শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬, ০৭:২৮ অপরাহ্ন

লুটেরা দমনে

মজুতদারদের সাথে ব্যাংক লুটেরাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কেনো নয়?

দেওয়ান ফয়সল
  • খবর আপডেট সময় : বৃহস্পতিবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩
  • ৩০৮ এই পর্যন্ত দেখেছেন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশকে যে ভাবে অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তা দেখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার যেমন মূল্যায়ন করছে ঠিক তেমনি দেশের জনগণও তার সুফল ভোগ করতে শুরু করেছে।

কিন্তু দু’টি কারণে দেশের অগ্রগতি বিশেষ ভাবে বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। তার প্রথমটি হচ্ছে দেশের কিছু অসাধু মজুতদার ব্যবসায়ীদের কারণে এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে ব্যাঙ্ক থেকে টাকা লুটপাট করা ব্যক্তিদের কারণে। আজকের লেখায় দুটি বিষয় নিয়েই একটু আলোচনা করবো। গত বছরের ১৩ই মে ’বাংলা ট্রিবিউন’ পত্রিকায় ” অসাধু মজুতদারের শাস্তি মৃত্যুদন্ড” শিরোনামে এক খবর প্রকাশিত হয়েছিলো। খবরে প্রকাশ, দেশে মজুতদারদের কারসাজিতে ভোজ্যতেলের সংকট দূর করতে দেশজুড়ে শুরু হয় ভ্রাম্যমান আদালতের কার্যক্রম। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী দুই বছরের সাজা ও জরিমানাতেও অসাধু ব্যবসায়ীদের লাগাম টানা যাচ্ছে না। অথচ জনস্বার্থ- সংশ্লিষ্ট এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ নেই বিশেষ ক্ষমতা আইনের।

আইনবিদদের মতে, বিশেষ এই আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে অসাধু মজুতদারদের মৃত্যুদন্ডের সাজা পর্য্যন্ত হতে পারে। এটা করা হলে তাদের মনে ভীতির সৃষ্টি হবে এবং কমে যাবে তাদের অসাধু মনেভাব। অবৈধ মজুতদারী এবং কালোবাজারীর শাস্তি সম্পর্কে বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪-এর ২৫(১) ধারায় বলা হয়েছে ”মজুতদারী বা কলোবাজারীর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে সেই ব্যক্তি মৃত্যুদন্ডে, যাবজ্জীবন কারাদন্ডে বা ১৪ বছর পর্য্যন্ত মেয়াদে ও তদুপরি জারিমানা দন্ডেও দন্ডিত হবে। তবে শর্ত থাকে যে, মজুতদারীর অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি প্রমাণ করে যে, আর্থিক বা অন্যবিধ লাভ করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং সে অন্য কোনও উদ্দেশ্যে মজুত করেছিল, তবে সে তিন মাস পর্য্যন্ত কারাদন্ডে ও তদুপরি জরিমানা দন্ডে দন্ডিত হবে। এই বিশেষ ক্ষমতা আইনে মৃত্যুদন্ডের সাজা হলে দোষী ব্যক্তিকে ৩৪(ক) ধারা অনুসারে ফঁসি দিয়ে বা নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে গুলি করে দন্ড কার্য্যকর করারও বিধান রয়েছে।

হাইকোর্টের আইনজীবী সৈয়দ মহিদুল কবির  অভিযোগ করে বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীদের স্বল্প সাজা দিয়ে অপরাধকে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। এতবড় ঘৃণিত অপরাধের বিরুদ্ধে সুযোগ থাকা সত্বেও বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে না।
অসাধু মজুতদারদের দমন করার জন্য দেশে যে বিশেষ ক্ষমতা আইন পাশ হয়েছে সে আইনটি বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য্য হয়ে পড়েছে। কেননা, একদিকে সরকারকে বর্তমানে রাজনৈতিক, সামাজিক সহ বিভিন্ন দিক দিয়ে বিরাট চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করে চলতে হচ্ছে। বিশেষ করে স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের লাগামহীন মিথ্যা অপপ্রচার, বিদেশে বাংলাদেশে উজ্বল ভাবমূর্তি নস্যাৎ করার চক্রান্তে অনবরত কাজ করে যাচ্ছে। অবশ্য সে দিন আর বেশি দূরে নয়, এসব স্বাধীনতা বিরোধীদের ধ্বস অচিরেই নেমে আসছে, একটু সময়ের ব্যাপার মাত্র। সুতরাং দেশবাসীকে ধৈর্য্য সহকারে এই সময়টুকুর জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

অন্যদিকে, বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, অসাধু ব্যবসায়ীরা এখন থেকেই চাল, ডাল, ছোলা, ভোজ্য তেল সহ বিশেষ করে রমজান মাসে ব্যবহারযোগ্য পণ্যগুলো বাজার থেকে সরানো শুরু করেছে, যার ফলে বাজারে এ সব জিনিষের দাম বাড়তে শুরু করেছে। সেই সাথে সরকারকে এ সব অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। আমাদের দেশে যে পরিমাণ ফসল, শাকশব্জি, ডাল, তরিতরকারী বিভিন্ন জেলায় উৎপাদন হয়, তা দেশের বাজারে ঠিকমতো সরবরাহ করা যেতে পারলে একদিকে যেমন ক্রেতারা সুলভ মূল্যে কিনতে পারতেন অন্যদিকে কুষকরা ন্যায়্য মূল্য পেতেন। কিন্তু বাঁধ সেজেছে সিন্ডিকেটের দল। তারা কৃষকদের কাছ থেকে অতি অল্পমূল্যে কিনে গুদামজাত করে রাখে এবং যখন মওসুম চলে যায় তখন চড়া মূল্যে বাজারে বিক্রি করে। যার ফলে কৃষকরা যেমন ন্যায্য মুল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়, ঠিক তেমনি ক্রেতদেরও অত্যধিক মূল্য দিয়ে কিনতে হয়। লাভবান হয় এসব মজুতদাররা।

সম্প্রতি যে বিশেষ আইন পাশ হয়েছে, সেই আইনের যদি সঠিক বাস্তবায়ন হয় তাহলে হয়তো তার সুফল জনগণ ভোগ করতে পারবে। তবে এই আইনের বাস্তবায়ন কতটুকু সম্ভব হয় তা নিয়ে জনগণের মধ্যে বিরাট সংশয় রয়েছে। কারণ এসব সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত রয়েছে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ এবং সাথে আছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অসাধু গোষ্ঠি। এদেরকে প্রতিহত করতে হলে প্রয়োজন সৎ এবং উচ্চ পর্য্যয়ের দেশপ্রেমিক আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের এবং তাদের সহযোগিতা করতে হবে প্রতিটি এলাকার সৎ রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণকে। এভাবে যদি একতাবদ্ধ হয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া যায় এবং যারা ধরা পড়বে তাদের বিরুদ্ধে উপরোক্ত আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তাহলেই হয়তো তা কন্ট্রোল করা যেতে পারে। আর তা কন্ট্রোল করে নিতে পারলে বাজারে যদি মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম স্থিতিশীল হয়ে যায়, তাহলে তথাকথিত বিরোধী দলের আন্দোলনও নস্যাৎ হয়ে যাবে। সুতরাং এই বিশেষ ক্ষমতা আইনটিকে যে ভাবেই হোক কার্য্যকরী করতে হবে সরকারকে।

দ্বিতীয়টি হচ্ছে ব্যাঙ্ক থেকে টাকা লুটপাটের ঘটনা যা দেশবাসীকে বিক্ষুব্ধ করে তুলছে। লন্ডন থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক জনমত পত্রিকার ২০২২ সালের ৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত ”ব্যাংক থেকে টাকা কোথায় যাচ্ছে” শিরোনামে জনা মারুফ মল্লিকের একটি লেখা পড়লাম। লেখাটির কিছু অংশ এখানে তুলে ধরলাম। “গত এক দশক কি ব্যাংক লুটের দশক হিসেবে চিহ্নিত হবে? এই সময়ে একের পর এক ব্যাংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সাধারণ মানুষের ব্যাংকে আমনতকৃত অর্থ ঋণের নামে লুটিয়ে নিয়েছে একশ্রেণীর দুর্ণীতিবাজ ব্যবসায়ী ও ব্যাংকের মালিকশ্রেণি। সর্বশেষ ইসলামী ব্যাংক সহ তিনটি ব্যাংক থেকে ্ঋণের নামে ৯ হাজার কোটি টাকা লোপাট হওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। শুধু ইসলামী ব্যাংক থেকেই নিয়েছে ৭ হাজার কোটি টাকা।

এ প্রতিবেদন যদি সত্য হয় বা ভিত্তিহীন না হয়ে থাকে, তবে দেখা যাচ্ছে কেবল ইসলামী ব্যাংক থেকে লোপাট হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকার মতো। এমনও প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দেয়া হয়েছে, যাদের অস্তিত্বই নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় আবাসিক ভবন পাওয়া গিয়েছে। এসব ভবনে মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন। এই হচ্ছে ব্যাংক খাতের অবস্থা। কে কাকে ঋণ দিচ্ছে তার কোন জবাবদিহিতা নেই।

এক যুগ ধরেই ব্যাংকগুলো লুটপাটের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। অভিনব পদ্ধতির এই লুটপাটের কথা বলতে গেলে চলে আসে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সোনালী ব্যাংকের নাম। ২০১১ সালে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে হলমার্কের নামে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এ ঘটনার বিচার চলছে। কিন্তু সোনালী ব্যাংক এখনো টাকা ফেরত পায়নি। সোনালী ব্যাংক দিয়ে যে সূচনা হয়েছে সেই পথ ধরে একের পর এক বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নানা ভাবে টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। কখনো ভুয়া কোম্পানী নামে, কখনো মালিক পক্ষ নিজেই টাকা তুলে নিয়েছে। বেসিক ব্যাংকের সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার অনিয়মের তথ্য ফাঁস হয়েছে। মোটামুটি একই পদ্ধতি অনুসরণ করে আরও অন্তত: ৯/১০টি ব্যাংক থেকে হাাজর হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে, ঋণপত্র খোলার নামে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে।

এ পর্য্যন্ত কত টাকা লোপাট হয়েছে, এর কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে একটা আনুমানিক হিসাব প্রস্তুত করা সম্ভব। প্রথম আলো’র গত বছরের ২৪ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ব্যাংক থেকে গত এক দশকে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার ঋণ প্রদান করা হয়েছে বিভিন্ন স্বত্ত পরিচিত ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে। এর সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের হিসাব যুক্ত করলে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণের নামে হাতিয়ে নেয়ার অর্থের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। কিন্তু এসব ঋণের অর্থ ফেরত আসার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, বিভিন্ন বেনামী প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়া হয়েছে।”

লুটপাটের এসব কোটি কোটি টাকাগুলোর অধিকাংশই কিন্তু দেশ থেকে বাইরে চলে গেছে। এসব টাকা দিয়ে তারা দামী দামী বিলাসবহুল বাড়ি কিনছে কানাডা বৃটেনের মতো দেশগুলোতে যেসব এলাকার নামকরণ করা হয়েছে বেগম পাড়া। লন্ডনের অভিজাত এলাকা নাইটব্রীজে ২০২০ সালে ৯ মাসে ৯৮টি বাড়ি কিনেছেন বাংলাদেশীরা যার মূল্য তখনকার সময়ে ছিলো প্রতিটি দেড় হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে এর মূল্য দ্বিগুন হয়েছে। এই খবর প্রকাশ হওয়ার পর বৃটেনে বাংলাদেশীদের মধ্যে ভীষণ ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

যুক্তরাজ্যের অন্যতম কোটিপতি ব্যবসায়ী ইকবাল ব্রাদার্সের মালিক ইকবাল আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এদেশে আমরা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং প্রচুর টাকার মালিক অথচ লন্ডনের অভিজাত এলাকা নাইটব্রীজের মতো অভিজাত এলাকায় বাড়ি কেনার সাহস পাই না। তারা কি ভাবে বাংলাদেশ থেকে টাকা এনে এখানে বাড়ি কিনতে পারে। এ টাকাগুলোর উৎস কোথা থেকে আসে এটাই আমাদের প্রশ্ন?

অভিজ্ঞ মহলের কাছে একটিই প্রশ্ন বাংলাদেশ থেকে এসব টাকাগুলো কি ভাবে বিদেশে চলে আসে? বাংলাদেশ থেকে টাকা বিদেশে পাঠানোর জন্য কোন ছাড় দেয়া হয়না শুধুমাত্র মালপত্র আমদানী রফতানীর ক্ষেত্রে ডলারের মাধ্যমে এলসি খুলে তা করতে হয়। বাংলাদেশ থেকে লুটপাটের টাকা কি ভাবে বিদেশে পাচার হয় তা খতিয়ে দেখা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। এসব টাকাগুলো যদি বিদেশে পাচার না হতো তাহলে আজ বাংলাদেশের রিজার্ভে ঘাটতি হতো না বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ কানায় কানায় ভর্তি থাকতো।

দেশবাসীর দাবি, অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ ক্ষমতা আইনে মৃত্যুদন্ডের যে বিধান চালু করা হয়েছে, সেই বিশেষ আইনের অধীনে এসব লুটেরাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনে এই আইনকে সংশোধন করে এদেরও ঢুকাতে হবে। এই বিশেষ ক্ষমতা আইন শক্ত হতে বলবৎ করতে হবে। এসব লুটেরাদের অনেকেই এখনও দেশে আছে, তারা যাতে দেশের বাইরে না যেতে পারে সে ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে এবং দেশেই ভ্রাম্যমাণ আদালতে তাদের বিচার করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে অন্যথায় দেশকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে। সরকারের প্রতি দাবি রইলো, সময় থাকতে ব্যবস্থা করুন।

লেখকঃ কলামিষ্ট, সিনিয়র সাংবাদিক ও সদস্য লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102