

নবাব উদ্দীনঃ “প্রত্যেক প্রাণই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আমি তোমাদের ভাল ও খারাপ অবস্থা দিয়ে পরীক্ষা করি। আর আমারই কাছে তোমাদের ফিরে আসতে হবে।” (সূরা আম্বিয়া আয়াত: ৩৫)
বিশিষ্ট লেখক, গবেষক, সাংবাদিক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বিলেতের বাঙালির অভিভাবক, বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ প্রণেতা নূরুল ইসলাম গত ১১ জানুয়ারি মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় এসেক্সের রমফোর্ডস্থ কুইন্স হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন।
গত নভেম্বরেই ভাবছিলাম উনার বাসায় গিয়ে দেখা করে আসবো। সঙ্গে থাকার কথা ছিল সাঈম চৌধুরী ও আ স ম মাসুম। এ মর্মে কথাও হয়েছিল তাঁর ছেলে মুরসালিনের সাথে। কিন্তু এর আগেই তিনি মহান রাব্বুল আলামীনের ডাকে চলে গেলেন পরপারের ঠিকানায়।জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি নিজের বাসভবনেই কাটিয়েছেন। বিদ্যোৎসাহী এ লেখকের ইচ্ছা ছিল নিজ এলাকায় একটি বিশাল পাঠাগার গড়ে তোলা। জীবৎকালের অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলশ্রতিতে তার সেই ইচ্ছা পূরণ হতে যাচ্ছে। সুবিশাল এই গ্রন্থাগারের কাজ প্রায় শেষের পথে।
পরম শ্রদ্ধেয় নূরুল ইসলাম ছিলেন বঙালি কমিউনিটির প্রাণপুরুষ। তাকে বিলেতের বাঙালিদের অভিভাবক বললে সামান্যও অত্যুক্তি হবে না। বহুগুণের অধিকারী এই ইতিহাসবিদের চলে যাওয়ায় কমিউনিটিতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো তা সহজে পূরণীয় নয়। তিনি চলে গেলন ঠিকই, কিন্তু প্রবাসী বাঙালিদের নিয়ে তার লেখা মহান ইতিহাস চিরকাল বেঁচে থাকবে। তার মৃত্যুতে আমার মনের পর্দায় ভেসে উঠছে অসংখ্য স্মৃতি। রক্ত সম্পর্কে তিনি আমার আত্মীয় নন, কিন্তু মনে হয় তিনি আমার আত্মার আত্মীয়। তাঁর মৃত্যুতে মনে হচ্ছে আমি যেন একজন বড়ভাই, অভিভাবক তথা পরমাত্মীয়কে হারালাম।
সাপ্তাহিক জনমতের হাত ধরেই তাঁর সাথে আমার পরিচয়। আমি বয়সে তার অনেক ছোট অথচ তিনি আমাকে নবাব সাহেব সম্বোধন করতেন। অতি বিনয়ী, ভদ্র, প্রতিভাধর এই লেখককে বিলেতের বাঙালি কমিউনিটি তেমন মূল্যায়ন করতে পারে নি। আমার জনমতে থাকাকালীন তিনি প্রায় প্রতি সপ্তাহেই জনমতে আসতেন, নিয়মিত জনমতে লিখতেন এবং তার লেখা ছাপা হলে তিনি ৫/৬ কপি জনমত নিয়ে বাসায় ফিরতেন। তিনি একাধারে সুলেখক ও জাদরেল পাঠক ছিলেন। তাঁকে বাঙালি কমিউনিটির দুঃসমের সাথী, দুরাশার আশা ও বাতিঘর হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। বিলেতে বাঙালির টিকে থাকার আন্দোলনে নূরুল ইসলাম ছিলেন অগ্রসৈনিক। দাবি আদায়ে কমিঊনিটির জন্য ইংরেজি চিটি লেখা, গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদ প্রভৃতির জন্য নূরুল ইসলামই ছিলেন অন্যতম ভরসাস্থল।
তাঁর সাথে আমি শেষ কাজটি করি আজ থেকে প্রায় ১৭/১৮ বছর আগে। আমি বাংলাদেশের ‘ইটিভি’র জন্য একটা ডকুমেন্টারি তৈরি করলাম, যার নাম ছিল ‘বাঙালির প্রবাসযাত্রা’। তারপর গত নভেম্বরে একটা সাক্ষাৎকার নেয়ার কথা ছিল। কথাও হয়েছিল বাসায় যাব। কিন্তু আর যাওয় হলো না। তাঁর ছেলে মুরসালিনের সাথে আমার প্রায়ই যোগাযোগ হয়। গেল ডিসেম্বর ২০২১ এ আমি উমরা করতে সৌদি আরবে যাই। আমার মক্কা অবস্থানকালে মুরসালিন ফোন করে জানালো যে তার বাবা কোভিড আক্রান্ত এবং ২৭ ডিসেম্বর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে; অবস্থা