

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয়ার পর থেকে বাংলাদেশ ছিলো একটি গরীব দেশ হিসেবে বিশ্বের কাছে স্বীকৃত। ’৭১ সালের পর থেকে বেশ কয়েকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো, এ নিয়ে কোন দেশেরই মাথা ব্যথা দেখিনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবদ্দশায় এই বাংলাদেশের গরীবানা দূর করতে গিয়ে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। বাংলাদেশের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার লক্ষ্যে ’সবুজ বিপ্লব’ কর্মসূচী শুরু করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্যে ছিলো দেশের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে এবং দেশ থেকে দারিদ্রতা দূর করতে হলে জনগণকে প্রথমেই ভাত এবং পরিধানের জন্য কাপড়ের ব্যবস্থা করতে হবে এবং সে লক্ষ্যেই তিনি সবুজ বিপ্লব বাস্তবায়নের জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ নেন। তিনি বলেছিলেন, দেশের এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদী থাকবেনা। যার যতটুকু জায়গা আছে তাতে যেন ফসল, শাকশব্জি ফলিয়ে দেশকে খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ করা হয়। সে লক্ষ্যে ব্যাংক থেকে কৃষকদের সহজ শর্তে লোন এবং সরকার থেকে বিনামূল্যে সার, বীজ ইত্যাদি সরবরাহের ব্যবস্থা করার পদক্ষেপ নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন।
স্বাধীনতা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বঙ্গবন্ধুর এই পদক্ষেপকে মেনে নিতে পারেনি। তাই তারা বিভিন্ন ভাবে এই সবুজ বিপ্লবের মাষ্টার প্ল্যান যাতে বাস্তবায়িত করতে না পারেন সে জন্য তারা এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অজুহাত তুলে দেশে প্রোপাগান্ড ছড়াতে থাকে। বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন দেশ থেকে সাহায্য এনে একটি সদ্য স্বাধীন দেশকে আত্মনির্ভরশীল একটি রাষ্ট্রে পরিণত করার আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। সেই সময় থেকেই দেশটি যখন সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরণের পদক্ষেপ নিতে বঙ্গবন্ধু কাজ শুরু করে দেন, তখন স্বাধীনতা বিরোধীরা তা মেনে নিতে পারে নি। তাই ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট তারা বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করে মনে করেছিলো তারা বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা শেষ করে দিয়েছে! তারা তখন বুঝতে পারেনি বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা এখনও দুনিয়ার বুকে বেঁচে রয়েছেন। এই শেখ হাসিনাই যে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া দেশকে ’সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্ল বাস্তবায়ন করে, দেশ থেকে দারিদ্রতা দূর করে বঙ্গবন্ধু এবং ১৮ কোটি মানুষের স্বপ্ন পূরণ করতে সক্ষম হবেন তা এই দেশদ্রোহীরা বুঝতে পারেনি।
আজ যখন আমাদের স্বাধীন সার্বভোম রাষ্ট্র বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সুদক্ষ নেতৃত্বে দেশ থেকে ধীরে ধীরে দুর হচ্ছে দারিদ্রতা, দেশে রাস্তাঘাট নির্মাণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করে দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটতে শুরু করেছে। চট্টগ্রামে ’বঙ্গবন্ধু টানেল’ চালু হওয়ার পথে, ঢাকায় মেট্রোরেলের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নীত হতে যাচ্ছে তখনই আমেরিকা, রাশিযা, চীন, জার্মানী এমনকি সৌদী আরব, ইরান সহ বিশ্বের মাতব্বর এবং ধনী দেশগুলোর মাথা চক্কর দিতে শুরু করেছে। যারা একদিন আমাদের গরীব এবং মিসকিন বলতো তারাই আজকের বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে যে কোন ধরণের সাহায্য প্রদানের লক্ষ্যে এগিয়ে আসছে।সব দেশই বাংলাদেশের সাথে ব্যবসা বাণিজ্য, কল-কারখানা গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়ে ওঠেছে। তারা বুঝতে পেরেছে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগই একমাত্র দল, যে দলের মধ্যে রয়েছে একটি সুদক্ষ নেতৃত্ব, এ দেশের ভবিষ্যৎ উজ্বল। সুতরাং আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হয় তা নিয়ে কথাবার্তা বলতে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত নেতৃবৃন্দের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠেছে বাংলাদেশ। এসব নেতৃবৃন্দ আওয়ামী লীগ ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথেও নির্বাচন নিয়ে আলাপ আলোচনা করছেন এবং অন্যান্য দলগুলোকেও বলছেন দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতে।
একমাত্র বিএনপি-জামায়াত বলছে, এই সরকারের অধীনে তারা নির্বাচনে যাবে না। তারা চায় এই সরকারের পদত্যাগ। বিএনপি ভালো করেই জানে যে, নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করলে তারা জয়ী হতে পারবে না, কারণ গত ১৪ বছর যাবত তারা দেশের জনগণ থেকে বিতাড়িত। সুতরাং আগামী নির্বাচন যাতে বানচাল করা যায়, সে লক্ষ্যেই তারা কাজ করে যাচ্ছে দেশী এবং বিদেশী যড়যন্ত্রকারীদের নিয়ে। সুতরাং এব্যাপারে সরকারকে হুঁশিয়ার থাকতে হবে।
বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যেও রয়েছে বিরাট প্রতিযোগিতা। আমেরিকা বাংলাদেশের প্রতি তাদের অতীতের গ্লানি মুছে ফেলার লক্ষ্যে বাংলাদেশের সাথে একটি ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়ে ওঠেছে। বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের গত ৫০ বছরে ব্যবসা বাণিজ্য সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠেছে তাকে আরও শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে আগ্রহী তারা। গত ১১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রধান মুখপাত্র মাথিউ মিলার বলেছেন, বাংলাদেশে আমরা কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করিনা, আমরা একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সমর্থন করি। স্টেট ডিপার্টমেন্টের (১০ জুলাই) নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিষয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। বাংলাদেশের নির্বাচনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে রাশিয়া, চীন ও ইরানের সমালোচনা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার বার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তার নিজের অঙ্গীকারের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাস্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫০ বছরের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। আমরা কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করিনা। আমরা একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সমর্থন করি। (খবর ইউকেবিডিটিভি)
অন্যদিকে চীন, জাপানও বাংলাদেশের সাথে ব্যবসা বাণিজ্য সহ বিভিন্ন ধরণের সহযোগিতা দানে আগ্রহী। ইতিমধ্যে চীন এবং জাপান বাংলাদেশের রাস্তাঘাট, ব্রীজ নির্মাণ ইত্যাদি নির্মাণে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে।
একটি অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত খবরের কিছু অংশ এখানে তুলে ধরলাম, ”ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা এই পাঁচ দেশের অর্থনৈতিক জোট ’ব্রিকসে’র শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পেয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগষ্ট মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেন্সবার্গে অনুষ্ঠেয় ৫ জোটের সম্মেলনে পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ সহ ৮টি দেশকে এই সম্মেলনে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালায় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ ফারুক খান বলেন, ব্রিকস আমাদের অবজারভার হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আরও ৭টি দেশকেও তারা আমন্ত্রণ করেছে। সম্মেলনে ব্রিকসে জয়েন করার আমন্ত্রণ জানালে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। আমি মনে করি যোগ দেয়া উচিত। কারণ, এটি দিন দিন বড় ও কার্য্যকর অর্থনৈতিক সংস্থা হয়ে উঠছে।” আমার মনে হয়, এই পদক্ষেপ আমেরিকার জন্য এক হুমকি তাই আমেরিকা কিছুতেই তা মেনে নেবে না।
ইউকে বিডিটিভ অনলাইনে আরেকটি খবরের কিছু অংশ তুলে ধরছি। ”কুটনীতির ’হটস্পটে’ পরিণত হয়েছে ঢাকা। বিশেষ করে বাংলাদেশের নির্বাচন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শ্রম অধিকার সহ নানা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন-রাশিয়ার পাল্টাপাল্টি বিবৃতির মধ্যে মুখ খুলেছে ইরানও। সঙ্গে যুক্ত আছে ইইউ সহ আরো কয়েকটি দেশ। সব মিলিয়ে কুটনীতিক তৎপরতায় মুখর ঢাকার দিকেই সবার নজর। তবে এ তৎপরতাকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখে দেশের স্বার্থ বজায় রাখার কূটনীতিতে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এটা চাপ সৃষ্টি করার জন্য নয় বরং এসব সফর ভু-রাজনৈতিক ও ভু-অর্থনীতির অংশ।”
উপরের খবরের অংশগুলো বিশ্লেষণ করলে সহজেই বুঝা যায় যে, বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন-রাশিয়া সব সময়ই তারা একে অপরের শত্রু। তারা দুটি আলাদা বলয়ে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ বর্তমানে এমন একটি অবস্থানে পৌঁছেছে যে, সবাই এ দেশের সঙ্গে যে ভাবেই হোক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। প্রত্যেকটি দেশেরই উদ্দেশ্য হলো তাদের বলয়ে রাখতে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশ সরকারকে খুব ভেবে চিন্তে কাজ করতে হবে। উভয় বলয়ের দেশগুলোই তাদের নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের জনগণকে যাতে কোন রকমের হুমকির সম্মুখীন হতে না হয়, সে দিকে বিশেষ ভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ এখন কঠিন সময় পাড়ি দিচ্ছে।
তবে আমার বলতে দ্বিধা নেই যে, বিশ্ববাসীর কাছে আজ বাংলাদেশ একটি হীরক খন্ড । এই হীরক খন্ডকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপর।
লেখকঃ দেওয়ান ফয়সল, কলামিষ্ট, সিনিয়র সাংবাদিক ও সদস্য লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব