

ইউকে বিডি টিভির পাঠকদের জন্য দুই বাংলার প্রখ্যাত কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক”- এর সাক্ষাৎকার সহ স্বরচিত কিছু কবিতা তুলে ধরা হলো
ইউকে বিডি টিভিঃ এই মূহুর্তে বিশ্বমানচিত্রে যে জটিল পরিস্হিতি , অমানবিক বর্বরতা নিষ্ঠুরতা নৃশংসতায় লজ্জায় মুখ ঢেকেছে মানবতা , বিদ্যুৎ বাবু আপনি কি মনে করেন এই বহতা বিশ্রী সময়টা একদিন সত্য ও সুন্দরের চেহারা নিয়ে আমাদের একটা ভালো রাস্তা দেখাবে ?
কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকঃ অবশ্যই ! আমি সব সময়ই পজেটিভ চিন্তা করি ৷ আসলে কি , এই ছলচাতুরি , কপটতা , আর ভন্ডামি হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক চতুর্যের অমোঘ নিয়তি ৷ এই বিস্তৃত প্রমাণ্যসূত্রিক আলোচনায় , এটাই সুস্পষ্ট হয় যে , রাষ্ট্রসন্ত্রাস, গণহত্যার বর্বরতা চলে এসেছে সেই আদ্যিকাল থেকে ! পৃথিবীর শিল্পী , কবি , সাহিত্যিক , চিত্রকর , ভাস্কর , শিক্ষক ও বুদ্ধিজিবি , এঁরা গান গেয়ে , কবিতা গল্প গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ নিবন্ধ লিখে , ছবি এঁকে যুগ যুগ ধরে আপ্রাণ চেষ্টা করে আসছেন এই পৃথিবীটাকে দুষণমুক্ত করার ! সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুই পাল্টেছে , বদলেছে শয়তানের চেহারা ! ভদ্রতার মুখোশ এঁটে এটা চলিয়ে যাচ্ছে তান্ডাব ! আমরা যারা স্বপ্ন দেখি একটা সত্যি কারের মেঘমুক্ত আকাশ , একটা ফুল আর পাখির কাকুলিতে ঢাকা পৃথিবী ; সেই স্বপ্নকে কিছু ধান্দাবাজ শয়তান তাদের হিংসা ও সার্থপরতা দিয়ে ভেঙে খান খান করে দিচ্ছে ! এটার জন্য আমি বর্তমান রাজনিতিকে দায়ি করবো ৷ তবে এটা বেশি দিন চলতে পারে না , একটা সময় একদিন আসবে যখন আমাদের স্বপ্নগুলো একে একে বেঁচে উঠবে ! আর যারা এই পৃথিবীটাকে কব্জা করতে চেয়েছিল , তাদের অবস্থানগত পরিবর্তন হবেই হবে ! দেখে নেবেন ,—–
ইউকে বিডি টিভিঃ সংস্কৃতি দিয়ে কি এই সমস্যা মিটতে পারে ?
কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকঃ অবশ্যই , কেন না ? একসময় ভারতবর্ষ থেকে ইংরেজরা তল্পিতল্পা গুটিয়ে পেছন হেঁটেছিল কত বিপ্লবী , কত কবি ও গিতিকারদের সৃষ্টি , সাহস এবং সংগ্রামী চেতনার প্রতিভূকে ভয় পেয়ে ! তাই না ? আমি মনে করি , যখন কোন দেশ অন্য আর এক দেশের সাথে যুদ্ধ করে ; তখন এই দু’ই ক্ষমতা লোভি দেশকে আমি কখনোই ভালো এবং সুসভ্য দেশ বলে গণ্য করবো না ! যাই হোক এই অবকাশে আমার নির্বাচিত কবিতা কাব্যগ্রন্থ থেকে একটা কবিতা আপনাকে শোনাচ্ছি , …….
১) পরবাস্তব এবং হৃদয়তান্ত্রিক পদ্য
চোখের কাছে অচেনা সর্বনাশ
ভেতর থেকে দৃশ্যের বিচ্ছেদ
মনের মধ্যে যন্ত্রণার অলি-গালি
নামহীন যত কান্নার নির্দেশ !
এখন থেকে অন্তরে তুমি থাক ; কিম্বা অতলে
হৃদয় মেলে রাখ
এইবেলা যদি স্পর্শে ওঠো কেঁপে , আকাশ
থেকে বৃষ্টি আসুক ঝেঁপে ,…..
গভীরের সুখ সময়ের পথ ধরে
চলতে চলতে কোন অতলান্ত ভোরে
স্বপ্নের কথা নিজেকে বলতে বলতে
ঘুম ভেঙে যায় নিজের অজান্তে !
কোথায় যেন পুড়ছে অচেনা স্মৃতি
মিথ্যে মিথ্যে বিষণ্ণ দুটি চোখ ;
কোথায় যেন নামহীন পৃথিবীতে
ভরে আছে যত মৃত্যুর প্রতিশোধ !
হঠাৎ যদি ফুল – পাখি – চাঁদ দেখে ;
সময়ের সাথে একা-একা পথ চলি , ……
কবিতার কাছে আশ্রয় খুঁজে নিয়ে
তিন প্রহরের যন্ত্রণা তাকে বলি !
এসব কথা আত্মায় ঘোরে-ফেরে ;
তবুও কেন মন বোঝে না তাকে ,
চতুর্দিকের অগণন স্মৃতিগুলো
আদিগন্ত ভালোবাসা হয়ে থাকে !
চলে যাব ব’লে চোখ ভিজে আসে জলে
চুপচাপ শুধু নীরবতা নিয়ে থাকি ;
চেনা – অচেনায় অনেকেই কাছে থাকে
মৃত্যুর পাখি করে যায় ডাকাডাকি !
নতুন করে আসব আবার ফিরে
ডাকবে কাছে নতুন নামে যখন ;
সেই পুরাতন স্মৃতির ফাঁকে ফাঁকে
আগের আমিকে পড়বে কি মনে তখন ?
ইউকে বিডি টিভিঃ চমৎকার বিদ্যুৎ বাবু, এই কবিতাটি আমি
আপনার কণ্ঠে কলকাতার একটা টিভি চ্যানেলে শুনেছি !
এবার আসছি বিদ্যুৎ বাবু আপনার কবিতা নিয়ে কিছু কথা শুনতে ৷ ( কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক হাসি মুখে বললেন , বলুন ? )
বর্তমান পরিস্থিত , সমাজ ব্যবস্থা , মূল্যহীনতা , জাত-পাত , কিম্বা ধর্মটর্ম ; এইসব বিষয় নিয়ে আপনি কি এই মূহুর্তে কিছু লিখছেন , বা লিখবেন বলে চিন্তা করছেন ?
কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকঃ দেখুন আমি শুধুমাত্র কবিতা ও ছোটদের জন্য ছাড়া লিখি , তবে সম্পাদকদের আবদার মেটাতে গিয়ে মাঝেমধ্যে গল্পটল্প লিখতে হয় ! আমি মনে করি আমার মত যঘণ্য গদ্যকার অর্থাৎ গল্প লেখক পৃথিবীতে আর আছেন কিনা , সে বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে ! আমি খুব কমই গল্প লিখি , সেই লেখা যে কবিতার শরীর নিয়ে ফেলে সেটা আমি লেখার আগে অনুধাবন করতে পারি না ! ( মৃদু হেসে ) তবে কবিতাটা আমি খুবই যত্ন , নিষ্ঠা এবং একাগ্রতার সাথে লিখি ! এটা দু’ই বাংলার আমার পাঠক বন্ধুরা র্দীঘদিন ধরে দেখে আসছেন !
ইউকে বিডি টিভিঃ আধুনিক কবিতা নাকি দুর্বোধ্য , এবিষয়ে আপনি কি মনে করেন ?
কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকঃ আসলে কি দুর্বোধ্যতা পাঠকদের অজ্ঞতা বা অযোগ্যতা বলে আমি মনে করি ! কবি বিষ্ণু দে , সুভাষ মুখোপাধ্যায় , বিরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় , প্রেমেন্দ্র মিত্র , শঙ্খ ঘোষ , সুনীল , শক্তি , জয় গোস্বামী , সুবোধ সরকার”- দের এই অপবাদ শুনতে হয়েছে এবং মন্দার , সৃজাত আমাকেও শুনতে হয় ! আসলে কবিতা অনুধাবন করতে গেলে আগে ভিতরকার শিক্ষার প্রয়োজন ৷ এক কথায় পাঠকদের কবিতার শিক্ষার শিক্ষীত হতে হবে , তা না হলে আমাদের কবিতা পাঠকদের মাথার উপর দিয়ে চলে যাবে ! তবে এটা সত্যি , কবিতা বোঝার লোক খুবই কম ! হাতে গুনে বলা যায় !
ইউকে বিডি টিভিঃ আপনি যে একটা কঠিন রাস্তার উপর দিয়ে দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে একটানা হেঁটে চলেছেন ; এতে আপনার এই কবিতা লেখার ব্যাপারটাকে কখনো একঘেঁয়েমি মনে হয় নি ?
কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকঃ না , কখনোই না ৷ আমি কবিতাকে ভালোবাসি , এই ভালোবাসা থেকেই নির্মাণ হয়ে আসছে আমার কবিতারা ! দেশ ও বিদেশের পাঠক বন্ধুরা আমাকে এবং আমার কবিতাকে ভালোবাসেন ৷ আর এক দুই বছর তো আমি লিখছি না , চল্লিশটা বছর ! এই টানা দীর্ঘ চল্লিশটা বছর আমাকে এবং আমার কবিতাকে পাঠকরা সহ্য করে আসছেন ; এটাই আমার কবিতার সার্থকতা বলতে পারি !
ইউকে বিডি টিভিঃ বিদ্যুৎ বাবু এবার বলুন আপনার প্রেম এবং কবিতার ভেতর তার প্রভাব কতটা বিস্তৃত ?
কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকঃ আমি বেশ পাকাপোক্ত প্রেমিক বলা যেতে পারে ! সাতপুরুষের সম্পত্তি আগলে রাখার মতোই এই প্রেম ও প্রতিশব্দময় ভালোবাসা”- কে আমি আগলে রেখেছি ৷ আমার প্রেম ? কিভাবে বর্ণনা করবো ভেবে পাচ্ছিনা , তবু প্রশ্নটা যখন করেছেন তখন না বলে পারছি না ৷ আমার জীবনে প্রেম বহু বার এসেছে ও গেছে ! কাছে থেকেছে খুব কম , অনাহুতো অতিথির মতোই ! আমি তখন শ্রীরামপুর হুগলীর পূর্ণচন্দ্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জুনিয়র ক্লাসে পড়ি ৷ আমার পাশে একই বেঞ্চে শুভ্রা নামে একটা মেয়ে বসতো , ভীষণ সুন্দরী একটা ফুটফুটে মেয়ে ! আমি স্কুলে পড়া পারি বা না পারি , প্রতিদিন ওই ছোট্ট শুভ্রা মেযেটার জন্য স্কুল কামাই করতাম না ! আমাদের ঝিলবাগানের কুসুমকুঞ্জের বাড়িতে আমি আমার জ্যাঠতুতো দাদা-দিদি ও বড়দের কাছে শুভ্রার গল্প করতাম ৷ দাদা , দিদি , ও বাড়ির বড়রা আমাকে ঠাট্টা করে বলতো ; “রানা তোর সাথে শুভ্রার বিয়ে দিয়ে দেব !”— একটা কথা এখানে বলি , আমার ডাক নাম রানা ৷ এই রানা ব’লে বাড়ির সবাই আমাকে ডাকে ৷ ওদের কথা আমি ওই অল্প বয়সে বিশ্বাস করে ফেলে ছিলাম , একটু একটু করে শুভ্রাকে আমি ভালোবেসে ফেলে ছিলাম ! তখন প্রেম বা ভালোবাসা কাকে বলে সেটাই জানতাম না , তবে কিছু একটা যে মনের মধ্যে ঝড় তুলেই চলেছে সেটা অনুধাবন করতাম ! বাড়ির যারা আমাকে বলেছিল শুভ্রার সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দেবে , সেই ওদের কথা আমি শুভ্রাকে বলেও ছিলাম ! আমার কথা শুনে ওই মেয়েটা সেদিন এক হাতে মুখ ঢেকে হেসে ছিল ! সে স্মৃতি এখনো আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে গোচ্ছিত আছে !
সেই শুভ্রা একদিন স্কুলে আসা বন্ধ করে দিলো ! স্কুলের অন্য সব বন্ধুদের কাছে ওর কথা জিজ্ঞাস করাতে কেউ বলতে পারেনি শুভ্রা স্কুলে আসছেন কেন ! একদিন টিফিন প্রিয়ডে আমাদের স্কুলের কমলবাবু নতুন দিদিমুনিকে কি যেন বলছিলেন , আমি একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলাম ৷ কান পেতে শুনলাম কলমবাবু বলছিলেন ; শুভ্রা মেযেটার ব্লাড ক্যানসার হয়েছে ও আর স্কুলে আসবেনা ! সত্যি শুভ্রা আর কোনোদিন স্কুলে আসেনি ! ওর বাড়ি কোথায় , সেটাও আমার জানা ছিল না ! মেয়েটা বেঁচে আছে , না মরে গেছে , তাও জানিনা ! তবে এখনো আমার মনের মন্দিরে সেই মিষ্টি হাসি মাখা সুন্দর মেয়েটা এখনো আছে ! এটাই প্রেম , যা আমাকে এই ছাপান্ন বছর বয়সেও অহর্নিশ ডুবিয়ে মারে ! এরপর বড় বেলাতেও প্রেম এসেছে , আবার ফুঁড়ুৎ করে পালিয়েও গেছে !
আমার পরবর্ত্তী সময়ে ওই সব প্রেম”- নানা ভাবে , নানা রূপে কবিতায় এসেছে ! নবনীতা’-কে নিয়ে আমার কবিতার পাঠকদের মধ্যে গুঞ্জন শোনা যায় ৷ আমি নবনীতাকে নিয়ে প্রচুর কবিতা লিখেছি ৷ আমার , কথা না রাখার কথা শীর্ষক কাব্যগ্রন্থে নবনীতাকে নিয়ে বেশকিছু কবিতা আছে ৷ এই নবনীতা কে , কেন , এবং আমার সাথে কি সম্পর্ক সেটা আমি বলতে পারবো না ৷ এটা বলে ফেললে কবিতার মেজাজটাই নষ্ট হয়ে যাবে ৷ তাই না ,—- ?
ইউকে বিডি টিভিঃ এবার আসছি আপনার কাছে কবিতায় উত্তর আধুনিকতাবাদ প্রসঙ্গে ৷ এই ব্যাপারটা যদি একটু খোলসা করে বলেন বিদ্যুৎ বাবু ?
কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকঃ এই প্রসঙ্গ নিয়ে ইতিমধ্যে অনেকে অনেক ভাষণ-টাষণ দিয়েছেন , নানা সাহিত্যধর্মী ম্যাগাজিনে লম্বা লম্বা প্রবন্ধ লিখেছেন পন্ডিত মহল ৷ আমি সেই বিচারে পণ্ডিত- টন্ডিত নই , তবে আমার সামান্য অল্পসল্প পড়াশোনা থেকে এটা বলতে পারি , আসলে আমার যেটা মনে হয় এই উত্তর আধুনিকতাবাদ আধুনিকতাবাদের একটা প্রকারন্ত দিক ! যা গোটা ব্যাপারটাকে সমৃদ্ধ করে । কিম্বা আধুনিকাতার পরবর্তী সিঁড়ি বলা যেতে পারে ৷ কিন্তু আসলে আদৌ সেটা তা নয় ! কারণ এরা পরস্পর বিরোধী পক্ষ ৷ আধুনিকতার মূল উপজিব্য কারণ হল এটা যে সময় , একে আদ্যোপান্ত ধারণ করা ৷ কিন্তু উত্তরাধুনিকতার মূল বিষয়টা হল কোন কিছু ধ্রুব অর্থাৎ সত্য মেনে ধারণ করা যাবে না ৷ ফলে এই ধ্রুবহীনতাকে আদর্শ ধরে যে কাঠামোকে গ্রহণ করা হয় তাকেই বলা যেতে পারে উত্তরাধুনিকতাবাদ ৷ এই মতবাদটিতে লেখকের যে ক্যারেক্টরের কথা বলা হয়ে থাকে তা মূলত লেখকের স্বাধীনতা কিম্বা স্বকীয়তা ৷
কবিতার বিষয়বস্তুই হল বাস্তবতার ভিন্নরূপ ! কেননা কবি তার চারপাশে যেই চিত্র উপলদ্ধি করেন তাই শব্দের মাধ্যমে আঁকেন ৷ তবে বাস্তবতাকে যদি ধ্রুব না মানা যায় তবে কি দরকার কবিতায় ধ্রুবহীনতা ? এটাও কিন্তু সত্যি এই সব ব্যাপার ট্যাপার নিয়ে বেশি ভাবলে কিন্তু আসল দিকটায় ফাঁক থেকে যাবে ৷ সেটা হল কবির কলম দিয়ে কবিতা নির্মাণ না হয়ে ব্যাকরণ ট্যাকরণ শব্দ ও অক্ষরে গড়ে উঠবে ৷ আমি বিশ্বাস করি কবিতা মূলত সমাজ ও শিল্প গঠনের উপর নির্ভর করে নির্মাণ হয় ৷ আবার এটাও সত্য কবিতা কিন্তু গঠন নির্ভর নয় ৷ কবিতা হল বিষয় আর ভাব নির্ভর ৷ বাস্তবতার কল্পনা জ্ঞান দ্বারা যে নির্মাণ কাজ সাধিত হয় সেটাই কবিতা ৷ আমরা কি আগের কোন কবির কবিতা ফেলে দিতে পারবো , কিম্বা তাঁদের সৃষ্টি নিয়ে বিদ্রুপ করতে পারি ? অবশ্যই নয় ৷ যেটা পারি তা কেবল কবিতার ভিন্নধারা নির্মাণ করতে ৷ এইজন্যেই কবিতা আধুনিক বা পুরাধুনিক হয় না ৷ আধুনিক কিম্বা পুরাধুনিক হয়ে যার কবিতার শব্দ , গঠন , ভাষা আর তার সময়ের প্রেক্ষাপট ৷
ইউকে বিডি টিভিঃ বর্তমান প্রজন্মের কবিদের প্রতি আপনার পরামর্শ কি ?
কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকঃ নতুন বা নবীন যারা , তাদের লেখা আমি খুব মন দিয়ে পড়ি ৷ ওরা খুব ভালো লিখছেন ৷ আমার হুগলীর শ্রীরামপুরের ছায়ানীড়”- এর বাড়িতে বেশ কিছু নতুন কবি তাদের কবিতা শোনাতে আসেন , আমি ওদের কবিতা শুনে মুগ্ধ হই ! ওদেরকে একটা কথা বলবো , নিজেদের পায়ের নিচের মাটিকে শক্ত করে তবেই এই কবিতা চর্চার দিকে ঝুঁকতে ৷
যাই হোক , সবাই ভালো থাকুন , সুন্দর ও সুস্থ থাকুন ৷
ইউকে বিডি টিভিঃ বিদ্যুৎ বাবু একটা বিশেষ কথা আপনার কাছে জানতে চাইছি , সেটা হল কবিতার চিত্রকল্প ৷ এই বিষয়টা নিয়ে যদি বিস্তারিত কিছু বলেন ? সঙ্গে আপনার সাম্প্রতিক সময়ের লেখা অপ্রকাশিত একটি কবিতা , যে কবিতার গভীরে আপনার একমাত্র মৃত্যু চেতনার ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ; সেই কবিতাই আপনার কণ্ঠে শুনতে চাই
কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকঃ হ্যাঁ খুব ভালো প্রশ্ন করেছেন , দেখুন গোটা জীবনটা ধরে মস্ত মস্ত মোটা মোটা বই লেখার চাইতে , আমি মনে করি একটা সত্যি কারের রিয়্যালিষ্টিক অর্থাৎ সার্থক চিত্রকল্প নির্মাণ করা অনেক ভালো ! তাই না ? It is better to present one image in lifetime than to produce voluminous work I এটা আমার কথা নয় , এটা এজরা পাউন্ড এর প্রণিধানযোগ্য বাণী ! এই চিত্রকল্প বিষয়টা কি ? উপমা ও চিএকল্প ব্যাপারটা কি এক ? কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন ; উপমাই কবিত্ব ৷ উপমার মধ্যে চিত্র থাকলেও চিএকল্প ও উপমা কখনোই এক হয় না ৷ কবিতা রচনার মধ্যে কবির বুদ্ধিমত্তা ও আবেগের সংহতিকে যা একটা বিশেষ মুহূর্তে কবিহৃদয়ে জাগিয়ে তোলা ! কিন্তু এই ইমেজ কবির মনে জন্ম নেয় কিভাবে ? কবিকে আগে শব্দের দীক্ষা নিতে হবে ৷
শব্দ একটা কন্সেপ্ট concept অর্থাৎ ধারণার প্রতীক , এটা কিন্তু সর্বাগ্রে কবিকে অনুধাবন করতে হবে ৷ এরপর কবিকে শরীর , মন , প্রাণ দিয়ে বিশুদ্ধ থাকতে হবে ! তবেই তাঁর দর্শন আরও শক্তিশালী হবে ৷ সাম্প্রতিক বাংলা কবিতায় চিত্রকল্পের যে বহুল প্রয়োগ দেখা যায় , “ইমেজিষ্ট” আন্দোলনের পরোক্ষ প্রভাব থেকেই সেটা এসেছে ! কবিতায় জীবনের গভীরার্থ অনুসন্ধান করতে গিয়ে ভাঙাচোরা সময় থেকে সুস্থিতি ফিরে পাওয়ার আত্যান্তিক তাগিদ আমি অহর্নিশ উপলব্ধি করি ! যাই হোক , এটুকুই বললাম ৷ আগামী দিনে কবিতার চিত্রকল্প”- এই বিষয়টা নিয়ে আরও বিস্তারিত বলার ইচ্ছা রইল ৷ যাই হোক ইব্রাহীম সাহেব আপনার অনুরোধে আমার লেখা একটা কবিতা পড়ে শোনাচ্ছি , যেটা ৯০’- এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের লেখা …..
_______________________________
স্মৃতিঘর ও পরিচিত উপহাস
যদি ওভাবে উচ্চারণ হত অফুরান স্বপ্নগুলো ; তাহলে আর একবার মৃত্যু নিয়ে ঘুমিয়ে পরবো এই ঘরে , এই বিছানায় !
মহাবনস্পতি থেকে শূন্যের অদূরের আকাশ ; এধারে – ওধারে মাখামাখি নীলের বৃষ্টি ….. ভেতরে নিরাময় স্তব ; চোখের পিঞ্জরে নির্জন নিঃশব্দ কথা , আরও কত প্রাঞ্চল অসুখ ; এ আমারই !
নতুন কেনা চশমায় চোখ বাসা বাঁধে ; হাওয়ায় বাতাসে ভাসে এ বাড়ির প্রতিটা স্তবক ৷ চার ধারের চোখগুলো ছায়া ছায়া ভাসমান ; অদ্ভুত হেঁয়ালী নিয়ে নির্বাক এভাবেই স্বপ্নে ঘুরে গেছে ব-হু বার ,—- অথচ প্রত্যন্ত অস্থিরতায় কেউ যেন শরীরের সমস্ত নগ্নতা আদিখ্যেতায় দেখাতে চেয়েছে এই আমিটাকে ! এই বাড়ি , ঘর – দোর , চেনা সিঁড়ির প্রতিটা অবয়ব কবে থেকে অন্য এক সময় থেকে নির্বাসন নিয়েছে ! অথচ এখন …..
সেই দেরাজে লুকিয়ে রাখা মৃত প্রজাপতির ডানা ; সেটাও মনকে পোড়ায় !
এই গভীরের অসুখ স্মৃতিভিক্ষা করে সময়ের কাছে কতবার , কতভাবে ,—- তবু যতবার আমার শরীর ছেড়ে চলে যাওয়া ; আজীবনের কবিতাদের ফেলে , সেগুলো এখন বাহিরের দরজায় দাঁড়িয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে !
কাউকে এভাবে মন খুলে ডাকিনি এভাবে ; সেই আকাশ পাড়ের চাঁদ , সেও বৃষ্টির ভেতর আমার ডাক শুনতে পায়নি একবারও !
স্নানঘরের ভেতর বারোমাসের স্বপ্নদোষ ; তারাও মধ্যরাতের দুঃস্বপ্নে এসে আমি কেমন আছি খোঁজ নিয়ে গেছে !
কাল সারারাত এই মেঘ-বৃষ্টির ভেতর ঘরের জানলা খোলাই ছিল !
মনের মধ্যে দিয়ে কত রাতের নির্ঘুম যাপন ; সেও পাখির বাসার মত নীরবতায় একাকার ,—— সবটাই এই স্মৃতিঘরে একাই জীবন পেতে বসে আছে !
কেউ একজন মৃত্যুর পরেও নিমন্ত্রণ পাঠিয়েছে আমাকে ; উষ্ণ আলতো উচ্চারণে ,—– ভেতরের যাবতীয় প্রাপ্য দুঃখ ; তারাও আমার পায়ের নীচের রাস্তায় নির্দ্বিধায় অশ্রু ঝরিয়েছে !
এই রাস্তায় আমার নাম ধরে কবেকার আধপোড়া স্মৃতি ডেকেছে ; সেটাও নির্ঘুম ঘুমন্তে শুনতে পেয়েছি ,—– এই অন্তহীন সময় শ্মশান থেকে আমিও অশরর বৃষ্টি ভিজে ফিরে আসা ;
অন্য কোন জন্মঘরে ! মৃত্যুর অনেক পরে …..
🖋️
ইউকে বিডি টিভিঃ অসাধারণ বিদ্যুৎ বাবু ৷ একটা বলতেই হচ্ছে , আপনার বেশিরভাগ ৯০’- দশকের কিছু আগে এবং ওই সময়ের দু’এক বছরের বহতাময় স্নোতের মধ্যে এই “মৃত্যু” নামক শব্দটা অর্থাৎ “মৃত্যু চেতনা” ভীষণ ভাবে কবিতায় ঘুরেফিরে দেখা দিয়েছে ! এই মৃত্যু”- নামক ব্যাপারটা নিয়ে আপনি আপনার পছন্দের সাদা পৃষ্ঠায় মেতে উঠেছেন, এই প্রসঙ্গে যদি কিছু বলেন?
কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকঃ আমি মৃত্যু’র উপমা দিয়ে আমার পাঠকদের কাছে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাইনি কখনো ৷ এই মৃত্যু ধুম্রজালের বেষ্টনে ঢাকা ৷ আমার আগে অনেক সাধক , কবি ও লেখক এই “মৃত্যু” নিয়ে প্রচুর লিখেছেন এবং আলোচনা করেছেন ! আমি আর নতুন কী আর লিখেছি ?
আমার পাঠক বন্ধুরা আমার কবিতা গুলিতে হৃদয় নিয়ে জামায়াত হয়েছেন , কবিতাগুলি খুব বেশি বেশি করে মন দিয়ে পড়েছেন এখনো পড়েন , …. তারা নিশ্চই এর ভেতর কিছু খুঁজে না পেলে পড়বেনই বা কেন ? আমি অনেক অল্প বয়সেই জন্ম ও মৃত্যু’র কেমিসট্রি’টা বুঝে গেছি ! এটাও দেখেছি মৃত্যু’র আবির্ভাব ঘটেছে খুব সহজসত্য ভাবেই মাতৃ জঠরের ভেতর নিঃশব্দে ! আবার এও দেখেছি , কথা বলতে বলতে একজন মানুষ আমার চোখের সামনে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পরলো , ….. প্রচুর চেনা অচেনা মৃত্যু আমি খুব সামনে থেকে দেখেছি , তাই হয়তো এর প্রতিফলন ঘটেছে আমার ওই সব কবিতায় ! এর বেশি কিছু আমি বলতে পারবো না ৷ ( মৃদু হেসে )
ইউকে বিডি টিভিঃ যাই হোক বিদ্যুৎ বাবু আপনার অনুমতি নিয়ে আপনার’- র কয়েকটি কবিতা দুই বাংলার পাঠকদের জন্য এখানে তুলে ধরছি …..
কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক এর সাম্প্রতিক কয়েকটি কবিতা পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো
________________________________
স্বপ্নদ্বীপ এবং অন্যান্য নিরীহ শব্দেরা
🖋️
যেটুকু বাকি ছিল
তার সবটা দিয়ে সময়লগ্নের তিথিক্ষণে মৃত্যু ঠেকানো কবচ গড়লাম ; তবু সে অপঘাতে অকস্মাৎ মরলো ! ছেলেটা যাদের জ্বালায় মনে মনে এতকাল জ্বলছিল ; সেই সব বকে যাওয়া অসভ্য ঘৃণ্য ছেলে গুলোর অন্যায় – অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে মৃত্যু নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো চির দিনের জন্য !
দেখে নিও সময় ওদের ক্ষমা করবে না , …..
এখন শহরের সব রাস্তায় চিরকালের অসুখ ; এখানে নির্বোধ হয়ে ঘুরছে স্বপ্নদ্বীপের মৃত্যু নিয়ে আলোচনা , …..
অন্য দিকে ব্যাথা নিংড়ানো মন নিয়ে আসে-পাশের রাস্তায় কেউ – কেউ ওই সব কুচক্রি বর্বর হিংস্র অকর্মণ্য জানোয়ারদের ভয়ে ভেতরে ভেতরে নিঃশব্দ নিরবতা নিয়ে চুপ করে ছিল ! এটাই ঘটে যাওয়া বহতা সময়ের করুণ পরিণতি ; সেই কারণে প্রতিবাদ – সভা – সমাবেশ দিন কেটে যাচ্ছে সংবাদে সংবাদে এভাবে চিরাচরিতের মত ! অন্যদিকে দল বাঁচানোর কৃত কৌশল পরিপাটি উক্তি কিম্বা তর্ক-বিতর্ক টিভিতে টিভিতে ; এরই মধ্যে নানান বিজ্ঞাপন রিরোতি ! কী এক দুর্বোধ্য স্বপ্নের মত লাগছিলো স্বপ্নদ্বীপের মৃত্যুটা ;
যাদের কারণে ছেলেটা অকালে শেষ হয়ে গেল সেই সব খুনি ইপ্টেজারদের জন্য অগুন্তি ছি ছি কিম্বা নতুন আবিষ্কৃত খিস্তি-টিস্তি পরিপটি ভব্যতায় দিয়েছি কত – শত বার ; প্রকাশ্যে নয়তো মনে মনে ! স্বপ্নদ্বীপের নির্মোহ মাখা গাঢ় নিঃসঙ্গ ছায়া-ছায়া অস্পষ্ট কায়া অস্ফুটে বলতে চেয়েছে “আমাকে মেরোনা , আমি বাঁচতে চাই , আমাকে বন্ধুরা বাঁচতে দাও ! যারা ছেলেটাকে মারলো ; এদের জন্য বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে কেঁদেই চলেছে অহর্নিশ ,…. ভেতর থেকে নির্জন রাতের অন্ধকারে সভ্য-ভদ্র সেজে থাকা ছদ্মবেশী বর্বর জানোয়ার গুলো মাথা উঁচু করে প্রকাশ্যে ঘুরছে ফিরছে হাসছে নির্ভয়ে কথা বলছে বিদ্যাস্তম্ভের চাতালে !
চিত্রপট এভাবেই বদলে যায় , গেছে সময়ে ; বিচ্ছিরি স্বপ্ন নিয়ে মজে আছে এ দেশের প্রতিটা ঘর – বাড়ি এবং অন্য কোনো অন্তরের অন্তঃস্থল ! তবু উদ্ভিন্ন চোখের ভাষায় ভালোবাসা মাখা মন আমার মতো প্রতিবাদি বোকাকে নরকে পাঠায় !
শেষবার এই রাজপথে
গত জন্মের আয়না ভাঙার শব্দ পেয়েছিল স্বপ্নদ্বীপ ! ওর মৃত চোখ দুটো নিষ্পলক ছিল অনেকটা সময় ধরে , সেখানে মৃদু কান্নার চাপা আওয়াজ কেউ শুনতে পায়নি ; শোনার চেষ্টাও করেনি !
🖋️
___________________________________মিছিলে শয়তান ভদ্র সেজেছে
🖋️
পরিবর্তিত ঘটনাগুলো স্বপ্নে ঘোড়া ছুটিয়ে মাত্রাবৃত্তে বিদেহী পরিজনের ছবির কাছে এসে দাঁড়াতেই ; দ্বিতীয় অপুষ্টিজাত স্মৃতি অস্তিত্বকে দ্বিচারিতা হতে নিশেধ করতেই ভাষা বিপ্লবের পাঞ্জিকায় ছেঁকা লাগলো !
পৃথিবীর মানুষেরা দর্পণের কাছে যুগে যুগে ক্ষুণ্ণ হতে দেখে গেছে , সে জন্য পাঠশালায় নাগরিক সভার প্রস্তুতি চলছে উদ্বাস্তুদের নিয়ে !
অকস্মাৎ উচ্চারণ হল পিছিয়ে থাকা রূপকথার প্রাচীন নির্দিষ্ট সময়ের ধ্বনি ,—–
ভেতর থেকে সেক্যুলারিজম গন্ধ মিছিলের মধ্যে বাতলে দিল দঙ্গল থেকে অমানুষগুলোকে বুদ্ধিজীবিদের মতোই দেখাচ্ছে !
এই এক স্বপ্ন ধর্মহীনতার জন্ম দিয়েছে ; তাই বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে চতুর্দিকের নক্ষত্রগুলো ! প্রাণহীন ছায়া ভাসছে রাতের ভেতর ,—– এভাবেই গোপনে পুড়ছে অন্তর ; এভাবেই আদর্শ রাস্তা পার হচ্ছে বিধাতার ঠেলা খেয়ে !
এটাও এক অচেনা মানুষের কঙ্কাল , গভীরে প্রখর বাস্তরের বিষময় দশা ! তবুও মিছিলের ওপাশে গরু ও শুয়োরের বৃত্তান্ত নিয়ে লড়ছে ধার্মীক লোকজন …..
যতোই তোরা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ বলিশ ; দেখে নিশ তোদের মুখোশ একদিন খুলবেই ৷
যে বা যারা ঈশ্বর এবং আল্লাকে নির্মাণ করেছে তাঁদেরকে সময় ঠিক খুঁজে বার করে নেবে !
অন্য দরজায় শয়তান এসে দাঁড়ালে অনুমানের ফর্দ ঝাপসা হয়ে যায় ! এটাও আমাদের অস্তিত্বের সংকট ; তা না হলে বিভিষণপ্রথম দল পালটানোর সাহস পায় !
মাঝেমধ্যে মোমবাতির নিচে অন্ধকার স্পষ্ট হয়ে ওঠে , তাই জ্যোৎস্না পেতে দিয়েছি প্রাচীন বৃক্ষের নিচে ,—– কেউ একজন মনস্তত্ত্ব নিয়ে সাধারণ মানুষগুলোকে ঠকাচ্ছে সমষ্টির সমর্থন চরিতার্থ করার জন্য !
এভাবেই চলছে দুনিয়া ; যা কিছু পালটেছে সবটাই নড়বড়ে ঘড়ির কাঁটা ! এটাই নাকি ঐতিহাসিক বিপ্লব !!
__________________________________
পোশাক ছেড়েছি নগ্ন হইনি
🖋️
আস্তিন থেকে মুখ বারিয়ে দিল ছবির শহর ; স্বীকার্য মধ্যভাগে প্রাণ সামলে স্বাগত শব্দ কিছু ঝাপসা খোলা বেমালুম সরস্বত ! অতিরিক্ত ঝিম মেরে কৈশোর এভাবেই বিলাসি পদ্যের ভেতর অবিচল শূন্যতা আঁকে ,—- তবুও পাংশুটে এক রাস্তায় মধ্যরাতে একা একা বৃষ্টিতে ভিজতে – ভিজতে একটা লোম ওঠা কুকুর পদবিহীন সারমেত্ত নাবালীকার যোনীর জায়গা জিভ দিয়ে চাটে !
আলো গুলো জ্বলছে সারারাতের বৃষ্টির ভেতর ,—- স্বজনহীন কালো রাত বৃষ্টি নিয়েই নির্ঘুম একক এভাবেই ! কোথাকার মন থেকে রাতবেস্যারা কটুবাক্যে নিজেরাই পর্দা সরিয়ে দিয়ে অচেনা দরজা খুলে দেয় অলৌকিক রাতসঙ্গীর কাছে ,— আত্মগর্বে বুদ্ধিজীবী পোকা-মাকোড়েরা এই রাস্তাতে দিন হলে মিছিল করে ; তবু অন্য প্রশ্ন আঁকে বেহায়া প্রজাপতির দল !
সর্দার পাড়ার কিছু মেয়ামানুষ রাতের শহরকে দেখায় পেটের মধ্যে থাকা অদেখা ভুবন !
এভাবে প্রায় দিনই এই রাস্তায় আমি চলি অনেক অসুখ বুকে নিয়ে ; তবু হাইওয়ের মাঝ বরাবর দিয়ে কোনো এক অচেনা মদ্যপ ঈশ্বর অসাবধানে হেটে হেটে রাস্তা পাড় করে !
এই কটা দিন দেওয়ালের রাজনৈতিক স্লোগান গুলো বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে বর্ণমালা হরায় !
যদিও এই সর্বনাশ ঘুরে ফিরে নিরবে নিভৃতে কাঁদে বিবেক পাড়ায় ,—– শয়তান শৃঙ্খলে বাঁধা শহরের আইন ; প্রতিরাতে এই বৃষ্টির ভেতর স্বপ্নে স্বপ্নে ঘুম বিক্রি করে অন্যমনা চাঁদ ! কথা হারিয়ে ওই লোকটা স্মৃতির ভেতর মনে মনে সোহাগচিহ্ন মুছে দেয় দর্পণে সূর্যদয় হলে ,—- স্বভবতই এমনই বিরামহীন ছায়াচিত্র ; ওধারের শূন্যতাকে চ্যালেঞ্জ ঠুকে নিদারুণ ধারাভাস্যে বলে , পোশাক ছেড়েছি কিন্তু নগ্ন হইনি !!
🖋️
—————————————————————————
আকাশলীনা তোর জন্য
🖋️
যতোই আমায় বৃষ্টি বাদল স্বপ্নে এসে দেখা ; তোর মত মিথ্যা বলতে পারবো না ,—- তিন সত্যি ! দিব্বি কাটছি !
এই ভাবে ঠিক মনের মধ্যে প্রতি মূহুর্ত আঁকতে আঁকতে লাবণ্যরেখা ; এরপরেতে মেঘের দেহে হঠাৎ করে আচম্বিতে আগুন জ্বলে ওঠে , নতুন কেনা আয়না দিয়ে অঝর ধারায় শ্রাবণ নামে ছন্দ না মেনে ! ঠিক এভাবেই সে–ই আগের মতই দলবেঁধে বৃষ্টিরা সব একই সাথে নেমে আসে ভুবনডাঙায় ভরদুপুরে !
শেষ সন্ধ্যায় চাঁদের আলো কী ভাসমান অসাবধানী ; তবুও যেন ভালো লাগা , মন্দ লাগা যাইনি ভোলা !
দুই হাতেতে হঠাৎ পাওয়া বৃষ্টি আদোর ; হৃদয়পাড়ে যত্ন করে রাখাই ছিল সাতটা বছর ! এটা আমার সর্বকালিন সত্যি কথা ; তবুও আমি বুক বাজিয়ে বলতে পারি ,— তোর মত একটাও মিথ্যা বলতে পারবো না !
অন্ধকারকে বনের পথে খুঁজতে গিয়ে আকাশ আমায় হাত বারিয়ে দু চার মুঠো হীরের মতন জ্বল জ্বলে কত তারা !
এই যে আমার মনের মধ্যে সমুদ্র এসে সতত ঢেউ তোলে ; তবুও যেন তুমিশূন্য তুমিশূন্য এই বিছানা ,—- অবিবেচক প্রতিটা রাতে !
যদিও আমার স্বপ্ন থেকে নতুন একটা আকাশ ডাকে ; রূপকথারা সেই হরিণীর পেছন ছোটে মৃগনাভীর ব্যাকুলতায় !
হঠাৎ করেই অন্য একটা সময় এসে হাজির হলো ! এই তো আমার ঠোটের মধ্যে তোর আঁকা সেই প্রথম চুমু ; অটুট তবু স্মৃতিনির্জন ,—– তবু কেন এই এতক্ষণ তোরই জন্য অতল জুড়ে বৃষ্টি ভেজা সকাল – দুপুর – সারারাত্রি !
অন্য একটা দিনের মধ্যে সে–ই তোকে তাই গুছিয়ে রাখি ; স্বভাবদোষে !