স্থিতিশীল। প্রত্যুত্তরে আমি জানিয়েছিলাম, তোমার আব্বার জন্য দোয়া করবো। আমি ভাবতেও পারি নি যে, উমরা থেকে ফিরে এসে তার মৃত্যুর খবর আমাকে শুনতে হবে। তার ইন্তেকালের খবরে যতটা না কষ্ট পেয়েছি তার চেয়েও বেশি মর্মবেদনায় ভোগছি তার জানাজায় অংশগ্রহণ করতে না পেরে। বস্তুত, উমরা থেকে ফিরে অনেক সতর্ক থাকার পরও আমি করোনা আক্রান্ত হয়ে পড়ি। সবই আল্লাহর ইচ্ছা; মহান প্রভুর ফায়সালায় পূর্ণ আস্থা আছে। দোয়া করি নূরুল ইসলাম সাহেবকে যেন আল্লাহ তাআলা জান্নাতুল ফেরদাউস দান করেন।
লেখক, গবেষক নূরুল ইসলাম ১০৭৯ পৃষ্ঠার প্রবাসীদের ইতিহাস গ্রন্থ ‘প্রবাসীর কথা’ রচনা করে শুথু প্রবাসী বঙালির দায়িত্ব নয়, পুরো জাতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সুবৃহৎ গ্রন্থে ফুটে উঠেছে প্রবাসী বাঙালির যাপিত জীবনের বিচিত্র কাহিনী, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা ও চাওয়া-পাওয়ার কথা। প্রবাসের প্রতিক‚ল পরিবেশে বিশ্ববাঙালির প্রাণের কথা বিধৃত হয়েছে তাঁর এই গ্রন্থটিতে। তাই প্রবাসীদের সুদীর্ঘকালের জীবন সংগ্রাম সম্পর্কে জানতে তাঁর এই ঐতিহাসিক গ্রন্থটি পড়ার বিকল্প নেই।
বহু প্রতিভার অধিকারী নূরুল ইসলাম ১৯৩২ সালের ১ জুন সিলেট সদর থানার সদরখলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সিলেট এমসি কলেজে অধ্যয়নকালে ১৯৫২-৫৩ সালে তিনি কলেজ ইউনিয়নের সেক্রেটারি নির্বাচিত হন এবং ভাষা আন্দোলনে অবদান রাখেন। ঢাকায় ভাষা আন্দোলনরত ছাত্রদের গুলি করে হত্যার প্রতিবাদে এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তৎকালীন গোবিন্দ পার্কে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ঐতিহাসিক প্রথম সভায় তিনি সভাপতিত্ব করার বিরল গৌরবের অধিকারী। ১৯৫৩-৫৪ সালে তিনি সিলেট মহকুমা (বর্তমান সিলেট জেলা) ছাত্র ইউনিয়নের (ইপসু) প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তখন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পাশাপাশি যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে একনিষ্ঠভাবে কাজ করেন। নুরুল ইসলাম ১৯৫৬ সালের ৬ নভেম্বর ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য বিলেতে আসেন। লন্ডনে তিনি ১৯৫৮ সালের আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৩ সালে ‘ন্যাশনাল ফেডারেশন অব পাকিস্তান অ্যাসোসিয়েশন ইন গ্রেট ব্রিটেন’ গঠনের অন্যতম প্রধান এবং ১৯৬৪ সালে ‘ইস্ট পাকিস্তান হাউস’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নূরুল ইসলাম।
১৯৬৬ সালে বাংলাদেশে ভ্রমণকালীন লন্ডনে ইস্ট পাকিস্তান হাউসকেন্দ্রিক পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীনতার নামে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার করে পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করা হয়। ফলে লেখাপড়ার সেখানেই ইতি ঘটে। তিনি দেশে ৬-দফা আন্দোলন, সত্তরের নির্বাচন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং শেষ পর্যন্ত ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ভারতে তখন ৪ ও ৫ নং সেক্টরের প্রতিনিধি দেওয়ান ফরিদ গাজীর (প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা সম্পন্ন) একান্ত সচিব ছিলেন।
১৯৭১ সালে তিনি মুজিবনগর সরকারের নির্দেশে বহির্বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য বাংলাদেশ সরকারের ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি আব্দুস সামাদ আজাদের সফরসঙ্গী হিসেবে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। স্বাধীনতা লাভের পর বৃহত্তর সিলেট জেলাকে পুনর্গঠনের জন্য দেওয়ান ফরিদ গাজীর নেতৃত্বে সিলেটের সকল পার্লামেন্ট সদস্যকে নিয়ে গঠিত ‘সিলেট জেলা প্রশাসন পরিষদ’-এর সচিব ছিলেন। একই সঙ্গে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর দোসর ঘাতক-দালাল ও রাজাকারদের বিচারের জন্য গঠিত ‘সিলেট জেলা ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি’র সঙ্গেও দীর্ঘদিন কাজ করেন। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রবাসীদের কল্যাণার্থে ‘প্রবাসী বাঙালি কল্যাণ বোর্ড’ গঠিত হলে এটির সচিব হিসেবে ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট পর্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন।
১৯৭৮ সালে সিলেটে ‘বাংলাদেশ ওভারসিজ সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করা হলে তিনি এটির ট্রাস্ট্রি বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। যুক্তরাজ্যে বাঙালিদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ের আন্দোলনের পাশাপাশি সাংবাদিকতার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তিনি লন্ডন থেকে প্রকাশিত দেশের ডাক, পাকিস্তান টুডে এবং পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত ডন পত্রিকার লন্ডন প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬৮ সাল থেকে বাংলাদেশ টাইমস এবং সিলেট থেকে প্রকাশিত সিলেট বার্তা পত্রিকার লন্ডন প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেন। এছাড়া বিলেতের প্রাচীনতম বাংলা পত্রিকা জনমতে নিয়মিত লেখক হিসেবে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন।
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ‘প্রবাসীর কথা’ (প্রবাসী পাবালিকেশন্স, সিলেট-১৯৮৯); ‘Sojourners to Settelers :The Tales of Immigrants’ (বাংলা একাডেমি-২০১৩)। লেখালেখি ও গবেষণার স্বীকৃতি স্বরূপ নূরুল ইসলাম ২০১২ সালে বাংলা একাডেমির ফেলোশিপ লাভ করেন।
জন্মমাটি সদরখলা গ্রামে বৃহৎ পরিসরে একটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার অন্তিম ইচ্ছা ছিলো আজীবন জ্ঞানান্বেষী এই লেখকের। তাঁর সুপুত্র মুরসালিন আমাকে জানিয়েছে, বাবার ইচ্ছ পূরণে ইতোমধ্যে সদরখলায় সুরমা নদীর তীরে একটি অত্যাধুনিক প্রন্থাগার তৈরি করা হয়েছে। এ পাঠাগার তৈরিতে আর্থিক ও আন্তরিক সহযোগিতা করেছেন লেখকের এককালের সহযোগী ও বন্ধু সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মোহিত।
লেখক, গবেষক, মুক্তিযোদ্ধা নূরুল ইসলাম যতদিন সুস্থ ছিলেন ততদিন লেখাপড়া ও রিসার্চ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। দেশ ও মানবতার সেবাই ছিল তাঁর জীবনের প্রধান লক্ষ্য। বিশেষত প্রবাসী বাঙালির অধিকার রক্ষায় তিনি আজীবন প্রাণান্তকর চেষ্টা করে বহুলাংশে সফল হয়েছেন। তাই তার মৃত্যুতে সত্যিকার অর্থেই আমরা একজন মহাপ্রাণ, জ্ঞানী ও গুণীজনকে হারালাম। দোয়া করি, মহান রাব্বুল আলামীন যেন তাঁকে পরপারে চিরশান্তিতে রাখেন। আমীন।

নবাব উদ্দিন: সাবেক সম্পাদক, সাপ্তাহিক জনমত; সাবেক প্রেসিডেন্ট, লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব; চেয়ারম্যান, ইস্টহ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল চ্যারেটি।