

ডেঙ্গুজ্বর শুধুমাত্র জ্বর ভেবে অবহেলা করা ঠিক নয়। প্রাথমিক লক্ষণ একই রকম হওয়ায় অনেকে সাধারণ জ্বর ভেবে ভুল করেন। পরে মারাত্মক আকার ধারণ করে। ডেঙ্গু ভাইরাস চার প্রকার। তবে যারা আগে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের পরে এ রোগ দেখা দিলে প্রাণঘাতী হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
লক্ষণ : ৩ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ভাইরাস বহনকারী এডিস মশার কামড়ে যে কারো ডেঙ্গুজ্বর হতে পারে। জ্বর ১০২-১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে। মাথাব্যথা, বমি, চোখের পেছনে ব্যথা, চামড়ায় লালচে র্যাশ, শরীরে শীতল অনুভূত হওয়া, ক্ষুধা কমে যাওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, স্বাদের পরিবর্তন, হৃদস্পন্দনের হার ও রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং পেশিতে ও গাঁটে ব্যথা হতে পারে।
ডেঙ্গু রোগের ধরন : সাধারণত দুধরনের ডেঙ্গুজ্বর হয়Ñ ক্ল্যাসিকাল ও হেমোরেজিক। ক্ল্যাসিকালে জ্বর সাধারণত ২ থেকে ৭ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। বিপদ ঘটে হেমোরেজিকের ক্ষেত্রে। এ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থা ৫ থেকে ৭ দিন পর মারাত্মক সংকটাপন্ন হতে পারে। হেমোরেজিকের ক্ষেত্রে রোগীর রক্তপাত হয়, রক্তে অনুচক্রিকার মাত্রা কমে যায় এবং রক্ত প্লাজমা কমে যায়। কিছু ক্ষেত্রে আবার দেখা দেয় ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। এতে রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমে যায়। কিছু সময় আক্রান্ত ব্যক্তির মুখ, দাঁতের মাড়ি ও নাক থেকে রক্তপাত ঘটে। মলের সঙ্গেও মাঝে মধ্যে রক্ত বের হতে পারে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত নারীর ক্ষেত্রে পিরিয়ডের সময়ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। কারও কারও রক্তের প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকা কমে গিয়ে শরীরের চামড়ার নিচে ইন্টারনাল ব্লিডিং হয়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যখন রোগীর হাত-পা দ্রুত ঠাণ্ডা হওয়া শুরু করে এবং রক্তচাপ কমে যায়। আক্রান্ত ব্যক্তি এই সময় মাত্রাতিরিক্ত ঘামা শুরু করে। এতে তার মধ্যে এক ধরনের ছটফটানি শুরু হয়। কেউ কেউ বমি করে বা তাদের বমিভাব হয়। এ সময়ে কোনো কোনো রোগীর হোয়াইট ব্লাড সেল স্বল্পতা, ইলেক্ট্রোলাইটের অসমতা, লিভারে সমস্যা অথবা ব্রেইনে রক্তক্ষরণ হয়। এতে তাদের শকে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমনকি রোগীর মৃত্যুও হতে পারে।
যারা ঝুঁকিতে : সাধারণত বেশি ঝুঁকিতে থাকেন ১ বছরের কম ও ৬৫ বছরের ওপরে যাদের বয়স। এছাড়া গর্ভবতী নারী, যাদের ওজন বেশি, যারা ডায়াবেটিসে ভুগছেন, যাদের উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা আছে, যারা হার্টের সমস্যায় আক্রান্ত, যাদের নিয়মিত ডায়ালাইসিস করতে হয়, তাদের ডেঙ্গু সংক্রমণের শুরু থেকেই হাসপাতালে থাকার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা।
যখন হাসপাতালে যাবেন : রোগী যদি হঠাৎ প্রচণ্ড দুর্বল হয়, মানসিকভাবে অস্থিতিশীল হয়ে পড়েন, অস্থির বা অচেতন হয়, দ্রুতই হাসপাতালে নিতে হবে। এছাড়া খিঁচুনি, পানিশূন্যতা, শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা, চোখের সাদা অংশ হলুদাভ, ক্ষুধামান্দ্য, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, সঠিকভাবে প্রস্রাব করতে না পারা অর্থাৎ প্রস্রাব আটকে যাচ্ছে বলে মনে হওয়া বা অল্প অল্প করে বারবার প্রস্রাব হওয়া কিংবা দেহের যে কোনো জায়গা থেকে রক্তপাতের কোনো চিহ্ন দেখা গেলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
চিকিৎসা : ডেঙ্গুজ্বরের শুরুতেই প্রথম ৫ দিনের মধ্যে ডেঙ্গু ঘঝ১ টেস্টটি করিয়ে নিন। একইসঙ্গে করাবেন ঈইঈ, ঝএচঞ, ঝএঙঞ টেস্ট। জ্বর কমাতে শুধু প্যারাসিটামল ওষুধ সেবন বা ব্যবহার করতে পারেন। ওষুধ সেবন বা মাত্রা নির্ভর করে জ্বরের মাত্রার ওপর নির্ভর। এক্ষেত্রে অ্যাসপিরিন অথবা ব্যথানাশক এনএসএআইডি গ্রুপের ওষুধ ব্যবহার করা যাবে না। জ্বর কমাতে গরম পানিতে কাপড় ভিজিয়ে শরীর মুছতে পারেন। গোসলও কার্যকরী। ডেঙ্গু রোগীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া জরুরি। লক্ষণ দেখা দেওয়ার ৭-১০ দিন পর্যন্ত ভারী কাজ বা মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম করা যাবে না। স্বাভাবিক হাঁটাচলা বা দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যেতে হবে। এ সময় বাসার বাইরে না যাওয়া ভালো।
লেখক : জনস্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক, খাজা বদরুদদোজা মডার্ন হাসপাতাল সফিপুর, কালিয়াকৈর, গাজীপুর। ০১৭১১৩৬০৯০৭