

বাংলাদেশে চা শ্রমিকদের শ্রম আর ঘামের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের। দেশের মোট ১৬৩টি চাবাগানে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন লক্ষাধিক চা শ্রমিক। চাশিল্প তথা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও বছরের পর বছর ধরে এসব বাগানে কর্মরত শ্রমকিরা ছিলেন অবহেলিত। এবার কিছুটা পরিবর্তন এসেছে তাদের জীবনমানে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বৃদ্ধি করা হয়েছে তাদের দৈনিক মজুরি; যোগ হয়েছে উৎসব ভাতাসহ আরও কিছু সুযোগ-সুবিধা।
চা শ্রমিকদের অনেকের বাড়িতেই উঠেছে পাকাঘর। বাড়ির পাশে ড্রেন, বাগানের ভেতর দিয়ে হয়েছে ইটের রাস্তা। পাচ্ছেন বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি, ডিশ ও ইন্টারনেট সংযোগ। সেই সঙ্গে তাদের ঐতিহ্যগত সাংস্কৃতিক কর্মকা- উদযাপনে দেওয়া হচ্ছে উৎসাহ। তাদের সন্তানরাও শিক্ষা-দীক্ষায় বেড়ে উঠছে। সরেজমিন শ্রীমঙ্গলের জেরিন, ফুলছড়া, রাজঘাট, ভাড়াউড়া চা বাগান ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।
কালিঘাট চাবাগানের শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় তাদের পরিবারের সবাইকেই কাজ করতে হতো বাগানে।
অন্য কোনো কাজের তেমন সুযোগ ছিল না। তবে এখন বাগানের পাশাপাশি অন্যান্য কাজের সুযোগও পাচ্ছেন। মুদিদোকান, গরু-ছাগল পালন, টেকনিক্যালসহ নানা কাজে যুক্ত হচ্ছেন। তাদেরই একজন দুলাল রবি দাস। এ তরুণ চাবাগানের কাজের অবসরে নিজের মুদিদোকান চালান; করেন কৃষিকাজও। সব মিলে বাবা-মা ও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আগের চেয়ে ভালো আছেন। এখন সন্তানদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন তিনি।
রাজু গোয়ালা নামে এক শ্রমিক বলেন, বাপ-দাদার মুখে শুনেছি- এমন একটা সময় ছিল, যখন চা শ্রমিকদের পড়তে দেওয়া হতো না। দিন-রাত কাজ করলেও বেতন দেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা করত; কিন্তু এখন আর সেই দিন নাই।
জানা যায়, দেশের মোট ১৬৩টি চাবাগানের মধ্যে ৯৭টি অবস্থিত মৌলভীবাজারে। এখানকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষই মূলত চাবাগানগুলোর প্রাণ। তাদের শ্রম আর ঘামে মৌলভীবাজারের চা দেশের সীমানা পেরিয়ে রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। সরকারের নানা পদক্ষেপে চা শ্রমিকদের জীবনও আগের চেয়ে অনেক বদলে গেছে। কথা বলার সময় তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বারবার ধন্যবাদও দিলেন চা শ্রমিকরা। তবে একই সঙ্গে বেশ কিছু সমস্যার কথাও জানালেন। এসব সমস্যা দূর করতেও প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে তারা।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি পংকজ কন্দ জানান, বছরের পর বছর ধরে দেশের চাবাগানে কর্মরত লক্ষাধিক চা শ্রমিক দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তবে এখনো তাদের নানা বঞ্চনার শিকার হতে হচ্ছে। ভূমির অধিকার প্রদান চা শ্রমিকদের প্রধান দাবি।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মাখন লাল কর্মকার বলেন, এখন চা শ্রমিকদের মূল দাবি- তাদের ভূমির অধিকার, এ ছাড়া ২০ মে-কে ‘জাতীয় চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া।
বাংলাদেশ চা সংসদ সিলেটের চেয়ারম্যান জিএম শিবলী বলেন, চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি বাগানমালিকরাও কাজ করছেন। বর্তমানে তাদের দৈনিক বেতন ১৭০ টাকা। এ ছাড়াও দেওয়া হচ্ছে ঘর, চিকিৎসা, রেশন, জ্বালানিসহ নানা সুযোগ-সুবিধা। প্রতি দুই বছর পর পর চা শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে মালিকপক্ষের দ্বিবার্ষিক চুক্তি হয়। এ সময় বাধ্যতামূলক বেতন বাড়ানো হয়।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ভানু লাল রায় বলেন, চা শ্রমিকসহ ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মানুষদের মাঝে বাইসাইকেল প্রদান, প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন, অনুদান বা ঋণ প্রদান, শিশুদের শিক্ষাবৃত্তি, শিক্ষা উপকরণসহ নানা কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ চা বোর্ডের প্রকল্প উন্নয়ন ইউনিটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ড. একেএম রফিকুল হক বলেন, ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুদানের পরিপ্রেক্ষিতে চা শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষার মান উন্নয়নে ‘বাংলাদেশ চাবাগান শ্রমিক শিক্ষা ট্রাস্ট’ গঠন করা হয়। ট্রাস্ট গঠনের শুরু থেকে শ্রমিক সন্তানদের বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে অন্যান্য সুবিধাও অব্যাহত রয়েছে।
নিউজ /এমএসএম