিনি মৌলভীবাজারের মাটি ও মানুষের আত্মার মাঝে মিশে আছেন এবং চিরকাল থাকবেন।

জীবদ্দশায় পুরোটা সময় তিনি অতিবাহিত করেছেন সাধারণ মানুষের সাথে মিলেমিশে। নিজের অর্থ-সম্পদ মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতে পছন্দ করতেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবনপণ সংগ্রামেই দেশের স্বাধীনতার রক্তিম আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছেন দিগ্বিদিক। স্পষ্ট ও বস্তুনিষ্ঠ বক্তব্যের কারণে তিনি ছিলেন সমালোচিত এক বীর পুরুষ।

১৯৪৮ সালের ১২ ডিসেম্বর সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পূর্ব পুরুষ ছিলেন ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম ওলী শের সওয়ার চাবুকমার হজরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা বোগদাদী (র.)। ছাত্রলীগের একজন সদস্য হিসেবে সৈয়দ মহসীন আলী ছাত্রজীবনেই আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মহসিন আলী ১৯৭১ ইং এ ২৩ বছর বয়সে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত মহকুমা/জেলা রেডক্রিসেন্ট এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসেবেও নিয়োজিত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি মৌলভীবাজার ডিস্ট্রিক্ট চেম্বার অব কমার্স এর প্রেসিডেন্ট এবং জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক এর দায়িত্বও পালন করেন।

সৈয়দ মহসিন আলী আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯৮৪ সাল থেকে পরপর তিনবার মৌলভীবাজার পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন। জেলা যুবলীগের সভাপতিও ছিলেন। তিনি চেয়ারম্যান থাকাকালে স্থানীয় সরকারের আওতায় বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নেন। তিনি থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনে পরিবার পরিকল্পনা এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৯২ সালে এ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ পৌরসভা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম এম. সাইফুর রহমানের মতো গুণীজনকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে তিনি আওয়ামী লীগের জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মৌলভীবাজার-৩ আসন হতে পুনরায় জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। সে বছরের ১২ জানুয়ারি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

২০১৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করেন। ২০১৫ সালে সৈয়দ মহসীন আলী ভারতের আচার্য দীনেশ চন্দ্র সেন রিসার্চ সোসাইটির কাছ থেকে ‘আচার্য দীনেশ চন্দ্র সেন স্মৃতি স্বর্ণপদক-২০১৪’ লাভ করেন। ‘হ্যালো কলকাতা’ নামে কলকাতাভিত্তিক একটি সমাজকল্যাণ প্রতিষ্ঠান তাকে ‘নেহেরু সাম্য সম্মাননা-২০১৪’ পুরস্কারে ভূষিত করে।

আমৃত্যু তিনি গণমানুষকে সেবা-সহায়তা করার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। ছাত্রলীগের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনে এবং ১৯৬৯- এর গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু মৌলভীবাজার সফরে এলে ছাত্রলীগের পক্ষে ব্যতিক্রমী তোরণ নির্মাণ করে তিনি জাতির জনকের নজর কাড়েন। সিংহ হৃদয়ের মহসীনকে চিনতে ভুল করেননি বঙ্গবন্ধু, তিনি তাকে কাছে টেনে নেন পরম মায়ায়। কোন প্রলোভন সৈয়দ মহসিন আলীকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। যখন দেশের অনেক বড় বড় নেতা নীতি ও আদর্শ বিসর্জন দিয়ে বাজারের পন্যের মতো বিক্রি হয়েছেন সে অবস্থা ও সময়কে তিনি পায়ে মাড়াতে সাহস দেখিয়েছেন। বরং নিজের বাপ-দাদার সম্পত্তি বিক্রি করে রাজনীতি করে গেছেন। আজকের যুগে তাঁর মতো এমন নির্লোভ, নির্মোহ, সৎ ও দেশপ্রেমিক নেতা পাওয়া বিরল।

তিনি সংসদ নির্বাচন করার আগে যে ৩ বার পৌরসভার মেয়র হয়েছিলেন তার সিংহভাগ ভোট এসেছে বিরোধী শিবির থেকেই। রাজনীতি করতে গিয়ে তিনি প্রায় ২৫কোটি টাকার পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করেছেন।

তিনি মারা যাওয়ার পর তার পরিবার জানতে পারেন এত ক্ষমতাবান শক্তিশালী সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী আরও ৫ কোটি টাকা ঋণ রেখে গিয়েছেন। এখনকার নীতিহীন লুটপাটের রাজনীতিতে এমন ঘটনা বিরল। উনার বাড়ীর গেইট দিন রাত ২৪ ঘন্টার জন্য খোলা থাকতো।ব্যক্তি জীবনে তার ৩ মেয়ে থাকলেও এলাকায় ছিল তার শত শত ছেলে মেয়ে। শত শত মানুষ তাকে বাবা বলে ডাকতেন।

তৃণমূলের পথ ধরে উঠে আসা এই নেতার রাজনৈতিক অর্জন ছিল অনেক, বারংবার নির্বাচিত পৌরসভার জনপ্রিয় চেয়ারম্যান , জাতীয় সংসদের আইনপ্রণেতা, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী। কিন্তু তাঁর পদ বা পরিচয় তাঁকে কখনোই দূরে সরিয়ে রাখেনি মানুষের কাছ থেকে। তিনি ছিলেন সেই বিরল নেতা,যাকে চেয়ারে বসিয়ে দেখে মানুষ শ্রদ্ধা করত না; বরং তাঁর আচরণ, মমতা আর খোলা হৃদয় তাঁকে মানুষের মনে জায়গা করে দিত। দলীয় পরিচয়ের সীমানা পেরিয়ে তিনি ছিলেন “সবার মহসিন আলী।”রাজনীতি তাঁর কাছে ছিল না প্রতিপক্ষ তৈরির খেলা; ছিল মানুষকে কাছে টেনে নেওয়ার এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন।

উনার জীবনের শেষ সময়ে এসে তিনি নিউমোনিয়া, ডায়াবেটিস, কিডনি ও হৃদরোগের সমস্যায় ভুগছিলেন। ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরের জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আজকের এই দিনে একজন মানবিক ও ভালো মানুষটির জন দেশে -বিদেশে বসবাসকারী সবাই দোয়া করবেন মহাণ আল্লাহু রাব্বুল আলামিন যেনো উনাকে জান্নাতবাসী করেন। আমিন॥ আমাদের প্রাণের বাংলাদেশ চিরজীবী হোক॥

লেখকঃ মোহাম্মদ মকিস মনসুর, চেয়ারম্যান, ইউকে বিডি টিভি,
সভাপতি,যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ ওয়েলস শাখা,
সাবেক সভাপতি, ইউকে ওয়েলস যুবলীগ,
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ইউকে ওয়েলস ছাত্রলীগ

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102