

বৈষম্য বিরোধী ছাত্রআন্দোলনের ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর মৌলভীবাজার জেলায় বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে তাণ্ডব চালিয়েছে একদল দুর্বৃত্তরা।
গত সোমবার শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার খবরে শহরে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিভিন্ন বাসাবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। দুর্বৃত্তরা একের পর এক বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাটের পর অগ্নিসংযোগ করে।
তারা সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসীন আলীর শহরের বেরিপাড়স্থ বাড়ি, সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি নেছার আহমদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান কামাল হোসেনের বাসা, জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আলহাজ এম এ রহিম শহীদ সিআইপি’র বাসা ও বাণিজ্যিক মার্কেট, জেলা যুবলীগের সহ-সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রুমেল আহমদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, জেলা যুবলীগের সহ-সভাপতি সমরেশ দাস জিশু’র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ম্যানেজার স্টল ও রাধিকা স্টল, যুবলীগ নেতা আকাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মামার বাড়ি রেস্টুরেন্ট, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অজয় সেনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রনির বাসা ছাড়াও সৈয়দ মানি একচেঞ্জ, মৌলভীবাজার পৌরসভা, মৌলভীবাজার মডেল থানাসহ অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায়। স্থানীয় লোকজন জানান কয়েকশ’ দুর্বৃত্ত একইসঙ্গে এই অপকর্ম চালায়। তাদেরকে বাধা দিয়ে কোনো ভাবেই নিবৃত্ত করা যাচ্ছিল না। তারা বেশির ভাগই স্থানীয় নয়। তারা সবাই ছিল অপরিচিত। তারা জানান হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের পর তারা বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন জ্বালিয়ে সবকিছুই পুড়িয়ে ফেলে। দুর্বৃত্তরা আলহাজ এম এ রহিম সিআইপি’র বাসা থেকে ব্যবহৃত সকল আসবাবপত্র নগদ টাকা লুটে নিয়ে অগ্নিসংযোগ করে ও তার বাণিজ্যক প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়।
এতে তার বাসা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪-৫ কোটি টাকার ক্ষতিসাধন করে। সাইফুর রহমান রনির বাসা থেকেও আসবাবপত্র লুট করে নিয়ে যায়। পরে ভাঙচুর শেষে অগ্নিসংযোগও করে। তবে এ সময় আওয়ামী লীগ নেতারা নিজ বাসাবাড়িতে ছিলেন না। এমনকি এ সময় তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও ছিল বন্ধ। ওইদিন রাত ও মঙ্গলবার নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন ছিলেন সংখ্যালঘু, আওয়ামী লীগ ঘরানার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়। কিছু উচ্ছৃঙ্খল দুষ্কৃতকারীরা বিভিন্ন বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনায় হামলা-ভাঙচুর চালানোর কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে এমন উদ্বিগ্নতা বাড়ে।
এমতাবস্থায় মৌলভীবাজার শহরের সর্বস্তরের বাসিন্দাদের ভয়ভীতি কাটাতে ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে সকলের দায়িত্বশীল হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে শহর জুড়ে মাইকিং করান সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপি’র সভাপতি এম নাসের রহমান।
সেই সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের শান্তি শৃঙ্খলা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে দায়িত্বশীল প্রহরীর ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেন। এম নাসের রহমানের এমন উদ্যোগ জেলা শহরের আইনশৃঙ্খলা ও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তার এমন মাইকিং ও নির্দেশনার পর থেকে দলের নেতাকর্মীরা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বাসাবাড়ি, সংখ্যালঘুদের বাসাবাড়ি ও ধর্মীয় উপাসনালয় রক্ষায় সক্রিয় হন।
এ ছাড়াও জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মী ও ব্যক্তি উদ্যোগেও অনেকেই পাহারায় নিয়োজিত হন। তবে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এখন পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল
আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা-কর্মী বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর প্রচারিত হওয়ার পরপরই মিছিল নিয়ে শ্রীমঙ্গল থানায় পৃথক ভাবে হামলা, অগ্নিসংযোগ ভাঙচুর করা হয়েছে । এরমধ্যে শ্রীমঙ্গল শহরের মিশন রোডস্থ সাবেক কৃষি মন্ত্রী ড. মো. আব্দুস শহীদ এমপি বাসভবনে অগ্ন সংযোগসহ জেলার একাধিক আওয়ামীগ নেতার বাড়ি ও দোকানপাটে ভাঙচুর করা হয় ।
এদিকে শ্রীমঙ্গল থানার ভেতরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং পুলিশের উপর হামলা চালানো হয়। এতে পুলিশ আত্মরক্ষার স্বার্থে টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট ছুড়লে শতাধিক আন্দোলনকারী যুবকরা আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, আজ বেলা চারটার দিকে শ্রীমঙ্গল শহরের মৌলভীবাজার সড়কে অবস্থিত থানায় আগুন ও ভাঙচুর করা হয়।
মৌলভীবাজার পুলিশ সুপার মো. মনজুর রহমানের মুঠোফোনে কল করলে তিনি কল কেটে দেন। পরে শ্রীমঙ্গল থানার ওসি বিনয় ভূষণ রায় বলেন, শটগান দিয়ে ফাঁকা গুলি ছুড়েছি। তবে আমরা কোন গুলি করেনি। তিনি আরও বলেন, আন্দোলনকারীর হামলায় থানার ৫ পুলিশ আহত হয়েছেন।

বড়লেখা
শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশ ত্যাগের খবরে মৌলভীবাজারের বড়লেখায় সাবেক পরিবেশমন্ত্রী শাহাব উদ্দিনের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। এ ছাড়া দক্ষিণভাগ উত্তর ইউপি চেয়ারম্যান এনাম উদ্দিনের বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে। তবে এই ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি।
সোমবার সন্ধ্যায় এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা জানান, হাসিনার দেশ ছেড়ে যাওয়ার খবর প্রচারের পর সাধারণ জনতা উপজেলার বিভিন্ন অলিগলি থেকে প্রধান সড়কে নেমে উল্লাস করতে থাকেন।
এরমধ্যে বিক্ষুব্ধ জনতা দক্ষিণভাগ উত্তর ইউপি চেয়ারম্যান এনাম উদ্দিনের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। রাত ১০টা পর্যন্ত ঘর আগুন জ্বলতে দেখা যায়। ফায়ার সার্ভিসের খবর দেয়া হলেও তারা নিরাপত্তার ভয়ে আসেনি। এ ছাড়া সন্ধ্যার দিকে বিক্ষুব্ধ জনতা সাবেক পরিবেশমন্ত্রী শাহাব উদ্দিনের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে অবশ্য স্থানীয়রা আগুন নেভায়।
আগুনে পরিবেশমন্ত্রী শাহাব উদ্দিনের বাড়ি ও ইউপি চেয়ারম্যান এনাম উদ্দিন বাড়ির সবগুলো কক্ষ ও আসবাবপত্র পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এতে কেউ হতাহত হয়নি। সরজমিন দেখা গেছে, পরিবেশমন্ত্রী শাহাব উদ্দিনের বাড়ির পাকা ভবন ও আধাপাকা ভবনের বিভিন্ন কক্ষ পুড়ে আগুনে গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়েছে।
বিভিন্ন মালামাল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। বাড়িতে থাকা লোকজন জানান, ঘটনার সময় শত শত মানুষ হামলা চালিয়ে বাড়িতে আগুন দিয়েছে। তারা ভয়ে বাধা দেননি। দক্ষিণভাগ উত্তর ইউপি চেয়ারম্যান এনাম উদ্দিনের বাড়ির সবকটি কক্ষ আগুনে পুড়ে গেছে। এ সময় বাড়িতে কাউকে পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান আজির উদ্দিনের দক্ষিণভাগ বাজারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে। এ ছাড়া বিক্ষুব্ধ জনতা থানা ভবন ও মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ইটপাটকেলও নিক্ষেপ করেছে। ভয়ে থানা ছেড়ে পালিয়েছে পুলিশ।
নিউজ /এমএসএম