

গত ১৭ই মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে উন্নয়নের গতি বাড়িয়ে বৈদেশিক সাহায্য অনুদানপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দায়িত্বরতদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে ২০২৬ সালের মধ্যে সরকারের পক্ষে যতটা বিদেশী ঋণ ও অনুদান ব্যবহার করা সম্ভব হবে, ততই আমাদের জন্য ভাল হবে। কারণ দেশটি স্বল্পোন্নত থেকে উন্নীত হওয়ার কারণে ২০২৬ সালে অনেক সুবিধা হারাবে।
প্রধানমন্ত্রী ছোট প্রকল্প গ্রহণের পরিবর্তে জেলা ভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ এবং সেই প্রকল্পগুলো তত্ত্বাবধানের জন্য জেলা পর্য্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়োগ করার পরামর্শ দেন। এছাড়াও বৈদেশিক সাহায্যপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে গতিশীলতা বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিভাগকে প্রতি তিন মাসে সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নের অগ্রগতির রিপোর্ট একনেকে অবহিত করতে বলেন।
পরিকল্পনা মন্ত্রী আব্দুস সালাম বলেন, সংসদ সদস্যরা জেলাগুলোর জন্য পাঁচ বছর পর্য্যন্ত জেলাভিত্তিক অংশগ্রহণমূলক মাষ্টার প্ল্যান প্রণয়নে নিযুক্ত থাকবেন এবং সেগুলোকে সঠিক ভাবে বাস্তবায়নে দেখভাল করবেন। উপজেলা চেয়ারম্যানরাও এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকবেন বলে মন্ত্রী জানান।
তিনি আরও বলেন, গ্রামীণ অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে আরও উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যেতে হবে। (সূত্র : ইউকে বিডি টিভি.কম)
এ কথা নির্দ্ধিধায় বলা যায় যে, দেশ এখন ধাপে ধাপে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে জেলা পর্য্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা চেয়ারম্যান সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে লক্ষ্য, প্রতিটি গ্রামকে শহরে রূপান্তরিত করা, সেই লক্ষ্যে পৌছাতে বেগ পেতে হবেনা যদি সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একে অন্যের প্রতি সহনশীল মনোভাব নিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
সকলকে মনে রাখতে হবে নিজের এলাকার উন্নয়নই দেশের উন্নয়ন। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি এলাকার স্থানীয় এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সহ সবাই দলমত নির্বিশেষে দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে গেলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্থাৎ ২০২৬ সালের মধ্যে বৈদেশিক সাহায্য, অনুদানপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোর কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেনাল্ড লু বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারী বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সাথে ১৪ই মে রাতে গুলশানে নৈশভোজ শেষে ডেনাল্ড লু বলেন, বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক জোরদার করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এই সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি জলবায়ু পরির্তন ইস্যু সহ বিভিন্ন খাতে এক সঙ্গে কাজ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়াও র্যাবের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা ইস্যু ও বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনীকে দেশে ফেরাতে আলোচনা হয়েছে বলেও সালমান এফ রহমান জানান।
আমার মনে পড়ে দেশে সাধারণ নির্বাচনের পূর্বে ডোনাল্ড লু সহ যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্য্যায়ের নেতৃবৃন্দের বাংলাদেশে ঘন ঘন সফর এর কথা। ভিসা নীতি প্রয়োগের কথা। মনে পড়ে বিএনপি’র নেতৃবৃন্দের সাথে তাদের দহরম মহরমের কথা।
দেশের অনেকেই মনে করেছিল আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে তারা মনে হয় বিএনপি’কেই ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। দেশের জনগণ তখন ছিলো ভীষণ উৎকন্ঠার মধ্যে। আর বিএনপিও মনে করেছিলো আর ক’দিন ক্ষমতা-তো আমাদের হাতেই আসছে, নির্বাচনের দরকার কি? যুক্তরাষ্ট্র আমাদের পাশে আছে!
সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসনের হম্বিতম্বি ভাব এবং তাদের দেয়া ভিসা নীতি র্যাব সহ অন্যান্যদের উপর দিয়েছিলেন। জনগণ যাতে এই ভিসানীতিতে বিভ্রান্ত না হয় সে জন্য গত বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালের ৫ই অক্টোবর লন্ডন থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ”জনমত” ও ”ইউকে বিডি টিভি” অনলাইন পোর্টালে ’যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতির মূল রহস্য কি?” আমার ’প্রবাসের আয়নায়’ কলামে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া ভিসা নীতি এবং সার্বিক অবস্থার উপর পর্যালোচনা করে একটি লেখা প্রকাশ হয়েছিল। তারই সংক্ষেপে কিছু অংশ তুলে ধরলাম।
”ভিসানীতি প্রয়োগের প্রক্রিয়া সহ নানা বিষয় নিয়ে একটি গমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য বিষয়ক সহকারী সেক্রেটারী ডোনাল্ড লু বলেন, আমরা শুরু থেকেই বলছি, এই নীতির আওতায় ভিসা নিষেধাজ্ঞা যাদের দেয়া হবে, তাদের নাম আমরা প্রকাশ করবো না। কাউকে ভিসা না দেয়া সহ যে কোন রেকর্ড মার্কিন আইন অনুযায়ী গোপনীয় তথ্য। ”আমি এ টুকু বলতে পারি যে, এই নীতি ঘোষণা করার পর থেকে আমরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্যদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছি”।
উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্র যখন বাংলাদেশের উপর ভিসানীতি প্রয়োগ করে সে সময় আগষ্ট মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহেন্সবার্গে অনুষ্ঠিত ১৫তম ”ব্রিকস” সম্মেলনে বাংলদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অংশ গ্রহণ করেন। উক্ত সম্মেলনে শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে বলেন, ব্রিকস’কে বহুমুখী বিশ্বের বাতিঘর হিসেবে আবির্ভূত হতে হবে এবং প্রতিক্রিয়ার সময় অন্তর্ভুক্তিমূলক প্ল্যাটফর্ম হতে হবে। এই প্ল্যাটফর্ম থেকে আমাদের শিশু ও যুবকদের কাছে প্রমাণ করতে হবে যে, আমাদের জাতিগুলো সংকটে পড়তে পারে, কিন্তু কখনই পরাজিত হবে না। প্রধানমন্ত্রী জোহেন্সবার্গের স্যান্ডটন কনভেনশন সেন্টারে ৭০টি দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে ফ্রেন্ডস অব ব্রিকস লিডার ডায়ালগ নিউ ডেভেলাপমেন্ট ব্যাঙ্ক অব ব্রিকস এর সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে এসব কথা বলেন।
ওরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকার জোহেন্সবার্গে অনুষ্ঠিত আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ মহাসচিব সহ বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধানদের সাথে মিলিত হয়ে যে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরী করেছেন এবং কোনদিন যদি বাংলাদেশ আমেরিকান ব্লক থেকে বেরিয়ে এসে ’ব্রিকস’ এর সাথে হাত মেলায় সেটাকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসন তাদের প্রতি একটি বিরাট হুমকি হিসেবে গণ্য করছে। সুতরাং যে ভাবেই হোক বাংলাদেশকে তাদের হাতে রাখার জন্য এই ভিসা নীতি প্রয়োগ করেছে। তারা মনে করছে, এই ভিসা নীতির ভয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জ্বী হুজুর বলে তাদের কাছে মাথা নত করবেন কিন্তু শেখ হাসিনা তার তোয়াক্কা করেন নি।
ভিসানীতির বিশ্লেষণটি আমি এভাবে করেছিলাম, প্রথমত: নির্বাচন অনুষ্ঠানের শেষ সময় পর্য্যন্ত বাইডেন প্রশাসন অপেক্ষা করবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের সাথে কোন সমঝোতায় যান কি না। যদি তাদের সাথে হাত মেলান, তাহলে বাইডেন প্রশাসন আওয়ামী লীগের পক্ষেই কাজ করবে অর্থাৎ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানোর লক্ষ্যে বিএনপি সহ অন্যান্য বিরোধী দলকে নির্বাচনে আনার ওয়াদা করবে বলে একটি ”টোপ” দেবে। শেখ হাসিনা যদি এই ’টোপ’ গিলে ফেলেন তাহলে তো বাইডেনের জন্য হবে সোনায় সোহাগা, আর যদি তা না হয় তাহলে নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের ওপর পড়বে ভিসানীতির পূর্ণ প্রভাব। তখন আওয়ামী লীগ যতোই চেষ্টা করুক না কেন সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন করার জন্য, তা তারা হতে দেবেনা বরং সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও তা স্বীকার করবে না। তখন তাদের তাবেদার বিএনপি-জামায়াতকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনের পুর্বেই নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করতে ত্রুটি করবে না। পরে দেখা যাবে আওয়ামী লীগের ঘাড়েই সব ভিসা নিষেধাজ্ঞা।
দ্বিতীয় কারণ: বাইডেন প্রশাসন মনে করছে যে, যদি উল্লেখিত ব্যক্তিদের ওপর নিষেধাজ্ঞার ভয় দেখানো হয়, তাহলে তাদের নিজেদেরকে এই নিষেধাজ্ঞার হাত থেকে বাঁচার জন্য সরকারের বিরুদ্ধে তৎপর হয়ে ওঠবে। তার কারণ হচ্ছে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় যারা পরবে, এক দিকে তারা যেমন যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের সুযোগ পাবে না ঠিক তেমনি যারা বাড়িঘর সেখানে কিনেছেন তাদের বাড়িঘর বাজেয়াপ্ত হতে পারে, এমনকি পরিবারের যারা সেখানে বসবাস করছেন তাদেরকেও দেশ থেকে বের করে দেয়া হতে পারে। যেসব ছাত্রছাত্রী সেখানে লেখাপড়া করছে তাদের ভিসাও বাতিল হতে পারে। এসব দিক বিবেচনা করে তারাই সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে সরকারকে অর্থাৎ সরকারের লোক দিয়েই সরকারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার পাঁয়তারা করবে। ”
আমার পুরনো লেখাটির কিছু অংশ উপরে উদ্বৃত করার উদ্দেশ্যই হলো, যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বার্থ আদায়ের জন্য যা ইচ্ছা তা-ই করতে দ্বিধাবোধ করে না। নির্বাচন অনুষ্ঠানের পূর্বে বিএনপি জামায়াতকে কাজে লাগিয়ে আওয়ামী রাজনীতি অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিকে রাজনীতি থেকে উৎখাত করার প্রাণপন চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্ববাসীর কাছে তাদের কপালে যে কলঙ্কের কালিমা লেপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তা মোচনের জন্যই যুক্তরাষ্ট্র এখন নানা অজুহাতে বাংলাদেশে এসে বাংলাদেশের সাথে তাদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে, ব্যবসা বানিজ্যে আরও সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করতে তৎপর হয়ে ওঠেছে। ’ব্রিকস’ সম্মেলনে ৭০টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সামনে প্রধানমন্ত্রী যে বক্তব্য রেখেছেন, সে বক্তব্য শুনেই বাইডেন প্রশাসনের ঘাবড়ে গেছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার বারই বলছেন, আমরা সবসময়ই চাই, ছোট বড় বিশ্বের সব দেশের সাথেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে।
আমার মনে হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের জনগণের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে বাইডেন প্রশাসন ব্যর্থ হয়ে যে শিক্ষা পেয়েছেন, তা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরস্মরীয় হয়ে থাকবে।
লেখকঃ দেওয়ান ফয়সল, কলামিষ্ট, সিনিয়র সাংবাদিক ও সদস্য লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব।