

বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালয়েশিয়া। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে বিদেশি শ্রমিক ব্যবস্থাপনার প্রধান দায়িত্ব পালন করবে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মালয়েশিয়া সরকার বলছে, এই পরিবর্তনের ফলে ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতা কমে আসার পাশাপাশি কম সময়ে কর্মী নিয়োগ করা সম্ভব হবে।
এদিকে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করতে আগামীকাল রবিবার বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর সঙ্গে ভার্চুয়ালি বৈঠকে বসবেন মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাতুক সেরি সাইফুদ্দিন নাসুশন ইসমাইল। এ ছাড়া মালয়েশিয়া সরকারের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন-বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি (বায়রা)।
গত বৃহস্পতিবার পুত্রাজায়ায় এক সংবাদ সম্মেলনে সাইফুদ্দিন নাসুশন ইসমাইল বলেন, নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিদেশি শ্রমিক ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্বে থাকবে আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে শ্রমনীতি, কোটার যোগ্যতা নির্ধারণ, চূড়ান্তকরণ ও বিদেশি শ্রমিক আসা দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রে মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা শক্তিশালী করা হবে।
এ বিষয়ে বায়রা মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, মালয়েশিয়ার নতুন সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলো আমাদের জন্য ভালো খবর। উদ্যোগগুলো কার্যকর হলে কম খরচে কর্মী যেতে পারবে। ভিসা প্রসেসিংয়ে সময় কম লাগবে। এমনকি সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাজার সবার জন্য উন্মুক্ত হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা অপেক্ষায় আছি। আশা করা যায়, আমাদের দেশের জন্য ভালো কিছু হবে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য পরিবর্তন সম্পর্কে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ভিসা আবেদন থেকে শুরু করে প্রাথমিক অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়াটি ৩০ দিনেরও কম সময়ে সম্পন্ন করার চিন্তা করছি। আমরা দেখতে পাচ্ছি, কম সময়েই প্রাথমিক অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুযোগ আছে। যেমন- আগে বিজ্ঞাপনের একটা প্রক্রিয়া ছিল, এ জন্য ৩০ দিন পর্যন্ত সময় নেওয়া হতো। এখন আমাদের পরিকল্পনা হলো, এ জন্য মাত্র একদিন ব্যয় করা হবে, এমনকি প্রক্রিয়াটি বাতিলও করা হতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, আমরাও তো চাই, কম খরচে, কম সময়ে কর্মী পাঠাতে। এখনই এর চেয়ে বেশি মন্তব্য করতে চাই না। আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের কাছে কোনো খবর আসেনি। তাদের সঙ্গে আলোচনা শেষে বোঝা যাবে, তারা কী করবেন।
বায়রার যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, মালয়েশিয়ার নতুন উদ্যোগ ভালো। আমরাও চাই বাজার সবার জন্য উন্মুক্ত হোক।
অ্যাসোসিয়েশন অব এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সির (পাপা) পরিসংখ্যান বলছে, মালয়েশিয়ায় চলতি বছর প্রায় ১০ লাখ বিদেশি শ্রমিক প্রয়োজন পড়বে। মহামারীর আগে ২০২০ সালে ২২ লাখ নিবন্ধিত বিদেশি শ্রমিক ছিল মালয়েশিয়ায়। কিন্তু মহামারীর পর এই সংখ্যা প্রায় ৯০ হাজারের ঘরে নেমে আসে।
গত চার বছর বাংলাদেশের শ্রমিক নেয়নি মালয়েশিয়া। গত ৯ আগস্ট থেকে আবার কর্মী পাঠানো শুরু হয়েছে। এর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আগামী তিন বছরের মধ্যে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের ৫ লাখের বেশি নতুন কর্মীর কর্মসংস্থান হবে। এর মাধ্যমে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে পাঠানো মোট রেমিট্যান্স তিনশ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। কিন্তু নানা কারণে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া সরকার। ২০১২ সালে সিদ্ধান্ত হয় জিটুজি পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগের। সে পদ্ধতি ব্যর্থ হওয়ায় বছর দু-এক পর সিদ্ধান্ত হয় জিটুজি প্লাস অর্থাৎ তখন বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা হয়। সে উদ্যোগে আড়াই লাখের বেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে পারে। সেখানে সিন্ডিকেটের কারণে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ বন্ধ করে দেয়। এরপর নানা দেনদরবার বৈঠক, চিঠি চালাচালির পর ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর সমঝোতা স্মারকে চুক্তি হয়।
মালয়েশিয়ার নির্মাণ, সেবা, কৃষি, পর্যটনসহ বিভিন্ন সেক্টরে বাংলাদেশি কর্মীরা দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে কাজ করে আসছেন। কয়েক বছর আগেও অবৈধপথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমাতে গিয়ে নৌকাডুবিতে বহু মানুষের প্রাণ গেছে। তখন মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের কারাগারেও স্থান হয় বহুজনের। অনেকে গহিন জঙ্গলে আফিম চাষের জন্য ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি হয়ে যায়। অনেককে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও ঘটে সে সময়। আবার ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়ায় যেতে পারলেও অনেককে নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। অবৈধ অভিবাসী হিসেবে অনেককে পালিয়ে বেড়াতে হয়। ধরা পড়ার পর ঠাঁই হয় কারাগারে। কাটাতে হয় মানবেতর জীবন।
বর্তমানে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানিতে যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নতুন নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করার পারামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। রেমিট্যান্স বাড়াতে হলে দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করছেন তারা।
নিউজ /এমএসএম