

ইউকেবিডি ডেস্ক: লেখালেখির চেষ্টা শুরু করেছিলাম স্কুল জীবন থেকেই। আনাড়ি ভাষা ও ছন্দে কবিতা লেখার চেষ্টা করতাম তখন। স্কুল জীবনের শেষভাগে হাত খরচের টাকা বাঁচিয়ে শুরু করেছিলাম কবিতার বই কেনা। আমার জীবনের প্রথম কেনা কবিতার বইটি ছিল মহাদেব সাহার এই গৃহ এই সন্ন্যাস, খান ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত বইটির দাম ছিল সাড়ে তিন টাকা। সম্ভবত দেশের প্রথম লাইনো টাইপে ছাপা বইগুলো গতানুগতিক সীসায় কম্পোজ করা বইয়ের তুলনায় ছিল অনেক বেশি ঝকঝকে ও পরিচ্ছন্ন। দ্বিতীয় বইটি আবুল হাসানের রাজা যায় রাজা আসে, এটির দামও ছিল সাড়ে তিন টাকা। আমার কেনা তৃতীয় বই হুমায়ুন কবিরের কুসুমিত ইস্পাত, এটির দাম পাঁচ টাকা। পরে, ১৯৭৩ সালে বড় ভাইর বিয়ের উপহার হিসেবে পাওয়া অনেকগুলো বইয়ের মধ্যে ছিল রনেশ দাশগুপ্ত সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের কাব্য সম্ভার। উল্লেখ্য, বিয়েতে বই উপহার দেওয়ার প্রচলন তখনো চালু ছিল। জীবনানন্দ দাশের বইটি হাতে পাওয়ার পর আমার কাব্যপাঠে একটা গুণগত পরিবর্তন ঘটে। ব্যর্থ কাব্যপ্রয়াসেও আসে পরিবর্তন। জীবনানন্দের কাব্যভাষার অনুকরণে কবিতা লেখার চেষ্টা করতে থাকি, ক্রিয়াপদ ব্যবহারে তাঁর অভিনবত্ব আমাকে গভীরভাবে আকর্ষণ করে বলে আমিও সেসব অনুকরণের ব্যর্থ চেষ্টায় তাঁর কিছু কবিতার মতো হ্রস্ব পংক্তির দীর্ঘ কবিতা লিখে খাতা ভর্তি করে ফেলি। এমনকি কবিসুলভ ভাব আনার জন্য মাথার মাঝখানে সিঁথি করে চুল আঁচড়ানোও শুরু করেছিলাম। বালসুলভ প্রয়াসে লেখা অপরিপক্ক সেই কবিতাগুলো প্রকাশের একটা মাধ্যম খুঁজে পেয়েছিলাম ঢাকা বেতারের নবীনকণ্ঠ অনুষ্ঠানের স্বরচিত কবিতা পাঠের আসরে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য এই অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হতো বিকেল সাড়ে তিনটার সময়। অনুষ্ঠান কর্তৃপক্ষ কখনোই আমাকে আমার বয়স ইত্যাদি জানতে চাননি। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তাঁরা জানতেন আমি ঢাকা কলেজের ছাত্র, সম্ভবত সেসময় থেকেই আমার কিঞ্চিত ঘন ঘোঁফের কারণেই তাঁদের এমন ধারণা হয়েছিল। একদিন কেউ একজন কোনো কথা প্রসঙ্গে বললেন, আপনি তো ঢাকা কলেজের। বলাবাহুল্য তাঁর সেই ধারণার ভুলটা ধরিয়ে দিইনি। অনুষ্ঠানটার প্রযোজক ছিলেন সাইফুল আলম জোয়ারদার। তাঁর কাছে একটা কবিতা জমা দিয়ে আসার মাসখানেক পর অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে ইংরেজীতে ছাপা একটা প্রোগ্রাম শিডিউল ডাকযোগে পাই। ওটা পেয়ে আমার সীমাহীন বিস্ময় যেন বাধা মানে না। সেই প্রোগ্রাম শিডিউলে সম্মানীর উল্লেখও ছিল, পঁয়ত্রিশ টাকা। লেখালেখি থেকে আমার অর্থলাভের প্রথম অভিজ্ঞতা ছিল সেটাই।সেসময় আরেকটি ঘটনা আমার কাব্য প্রয়াসের ওপর বেশ আস্থা এনে দেয়। ১৯৭৪ সালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) একটা কবিতা প্রতিযোগিতা আহবান করে। জিপিওর উল্টোদিকে জাসদ অফিসে নিজে গিয়ে একটি কবিতা জমা দিয়ে এসেছিলাম। জেনে এসেছিলাম, প্রতিযোগিতার ফলাফল ঘোষিত হবে ১৯ ফেব্রুয়ারি তারিখে শহীদ মিনারের সামনের চত্বরে। নির্দিষ্ট দিনে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলাম। প্রতিযোগিতার ফলাফল ঘোষণায় শুনতে পাই আমার কবিতাটি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। কোনো কবিতা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা এবং তাতে পুরস্কার পাওয়ার এটাই ছিল আমার প্রথম ও শেষ অভিজ্ঞতা। উল্লেখ্য পুরস্কারপ্রাপ্ত কবিরা তাঁদের নিজ নিজ কবিতা সেখানে পাঠ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। পরদিন ২০ ফেব্রুয়ারি দৈনিক বাংলায় কবিতা পাঠরত অবস্থায় নামোল্লেখ ছাড়াই আমার একটা ছবি ছাপা হয়। বলাবাহুল্য এরকম অপ্রত্যাশিত প্রচারণা আমার মধ্যে এক বিশাল সাহস এনে দিয়েছিল। কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন গণকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক কবি আল মাহমুদ। অনুষ্ঠানের পর তিনি তাঁর পত্রিকার ক্যামেরাম্যানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন পুরস্কার পাওয়া কবিদের ছবি তুলে নেওয়ার জন্য, যাতে পরদিন নিউজের সাথে দেওয়া যায়। সেদিন যিনি প্রথম বা তৃতীয় হয়েছিলেন তাঁরা কে কোথায় আছেন জানি না।অপরিপক্ক সেসব কবিতা থেকে বাছাই করা কয়েকটা দুঃসাহসে ভর করে জমা দিতাম দৈনিক বাংলার সাহিত্য সাময়িকীতে। পাতাটি সম্পাদনা করতেন কবি আহসান হাবীব। প্রথম দেখাতেই সৌম্য চেহারার পরিচ্ছন্ন মানুষটিকে খুব ভালো লেগে যায়। তাঁর ঠোঁটগুলো দেখতে সাধারণ পুরুষালী ছিল না। সবচেয়ে যে বিষয়টা আকর্ষণ করত, সেটা হচ্ছে কাশফুলের মতো তাঁর দীর্ঘ চুল। আমি কিন্তু কবিতা জমা দিয়েই ক্ষান্ত ছিলাম না, সেই কবিতার নিয়তি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার জন্য হানা দিতাম তাঁর অফিসে। তিনি আমার মতো কবিযশোপ্রার্থী কৈশোরোত্তীর্ণ বালকটির ধৃষ্টতায় কখনোই বিরক্ত হতেন না। পরম ধৈর্য্য নিয়ে সামনের বক্সফাইল থেকে খুঁজে বের করতেন আমার কবিতা। মন দিয়ে পড়তেন যখন, আমি নির্লজ্জের মতো কাঁটা হয়ে বসে থাকতাম তাঁর সামনে। কখনো নিজের জন্য চায়ের ফরমায়েশ দেওয়ার সময় আমার জন্যও দিতে বলতেন। একসময় পড়া শেষ হলে মুখ তুলে বলতেন, না এখনো ছাপার মতো হয়নি। ‘এখনো’ শব্দটার মধ্যে আমি একধরনের সান্তনা খুঁজে পেতাম, ভাবতাম, ‘এখনো’র মধ্যে উহ্য আছে ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। কবিতা মনোনীত না হওয়ার দুঃখের মধ্যে একমাত্র উপশম ছিল তাঁর ধীর শান্ত ও ¯েœহশীল আচরণ। আর দ্বিতীয় উপশম ছিল ঢাকা বেতারে মনোনীত হওয়া কবিতাগুলো পড়ার সুযোগ। কেবল আহসান হাবীব নয়, গণবাংলার সাহিত্য পাতাতেও কবিতা জমা দিতাম আমি। বর্তমান সাকুরার পেছনে একটা লম্বা ব্যারাকে ছিল পত্রিকাটির অফিস। একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে দ্য পিপল অফিস জ্বালিয়ে দেওয়ার পর তৈরি হয়েছিল এই অস্থায়ী কাঠামোটি। গণবাংলার সাহিত্য পাতা সম্পাদনা করতেন কবি আবুল হাসান। তাঁর কাছে কবিতা নিয়ে যাওয়ার সময় আমার হাতে থাকত কিছু কবিতার বই, তাঁর রাজা আসে রাজা যায় বইটাকে ওপরে রাখতাম যাতে তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়। আমার প্রচ্ছন্ন উদ্দেশ্যটা কবিতা প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো সফলতা না পেলেও প্রদর্শন করার উদ্দেশ্যটা সফল ছিল। লক্ষ করেছি, আমার সাথে কথা বলার ফাঁকে এক ঝলক তাকিয়ে নিজের বইটি তিনি দেখেও বজায় রেখেছেন পরম ঔদাসীনতা। কাব্যপ্রয়াসের এমন মরিয়া সময়ে একটি কবিতা লিখেছিলাম, তার প্রথম পঙক্তি এখনো মনে আছে। সেসব সময়ের কোনো কবিতাই সংরক্ষণ করিনি, তবে এই পঙক্তিটা মনে থাকার একটা কারণ আছে। কবিতার প্রথম পঙক্তি ছিল ‘সুস্বাদু খাবারের মোড়ককে আমি রমণীর ছলনা বলে ভ্রম করি।’ কবিতাটা আবুল হাসানের কাছে জমা দেওয়ার কিছুদিন পর নির্মলেন্দু গুণের একটা কবিতা পড়ে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই, কবিতাটার প্রথম পঙক্তি ছিল, ‘আমি চালের আড়তকে নারীর নগ্নতা বলে ভ্রম করি।’ কবিতাটা কোথায় পড়েছিলাম স্মরণে নেই, এটি গ্রন্থিত আছে গুণের কবিতা, অমীমাংসিত রমণী গ্রন্থে। কবিতাটা পড়ার পর আমার মধ্যে আত্মবিশ্বাসের সাথে একধরনের সংশয় জাগ্রত হয়, আবুল হাসান ভাবতে পারেন এই কবিতাটার প্রথম পঙক্তি আমি গুণের কবিতা থেকে মেরে দিয়েছি। তাই দ্রুত গণবাংলা অফিসে গিয়ে অপেক্ষা করি তাঁর জন্য।দীর্ঘসময় অপেক্ষার পর আমি যখন অফিসটির বাইরে দাঁড়িয়ে আছি, তখন সামনেই রিকশা থেকে নামলেন আবুল হাসান এবং তাঁর সাথে গোলাম সাবদার সিদ্দীকি। সাবদারের পরনে বেশ ঢোলা একটা জিনসের প্যান্ট। তাঁরা নেমে অফিসে ঢোকার সময় ওঁদের পিছু নিলাম। যেতে যেত সাবদার সিদ্দীকিকে বললাম, আপনার একটা বই বের হওয়ার কথা ‘হে নারী হে ব্রহ্মচারী’, কখন বের হবে? তিনি ঠোঁটের ওপর ঝুলে পড়া গোঁফ দুআঙুলে পাট করতে করতে বললেন, ওটার নাম পালটে দিয়েছি। ওটার নাম দেবো ‘আমি সেই যীশু পশু শিশু।’ বইটি পরবর্তী সময়ে আদৌ বের হয়েছিল কি না জানি না। সাবদারের একথার পর আর কোনো কথা চলে না। খুব স্বাভাবিকভাবেই স্কুলের গ-ি পেরোয়নি এমন তরুণসদৃশ এক কিশোরের সাথে ওঁদের কী-ইবা কথা হতে পারে? আবুল হাসান তাঁর নির্দিষ্ট টেবিলে বসার পর আমি সামনে গিয়ে বসি। তাঁর কবিতার বই কিনে তাঁকে প্রদর্শন করেছি এবং তিনি সেটা দেখেছেন বলে নিজে নিজেই তাঁর সামনে গিয়ে অনাহুতভাবে বসে পড়ার একটা স্বোপার্জিত অধিকার অর্জন করে ফেলেছিলাম আমি। আবুল হাসানকে নির্মলেন্দু গুণের কবিতার একটি পঙক্তির সাথে তাঁর কাছে জমা দেওয়া আমার কবিতাটির আশ্চর্যজনক মিলের কথা বলে তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করি যে গুণের এই কবিতাটি আমি আগে কখনোই পড়িনি, তাই এরকম মিল একেবারেই অনিচ্ছাকৃত। তিনি যাতে না ভাবেন এই পঙক্তিটি আমি গুণের কবিতা থেকে েের দিয়েছি। আবুল হাসান আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘এরকম হতেই পারে।’ এখন বুঝতে পারি, তিনি আমার মতো একজনের এই কথা মোটেই বিশ্বাস করেননি।স্কুলজীবন শেষ হওয়ার পর ঢাকা ছেড়ে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হই আমি। সেসময়ও কবিতা লেখার চেষ্টা ছাড়িনি। কেবল কবিতা লেখা নয়, একটি কবিতার কাগজও বের করতাম তখন। সুতরাং তখন কেবল কবি যশোপ্রার্থী একজন নই, একটা কাগজের সম্পাদকও। সেসময় যেসব কবিতা লিখেছিলাম, তার একটি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আজাদী পত্রিকায় দিয়ে এসেছিলাম। পত্রিকাটির কারো সাথে কোনো পরিচিতও ছিল না। কিন্তু আমাকে অবাক করে সেই কবিতাটি ছাপা হয় আজাদীর একুশে ফেব্রুয়ারি বিশেষ সংখ্যায়। সে অর্থে কোনো বড় কাগজে সেটিই আমার প্রকাশিত প্রথম ও শেষ কবিতা।চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করার পর সেশনজট দূর করার জন্য আমাদের এক বছর বসিয়ে রাখা হয় পরের ব্যাচের সাথে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করানোর জন্য। সেই এক বছরের অখ- অবসরে কবিতা লেখার পাশাপাশি একটি গল্প লিখে ফেলেছিলাম। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আবার যখন ঢাকায় ফিরে আসি, তখন জীবনে প্রথম লেখা গল্পটি জমা দিয়েছিলাম আবারও দৈনিক বাংলায়, আহসান হাবীবের কাছে। সেসময় একটা ঘোষিত ও অঘোষিত নিয়ম ছিল যে তিন মাসের মধ্যে ছাপা না হলে ধরে নিতে হবে, লেখাটি অমনোনীত হয়েছে। কলকাতার কাগজে যাঁদের লেখা ছাপা হতো না, সেসব ডাকযোগে ফেরত পাঠানোর এই সংস্কৃতিটা আমাদের সময় এখানে ছিল না, আগে ছিল কি না জানি না। তাই লেখার কপি রেখে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হতো। জীবনে প্রথম লেখা গল্পটা জমা দিয়ে আসার অল্প কিছুদিন পর আমার বন্ধু ফরহাদুর রেজা প্রবালের কাছ থেকে জানতে পারি দৈনিক বাংলায় আমার একটা গল্প ছাপা হয়েছে। ও জানায় খবরটা দিয়েছে ওর মা রাবেয়া খাতুন। গল্পটা এত তাড়াতাড়ি ছাপা হবে বলে আশা করিনি বলে পত্রিকাটির সাহিত্য পাতা দেখার প্রয়োজন মনে করিনি। প্রবালের কাছ থেকে জানার পর ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরির রেফারেন্স বিভাগে গিয়ে আগের সপ্তাহের দৈনিক বাংলা পত্রিকাটা বের করি। পরম বিস্ময় নিয়ে দেখতে পাই গল্পটা সত্যিসত্যিই ছাপা হয়েছে। জমা দেওয়ার সময় ওটার নাম দিয়েছিলাম ‘ক্ষীয়মান কালবেলা’, কিন্তু সম্পাদক নামটা পরিবর্তন করে ছেপেছেন ‘কালবেলা’ নামে। এতে আমার কোনো আপত্তি নেই, জীবনে প্রথম লেখা গল্পটা আহসান হাবীবের মতো সম্পাদক ছেপেছেন, এটাই পরম তৃপ্তি ও পরিপূর্ণতা।আশাতীতভাবে অবিশ্বাস্য কম সময়ে গল্পটি প্রকাশিত হওয়ার পর আমি খুবই উদ্দীপিত হলেও কবিতা লেখার চর্চা শুরু ছাড়িনি। এখন বুঝতে পারি সেসব ছিল ব্যর্থ প্রয়াস। সেসময় লেখা প্রকাশের জন্য অনেক কাগজ ছিল না, দৈনিক পত্রিকা হাতে গোনা: দৈনিক বাংলা ছাড়াও ইত্তেফাক, সংবাদ, পূর্বদেশ ও নতুন প্রকাশিত জনপদ। এসব কাগজের মধ্যে অবশ্যই সম্পাদনার কারণে দৈনিক বাংলার সাহিত্যের পাতাটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তরুণ কবি লেখকদের কাছে তখন খুবই আদৃত একটা কাগজ ছিল ওটা। প্রথম গল্পটি ছাপা হওয়ার সুবাদে আহসান হাবীবের কাছে যখন-তখন যাওয়ার একটা সুযোগ জুটে যায়। হাতে কোনো লেখা নেই, তবুও এমনিতেই দেখা করার জন্য যেতাম। সেসময় দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকদের অফিসে আড্ডার একটা সংস্কৃতি চালু ছিল।দৈনিক বাংলা অফিসের ছোট্ট লিফট দিয়ে উঠে তাঁর অপরিসর রুমে যেতাম। সেই ছোট খুপরিতে মাফরুহা চৌধুরীও বসতেন। পত্রিকাটির মহিলা অঙ্গন পরিচালনা করতেন তিনি। আহসান হাবীবের কাছে আমাদের মতো আরো অনেকেই যেতেন। তাঁদের মধ্যে দুজনের কথা বলা উচিত, আনা ও অ্যানি ইসলাম। পরবর্তী সময়ে আনা ইসলাম প্যারিস প্রবাসী শিল্পী শাহাবুদ্দীনের ঘরণী হয়েছেন। তরুণদের পেলে আহসান হাবীব খুব আনন্দিত হতেন। চায়ের সাথে ফরমায়েশ দিতেন সিঙাড়ার। আমাদের মতো তরুণদের পেলে সিঙাড়াটি সেতার বাজানোর মতো তাঁর চমৎকার সরু আঙুলে ভেঙে ভেতর থেকে আলু বের করে আমাদের খেতে দিয়ে নিজে খেতেন বহিরাংশ। বলতেন, আলু খাওয়া ডাক্তারের নিষেধ। আজকাল আমাদেরও এরকম ডাক্তারের নিষেধ মানতে হয়, কিন্তু আহসান হাবীবের কাছে যাওয়া অনুরাগী তরুণদের মতো কেউ কাছে নেই।দৈনিক বাংলায় প্রথম গল্পটি প্রকাশিত হওয়ার পর স্বভাবতই আমার মধ্যে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস জন্মায় যে আমি গল্প লিখতে পারব। এটাও বুঝতে পারি কবিতা আমার মতো অকবির বিষয় নয়। এই বিশ্বাসে আমি গল্প লেখায় মনোনিবেশ করি এবং বেশ কিছু গল্প বিভিন্ন কাগজে প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে জীবনের প্রথম অনুবাদটি করি আমি। নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের দোকান থেকে একটি গল্পের বই কিনেছিলাম, জন স্টাইনবেকের দ্য লং ভ্যালি। বইটির কিছু গল্প পড়ে আমি এতই উদ্বেলিত হয়েছিলাম যে তার একটি গল্প অনুবাদ করে ফেলি। গল্পটির নাম দ্য ¯েœক। জীবনে প্রথম অনূদিত গল্পটা যধারীতি দিয়েছিলাম আহসান হাবীবের হাতে। কাজটা তিনি নিশ্চয়ই পছন্দ করেছিলেন, তা না হলে ‘সাপ’ নামে ওটা তিনি ছাপতেন না। এটা ছাপা হওয়ার পর একদিন তাঁর অফিসে গেলে তিনি বলেছিলেন যে স্টাইনবেক তাঁর প্রিয় লেখক। সুতরাং আমি যদি তাঁর আরো কয়েকটি গল্প অনুবাদ করে দিই। তাঁর সেই অনুরোধে আমি আরো একটি গল্প অনুবাদ করি, ‘দ্য মার্ডার’ নামের সেই অনুবাদ গল্পটিও তিনি ছাপেন ‘হনন’ নামে।এ সময় হাঙ্গেরির জনপ্রিয় বিপ্লবী কবি সেনদর পেতোফিকে নিয়ে আমি একটা প্রবন্ধ লিখি, লেখাটিতে পেতোফির কিছু কবিতার অনুবাদ দিতে হয়েছিল। আহসান হাবীবের কাছে প্রবন্ধটি দেওয়ার পর তিনি আমাকে শুধু একটি কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন, লেখার মধ্যে কবিতাগুলো কার অনুবাদ? আমি বলেছিলাম আমারই করা। তিনি কিছু না বলে প্রশংসার চোখে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। সেদিন তাঁর দৃষ্টির মধ্যে সত্যিকার অর্থেই উৎসাহ পেয়েছিলাম। তাঁর সেই সৌম্যকান্তি চেহারার মধ্যে যে এক ধরনের প্রশংসা এবং ¯েœহমিশ্রিত প্রশ্রয় লুকিয়ে ছিল, সেটি আমার স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল।বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষদিকে আমি যখন আরো অনেকের সাথে চিত্রবাংলা নামের একটা কাগজে কাজ করছিলাম, তখন কবি আহসান হাবীবের একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার দায়িত্ব আমার ওপর পড়েছিল। বেশ তৃপ্তির সাথে সাক্ষাৎকারটি আমি নিয়েছিলাম তাঁর মগবাজারের বাসায়। মগবাজার রেলগেটের ঠিক পাশেই ছিল তাঁদের বাড়ি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই সাক্ষাৎকারটি এখন আমার কাছে নেই। সেসময় আলাপ হয়েছিল বহু বিষয়ে। তিনি যে একজন ভবিষ্যৎদ্রষ্টা মানুষ ছিলেন তার প্রমাণ পেয়েছিলাম সেবার। সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে আলাপে উঠে আসে আমাদের সমসাময়িক এক ঈর্ষণীয় গল্পকারের কথা। তাঁর গল্পগুলো হাসান আজিজুল হক সহ অনেক মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। সেই প্রতিশ্রুতিশীল গল্পকারের কথায় তিনি একটা অমোঘ উক্তি করেছিলেন। স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে বলতে পারি, তিনি বলেছিলেন, দেখে রেখো, সে কখনোই উঠতে পারবে না। তাঁর কথাটি পরবর্তী সময়ে কিংবা এখনো সত্য বলে মনে হয়েছে। তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল একজন লেখক সম্পর্কে তাঁর সেই পূর্বাভাষ থেকে বুঝতে পারি, একজন সাহিত্য সম্পাদক কেবল তাঁর কাগজে প্রকাশিত লেখাই সম্পাদনা করবেন না, তাঁর মধ্যে একজন লেখকের ভেতরের জিনিস এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাটা বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে। এই হিসেবেও আহসান হাবীব ছিলেন নিশ্চিতভাবে একজন সফল সাহিত্য সম্পাদক। তরুণদের তিনি যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন, যাঁদের প্রায় সবাই পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। লেখালেখি প্রকাশে আমার অভিষেক কিংবা এই জগতে টিকে থাকার জন্য আমার জীবনে আহসান হাবীবের যে অসামান্য অবদান, তার জন্য কিছুমাত্রায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশের চেষ্টা করেছি আমার দ্বিতীয় গল্প সংকলনটি তাঁকে উৎসর্গ করার মাধ্যমে।The post একজন প্রকৃত সাহিত্য সম্পাদক appeared first on arts.bdnews24.com.