

স্টাফ রিপোর্টার, নওগাঁ: বরেন্দ্র কন্যা নিয়ামতপুরের ভাবিচা এখন পাখি গ্রামে পরিচিতি লাভ করেছে। দিন দিন এর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ছে বরেন্দ্র অঞ্চলের সর্বত্রই।
পাখিপ্রেমী পর্যটকরা ছুটে আসছেন এই গ্রামে। ভাবিচা গ্রামের প্রতিটি গাছই এখন পাখিদের দখলে। এ যেন পাখির অঘোষিত অভয়ারণ্য। ওই গ্রামের মানুষের ভোরবেলা এখন পাখির মিষ্টি কলতানে ঘুম ভাঙে প্রতিদিন জানান গ্রামবাসীরা।
নিয়ামতপুর উপজেলা সদর থেকে দুই কিলোমিটার পূর্বে নিয়ামতপুর-মান্দা সড়কের ধারে ভাবিচা গ্রাম। গ্রামের সীমানায় প্রবেশ করে উঁচু উঁচু গাছের দিকে নজর বোলালেই চোখে পড়বে সবুজ পাতার ওপর পাখা গুটিয়ে বসে আছে সাদা-কালো রঙের বাহারি পাখি। দেখে মনে হবে, যেন সাদা ফুল ফুটেছে গাছে। বাতাসের দোলায় তাদের পাখা ঝাপটানো মোহনীয় এক তাল তৈরি করে।
গ্রামের প্রায় প্রতিটি গাছেই এমন পাখির ঝাঁক। কেউ উড়াল দিচ্ছে, কেউ পাখা মেলে রোদ পোহাচ্ছে, কেই ডিমে তা দিচ্ছে। আবার কেউবা পাখা ঝাপটিয়ে ঝগড়া করছে একে অপরের সাথে। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির এমন সব কর্মকাণ্ড দেখে মনে হবে এ এক পাখিরাজ্য।
দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সারা বছর এ গ্রামে এখন পাখিদের আসা-যাওয়া। গ্রামের কেউ পাখিদের বিরক্ত করে না। তাই দূরদেশ থেকে আসে অতিথি পাখিও। জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি সময়ে শামুকখৈল পাখির আগমন ঘটে এবং অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে আবার চলে যায় তারা।
সম্প্রতি স্থানীয় উদ্যোগে ‘পাখি শিকার মুক্ত এলাকা’ হিসেবে গ্রামটিকে ঘোষণা করা হয়েছে। গ্রামেই গড়ে তোলা হয়েছে পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থলের ব্যবস্থা। পাখিদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন গ্রামের সবাই। পাখি শিকার রোধে তারা যথেষ্ট সচেতন ও সজাগ সবসময়।
গ্রামবাসীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ৫ বছর থেকে এই গ্রামে শামুকখৈল প্রজাতির হাজার হাজার পাখির যাওয়া আসা। বছরের ৫/৬ মাস তারা অবস্থান করে এই গ্রামে। মূলত এ সময়টা তাদের প্রজননের সময়। এই সময়ে এখানে তারা ডিম পেড়ে বাচ্চা ফোটায়, বড় করে। প্রজননের এ মৌসুমে শামুকখৈল ও বক পাখি দেখতে বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে এখন ভাবিচা গ্রামে।
ভাবিচা গ্রামের তরুণ প্রজন্মের উদ্যোক্তা সবুজ সরকার বলেন, অতিথি পাখির আগমন গ্রামের জন্য আশীর্বাদ মনে করেন তারা। তাই পাখিদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গ্রামে একটি টিম গঠন করা হয়েছে। যাতে বাহির থেকে কেউ এসে এই অতিথি পাখি শিকার করতে না পারে। পাখিদের মলত্যাগে কিছুটা বিপত্তি ঘটলেও তা স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিয়েছেন তারা।
তিনি আরও বলেন, শামুকখৈল সাধারণত এখানে প্রজননের জন্য আসে। এরপর বাচ্চা বড় হলে বাচ্চা নিয়ে তাদের গন্তব্যে আবার চলে যায়।
তার দাবী, সরকারিভাবে গ্রামটিকে পাখিগ্রাম ঘোষণা করে পাখিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। পাশাপাশি অভয়ারণ্য ঘোষণা করে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা হোক এই গ্রামে। ভাবিচা হয়ে উঠুক বরেন্দ্র অঞ্চলের একমাত্র পাখিগ্রাম।
গ্রামের আরেক পাখিপ্রেমী গোবিন্দ ‘টি’ স্টলের সত্ত্বাধিকারী গোবিন্দ প্রামাণিক বলেন, অনেকেই তার স্টলে বসে পাখি শিকারের মনোবাসনা ব্যক্ত করে, তিনি তাদের নিরুৎসাহিত করেন। তার মতে, সরকারি উদ্যোগে ‘পাখি শিকার করবেন না, পাখি মারবেন না’, ‘পাখিরাও আমাদের মতো বাঁচতে চায়, পাখি আমাদের পরম বন্ধু, তাদের আগলে রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে’ প্রচারে উপজেলা প্রশাসন এমন কিছু লিখে গ্রামের প্রবেশ পথ সড়কের ধারে, ভিতরে ও বাজারে টাঙানো হলে অনেকেই পাখিদের শিকার বা বিরক্ত করতে ভয় পাবেন। তবেই ভাবিচা গ্রাম পাখিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়া মারীয়া পেরেরা বলেন, আমি ভাবিচা গ্রামের পাখিদের অভয়ারণ্য পরিদর্শন করে মুগ্ধ হয়েছি। সবুজ প্রকৃতির বুকে সুশোভিত বৃক্ষের ডালে ডালে পাখিগুলোর দ্বিধাহীন অবাধ বিচরণ এক আনন্দঘন মনোমুগ্ধ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। পাখিগুলোর আগমনে এলাকাবাসীও অত্যন্ত খুশি।
তিনি স্থানটিকে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তুলতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে প্রয়োজনীয় কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানান।