

বিডিআর বিদ্রোহ ঘটনার সেনা তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির নতুন সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন।
শনিবার (১৭ আগস্ট) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সমাবেশ থেকে তিনি এই দাবি জানান।
হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘অন্তবর্তীকালীন সরকারে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে শুক্রবার শপথ নিয়েছেন লে. জেনারেল জাহাঙ্গীর তার নেতৃত্বে একটা ইনকোয়ারি হয়েছিল বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে। তিনি সঠিকভাবে কারণ এবং সমাধান বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই রিপোর্ট আলোর মুখ দেখে নাই।’ আমরা চাই, তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত যে সত্য অনুসন্ধান রিপোর্ট তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক।
তিনি বলেন, বিডিআর এ মেধাবী চৌকস সেনা অফিসারদের পোস্টিং দেয়া হয়েছিল। এদেরকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রের কারণে তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা দেখছি এই হত্যাকাণ্ডের যে বিচার হচ্ছে দীর্ঘসূত্রিতা, ভেরি স্লো। এভাবে কেয়ামত পর্যন্ত এর বিচার শেষ হবে না।
অতি দ্রুত প্রয়োজন লাগলে স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল করে যাদের যাদের ফাঁসির আদেশ হয়েছে প্রত্যেককে ঝুলিয়ে দেন। তাহলে নিহতদের আত্মা শান্তি পাবে।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর (বাংলাদেশ রাইফেলস) এর সদর দপ্তর পিলখানায় বিদ্রোহের ঘটনা ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। এর মধ্যে তৎকালীন বিডিআর প্রধান মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদকেও হত্যা করা হয়ে ছিল।
এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সেনা বাহিনী থেকে লে. জেনারেল জাহাঙ্গির আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে ইনকোয়ারি কমিটি গঠন করা হয়ে ছিল। তিনি তদন্ত প্রতিবেদন জমাও দিয়েছিলেন।
বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনার পর সে বাহিনী পুনর্গঠন করে নাম বদলে বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) করা হয়।
ছা্ত্র-জনতার ওপর পুলিশের গণহত্যার নির্দেশদাতা শেখ হাসিনার বিচার ও সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবিতে মুক্তিযোদ্ধা দল এই সমাবেশ ও আলোচনা সভা করে।
সমাবেশে মুক্তিযোদ্ধা দলের পক্ষ থেকে ৬ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়। এগুলো হচ্ছে, শেখ হাসিনার দেশে ফিরিয়ে এনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার, সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গণহত্যার সঙ্গে জড়িত পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের বিচার, ভুয়া ৫০ হাজার মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিল, জামুকা (জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল) বাতিল, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সকল শহীদের জাতীয় বীর ঘোষণা এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যয়ভাব রাষ্ট্রীয়ভাবে বহন এবং অসচ্ছল পরিবারকে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা প্রদান।
হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ভারতকে বলতে চাই, আপনারা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহযোগিতা করেছেন, সেজন্য আমরা অনেক কৃতজ্ঞ। লড়াই করেছেন, আমাদের পাশাপাশি যুদ্ধে করেছেন কিন্তু এদেশের প্রভু হওয়ার চেষ্টা করবেন না, জনগণের বিপক্ষ হওয়ার চেষ্টা করবেন না।
বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক থাকবে কিন্তু কোনো রকমভাবে আমাদের দেশ, সাধারণ মানুষ সম্পর্কে ষড়যন্ত্র করার চেষ্টা করবেন না। সার্কের প্রত্যেকটা দেশ আপনাদের বিরুদ্ধে কেনো? ছোট ছোট দেশ…. ওয়াট ইজ মালদ্বীপ, ওয়াট ইজ শ্রীলঙ্কা। আমাদের ১৮ কোটি মানুষের দেশ। আমরা চাই, বন্ধুত্ব হবে জনগণের সঙ্গে… সুতরাং বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে বলছি, বাংলাদেশকে বিনষ্ট করার চেষ্টা করবেন না।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ইতিহাসের সবচাইতে বড় ঘাতক, এহেন ঘটনা নাই করে নাই, কত মায়ের বুক যে খালি করেছে… আমরা আজকে মুক্তিযোদ্ধাদের এই সভা থেকে দাবি করব, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করতে হবে। ভারতকে বলবো, যদি বন্ধুত্ব করতে চান, তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠান।
হাফিজ উদ্দিন বলেন, নির্বাচন কমিশন একটা নিকৃষ্টতম প্রতিষ্ঠান। ভোট ডাকাতি করে এতোদিন আওয়ামী লীগকে বহাল রেখেছে তারা। সন্ত্রাস, নৈরাজ্যর প্রতিহত করতে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসাবে তেঁতুলিয়া উপজেলায় অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
সকাল থেকে তেঁতুলিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী তেতুল তোলায় উপজেলা বিএনপির আহবায়হক শাহাদত হোসেন রনজু ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সদস্য সচিব রেজাউল করিম শাহীন এর নেতৃত্বে অবস্থান নিতে থাকেন নেতাকর্মীরা। দুপুর পর্যন্ত কর্মসূচিতে অংশ নেন সহস্রাধিক নেতাকর্মী। এসময় বিভিন্ন শ্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে ঐতিহ্যবাহী তেতুলতলা চত্ত্বর।
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক আবু সাইদ মিয়া, উপজেলা ওলামা দলের আহবায়ক সোহরাব আলী, খন্দকার আবু নোমান এনাম আহবায়ক উপজেলা যুবদল ,জেলা শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্বাস আলী, উপজেলা তাঁতি দলের সভাপতি আল আমিন, সেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি মাসুদ করিম, মৎসজীবি দলের সভাপতি আসিক ইকবাল, ৩নং ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন, যুগ্ন আহবায়ক জাহাঙ্গীর আলম, যুগ্ন আহ্বায়ক হামিদুল হক লাবু,সদ্যস সচিব জাকির হোসেন,৩নং ইউপি সম্পাদক তোজাম্মেল হক সহ উপজেলার সকল ইউনিয়নের বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতা কর্মীগণ।
কর্মসূচি থেকে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য প্রতিহত করতে নেতাকর্মীদের নিজ নিজ জায়গা থেকে কাজ করা আহ্বান জানানো হয়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে শেখ হাসিনাসহ জড়িতদের সর্বোচ্চ বিচারের দাবি করেন নেতাকর্মীরা।পরে যুবদলের নেতৃত্বে এক বিশাল মিছিল সহ উপজেলার প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করেন।
এই কমিশন বলে ছিল, আওয়ামী লীগ আসলে ভোটাররা আসবে। ইলেশনের দিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ঘুমান, এক ঘুমে ২৪ শতাংশ ভোট ৫৫ শতাংশ হয়ে গেছে দুপুরেই। কি ধরনের ইলেকশন কমিশন এরা, এখনো তারা কি করে থাকে?
