

লেখার শুরুতেই আমার পাঠকদের প্রতি রইলো স্বাধীনতা দিসের শুভেচ্ছা। হাঁটি হাঁটি পা পা করে, কি ভাবে যে ৫৩টি বছর কেটে গেলো তা যেন বুঝতেই পারলাম না। আজ লিখতে বসে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস চোখের সামনে এক এক করে ভেসে উঠছে। সেই ১৯৬৯ এর আইয়ুব খেদাও আন্দোলনে ছাত্র সমাজ সহ দেশের আপামর জনগনের আন্দোলন, ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, প্রাণ বাঁচানোর জন্য হাজার হাজার মানুষ শরনার্থী হয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ, রাজাকার আলবদরের সহযোগিতায় হিন্দু সম্প্রদায় সহ কত মানুষের বাড়ি ঘর আগুন দিয়ে পুড়ানো হয়েছে যা নিজের চোখেই অনেক দেখেছি। গুলি করে কত লোককে হত্যা করেছে এই নরপশুর দল এসব ঘটনা থেকে শুরু করে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী মুক্তিবাহিনীর কাছে পরাজিত হয়ে যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন সব ঘটনাই টিভির পর্দার মতো চোখের আয়নায় ভেসে উঠছে।
স্বাধীনতার ৫৩ বছর পাড়ি দিল বাংলাদেশ গত ২৬শে মার্চ ২০২৩ সালে। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতের আঁধারে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী বাঙালীদের উপর অতর্কিত গণহত্যা অভিযান ”অপারেশন সার্চলাইট” শুরু করে। ঐ রাতে তারা দেশের বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার নামীদামী লোকদের ধরে নিয়ে হত্যা করে এবং এই হত্যাকান্ড থেকে সাধারণ জনগণও রেহাই পায়নি। এই অভিযান চলাকালে ২৬শে মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
বঙ্গবন্ধুকে তাঁর ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতারের আগে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পাশাপাশি যে কোন মূল্যে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। বার্তাটি তৎকালীন ইপিআর-এর ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পরে। পরবর্তীকালে চট্টগ্রামের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ ও ২৭ মার্চ বেশ কয়েকজন শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।
এখানে একটি কথা বলা দরকার। অনেকেই মনে করেন যে, ”স্বাধীনতা ঘোষণা এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা” একই কথা। আসলে কিন্তু তা নয়। এ কথাটা অনেক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও জানেন না অথবা বোঝেন না এ দু’টো শব্দের অর্থের পার্থক্য। যদি বুঝতেন তাহলে বলতেন জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক নন, পাঠক মাত্র। ঘোষণা এক জনেই করেন।
বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার মূল্যবান দলিলটি লিপিবদ্ধ হয়েছে এভাবে ”ইহাই হয়তো আমার শেখ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি যে, যে যেখানে আছে, যাহার যাহা কিছু আছে, তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও, সর্বশক্তি দিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করো। পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্য্যন্ত এবং চুড়ান্ত বিজয় অর্জন না হওয়া পর্য্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও। শেখ মুজিবুর রহমান। ২৬ মার্চ, ১৯৭১। ”
দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিশ্বের মানচিত্রে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে একটি ভুখন্ডের, যার নাম বাংলাদেশ।
যুদ্ধ চলাকালীণ সময়ে দীর্ঘ নয় মাসে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ধ্বংস করে দিয়ে যায়। পাক হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকার আলবদর এর দল বাড়িঘরে লুটপাট করে নিয়ে যায়। দেশে খাদ্য, সুপেয় পানির সংকট সহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জনগনকে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিশ্বের চাপে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু যখন দেশের মাটিতে ফিরে এসে দেশে হাহাকার অবস্থা দেখলেন তখন অপারগ হয়ে বিশ্বের কাছে সাহায্যের আবেদন জানালেন। তাঁর এই আবেদনে সাড়া দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সাহায্য আসতে শুরু করলো। এর মধ্যে ছিলো খাবার, কাপড়, কম্বল ইত্যাদি।
বাংলাদেশে এই দু:সময়েও যেসব সাহায্য বিদেশ থেকে আসতে শুরু করলো তারই একটি অংশ চোর লুঠেরাদের দল কালো বাজারে বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করতে লাগলো। এ সময় দু:খ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, বিদেশ থেকে সাড়ে সাত ৭ কোটি কম্বল আসলো, আমার কম্বল গেলো কোথায়? সে সময় তিনি বলেছিলেন, ”এ রকমের দু:সময়ে মানুষ পায় সোনার খনি, আমি পেয়েছি চোরের খনি।”
৭১ সালে বাাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে আমেরিকা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে তাদেরকে সাহায্য করে।তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে (বর্তমানে বাংলাদেশ) দাবিয়ে রাখার জন্য পাকিস্তানকে সপ্তম নৌবহর দিয়ে সাহায্য করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট নিক্সন বলেছিলেন, ”বাংলাদেশ ইজ এ “বটমলেস বাসকেট’ অর্থাৎ বাংলাদেশ একটি তলা বিহনীন ঝুড়ি।”!