বাতাসপরীর ডানার ঝাপট স্বপ্নে স্বপ্নে স্মৃতিনির্ভর ; অথচ কেন ভেতর থেকে ভুলতে চেয়েও যায়না ভোলা তোর দেওয়া সেই সর্তগুলো ! বহু দিনের কষ্টরা সব মিথ্যা মিথ্যা দগ্ধে মারে অতলান্ত ,—- শেষ পর্যন্ত এ’মন থেকে এতকালের বৃষ্টিগুলো বের করে দেই ; অথচ আমি অনেক চেষ্টায় না পারি যে তোকে ভুলতে , সত্যি বলছি আকাশলীনা !! তিন সত্যি , দিব্বি কাটলাম ……. !
🖋️
_________________________________
ছোবল
🖋️
এই অঘ্রাণেও বেঁচে থাকবে অগণ্য সরীসৃপ , শীত ও প্রেত চিরহরিৎ বৃক্ষের অতলান্ত নীচে রাত্রির শিশিরের মত প্রতাঘ্ন বিষ গভীরতর দাঁতের দংশনে – পীড়নে সর্বঘ্ন জ্বালায় — এবং স্তব্ধ নির্জন ! এই অঘ্রাণে জানলা ভাঙে ঔষধি রাতের যৌনভূক চাঁদ ; চোখের তলানি ছেঁচে অবিরাম চুম্বনে অনন্ত অতীব সঙ্গম ,—–
এই মেয়েলি বয়স গর্ভের অনন্ত অতলান্ত কালহরণে তুষ্ট !
অন্য এক শীতল প্রহর , শেষে ও রাতের পরম আদরে মৃত নখের বিনম্র আঁচোড় —- এটাও অতিরিক্ত তীব্র হলাহলে আদীম বিলাসিতা যেন ৷
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভেঙে রাত ডুবে গেছে ,—- কঠিনতম শোকে ঘুমিয়ে অতি প্রাচীন পরজন্মের দেহের অসুখ – বিসুখ ভেতরের বস্ত্রহীন নগ্ন আবেগ নিঃশব্দে ও ভয়ে চোখে রাখে প্রহরশূন্য শীতল চিবুক !
এখন অঘ্রাণ ; ফুলের পরাগ মেখে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে — আমার বিপরীতে , কোথাকার চেনা রাতে মৃত্যু এসে উলঙ্গ হয়ে লুকিয়ে ছিল উষ্ণ চাদরে ……
এভাবে গরল জমে শরীরী স্মৃতিতে ; স্বপ্নহীন অথচ নির্ঘুম আঁধার ডুবে মরে স্বপ্নে ও ধ্যানে !
সে কি নারী ? মূর্তিমতী অভাগী ঈশ্বরী ; সে কী ছায়া অথবা অতীব অলীক কল্পনা ?
যাবতীয় অনিয়মে ভীষণ সর্বনাশী ? নিঃসঙ্গ নীরব , —-
ভয় হয় এই বিষ যদি আমাকে অহর্নিশ দংশায় !
বুকময় আগুন সাজিয়ে রাখি রাত ভোর ,—– মধ্যরাতে দরজায় আঘাত ; ক্রমাগত অনন্ত ছোবল !! প্রাণেতে বিষঢালা ঈর্ষার আচোড় !
🖋️
_________________________
একমাত্র এই তুমিটার জন্য
🖋️
কিছু কী ফেলে আসতে হল ; মন ভর্তী অকেজো সংসার , হয়তো দূরের শহরের জনারণ্যের ভেতর এই তুমিটার একাকিত্ব ! শেষ ট্রেনটা দূ–রে চলে যেতে যেতে বিচ্ছেদের জ্বালায় পুড়ে ওঠে মন ; অন্য এক স্বপ্নের কথা স্মৃতির মধ্যে আজও অবসরে ভীষণ দারিদ্র !
কিছুটা দৃশ্যের ভেতর বাতাসে তোলে ঢেউ ; অচেনা সময় চোখের সামনে মেলে ধরে সন্ধিপত্র ,—– বাইরের আকাশে ভরে ওঠে প্রত্যন্ত জীবন ! সেখানে হাওয়ায় হাওয়ায় উড়ে যায় প্রথাগত শ্বাস – প্রশ্বাস ! অথচ এভাবেই উল্টো দর্পণে কারও কারও যান্ত্রিক ভাবে বেঁচে থাকার নির্জন বসবাস হয় !
বৃত্তের বাইরে থেকে কেউ দেখতে পেয়েছে ; পুরোনো শহরের জীবন ,——
অন্য রকম ছদ্মবেশ নিয়ে কেউ কেউ অমাইক হেসে ওঠে ; অন্য কোন বুকের ভেতর !
এই তুমিটা একই পুড়ছিল নিভৃতে ; চোখের সামনে আপাতত আজীবনের দুঃখগুলো এভাবেই কোল পেতে বসে ছিল দুঃখভরাতুর !
এই তুমিতে পেরিয়ে এলো সারা বছর জুড়ে লেখা কবিতার পঙক্তি ও স্তবক ; দিনরাতের দীর্ঘ ইতিহাস ব্যক্তিগত ভাবে দরজার ওপাশে অনুভবজাত , তবুও বিষাদ হয়ে সত্যের পথে বৃষ্টির মতন ঝরে যায় চোখের জল !
আমিতো এভাবেই
বাঁকচোরা রাস্তার পাশে একা একা দাঁড়িয়ে সেই তুমিটাকে খুঁজছিলাম ;
তুমি তখন একলা একলা পুড়ছিলে শমশানে , —– তবু জটিল নিভৃতে কাঁদে অন্য এক আমি ; ভেতরে ভেতরে দিগ্বিদিক ভেসে যায় ! একা সেই অন্তর্গত পথে ট্রেনটা স্টেশন ছাড়িয়ে কোথায় মিলিয়ে যায় ; এরই মাঝে অন্তঃস্থলে প্রতিধ্বনি শুনি রাত শেষ হতে হতে !!
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন ডঃ ইব্রাহীম ইসলাম
🖋️ স-মা-প্ত 🖋️