সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬, ১০:০৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ডেঙ্গু-চিকনগুনিয়া প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও র‍্যালী অনুষ্ঠিত তেতুলিয়া ইউএনও এর বিরুদ্ধে ১৫ শতাংশ ঘুষ আদায়ের অভিযোগ কালুরঘাট সেতুর কাজ দ্রুত বাস্তবায়‌নে স্মারকলিপি প্রদান সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য রিয়েলমির বিশেষ আয়োজন ‘ঈদের হাসি’ ল্যান্সনায়েক শহীদ গৌছ আলী মেমোরিয়াল ট্রাস্টের উদৌগে ঈদ উপহার বিতরণ অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে জমি দখলের চেষ্টায় অভিযোগ স্বাধীনতার মাসে যুদ্ধাপরাধীদের নামে শোক প্রস্তাবে সংসদ কলুষিত বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে স্বাধীন দেশ পেতাম না —ড.একে আব্দুল মোমেন ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি পালিত লায়ন্স ক্লাব চিটাগাং কর্ণফুলী এলিট এর উদ্যোগে ইফতার সামগ্রী ও ঈদ উপহার বিতরণ অনুষ্ঠিত

আল মাহমুদের কবিতা পাঠ: আমার অক্ষম কলমের অঞ্জলি

সারওয়ার-ই আলম
  • খবর আপডেট সময় : শুক্রবার, ১২ জুলাই, ২০২৪
  • ২২৬ এই পর্যন্ত দেখেছেন

প্রতীতি ও প্রজ্ঞায়, উপমা ও উৎপ্রেক্ষায়, নির্মাণ কৌশল ও শৈল্পিক ভাবনায়, সাম্যবাদ ও স্বাধিকারের চেতনায়, এবং অতুলনীয় সৃষ্টি ও সৃজনের অনবদ্যতায় আধুনিক বাংলা কবিতাকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন যে ক’জন কবি আল মাহমুদ তাঁদের একজন।

জীবনানন্দ পরবর্তী এক ঘনঘোর অমানিশায় তাঁর আবির্ভাব বাংলা সাহিত্যের আকাশে। কবিতা বিমুখ মানুষকে কবিতামুখী করেছেন আল মাহমুদ তার প্রাঞ্জল ভাষা , দেশপ্রেম, লোকজ ঐতিহ্যের কাব্যলংকার, অস্ফুট প্রেম ও ভালবাসার নান্দনিক প্রকাশ- সর্বোপরি এক বিস্ময়কর মোহাবিষ্টতা দিয়ে।

আবহমান বাংলার লোকজ জীবন, প্রাগৈতিহাসিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য , মানবিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, বাঙালির গণ-অভ্যুত্থান, ভাষা আন্দোলন ও মহান স্বাধীনতা সংগ্রামকে উপজীব্য করে ধর্মীয় কূপমণ্ডুকতার নাগপাশ ছিন্ন করে নিরঙ্কুশ প্রেম ও ভালবাসার মাধ্যমে মানবিক সম্পর্ক নির্মাণ এবং শ্রেণী বৈষম্য উচ্ছেদ করে সুষম সমাজ প্রতিষ্ঠার দুর্বার আহ্বান বারবার উচ্চারিত হয়েছে তাঁর কবিতা, গল্প, ছড়া, ও উপন্যাসে।

চিরায়ত বাংলার মৃত্তিকা থেকে তুলে আনা চিত্রকল্প, মিথ, লোকজ সংস্কৃতি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাষা, নদী ও মাতা, প্রেম ও প্রকৃতির অনুষঙ্গের নিঁখুত চিত্রায়ন এবং কবিতার বহুমাত্রিক ছন্দের সার্থক ব্যবহারের কারণে আল মাহমুদ একদিকে যেমন বিদগ্ধ পাঠকের কাছে বিপুল জনপ্রিয় অন্যদিকে অনতিক্রম্য উচ্চতায় উপবিষ্ট মহাকালের এ মহান কবি।

আল মাহমুদকে জানতে হলে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাঁকে পড়তে হবে; নিবিষ্টচিত্তে তাঁকে অধ্যয়ন করতে হবে । দীর্ঘ ছ’দশকের সাহিত্য জীবনে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখাকে।তাঁর কবিতা, গল্প ও উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের মুকুটে যুক্ত করেছে হিরন্ময় পালক।

আল মাহমুদ তাঁর কবিতা, ছড়া, গল্প ও উপন্যাসে শুধু মানুষের জীবনকে নয় মাতৃভূমির মানুষের আত্মাকে বর্ণনা করেছেন এক অভূতপূর্ব পারদর্শিতায়।তাঁর কবিতায় একদিকে যেমন প্রকৃতি ও প্রেমবাণী সোৎসাহী-সরব, অন্যদিকে সাম্যবাদ, জাগরণ, মানবমুক্তির বাণীও প্রতিধ্বনিত নিখুঁত ছন্দবদ্ধতা ও অনুপ্রাস অনবদ্যতায়। কবিতার ব্যাকরণকে প্রাধান্য দিতে যেয়ে তিনি অর্থহীন শব্দের স্তুপ তৈরি করেননি, বরং সাবলীল শব্দ সাযুজ্যে সৃষ্টি করেছেন অসাধারণ মায়া ও মোহাবিষ্টতার তীব্র আকর্ষণ; যার মাধ্যমে ক্লান্ত-ক্লিষ্ট গতানুগতিকতার গণ্ডি পেরিয়ে তৃষ্ণার্ত পাঠক খুঁজে পান এক অনর্বচনীয় কাব্য সুধা, যে কাব্যসুধা পানে কেবল তৃষ্ণাই মেটে না, হারিয়ে যেতে মন চায় ভাব ও মায়ার গহীন অতলে। বোধ করি এ কারণেই নব্বইয়ের দশকের অনেক তরুণ কবিকে বলতে শোনা যায়- মন ও মননে, চিন্তা ও স্বপনে, নিয়ম ও নিগ্রহের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আমি বোধহয় একজন আল মাহমুদই হতে চেয়েছিলাম!

বিরাশি বছরের বর্ণাঢ্য জীবনে আল মাহমুদের সাহিত্য কর্ম ছিল বিরামহীন, বিপুল এবং দারুণ ব্যঞ্জনা সমৃদ্ধ। সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় ছিল তাঁর গৌরবোজ্জ্বল উপস্থিতি। সমসাময়িক অন্য কবিদের মতো তিনি দেহাত্মা, পরমাত্মা- এ সকল বিষয়কে প্রাধান্য না দিয়ে নার-নারীর প্রেম, দেশমাতৃকা, আবহমান গ্রাম বাংলার মানুষের জীবন, তাদের হাসি-কান্না, আনন্দ বেদনা, ক্লান্তি ও কষ্ট, মুক্তি ও মানবিক সম্পর্ককে তাঁর লেখার উপজীব্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। ধর্মীয় বিশ্বাসকে অক্ষুন্ন রেখে আন্তর্জাতিক বোধ অর্জনেও তিনি ছিলেন সচেষ্ট। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল – মুসলমান হওয়াটা আন্তর্জাতিক বোধ অর্জনে কোনো বাধা হতে পারে না।

লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালী কাবিন, মায়াবি পর্দা দুলে ওঠো- এসব কালজয়ী কাব্যগ্রন্থের মধ্য থেকে সোনালী কাবিনই যে কবিকে বাংলা সাহিত্যে খ্যাতির শীর্ষ আসনে অধিষ্ঠিত করেছে একথা কবি নিজেই বিশ্বাস করতেন। বিষয় বৈচিত্র, কাব্য ভাষা, কাব্য রীতি, নিপুণ রচনা কৌশল ও চিত্রকল্পের অভূতপূর্ব ব্যবহার, এবং সমাজ জীবন, মিথ , লোকজ সংস্কৃতি ও প্রেমময়তার আশ্লেষে নর-নারীর সম্পর্ক, সুন্দর ও সৌন্ধর্য চেতনা, মানবিকতা ও সাম্যবাদকে উপজীব্য করে সোনালী কাবিনের ১৪টি সনেটের সৃষ্টি। এ যেন ১৪ খণ্ডে চিত্রিত হাজার বছরের বাঙালির অনবদ্য জীবন চিত্র।এক নারীকে উদ্দেশ্য করে সৃষ্ট এ সনেটগুচ্ছে কবি প্রাচীন বঙ্গভূমির সমাজ ব্যবস্থা ও তার অসংগতি, অধিকার বঞ্চিত মানুষের অনুচ্চারিত আর্ত চিৎকার তুলে ধরেছেন আপন আলোর প্রক্ষেপণে।

অন্য দিকে দুর্বার প্রেমময়তায় নিজেকে জাগ্রত করে স্বদেশপ্রেম , সৌন্দর্যবোধ, নান্দনিকতায় অনুপ্রাণিত হওয়ার মাধ্যমে মানুষের ঝড়গ্রস্ত জীবনের দুর্বলতাকে কাটিয়ে, ধর্মীয় কূপমণ্ডুকতার নাগপাশ ছিন্ন করে মানব মুক্তি আন্দোলন সৃষ্টির গোপন বার্তা বিলি করেছেন কবি আল মাহমুদ।

ভালবাসার মানুষের কাছে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়েই সোনালী কাবিনের সূচনা। কবি বলছেন-

সোনার দিনার নেই, দেনমোহর চেয়ো না হরিণী
যদি নাও, দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দু’টি,

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে – কেন কবির এই নিঃসংকোচ আত্মসমর্পণ? পরবর্তী পঙ্কতিতে তাঁর উত্তরে বলছেন-

আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনকালে সঞ্চয় করিনি

-এ একটি কথা যেন সর্বকালে সর্বযুগে সত্য। ঘাত-প্রতিঘাতের ধারাবাহিক মানব জীবনে কঠিন পারিবারিক,সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় আমাদেরকে কতভাবেই না আত্মবিক্রয়ের মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধ করতে হয় নিজস্ব সঞ্চয়!

একই স্তবকে কবি আরো বলছেন-

ছলনা জানি না বলে আর কোন ব্যবসা শিখিনি;
দেহ দিলে দেহ পাবে, দেহের অধিক মূলধন
আমার তো নেই সখি, যেই পণ্যে অলংকার কিনি।

-এত সাবলীল ভাষায় প্ৰেমময়তা খুব বেশি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না। একথা বললে বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না যে এ পঙ্কতিগুলো পড়ে বিমুগ্ধ পাঠক গ্রহণ করেন এক নিষ্কলুষ প্রেমের শপথ। আর এ শপথের পূর্ণতা পায় পরবর্তী চরণে, যেখানে কবি আত্মবিশ্বাসী হয়ে বলছেন-

পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয় না কবিরা;
দারুন আহত বটে আর্ত আজ শিরা-উপশিরা।

সোনালী কাবিন বহুমাত্রিক কাব্য সুষমায় সমৃদ্ধ। উচ্ছ্বসিত সৌন্ধর্য চেতনার পাশাপাশি মানবমুক্তির বাণী প্রধান। সামন্তবাদের বিরুদ্ধে দ্যর্থহীন উচ্চ কণ্ঠ কবি স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে এতদঞ্চলের গণমানুষকে যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির পথ প্রদর্শন করেছেন- স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দি পর তার আবেদন যেন ফুরিয়ে যায় না। কবি বলছেন-

শ্রমিক সাম্যের মন্ত্রে কিরাতের উঠিয়াছে হাত
হিয়েনসাঙের দেশে শান্তি নামে দেখো প্রিয়তমা
এশিয়ায় যারা আনে কর্মজীবী সাম্যের দাওয়াত
তাদের পোশাকে এস এঁটে দিই বীরের তকোমা।

-প্রেমময়তার আশ্লেষে এই যে প্রিয় নারীকে বিপ্লবী হওয়ার উদাত্ত আহ্বান- তার মধ্য দিয়ে আল মাহমুদ তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা নারীদের এগিয়ে আসার অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছেন। আর এ পরিবর্তনের পথে ধর্মীয় কুসংস্কার যেন কোন প্রতিবন্ধকতা না সৃষ্টি করতে পারে সেজন্য কবি উচ্চারণ করছেন-

আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন,
পরম স্বস্তির মন্ত্রে গেয়ে ওঠো শ্রেণীর উচ্ছেদ ,
এমন প্রেমের বাক্য সাহসিনী করো উচ্চারণ
যেন না ঢুকতে পারে লোকধর্মে আর ভেদাভেদ।

প্রিয়তমাকে শুধুমাত্র দেহজ প্রবৃত্তিতে আসক্ত রাখেননি কবি, তাকে ডাকছেন আলোর পথে, উজ্জ্বীবনের পথে, মুক্তির নিশানার সন্ধানে। আহ্বান করছেন ধর্মকে ব্যবহার করতে ফসলের সুষম বণ্টনে। ‘ক্ষেতের আড়ালে নগ্ন করা যৌবন জরদ’ যদি হয় জীবনের অপরিমেয় প্রশস্তি ও প্রশান্তির প্রতীকী প্রকাশ, তাহলে তা অর্জনে নারীকে যে সাহসিনী হতে হবে, লোকধর্মে ভেদাভেদ প্রবেশে তৈরী করতে হবে সুদৃঢ় প্রাচীর- এ আহ্বান দারুণ কাব্যময়তায় উচ্চারিত হওয়ার কারণেই বোধ করি সোনালী কাবিন এখনও এত প্রাসঙ্গিক।

সোনালী কাবিন একদিকে যেমন সামাজিক সচেতনাতের ডাক, অন্যদিকে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়টা কতটা প্রকট তারও চিত্রেরও উন্মোচন। কবি বলছেন-

পোকায় ধরেছে আজ এ দেশের ললিত বিবেকে
মগজ বিকিয়ে দিয়ে পরিতৃপ্ত পণ্ডিত সমাজ।
ভদ্রতার আবরণে কতদিন রাখা যায় ঢেকে
যখন আত্মায় কাঁদে কোনো দ্রোহী কবিতার কাজ

—এরকম একটি ঝড়গ্রস্ততায় নিজেকে গুটিয়ে বসে থাকবার পাত্র ছিলেন না কবি আল মাহমুদ। তির্যক কাব্য কৌশলে জিজ্ঞাসা করছেন-

তোমার দুধের বাটি খেয়ে যাবে সোনার মেকুর
না দেখার ভ্যান করে কতকাল দেখবে, চঞ্চলা?

– বিবেকের দৃষ্টি উন্মোচনের এরকম তির্যক প্রশ্নবানের মধ্য দিয়েই আমরা একজন আধুনিক সমাজ সংস্কারকের সন্ধান পাই, যার কণ্ঠ সহসা আপোষহীনতায় ম্লান হয়ে যায় না; শাণিত কণ্ঠ উচ্চারণ করে চলে-

লোহার বাসরে সতী কোন ফাঁকে ঢুকেছে নাগিনী
আর কোনদিন বলো দেখবো কি নতুন সকাল?

বাঙালি জাতীয়তাবোধের পুনর্জাগরণে শুধু নয়, সোনালী কাবিন আমাদের জাতিগত আত্ম অনুসন্ধানেও এক অনন্য অনুপ্রেরণা। স্বীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গৌরবকে ধারণ করে সোনালী কাবিনে কবি বলছেন-

মাৎস্যন্যায়ে সায় নেই, আমি কৌম সমাজের লোক
সরল সাম্যের ধ্বনি তুলি নারী তোমার নগরে
কোনো সামন্তের নামে কোনদিন রচিনি শোলোক
শোষকের খাড়া ঝোলে এই নগ্ন মস্তকের পরে
পূর্ব পুরুষেরা কবে ছিলো কোন সম্রাটের দাস
বিবেক বিক্রয় করে বানাতেন বাক্যের খোয়াড়
সেই অপবাদে আজও ফুঁসে ওঠে বঙ্গের বাতাস।
মুখ ঢাকে আলাওল -রোসাঙ্গের অশ্বের সোয়ার
এর চেয়ে ভালো নয় হয়ে যাওয়া দরিদ্র বাউল?

কাব্যভাষায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী আল মাহমুদ মানুষের মনের ভাষাকে কবিতায় এভাবেই তুলে এনেছেন। উপমা ও উৎপ্রেক্ষার অজুহাতে অর্থহীন দুর্বোধ্য শব্দচয়ন করে দুর্ভেদ্য প্রাচীর তৈরী করেননি বলেই তিনি গণ মানুষের কবিতে পরিণত হয়েছেন। এক সাক্ষাৎকারে তাকে বলতে শুনি-

আমার কোনো অপূর্ণতা নেই। এ দেশের মানুষ আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছে তাতে আমি তৃপ্ত ও অনেক কৃতজ্ঞ। তারা বুঝতে পেরেছে আমি তাদের কতটা ভালবেসেছিলাম।

আল মাহমুদের আরেকটি জনপ্রিয় কবিতা নোলক। এ কবিতাটির একটি স্তবকে কবি বলছেন-

আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেলো শেষে
হেথায় খুঁজি হেথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে
নদীর কাছে গিয়েছিলাম, আছে তোমার কাছে?
হাত দিও না আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে।

প্রাঞ্জল চিত্রকল্পের সুষমাসজ্জিত দেশাত্মবোধের এ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি। একথা কে না জানে যে নোলক আবহমান বাংলার মায়েদের শুধুমাত্র অলংকারই নয়, তার আত্মমর্যাদার প্রতীকও বটে। মাতৃভূমির ক্রম বিলুপ্ত ঐশ্বর্যকে কবি তুলনা করেছেন মায়ের নোলকের সাথে; যার সন্ধানে কবি ফিরছেন সারা বাংলার আনাচে কানাচে।নদীতে খোঁজার চেষ্টা করা হলে তাকে সতর্ক করা হচ্ছে এই বলে যে—
হাত দিও না আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে।

কবির এই উচ্চারণ শুনে আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না এ রাক্ষুসে বোয়াল মাছ আসলে কারা? সমকালীন বাস্তবতাকে কালের দর্পণে ধারণ করে এভাবে কবি আমাদের চেতনার দৃষ্টিকে উন্মীলিত করার নিরলস প্রয়াস চালিয়েছেন তার কবিতায়। নোলক কবিতায় মাতৃভূমির লুন্ঠিত মর্যাদা পুণরুদ্ধারে কবি সচেষ্ট। তার সাহসী উচ্চারণ-

এলিয়ে খোঁপা রাত্রি এলেন, ফের বাড়ালাম পা
আমার মায়ের গয়না ছাড়া ঘরকে যাবো না।

কবিতার পাশাপাশি আল মাহমুদ বেশ কিছু কালোত্তীর্ণ ছড়াও রচনা করেছেন।
‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ ও ‘ আয়রে পাখি লেজ ঝোলা ‘ – তার দুটি উল্লেখযোগ্য ছড়াগ্রন্থ। শিশুমনস্তত্ত্ব, স্বদেশপ্রেম, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পারিবারিক সম্পর্কের ঐতিহ্য, হারানো গৌরব, দ্রোহ ও প্রতিবাদ তার ছড়াগুলোর উপজীব্য। শিশুমনের সরল স্বীকারোক্তি ফুটে উঠেছে তার বহুল জনপ্রিয় ছড়ায়, যেখানে কবি বলছেন-

আম্মা বলেন, পড়রে সোনা
আব্বা বলেন, মন দে;
পাঠে আমার মন বসে না
কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।

একই ছড়ায় কবি বলছেন-

তোমরা যখন শিখছো পড়া
মানুষ হওয়ার জন্য
আমি না হয় পাখিই হবো
পাখির মতো বন্য।
শিশুমনের এই অকপট সরল স্বীকারোক্তি, এই মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ তার নিখাদ কাব্য মনীষাকেই চিত্রায়িত করে আমাদের সামনে।

আল মাহমুদ ছিলেন একজন ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা।মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী আদায়ের আন্দোলন নিয়েও তিনি রচনা করেছেন কালজয়ী ছড়া। যতদিন বাঙালি জাতি থাকবে ততদিন একুশে ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে তার বিপুল জনপ্রিয় ছড়া বাঙালিকে উজ্জ্বীবিত করবে ভাষা চেতনায়। গভীর শ্রদ্ধা ও মমতায় ‘একুশের কবিতা’য় কবি বলছেন-

ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ
দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়?
বরকতের রক্ত।

হাজার যুগের সূর্যতাপে
জ্বলবে এমন লাল যে
সেই লোহিতেই লাল হয়েছে
কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে!