আজ স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেয়া বাণীতে বলেছেন, ”আপনি বিশ্ববাসীর জন্য সহমর্মিতার নজির তৈরী করেছেন।” মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধান খুঁজে বের করতে এবং স্বৈরাচারকে জবাবদিহীতার আওতায় আনতে চায় তাঁর দেশ। স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা বার্তায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশ্যে জো বাইডেন বলেন, ”আপনি বিশ্ববাসীর সামনে চাক্ষুষ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।” বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও জনগণকে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের পক্ষ থেকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানান জো বাইডেন। শুভেচ্ছা বার্তায় জো বাইডেন বলেন, ”স্বাধীনতার মূল্য বাংলাদেশীরা ভাল বোঝে। কারন, ১৯৭১ সালে বীরের বেশে লড়াই করেছে এবং নিজেদের ভাষায় কথা বলার জন্য লড়েছে।”
যে আমেরিকা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলো, আজ ৫৩ বছর পর সেই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের জয়জয়গান গাইতে শুরু করেছেন। আর কেনইবা করবেন না, বাংলাদেশ আজ সব দিক দিয়েই একটি স্বনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, সারা দেশে রাস্তাঘাট, কালভার্ট, ছোট বড় সেতু, নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতুতে যানবাহন চলাচল শুরু এবং সেই সাথে সেতুর নীচতলা দিয়ে রেল লাইন নির্মান কাজ শেষ হওয়ার পর পরীক্ষামূলক ভাবে চলাচল শীঘ্রই শুরু হতে যাচ্ছে, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে ’বঙ্গবন্ধু টানেল’ দিয়েও যান চলাচলও শীঘ্রই শুরু হতে চলেছে। যার ফলে বাংলাদেশের মানুষ এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় গিয়ে কাজ করে বিকেলে আবার নিজের বাড়িতে ফিরে আসতে পারবে।
এছাড়াও ব্যবসা বানিজ্যের প্রসারও ঘটতে শুরু করেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ বর্তমানে কোন দিক দিয়েই আর পিছিয়ে নেই। এখন বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার পথে এগিয়ে চলছে। তা সম্ভব হয়েছে আওয়ামী লীগ নেত্রী, বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী চিন্তাধারা, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং দেশের জনগণকে একটি উন্নত দেশ উপহার দেয়ার প্রতিজ্ঞা করার কারণে।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্রমুক্ত, আত্মপ্রত্যয়ী ও আত্মমর্য্যাশীল ”সোনার বাংলাদেশ” বিনির্মাণে সব বাংলাদেশীকে অংশ গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ২৬ মার্চ রোববার ’মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস’ উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে তিনি এ আহ্বান জানান।
ভাবতেও অবাক লাগে যে, বিএনপি-জামায়াত তাদের গুরু আমেরিকা সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের সাথে ব্যবসা বাণিজ্য সহ বন্ধুত্বসূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং দেশের উন্নয়নে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করছে, তারা আজ বুঝতে পেরেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের জনগণের কল্যানের জন্য যা করছেন তা সর্বজন স্বীকৃত অথচ স্বাধীনতা বিরোধী এই চক্রটি এখনও তাদের সেই পুরনো নেশায়ই আসক্ত হয়ে বসে আছে। বাংলাদেশের এই উন্নয়নে সরকারকে সহযোগিতা করাতো দূরের কথা বরং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরণের অপপ্রচার চালিয়েই যাচ্ছে।
আমি মনে করি, দেশের বিরুদ্ধে তাদের এই অপপ্রচারের ফলে তারা এক দিকে ধীরে ধীরে জনগণ থেকে যেমন বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, ঠিক তেমনি তাদের দলের অনেক নেতাকর্মীরাও বিমুখ হচ্ছে। যার ফলে বিএনপি এখন যে অবস্থানে আছে তা থেকে ধীরে ধীরে তলানীর দিকে চলে যাচ্ছে! তাদের এই অপপ্রচার কোন কাজেই আসছে না। কারণ, দেশের জনগণ উন্নয়নের সবকিছু স্বচক্ষ্ দেখছে, উপভোগ করছে, শান্তিতে আছে। সুতরাং এখানে সরকারে প্রতি সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিলো বলতে গেলে একেবারে শূন্যের কোটা থেকে। ঐ বছর সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মাত্র ৭৮৬ কোটির টাকার বাজেট আজ পরিণত হয়েছে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার বাজেটে। সেদিনের ১২৯ ডলার মাথাপিছু আয়ের দেশটিতে বর্তমান মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮শ ১৪ মার্কিন ডলার। সময় পেরিয়েছে, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও এগিয়ে যাচ্ছে। মাথাপিছু আয়, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন, বেসরকারী খাতে বিনিয়োগ ও দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধি, বৈদেশিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও ব্যবহার এবং সম্পদ উৎপাদন ও আহরণ দৃশ্যমানভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
জনগণের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ”দেশের উন্নয়নে জনগণই আমার শক্তি। দেশকে স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। আল্লাহ আমাদের সহায় আছেন।”
লেখকঃ দেওয়ান রফিকুল হায়দার (ফয়সল), কলামিষ্ট, সিনিয়র সাংবাদিক ও সদস্য লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব