মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ১১:১৯ অপরাহ্ন

নদীর আর্তনাদ শুনবে কে?

সংবাদদাতার নাম :
  • খবর আপডেট সময় : শুক্রবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২১
  • ৩৭০ এই পর্যন্ত দেখেছেন

সৈয়দ শামসুল হক বাংলা ও বাঙালির সঙ্গে নিজের সম্পর্কের গভীরতা বোঝাতে গিয়ে ‘আমার পরিচয় কবিতায়’ বলেছিলেন-তের শত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে? তবে বিধিবাম, শামসুল হকের আত্মপরিচয় জানতে চাওয়া সেই তের শত নদীর আজ নিজেদের-ই অস্তিত্বের সংকট! ঘটনা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কাল আর বাকের ঝাণ্ডায় অস্তিত্বের টানাটানিতে তাদের সংখ্যা যে ঠিক কত-তে গিয়ে ঠেকল, সেই তথ্যও আজ ধোঁয়াশার মধ্যে।

২০০৫ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকাশিত বাংলাদেশের নদনদী গ্রন্থে মোট নদনদীর সংখ্যা উল্লেখ করা হয় ৩১০টি। আবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২০১১ সালের আরেকটি জরিপে এ সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪০৫টি-তে। এদিকে শিশু একাডেমি প্রকাশিত শিশু বিশ্বকোষ বলছে বাংলাদেশে মোট নদীর সংখ্যা ৭০০-র অধিক। এ তথ্য সমুদয়ের এত এত বৈচিত্র্যতা প্রমাণ করে যে নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীকেন্দ্রিক গবেষণায় যতটা ঘাটতি রয়েছে, উদাসীনতাও রয়েছে ঠিক ততটা।

এ উদাসীনতা কেবল গবেষণায়? তা নয়। এ উদাসীনতা পরিলক্ষিত হয় একটি নদীর সমস্ত জীবনযাত্রায়। এ দেশের নদীর ওপরে আঘাতের সূত্রপাত হয় ব্রিটিশ আমলে। ইংরেজদের ভুল নদীব্যবস্হাপনা ও যত্রতত্র ব্রিজ কালভাটের দরুন অন্তত কয়েক শ নদীর শবযাত্রার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে যায়। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের নামে তারা নদী হত্যার যে নীলনকশা এঁকেছিল ইংরেজ বিদায়ের ২০০ বছর পরেও আমরা সে জাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি। তাই এক সময়ে অথৈ জলে থইথই করা নদীর মোহনায় এখন বড় বড় অট্টালিকা উঠছে, মহাসড়ক হচ্ছে, বাস চলছে, রেইল চলছে। সেসব প্রথিতযশা নদীর আর কোনো চিহ্ন নেই, নাম-গন্ধ নেই। রেজিস্ট্রি খাতায় তালিকা পর্যন্ত নেই!

সভ্যতা নদীর দান। মানুষের সংস্কৃতির বিকাশ ও সভ্যতায় নদীর ভূমিকা অপরিসীম। নদী সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রধানতম ধারক ও বাহক। বৃহত্তম গাঙ্গেয় বদ্বীপ বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে নদী থেকে বয়ে আসা পলি মাটি থেকে। যার প্রাণশক্তি সঞ্চার করেছে শিরা-উপশিরার মতো বয়ে চলা ছোট-বড় নদনদীগুলো। নদীর সুকোমল স্পর্শে উঠানামা করেছে আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-অর্থনৈতিক-ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট। যে নদী জন্মদাতা তাকে উপেক্ষা করে আমাদের সামগ্রিক উন্নতির কথা ভাবা অবান্তর। আমাদের অব্যবস্থাপনা ও অপরিণামদর্শী কাজের দরুন যে নদী ছিল প্রকৃতির আশীর্বাদস্বরূপ তা এখন গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। একাটি উদাহরণ দিলে ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়। উৎপত্তি স্থান থেকে সমুদ্র পর্যন্ত পানির যাত্রাপথ বা দুটি সমুদ্রের সংযোগ পথকে নদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। নদীর ধর্ম বয়ে চলা। পাহাড় কিংবা জলপ্রপাত কিংবা অন্য কোনো মাধ্যম থেকে বয়ে আসা পানিকে সমুদ্রে মিলিয়ে দেওয়ায় তার কাজ। অর্থাৎ নদী হলো প্রবহমান ধারা। এখন নদীর এই সাধারণ যাত্রা পথকে যদি বাধা দেওয়া হয় বা রুদ্ধ করা হয়, তাহলে দুটি ঘটনা ঘটে। প্রথমত নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে বদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ফলে দেখা যায় স্রোতহীনতা ও নাব্য সংকট। দ্বিতীয়ত, বর্ষা মৌসুমে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পানি সমুদ্রে অপসারণে ব্যর্থ হয়ে নদী তীরবর্তী অঞ্চলে বন্যা দেখা দেয়।

নদীর সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নদী যেমন তার প্রবাহের সঙ্গে জনপদের বর্জ্য সরিয়ে নিয়ে যায়, তেমনি নদীর পানির কারণে আশপাশের পরিবেশ থাকে অপেক্ষাকৃত শীতল। নদী থেকেই উৎসারিত হয় জলীয় বাষ্প এবং তা আবার বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। সত্যিকার অর্থে নদীর অস্তিত্ব বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের অতি আলোচিত বিষয়ের সঙ্গে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের বিরাট এলাকা সমুদ্রে তলিয়ে যাবে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা এককভাবে আমাদের নেই; তবে দেশের নদনদী রক্ষার মাধ্যমে আমরা এই দুর্দশার মাত্রা কমিয়ে আনতে পারি।

সৌন্দর্যের আধার, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার উৎস, ব্যবসা-বাণিজ্য বিকাশের সহায়ক নদীনালাসমূহকে নির্মমভাবে গ্রাস করার ফলে দেশের যে ক্ষতি হচ্ছে তা অপূরণীয়। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই দেশ নদীশূন্য বিরানভূমিতে পরিণত হবে। মনে রাখতে হবে, ‘নদী বাঁচিলেই বাঁচবে দেশ, বাঁচবে জাতি।’

লেখক: শিক্ষার্থী, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102