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা কেউ নির্বাচিত নয়, তাদের সকল নিয়োগ বাতিলের দাবি জানান তিনি।
অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমি অত্যন্ত গর্ব করি, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আমাদের পাঁচটি কেন্টনমেন্টে বিদ্রোহী সৈনিকেরা বাংলাদেশ সেনা বাহিনী প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। এই সেনাবাহিনী সংগ্রামী জনগণের সঙ্গে ছিল। আমিসহ আরো ২৪ জন তরুণ কর্মকর্তা আমরা ক্যাপ্টেন ছিলাম, জিয়াউর রহমানসহ তিনজন মেজর, আমরা গুটিকয়েক ক্যাপ্টেন, একজন লেফটেন্টেসহ এই সেনা বাহিনী গড়ে তুলেছি। আমাদেরকে সেনাবাহিনীর ফাউন্ডিং ফাদার মনে করা হয়। এখানে অসংখ্য ছাত্র-জনতা নিয়ে গঠিত হয়েছিলো মুক্তিবাহিনী।
এই সেনা বাহিনী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে কি করে অপেক্ষায় ছিলাম। ২রা আগস্টে বর্তমান সেনা বাহিনী প্রধানকে আমি একটা এসএমএস পাঠিয়ে ছিলাম…. জনগণের সঙ্গে থাকতে এবং বিপ্লবে যোগ দিতে। আশা ছেড়ে দিয়ে ছিলাম কিন্তু মাহেন্দ্রক্ষনে আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী শেখ হাসিনাকে সরানোর ব্যাপারে সঠিক ভূমিকা রেখেছে সেজন্য আমি তাদেরকে অভিবাদন জানাই। আমাদের যে দাবি স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার নামে যে কেন্টনমেন্ট করা হয়েছে অবিলম্বে তা বাতিলের ব্যবস্থা করতে হবে।
বিগত কয়েকটি নির্বাচনের সাবেক সেনা প্রধানরা ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের’ পক্ষে যেভাবে ‘তোষামোদি’ করেছেন তার কঠোর সমালোচনাও করেন তিনি।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহীদদেরকে দেশের আদর্শ বলে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে হাফিজ বলেন, ‘ আবু সাঈদের ছবি এখানে আছে। এরা আদর্শ রোল মডেল বাংলাদেশের। গত কয়েক বছরে আমরা একাত্তর ভুলে গিয়েছিলাম। একাত্তরের চেতনায় উদ্বিপ্ত যুবকরা যে এখনো আছে তার প্রমাণ শহীদ আবু সাঈদ।
আবু সাঈদের মৃত্যু সারা বিশ্ব দেখেছে। তার মৃত্যু দৃশ্য দেখে দুই চোখ দিয়ে অশ্রু নির্গত হয়। এমন সাহসী সন্তান এখনো আছে বাংলাদেশে… প্রথমে গুলি লেগেছে, সে শুয়ে পড়ে নাই… তারপরেও দাঁড়িয়ে আছে হাত প্রসারিত করে। হাজার বছর যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন আবু সাঈদ হিরো হিসেবে থাকবে।
দলের স্থায়ী কমিটিতে স্থান পাওয়া হাফিজ উদ্দিন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, গতকাল আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সুযোগ্য পুত্র তারেক রহমান আমাকে টেলিফোন করেছিলেন। তাকে একটা কথা বলেছি, যেদিন নির্বাচন হবে, ইনশাল্লাহ বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় যাবে।
কিন্তু আমরা যেন আওয়ামী লীগ না হই। আমরা জিয়াউর রহমানের বিএনপি থাকব… কোনো চাঁদাবাজি, কোনো দখলবাজি, কোনো দুর্নীতি আমাদের দলে কেউ করতে পারবে না। এখনো কেউ এসব করতে পারবে না। বিএনপি এসবের বিরুদ্ধে।
মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাতের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক সাদেক আহমেদ খানের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আবদুস সালাম, ফজলুর রহমান, জয়নুল আবদিন ফারুক, গণঅধিকার পরিষদের আহ্বায়ক নুরুল হক নুর, এবি পার্টির যুগ্ম সদস্য সচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক মহাসচিব নঈম জাহাঙ্গীরসহ মুক্তিযোদ্ধা দলের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
নিউজ /এমএসএম