

বর্ষা এলো নিথর বনে, কোন সে মায়া জাগলো মনে! প্রকৃতির মায়া জড়ানো সিক্ত আবেগঝরা বর্ষা ঋতু নিয়ে লিখেছেন রিয়াজ রিপন।‘বর্ষা’ কথাটি চট করে মাথায় এলেই কেন যেন প্রেমিক নর-নারীর মাঝে ভিন্ন এক আবেগের সঞ্চার ঘটে। যেন এই বর্ষায় তারা কোথায় হারিয়ে যেতে চায়। তাদের উদাস মনে বয়ে চলে স্রোতখানি। কবিতার বহমান বর্ষা ভিজিয়ে দেয় প্রিয়ার চোখের কাজলখানি। সে হোক, রাধা কিংবা কৃষ্ণকলি।সেই অতীত হতে আজ পর্যন্ত আমাদের কবি-সাহিত্যিকেরা বর্ষার রূপকে অবেগঘন করে তুলেছেন তাদের সৃষ্ট কর্মে। বিধাতার বোনা বর্ষার সিক্ত পরশ সমস্ত কবির অনুভবে পুলকিত। তাই, হয়তো প্রাচীন কিংবা মধ্যযুগের কোনো কবিই কবিতায় বর্ষাকে নিজেদের থেকে দূরে রাখতে পারেননি। বৈষ্ণব সাহিত্যে প্রিয়ার হৃদয়কোণে প্রিয়কে পাবার ব্যাকুলতা কতটা কাতর হতে পারে তা দেখেই আমাদের হাঁটি হাঁটি পা পা করে আধুনিক যুগে পুনঃসাহিত্য ভাবনা। এই পদাবলির প্রতিটি পঙক্তির পড়তে পড়তে বিছিয়ে রয়েছে আবেগমাখা রূপ। উল্লেখ্য চরণে এমনটাই প্রকাশিত এবং আবেগ উন্মোচিত।‘এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর /এ ভরা ভাদর মাহ বাদর /শূন্য মন্দির মোর।’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্ষা নিয়ে অসংখ্য কবিতা রচনা করেছেন। তার কবিতায় নতুন প্রজন্ম ছুটে বেড়ায়। খুঁজে নেয় প্রেম, গেয়ে যায় মানবের জয়গান। প্রেমের জয়গান যেন এখান থেকেই হুমরে চলে।‘এমন দিনে তারে বলা যায়এমন ঘনঘোর বরিষায়এমন মেঘস্বরে বাদল ঝরঝরেতপনহীন ঘন তমসায়।’ কালিদাসের ‘মেঘদূত’ যেন একটি বর্ষা-পালা, যেখানে মেঘের কান্নায় প্রকৃতি তার অপার সৌন্দর্য খুঁজে পায়। আর প্রিয় তার প্রিয়াকে কাছে পাবার আকুতি-মিনতি ও উন্মাদনার প্রতিরূপ ফুটে উঠে।প্রেমিক পুরুষ, কবি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনিও কোনও অংশে কম ছিলেন না। তিনি আবেগ নামক বৃক্ষটির শিখরে বসে বাঁশির সুর তুলেছেন। বিরহ-বিধুর মনে দ্যোতনার সৃষ্টি করেছেন তিনি, যেখানে ভাষার বরষা বহে।‘আজিকে বাহিরে শুধু ক্রন্দন ছল ছল জলধারেবেণু-বনে বায়ু নাড়ে এলোকেশ, মন যেন চায় কারে।’ এভাবে বর্ণন করে শেষ করার মতো নয় এমন অসংখ্য কবি কবিতায় বর্ষা নিয়ে মেতেছেন। পাঠককে দিয়েছেন দুচোখ ভরে প্রেম ও প্রকৃতি দেখার স্বাদ।যেদিক দিয়েই ভাবি না কেন, প্রকৃতির নিগূঢ় রূপ এই বর্ষায় ছড়িয়ে পড়ে। লতা-পাতা, বৃক্ষ, তৃণভূমি জেগে ওঠে। আড়মোড়া দিয়ে ওঠে সবুজে সবুজ, সোঁদা গন্ধ মাতাল করে বনে-বাদারে। বুনো ফুল ফোটে বনে, মধুকর মৌ আহরণে ভোঁ ভোঁ করে ফুলে ফুলে পাতায় পাতায় উড়ে চলে। ঝড়োফোটা টুপ টুপ করে মিশে যায় ধরাতে। ধীরে ধীরে প্রকৃতি সজীব ও সতেজ হয়ে ওঠে।আবহমান বাংলার রূপ আমাদের চিরো চেনা। মাঝি-জেলের দল উজানে ছুটে চলে জীবিকার সন্ধানে। দুরন্ত ছেলে-মেয়েরা খেতে ভিজে ভিজে ছুটে বেড়ায়। নগ্ন পায়ে ধেয়ে চলে কৃষকবেটা শুধু কাজ আর কাজ বলে। কৃষাণবউ বাড়ির সম্মুখপানে কাঁথা বুনন আর গালগপ্পে দিন সারা করে।ইট-পাথরের শহরে আবার এমন চিরাচরিত রূপ না মিললেও, বর্ষায় একা মনে রবীন্দ্র সংগীত, ঠোঁটে চায়ের চুমুক আর বেলকুনি দিয়ে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির ছোঁয়া এগুলো দেখা যায়, কিংবা মোটা চালের খিচুড়ি আর ঝাল গোস্তের উৎসব অথবা নব-প্রজন্মের ক্লিক ক্লিক ফ্রেমবন্দি আলোকচিত্র আর সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগঘন স্ট্যাটাসঝড়ে বর্ষা যাপন চলে। এখন অবশ্য আর সেই পুরনো দিনের মতো আনন্দ খুঁজে পাওয়া যায় না। নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তির বিক্রিয়ায় ঘরের বুড়ো শ্রদ্ধাভাজনদের স্মৃতিবিজড়িত গল্প থেকে সরে যাচ্ছে, মিশে যাচ্ছে তড়িৎসম ব্যস্ততার মাঝে।দিন যতটাই এগিয়ে যাচ্ছে, প্রকৃতি তার আপন মনে ধেয়ে চলছে। আর এই ভবের মাঝে আমরা যারা পেঁজা পেঁজা মেঘ আর ফালি ফালি রোদ খুঁজে বেড়াই না, তারা হয়তো ভুলতেই বসেছি এখন বাংলা কী মাস বা কী ঋতু। এই সময়ে ঝলমলে তির্যক রোদে আচমকা এক পশলা কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি মনের কোণে যে উচ্ছ্বাস জাগিয়ে তোলে তা বর্ণনাতীত। হঠাৎ বিজুরি চমকানো ঘনমেঘের বাদল দিনে উঁকি মারা রোদ্দুর দেখে মনে পড়বে পুরনো দিনের শিশুতোষ ছড়াখেলার কথা, “মেঘ হচ্ছে বৃষ্টি হচ্ছে, খেঁকশিয়ালের বিয়ে হচ্ছে।”আর এগুলো দেখার জন্য চাই মনের প্রফুল্লতা। শুধুই বাড়ির ছাদ বা বারান্দায় নয়, সৃষ্টির অপার সৌন্দর্য পরিপূর্ণভাবে অবলোকনের কিংবা অনুভবের জন্য আপনাকে লোকালয় ছেড়ে কিছুটা দূরে প্রকৃতির কোল বেছে নিতে হবে; কারণ করোনা নামক মহামারি এখনো দাপট দেখিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে সেখানে। তাই সাবধানতা সর্বাগ্রে।