শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬, ০৩:৫৮ অপরাহ্ন

বৃটেনের সামাজিক সংগঠন ও কিছু কথা

ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
  • খবর আপডেট সময় : সোমবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৩
  • ৪৬০ এই পর্যন্ত দেখেছেন

বৃটেনের সামাজিক সংগঠনের শুরু কখন হয়েছে, তা জানা নেই তবে ব্যক্তিগত গবেষণা থেকে যে টুকু জেনেছি – প্রথমে শুরু হয়েছিলো সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের সমন্বয়ে। তখন মানুষের সংখ্যা ছিলো নিতান্ত কম আর পারস্পরিক সম্পর্ক ছিলো চমৎকার। আর সেকারণে হয়তো কে কোন জেলা থেকে এসেছে একথা বিবেচনা করা হতোনা। বিবেচনা করা হতো বাঙালি হিসাবে। আর সময়ের আবর্তে এখন আর দেশের নাম দিয়ে সংগঠনের সংখ্যা নিতান্ত নগন্য। এখন দেশ থেকে জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন এমনকি গ্রামের নামে গড়ে উঠেছে হাজারো সংগঠন। সবার উদ্দেশ্য সামাজিক সেবা মূলক কাজ করা। তবে মজার ব্যাপার হলো – প্রত্যেকটি সংগঠনের বিপরীতে একাদিক নয় কোন কোন ক্ষেত্রে ২-৩ টি বিদ্রোহী সংগঠন রয়েছে।

আমি কখনোই সামাজিক সংগঠনের বিরুদ্ধে নই। এবং ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সামাজিক সংগঠনের প্রয়োজন এবং সামাজিক কর্মকান্ডে প্রতিযোগিতা থাকা ভালো। তবে প্রতিহিংসা থাকা অত্যন্ত খারাপ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে সংগঠনগুলো যাত্রা শুরু করে এবং কিছুদিনের মধ্যে দেখা যায় সংগঠনটি হোঁচোট খায়। এই হোঁচট খাওয়ায় পেছনে রয়েছে অনেকগুলো কারণ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় নেতৃত্বের অসুস্থ প্রতিযোগিতা আর অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে প্রতিহিংসা। অর্থাৎ কেউ কারো নেতৃত্ব মানতে চায়না আর সবাই নেতা হতে চায়। সে যোগ্য কিনা অজ্ঞ সে ব্যাপারটির ধার ধারেনা। তবে এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে ও একটু অতি উৎসাহী ভাব লক্ষ্য করা যায়। অনেকেই বুঝে না বুঝে অযোগ্য মানুষদের ও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উস্কানি দিতে দেখা যায়। আর এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার জন্য অনেকে অনেকের সাথে কথা বলা, মুখ দেখাদেশি বন্ধ করে। পরস্পরে প্রতি বিষোদ্গার এমন পর্যায়ে পৌঁছে যা শেষ পর্যন্ত আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আর অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় সামাজিক কর্মকান্ডের নামে গচ্ছিত হাজার হাজার পাউন্ড আদালত পাড়ায় খরচ হয়। এমন ও সংগঠন আছে যাদের মামলার খরচ সংগঠনের তহবিল থেকে বেশি। সামাজিক সংগঠনের নামে এই সকল কর্মকান্ড নিতান্তই মশকরা ছাড়া আর কিছু না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় এই বিষয়গুলো সমাধানের জন্য কেউ এগিয়ে আসেনা বরং সম্ভব হলে আরো বাড়িয়ে দেয়।

আবার এমন অনেক সংগঠন রয়েছে, সামাজিক উন্নয়নে দুই বছরে যে পরিমান আর্থিক কাজ করেছে তার চেয়ে বেশি সংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচনের পেছনে খরচ করেছে। শুধু সামাজিক সংগঠন বললে ভুল হবে মসজিদ কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্টানগুলো ও কিন্ত এর সাথে পাল্লা দিয়ে রয়েছে। প্রায়ই এসকল ধর্মীয় প্রতিষ্টান নিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হতে দেখা যায়। আর এর মুলে রয়েছে নেতৃত্বের কোন্দল। অর্থাৎ কেউ কারো নেতৃত্ব মানতে চায়না।

ব্রিটেনের বেশিরভাগ সামাজিক সংগঠনগুলোর মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশের মানুষের উন্নয়ন করা। অর্থাৎ ইউকে থেকে টাকা সংগ্রহ করে বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা, বাসস্থান, গৃহ নির্মাণ, চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা। অবশ্য কিছু কিছু সংগঠন মাঝে মাঝে ইউকের ছাত্ৰ ছাত্রীদের ভালো লেখা পড়া করার জন্য অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে থাকেন। তাদের সংখ্যা খুবই কম। এই কর্মটি করে তারা ঢেঁকুর তুলে বলেন আমরা ইউকের ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের জন্য অনেক করেছি। ব্রিটিনে বাঙালি মানুষের সংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ। আর এই দশ লক্ষ মানুষের রয়েছে হাজারো সমস্যা। ২০২০ সালে বিবিসির জরিপ অনুযায়ী ব্রিটেনে প্রতি তিনটির মধ্যে একটি বাংলাদেশী পরিবার বাসস্থান সমস্যায় জর্জরিত। তারা প্রতিনিয়ত এডভাইস সেন্টার, সলিসিটার আর কাউন্সিল অফিসে ধর্ণা দেন। এখানে যদি এই সকল সংগঠনগুলো এডভাইস সেন্টার খুলে সাধারণ মানুষদের সেবা কিংবা পরামর্শ দিতো তাহলে মানুষ উপকৃত হতো।

