

এই সময়কার কবিদের মধ্যে যাঁরা একমাত্র কবিতার মধ্যে নিজেকে আদ্যোপান্ত সোপে দিয়েছেন এবং নিজের নামটাকে কবিতার সাথে সাথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক । জন্ম ১৯৬৪
সনের ১৬ ই জুন — ভারতবর্ষ অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার ঐতিহাসিক শহর শ্রীরামপুরে শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে । পিতা ঈশ্বর পীযূষ কিন্তু ভৌমিক, মাতা শ্রীমতী ছায়ারাণী ভৌমিক ।এই ভৌমিক পরিবারের মধ্যম সন্তান কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক । অল্প বয়স থেকেই কবিতা বলা এবং লেখার প্রতি তাঁর একটু একটু করে আগ্রহ জন্মায় । সেই অমোঘ অনুরাগ ছোট্ট বিদ্যুৎকে কবি হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে । যথেষ্ট অধ্যবসায়ের সাথে অহর্নিশ চলে তাঁর কবিতাচর্চার অনুশীলন । তার ভেতর চলে বাচনক্রিয়া এবং
স্বরক্ষেপণের চড়াই – উৎরাই । প্রতিদিন তাঁর সকাল শুরু হয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতাপাঠ দিয়ে । কবিতা হোক কিম্বা অন্য কোনো রচনা, সে যাই হোক, কবি বিদ্যুৎ এর লেখা পড়তে পাওয়াই এক গভীর অভিজ্ঞতা । পলকে মনস্ক পাঠকদের
মনের অতলান্তে ঢুকে যান তিনি । বিদ্যুৎ এর ভাষার সুরঝংকৃত স্বকীয়তায় আবিষ্ট হয় ভারত ও বাংলাদেশের পাঠকমন । পাঠক সমাজ তাঁকে প্রকৃত কবি হয়ে ওঠার দুঃসাহস দিয়ে চলেছেন । কলকাতার একটি বিশেষ দৈনিক পত্রিকা কালান্তর এর রবিবারের পাতায় বেশ কিছু বড়দের জন্য গল্প লিখে গল্প লেখক হিসেবে ইতোমধ্যে সুনাম অর্জন করেছেন । অথচ কবি বিদ্যুৎ এর কাছে জানতে চাইলে তিনি সহাস্যে বলেন ; এসব আমার একেবারে ইচ্ছা ছিল না, আমি গল্প লিখে নাম করব । সাংবাদিক বন্ধু শ্রীযুক্ত মৃণাল দত্তের আবদার দৈনিক কালান্তর এ আমাকে গল্প লিখতে হয়েছে । সে অবশ্য অনেক আগে । আমি মূলত কবি
হিসেবেই বেশি পরিচিত আমি, এটা সবাই জানেন ।
আমার গল্প ভালো হয়ে গেছে, এটা এ্যাক্সিডেন্ট । যেমন ধরুন, আমি রাধুনি কিন্তু নই । আমার স্ত্রী জয়ীতা যখন বাপের বাড়ি যান তখন তাঁর
জায়গাটা আমাকে নিতে হয়, অর্থাৎ রান্নাবান্না করতে হয় এই আমাকে । কোনো কোনো দিন হঠাৎ করে আমার হাতে ভালো রান্না হয়ে যায় । তা বলে এই নয় আমি পাকা রাধুনি । গল্পের বা গদ্যের ব্যাপারে ঠিক একই কারণ, হঠাৎ করে যদি আমার এই কলম দিয়ে ভালো গল্প সৃষ্টি হয়, তা বলে এই নয় বিদ্যুৎ ভৌমিক
ভালো গল্পকার । আমি আমার জায়গায় থাকতে ভালোবাসি ।”
কবিতার জগতের মধ্যে আর একটা বিশেষ বিষয় শিশুসাহিত্য, কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক শিশু ও কিশোরদের জন্যেও লিখছেন বহু জায়গায় । তার মধ্যে * সন্দেশ * মৌচাক * কিশোরভারতী * শুকতারা * শিশুমহল ( ত্রিপুরা ) * শিশু সাহিত্য আকাদেমি *
সাহানা * ছোটদের কচিপাতা * রাজপথ দৈনিক *চাঁদের হাট ইত্যাদি । শুনলে অবাক হতে হয় কবি বিদ্যুৎ এর কবিতার ও ছড়ার সংখ্যা দশ হাজারেরও বেশি । লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের একজন সৈনিক তিনি । ভারত ও বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর বেশির ভাগ পত্র পত্রিকায় ৩০ /৩৫ বছর ধরে একমাত্র কবিতাকেই উপজীব্য করে যিনি ইতিমধ্যেই জনপ্রিয়
হয়ে উঠেছেন, তিনি আমাদের প্রিয় কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক । কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর কবিতা শুনে বলেছেন, এ সময়কার তরুণ কবিদের মধ্যে বিদ্যুৎ ভৌমিকের কবিতা পড়লে মনের গঠনমূলক সৃজনশীল ভাবনা চোখের সামনে এসে ধরা পড়ে ।”
আকাশবাণী এবং কলকাতা দূরদর্শনের তিনি বিশেষ আমন্ত্রিত বাচিক শিল্পী ও কবি । তিনি RADIO JU90.8 MHZ FM এর একজন নিয়মিত কবি ও আবৃত্তিকার । কবি কৃষ্ণা বসু তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, – বিদ্যুৎ ভৌমিক একজন কবিতাপ্রাণ তরুণ কবি । তাঁর কবিতার প্রতি অনুরাগ আমাদের আপ্লুত করে । তাঁর
কবিতায় প্রকৃতি, জীবন, সময়, প্রেম, কালপ্রবাহ যেভাবে ধরাপড়ে তাও ভালোলাগার । কবি বিদ্যুৎ – এর কবিতায় কখনো ছন্দের, কখনো গদ্যের প্রবাহ দেখবার মতো বিষয় । শব্দব্যবহারে
সাবলীল তাঁর কবিতাগুলি । বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে যাতায়াত রয়েছে তাঁর । তিনি অতিমাত্রায় রোমান্টিক । কবি বিদ্যুৎ এর কবিতা সহজেই সংযুক্ত হয় পাঠকের সঙ্গে আর শিল্পের শর্তও রক্ষিত হয়েছে পূর্বাপরই । তিনি জীবনকে দেখেছেন নানা কোণ থেকেই ।কোনো একটি বিশেষ দৃষ্টিতে সীমাবদ্ধ নয় তাঁর মানসিকতা । বৈচিত্র্যই, জীবনবিচিত্রতা – ই তাঁর বিষয় কবিতার
ক্ষেত্রে । আমি তাঁর দীর্ঘদিনের পাঠক ও ভক্ত । কবি বিদ্যুৎ – এর সাথে আমি টেলিভিশনে বিভিন্ন কবিতা নির্ভর অনুষ্ঠান প্রায়শইকরে থাকি । কবি বিদ্যুৎ আরো আরো লিখবেন । বহুবর্ণ জীবন দুলে উঠবে তাঁর কবিতার ছত্রে ছত্রে ; এই আশায় — । ” বিদ্যুৎ –
এর নয়নশোভন হস্তাক্ষর ও প্রচ্ছদশিল্প অত্যন্ত আকর্ষণীয় । বহু বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিকদের বইয়ের প্রচ্ছদ অঙ্কনে বিদ্যুৎ – এর মৌলিক চিন্তার প্রতিফলন ঘটে । কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকের কবিতা ও কথায় একপ্রকার প্রশ্রয় থাকে । যেখানে তিনি সিদ্ধান্তে না গিয়ে অপরূপ অভিজ্ঞতাকে নিজের মধ্যেই ধরে রাখেন এবং অনুপিঙ্খ তন্ময়তায় উচ্চারণ করেন ধ্রুপদী হৃদয়তান্ত্রিক উচ্চারণ “— আর সেই নিভৃত অন্তরালে কবি রচনা করেন তাঁর অবসরের কবিতা
প্রহর । তাই তাঁর স্পষ্ট এবং ব্যতিক্রমী লাইন — যে পৃথিবী ভেজার কথা সে পৃথিবী ভেজেনি” । আর তাই যে কবিতা লেখার কথা সে কবিতা আসেনি “। এই ছটফটানি কিম্বা আত্মখেদ দিয়েই কবি
বেঁচে থাকেন । বেঁচে থাকে কবিতা । ( নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতি – র মুখপত্র শিক্ষা ও সাহিত্য TEACHER’S JOURNAL – 2006 – এর SEPTEMBER প্রকাশিত ) । বঙ্গীয় সংগীত পরিষদের শ্রীযুক্ত সুবোধ গঙ্গোপাধ্যায় একটি পত্রে কবি বিদ্যুৎ ভৌমিককে লেখেন,
শান্তিনিকেতন – বিশ্বভারতীর আহ্বান নিশ্চিতভাবে প্রশংসনীয় “।SENIOR CITIZEN CLUB WITH SHELTERED ACCOMODATION থেকে ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৩ ভাষা সহিদ দিবস – কবি বিদ্যুৎ ভৌমিককে সংবর্ধনা জানায় । লালন শাহ্ বটতলা সাধুসঙ্গ ১৪১৮, নভেম্বর ঢাকা বিক্রমপুরে উক্ত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানায় ২০১১ । বাংলাদেশ ঢাকার সমস্ত দৈনিক পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয় এবং বাংলাদেশের সবকটি টিভি চ্যানেল কবি বিদ্যুৎ এর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে । এর আগে ১৯৯৩ বাংলাদেশের * জাতীয় কবিতা পরিষদ ‘ ফরিদপুর, কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক কে মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ কবিতা ” গ্রন্থের সহ সম্পাদনার দায়িত্ব দেন । কিন্তু সে দায়িত্ব কবি বিদ্যুৎ নেন নি !
গত ০৩ /১০ /১০ আকাশবাণী ও দূরদর্শন – কবিতা যখন আবৃত্তি’ নামক বিশেষ কবিতা নির্ভর অনুষ্ঠানে তাঁকে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে সম্মান জ্ঞাপন করে । কবি বিদ্যুৎ – কে ৪৫ মিনিট স্বরচিত কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠান দেয় দূরদর্শন কেন্দ্র কলকাতা । এর আগে ১৯৯৬ বিশ্বভারতী পল্লীসংগঠন বিভাগ লাইব্রেরি, শ্রীনিকেতন কবি ও সাহিত্যিক সম্মেলনে বিদ্যুৎ ভৌমিককে স্বরচিত কবিতা পাঠের জন্য আমন্ত্রণ জানায় । এই অনুষ্ঠানে সময়সীমা ছাড়াও তাঁকে দ্বিতীয়বার শ্রোতাবন্ধুদের অনুরোধে ঐ একই মঞ্চে কবিতা পাঠ করতে হয় । ২০০০ সালে American Biographical Institute তাঁকে MAN OF THE YEAR সম্মান জানায়, এরই কয়েক বছর পর একই সংস্থা কবি বিদ্যুৎ – কে THE WORLD MEDAL OF FREEDOM – ২০০৬ দিয়ে সম্মান জানায় । বাংলা কবিতা আকাডেমি আয়োজিত কবিতা উৎসব ২০০৬ তাঁকে আমন্ত্রণ জানায় । পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি শিশুসাহিত্য উৎসবে কবি বিদ্যুৎ ভৌমিককে ছড়াশিল্পী হিসাবে আমন্ত্রণ করে ।
বহুশ্রুত ও জনপ্রিয় কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক এই সময়ের কবিতা জগতে এতটাই নাম করেছেন, যে প্রতিদিন তাঁকে কবিতার যোগান দিতে হয় প্রথম শ্রেণীর পত্র পত্রিকা গুলিতে । তাঁর সৃষ্টির ভেতর তিনিই মহান ।” এই অমোঘ উক্তি কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় । ” কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যদি না থাকতেন তাহলে আমাকে
এই কবিতার জগতে কেউ চিনতেন না ।” উক্তিটি করেছেন কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক । তাঁকে আমাদের দেশের অর্থাৎ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনেক অনেক অভিনন্দন ও ভালোবাসা রইলো ****
তিনি দীর্ঘজীবী হোন এবং তাঁর কবিতা আরও পৃথিবীময় হয়ে উঠুক এই প্রার্থনা করি ।
লেখক সাংবাদিক ডঃ আদিত্য বসু !