

শাহারুর ইসলাম ফারদিন: ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে তিনদিনের বৃষ্টিতে যশোর পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে গেছে।পৌরসভার ৬ ও ৭ নং ওয়ার্ডের মানুষের দীর্ঘদিনের দুঃখগাথা হয়েআছে জলাবদ্ধতা। ভারী কিংবা অল্প বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যায়এই এলাকা। এটিকে নিয়তি মেনে নিয়েই জীবনযাত্রা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে কষ্টে রয়েছেন রেললাইন সংলগ্ন চোপদারপারা ও জমদ্দারপাড়ার মানুষ। ২৪ ঘন্টা অতিবাহিত হলেও এখনো জমে আছে হাঁটু সমান পানি। ঘর থেকে বের হতে পারেননিঅনেকেই। এ অবস্থায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের।
এসব এলাকার বাসাবাড়িতে পানি ওঠায় বেশিরভাগ বাড়িতে বন্ধহয়ে গেছে রান্না-বান্না। ভুক্তভোগীরা বলছেন, যেখানে এক থেকে দুইঘণ্টার মাঝারি বৃষ্টিতেই এই এলাকাগুলোয় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।সেখানে টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, পরিকল্পিতভাবে ড্রেন নির্মাণ না হওয়ায় এগুলোদিয়ে ঠিকমতো পানি নিস্কাসন হয় না। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই এলাকাতলিয়ে যায়। জলাবদ্ধতা সংকট নিরসনে গেল কয়েক বছরে পৌরকর্তৃপক্ষ কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও কোন সুফল নেই। পানিনির্গমনের প্রায় সব পথ বন্ধ হওয়ায় কাটছে না তাদের দুর্দশা।এদিকে শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে যশোর পৌরকর্তৃপক্ষ গত ১০ বছরে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও তৎসংলগ্ন সড়ক উন্নয়নে৯ ওয়ার্ডে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন বলে জানা গেছে।তবে এ ব্যয় কোন কাজেই আসছে না। টানা বৃষ্টি হলেই বন্যাবস্থাবিরাজ করে শহরের নিম্মাঞ্চলে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, সামান্য বৃষ্টিতেই যশোর পৌরসভার ৬ ও ৭নং ওয়ার্ডে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এ সংকটনিরসনে গেল কয়েক বছরে পৌর কর্তৃপক্ষ কোটি কোটি টাকা ব্যয়করার পরও কোন সুফল পাচ্ছে না তারা। পানি নির্গমনের প্রায় সবপথ বন্ধ হওয়ায় তাদের দুর্দশা কাটছে না।
৭ নম্বর ওয়ার্ডের শংকরপুর চোবদার পাড়ার বাসিন্দা খন্দকার আবুহোসেন জানান, তার এলাকায় প্রায় সকল বাড়ির উঠানে এবংঅধিকাংশ ঘরে পানি ঢুকেছে। মানুষজন দৈনন্দিন কাজেঅসুবিধায় পড়েছেন। পানি দ্রুত নিষ্কাশনে তিনি সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টিআকর্ষণ করেন।
যশোর পৗরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম শরীফ হাসান বলেন,যশোর শহরকে দু’ভাগে ভাগ করেছে ভৈরব নদ। শহরের উত্তর অংশের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থ্যা এ নদকে ঘিরে। আরদক্ষিণ অংশের পানি নিষ্কাশন হয় পৌরসভার ৬ ও ৭ নং ওয়ার্ডের উপর দিয়ে হরিনার বিলে।
যশোর পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র মোকছিমুল বারী অপু বলেন, আসলে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার জায়গা না রেখে অপরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন ও পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। যশোর পৌরসভার মেয়রসহ জনপ্রতিনিধিরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। আমরা চেষ্টা করছি,আগামী বছরের মধ্যে স্থাযী জলাবদ্ধতা নিরসন করার।’ ওই সময়পর্যন্ত নাগরিকদের কষ্ট সহ্য করার অনুরোধ জানান তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিকল্পিত উন্নয়ন না হওয়ায় কোটি টাকারপ্রকল্পের কোন সুফল পাচ্ছে না তারা। বরং আধা ঘন্টার বৃষ্টিতেইতলিয়ে যায় এ দু’টি ওয়ার্ডের রাস্তাঘাট বাড়ি-ঘরসহ বিস্তীর্ণএলাকা।
তবে পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি, পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।আর ভুক্তভোগীরা বলছেন, পানি নিষ্কাশনে পৌরসভার পুরোপরিকল্পনায় ত্রুটি রয়ে গেছে। বৃষ্টি হলেই পানি ঘরে ঢুকবে। এটানিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা অভিযোগের সুরে বলেন, ড্রেনের মাথা উঁচু আর রাস্তা নিচু; পানি কিভাবে বেরুবে?
যশোর পৌরসভার সচিব আজমল হোসেন জানান, ৯ ওয়ার্ডে২০১৬-১৭ অর্থ বছর থেকে নগর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প ও তৃতীয়নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নতিকরণ প্রকল্পের আওতায়ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও তৎসংলগ্ন সড়ক উন্নয়নে কাজ চলছে। এরইআওতায় হরিনার বিল এলাকার খাল মুক্তেশ্বরী নদীর সাথেসংযোগ দেয়া হবে। এটা বাস্তবায়ন হলে যশোরে জলাবদ্ধতানিষ্কাশন আরও সহজ হবে। তিনি এ জলাবদ্ধতার জন্যে অনাকাঙ্খিত অতি বৃষ্টিকে দায়ী করেন।
উল্লেখ্য, যশোর শহরকে উত্তর আর দক্ষিণ অংশে ভাগ করেছেমৃতপ্রায় ভৈরব নদ। শহরের উত্তর অংশের পানি নিষ্কাশন হয় এনদ দিয়ে। আর দক্ষিণ অংশের পানি নিষ্কাশন হয় পৌরসভার ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে বিল হরিনায়। কিন্তু সেহরিনার বিল এখন আর বিল নেই।
দক্ষিণ অংশের পানি নিষ্কাশনের জন্যে গত নয়-দশ বছর ধরে প্রচুরটাকা ব্যয়ে ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তুপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন না হওয়ায় তা দুর্ভোগের কারণহয়ে দাঁড়িয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই এই দুটি ওয়ার্ডের রাস্তাঘাট, বাড়িঘরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে বর্ষা মৌসুমজুড়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় স্থানীয়দের।
জলমগ্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব বাড়ির মধ্যেই হাঁটু সমানপানি। বিশেষ করে শহরের শংকরপুর, বেজপাড়া এলাকার হাজারোবাড়িতে পানি ঢুকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এসব এলাকারবাসাবাড়ির রান্নাঘরে পানি ওঠায় বেশিরভাগ বাড়িতে রান্না-বান্নাবন্ধ হয়ে গেছে। দুর্দশাগ্রস্তরা আক্ষেপ করে আর কোন অভিযোগ জানাতে চাচ্ছেন না। তারা নিয়তিকেই মেনে নিয়ে জীবনযাত্রা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এ এলাকার গৃহ পরিচারিকা লিলিমা খাতুন জানান, “আমরা পানির ভিতর কষ্ট করি কিন্তু মায়ার ক্ষাতিরে এই জায়গা থেকে সরতে চাইনা। আমরা বহুকাল ধরে এই জায়গা থেকে যাতি চাইনে।পানি হলেও ঐ কষ্ট করেই থাকি। দুই তিনদিন না খেয়েও আমাগেরদিন চলে যায়। মাঝেমাঝে দুই এক ওয়াক্ত খিচুরী দিয়ে যায়।আবার মাঝেমাঝে দেয়না। আমাদের কষ্ট হয় একটু।”
শংকরপুর এলাকার বাসিন্দা গৃহিনী শিখা খাতুন জানান, বৃষ্টি শুরুহলেই আমাদের দুর্দশার সীমা থাকে না। এ এলাকার প্রায় সকলেরঘরেই পানি থৈ থৈ করছে। খাটের ওপর উনুন রেখে রান্না করতেহয়। ছেলে- মেয়েদের নিয়ে বড়ই বিপদে আছি।
জমদ্দারপাড়ার বাসিন্দা রিকশা চালক আজিজ শেখ জানান, খুবই বাজে অবস্থার মধ্যে আছি।ড্রেন উপচে ময়লা আবর্জনাসহ পানিঘরের মধ্যে চলে এসেছে।