ড্রাগ আমাদের কমিউনিটির একটি ভয়াবহ সমস্যা। তাছাড়া রয়েছে নাইফ ক্রাইম। অনেক্ষেত্ৰে দেখা যায় ভালো প্যারেন্টিংয়ের অভাবে বাচ্চারা বিপদগামী হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাবা-মা নিজেও জানেনা ভালো প্যারেন্টিং কি এবং কিভাবে করতে হয়। সঠিক উপদেশ কিংবা পরামর্শ যদি এই সকল সংগঠনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষদের দেয়া হতো মানুষ অনেক ক্ষেত্রে উপকৃত হতো। তাছাড়া ইন্টারনেটে, সোশ্যাল মিডিয়া আর অবাধ মিডিয়ার যুগে পরিবারের কর্তাদের ভালো জ্ঞান না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় বাচ্চারা বিপদগামী হয়। কারণ তারা নিজেরাও জানেননা বাচ্চাদের কিভাবে পরামর্শ দিবেন। এক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ সামাজিক সংগঠনগুলো করতে পারে। বছরজুড়ে সামাজিক সংগঠনগুলোর ডিনার পার্টি, ভুরিভোজ পার্টি থাকে আর এইসকল পার্টিতে এই কাজগুলো না করে বরং শুধু ছবি তুলা আর ফেসবুকে আপলোডের মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকে।

বিলেতে এখনো অনেক মানুষ রয়েছে যারা ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। কেউ যদি আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করেন তাহলে সবিনয়ে বলবো তর্ক করার আগে ব্রিটেনের বাঙালি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটসের ফুড ব্যংকের লাইনগুলো একটু ভালো করে দেখবেন। তাছাড়া মার্চের প্রথম সপ্তাহে শেডওয়েলে একটি ২ বেডরুমের বাসায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্তে আসে ২ বেডরুম আর এক সিটিংরুমের মধ্যে ১৮-20 জন বাঙালি বসবাস করতেন। সামাজিক সংগঠনগুলোর কাউকে এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে কখনো শুনিনি।

এই সমস্যাগুলো দেখার কিংবা শুনার কেউ নাই। খুব কম বাঙালি সংগঠন রয়েছে যারা এসকল সমস্যা নিয়ে কাজ করে। যদি সংখ্যায় ধরা যায় তাদের সংখ্যা নিতান্ত নগন্য। তাদের ধারণা এই সব সমস্যা সমাধানের দ্বায়িত্ব ব্রিটিশ সরকারের অথবা একান্তই তাদের ব্যক্তিগত। সামাজিক সংগঠন গুলোর কোন দ্বায় নাই কিংবা চিন্তা করার কোন সময় ও নাই। তবে ব্রিটিশ মূল ধারার অনেক চ্যারিটেবল সংস্থা রয়েছে যারা প্রতিনিয়ত এই কাজগুলো করে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে কোন্দল খুব কম দেখা যায়। আর মানুষের উপকারের কথা বিবেচনা করলে, সাধারণ মানুষ সেই সকল সংগঠন থেকে প্রতিনিয়ত উপকৃত হচ্ছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে বাংলাদেশে পাওয়ার অব এটর্নির ক্ষেত্রে শুধুমাত্ৰ বৈধ বাংলাদেশী পাসপোর্ট গ্রহণের একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। যদিও স্বাধীনতা উত্তর বৃটেনে দীর্ঘ ৫০ বছর বাঙালিরা ব্রিটিশ পাসপোর্ট দিয়ে পাওয়ার অব এটর্নি সম্পাদন করে আসছিলেন। এই নীতিমালার কারণে কম বেশি সবাই ভুক্তভুগি। আমি আশ্চর্য ভাবে লক্ষ্য করলাম ২/১ টি বাদে কোন সংগঠনই এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে  টু শব্দ করেনি। যদি সবাই মিলে আমরা কথা বলতাম তাহলে কাজ হতো। তা না করে আমরা অনেকেই নির্লিপ্ত। কোন কথা বলেনা। যারা এখন বলছেন আমার কোন সমস্যা নাই সময়ের সাথে বুঝতে পারবেন এই সমস্যার মধ্যে একদিন আমরা সবাই পড়তে হবে।

সামাজিক সংগঠনগুলোর নির্লিপ্ততার জন্য দিন দিন সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরী হচ্চে। কারণ এই সংগঠনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে বেড়ে উঠা মানুষরা এই সকল সংগঠনের সাথে জড়িত থাকেন। এর এদের সংখ্যা শতকরা হিসাবে মোট ৯৯% অথবা কোন কোন ক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশি। আর এর প্রধান কারণ হলো আমাদের কোন্দল। সামাজিক সংগঠনগুলোর এই কোন্দল প্রতিহিংসার জন্য নতুন প্রজন্ম আর আগ্রহ দেখায়না। তারা সময়, অর্থ আর সম্পর্ক নষ্টের অজুহাতে এড়িয়ে চলে।

আমার এই লেখার মূল উদ্দেশ্য সামাজিক সংগঠনের বিরুদ্ধে বিষোধগার করা নয় বরং সংগঠনের নেতাদের প্রতি অনুরোধ সময়ের সাথে আপনাদের মানসিকতা, কাজের পরিধি এবং পরিসীমা বদলে ফেলুন। বিলেতের নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার জন্য বিলেতমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করুন। অন্যথায় দিনের পর দিন এই সংগঠনগুলো আমাদের সম্প্রীতি আর ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরী করবেনা বরং বিনষ্ট করবে।

লেখকঃ ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী, প্রিন্সিপাল সলিসিটার, কেসি সলিসিটর্স, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগ 

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102