প্রভাতফেরীর মিছিল যাবে
ছড়াও ফুলের বন্যা
বিষাদগীতি গাইছে পথে
তিতুমীরের কন্যা।

চিনতে না কি সোনার ছেলে
ক্ষুদিরামকে চিনতে?
রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিলো যে
মুক্ত বাতাস কিনতে?

পাহাড়তলীর মরণ চূড়ায়
ঝাঁপ দিলো যে অগ্নি
ফেব্রুয়ারির শোকের বসন
পড়লো তারই ভগ্নী।

প্রভাতফেরী , প্রভাতফেরী
আমায় নেবে সঙ্গে
বাংলা আমার বচন, আমি
জন্মেছি এই বঙ্গে।

বাঙালির ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে যে ক’টি পদ্য রচিত হয়েছে কাব্যমান বিচারে এটি নিঃসন্দেহে অনন্য। তিতুমীর ও ক্ষুদিরামের ত্যাগের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে ভাষা আন্দোলনের হিরন্ময় চেতনার সাথে সম্পৃক্ত করে যে অনবদ্য পদ- লালিত্যের ঝংকার তৈরি করেছেন আল মাহমুদ, তা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শুধুমাত্র দেশপ্রেমে উজ্জ্বীবিত করবে না, স্মরণ করিয়ে দেবে তাদের পূর্ব-পুরুষদের বীরত্বের গৌরব গাঁথা।

ঊনসত্তরের গণ অভ্যুত্থান নিয়ে রয়েছে তার আরেকটি তীব্র প্রতিবাদমুখর ছড়া। রক্তে দ্রোহের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়ায় এরকম একটি ছড়ায় আল মাহমুদ বলছেন-

ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!
শুয়োরমুখো ট্রাক আসবে
দুয়োর বেঁধে রাখ।
কেন বাঁধবো দোর জানালা
তুলবো কেন খিল?
আসাদ গেছে মিছিল নিয়ে
ফিরবে সে মিছিল।
ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!
ট্রাকের মুখে আগুন দিতে
মতিয়ূরকে ডাক।
কোথায় পাবো মতিয়ূরকে
ঘুমিয়ে আছে সে!
তোরাই তবে সোনামানিক
আগুন জ্বেলে দে।

– এই যে প্রতিবাদী ভাষা, আপামর জনগোষ্ঠীর স্বাধিকার ও মুক্তির আন্দোলনকে ক্ষুরধার লেখনীতে ধারণ করে নির্মিত কবিতার প্রকীর্তি- এটি কবি আল মাহমুদকে দিয়েছে মননশীল কবিতাপ্রেমীর অকুণ্ঠ ভালবাসা, বাংলা সাহিত্যে তিনি লাভ করেছেন স্থায়ী আসন। তিনি পেয়েছেন জনপ্রিয়তা। বাংলার মানুষের নিরঙ্কুশ ভালবাসা পেয়েছেন তিনি, তাঁর কবিতা পরিণত হয়েছেন গণ মানুষের চিন্তা ও চেতনার প্রতিধ্বনিতে। লেখক ও সাংবাদিক আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী এ মহান কবিকে অভিষিক্ত করেছিলেন পঞ্চাশের দশকের শেষ নক্ষত্র হিসেবে। বাংলা সাহিত্যের এ নক্ষত্র, মহাকালের এ কবি তাঁর কালোত্তীর্ণ সৃজনের বদৌলতে বাঙালির মানসপটে বেঁচে থাকবেন শতাব্দীর পর শতাব্দী।

আজ ১১ই জুলাই এই মহান কবির জন্মদিনে তাঁর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। জয়তু আল মাহমুদ!

নিউজ /এমএসএম

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102