

রফিকুল হায়দারঃ সম্প্রতি স্কটল্যান্ডে অনুষ্ঠিত কপ ২৬ জলবায়ু সম্মেলেন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন লন্ডনে অবস্থান করেন তখন তিনি লন্ডনের কুইন এলিজাবেথ হলে “বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলন ও রোড শো’র উদ্বোধন করেন। এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। বিনিয়োগকারীদের আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, প্রবাসীদের দেশে গিয়ে বিনিয়োগের নিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তা সুরক্ষার জন্য তিনি সিলেটে আলাদা ইকোনমিক জোন তৈরী করে দেবেন।
ভার্চুয়াল কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ এখন এক আকর্ষনীয় স্থান্। কৃষি ছাড়া ও বিদ্যুৎ, পর্য্যটন এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বিনিয়োগে বৃটিশ বিনিয়োগকারীদেরও আহ্বান জানাই।” প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং তার বাণিজ্যমন্ত্রীও এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর এ আহ্বান খুবই সময়োপযোগী হয়েছে বলে আমি মনে করি। কারণ, বাংলাদেশ এখন এমন এক অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যে, বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন উন্নত হয়েছে ঠিক তেমনি ডিজিটাল ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার প্রসার বাংলাদেশের এক প্রাপ্ত থেকে অপরপ্রান্তে অতি অল্প সময়ের মধ্যে পৌছে দিতে সক্ষম হবেন। যার ফলে ব্যবসায়ীরা যেমন লাভবান হবেন, ঠিক তেমনি জনগণও তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে আর হয়রানী বা দু:শ্চিন্তা করতে হবেনা। ঘরে বসেই টেলিফোন / অনলাইনে অর্ডার দিয়ে তাদের জিনিসপত্র হাতের কাছে পেয়ে যাবেন।
প্রবাসী বাংলাদেশী বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে গিয়ে বিভিন্ন ধরণের মিল ফ্যাক্টরী, কাপড় তৈরীর কারখানা, বিভিন্ন ধরণের ফল থেকে রস তৈরীর কারখানা স্থাপন করা ইত্যাদি সহ বিদ্যুৎ, পর্য্যটন খাত এবং জাহাজ শিল্পেও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগগুলো যদি প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা কাজে লাগাতে পারেন, তাহলে একদিকে যেমন লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হবে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীরাও লাভবান হবেন যার ফলে দেশের ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়বে। এই ব্যবসাগুলো শুধু বাংলাদেশেই নয়, ব্যবসায়ীদের মূল লক্ষ্যই থাকতে হবে বিদেশের বাজারগুলো ধরা। বিদেশের বাজারগুলো ধরতে হলে, বিদেশে রফতানীর জন্য প্রস্তুত মালামালগুলো হতে হবে উন্নতমানের। কারণ বর্তমান বিশ্বে এখন চলছে ভীষণ প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতার বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে ব্যবসা করতে গেলে অবশ্যই সেগুলো খদ্দেরদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে, হতে হবে টেকসই, আকর্ষণীয় এবং যতটুকু সম্ভব মূল্য কম রাখা। সবদিক ঠিক রেখে যদি প্রবাসী ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে এসে ব্যবসা করতে পারেন তাহলে ক্ষতির কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছেনা।
প্রবাস জীবনের প্রায় ৩৭ বছরের মধ্যে অধিকংশ সময়ে সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা এবং লেখালেখির সাথে জড়িত থাকার সুবাদে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন এলাকার ছোট বড় সব ধরণের ব্যবসায়ীদের সাথে মোটামুটি একটা যোগসূত্র তৈরী হয়েছে। তাদের সুখ দু:খের অনেক কথা শুনেছি এবং এখনও শুনছি। তাদের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপকালে একটি দু:খই আমার মনের মধ্যে ভীষণ দাগ কাটে আর সেটি হচ্ছে তাদের কথায় “আমরাতো স্ত্রী ছেলে মেয়ে নিয়ে এদেশে আছি, ভালই আছি মনটা তো পড়ে থাকে আমাদের জন্মভুমি বাংলাদেশে। বাংলাদেশের আমাদের আত্মীয় স্বজন, পাড়া পড়শী, গ্রামের মানুষ যাদের সাথে সব সময় চলাফেরা করেছি আজ অনেকেই এ দুনিয়া থেকে চলে গেছেন আর যারা বেঁচে আছেন তাদেরও দেখতে পারবো কি না জানিনা।” তাদের অনেকেই যারা ব্যবসা বানিজ্য করে প্রচুর অর্থ কামাই করছেন তারা আক্ষেপ করে বলেন, বাংলাদেশে গিয়ে যদি ব্যবসা বাণিজ্যে বিনিয়োগ করার মতো একটা পরিস্থিতি থাকতো, তাহলে এদেশে কষ্ট করে রোজগারের পাশাপাশি দেশেও একটা কিছু করতে পারতাম। তাহলে এই ব্যবসার খাতিরে দেশে ঘন ঘন যেতে পারতাম যার ফলে দেশের সাথে যেমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠতো তেমনি দেশে একটা আয়ের ব্যবস্থাও হতো। দেশে গিয়ে বড় একটা ব্যবসায়ে হাত দিলে আত্মীয় স্বজন সহ এলাকার মানুষেরও কর্মসংস্থান হতো। কিন্তু দেশে গিয়ে কোন একটা ব্যবসা করতে গেলে যে বাজেট নিয়ে ব্যবসা করতে যাবো তার সিংহ ভাগইতো দিয়ে দিতে হয় সিন্ডিকেটের দলকে। ওরা তো ওৎ পেতে বসে থাকে টাকাওয়ালা বিদেশীরা ব্যবসা করতে গেলে তাদের কিভাবে কুক্ষিগত করে টাকাগুলো পকেটে ঢুকানো যায়। যারা এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী তাদের কাছ থেকেই শুনেছি এসব কথা। এখন তাদের মধ্যে বাংলাদেশে গিয়ে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এমন ভয় ঢুকেছে যেন ” চুন খেয়ে মুখ পুড়লে, দই দেখে ভয় পায়” এই অবস্থা।
যেহেতু আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই লন্ডনে এসে প্রবাসীদের বাংলাদেশে গিয়ে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, প্রবাসীদের দেশে গিয়ে বিনিয়োগের নিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তা সুরক্ষার জন্য তিনি সিলেটে আলাদা ইকোনমিক জোন তৈরী করে দেবেন। খুবই সুন্দর এবং আশাপ্রদ কথাগুলো বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তার পরেও কথা থেকে যায়, প্রবাসী ব্যবসায়ীদের দেশে গিয়ে ব্যবসা করার ব্যাপারে মনের মধ্যে যে ভয় ঢুকেছে তা কি ভাবে দূর করবেন, তার একটা ফর্মূলা সরকারকে তৈরী করে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে প্রবাসীদের জানাতে পারলে মনে হয় ভালো হয়। প্রবাসী ব্যবসায়ীরা চান, তাদের কষ্টার্জিত টাকাগুলো যেন নষ্ট না হয় এবং তাদেরকে যেন হয়রানীর সম্মুখীন না হতে হয়। প্রবাসীদের প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কিভাবে সিন্ডিকেটকে কন্ট্রোল করবেন এবং আমাদের নিশ্চিন্তে ব্যবসা করার সুযোগ তৈরী করে দেবেন?
আমি মনে করি সরকারের উচিৎ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উচ্চ পর্য্যায়ের কর্তা ব্যক্তিদের নিয়ে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে প্রবাসীদের ভয় দূর করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা। এই কমিটির নাম দেয়া যেতে পারে “প্রবাসী বিনিয়োগকারী নিরাপত্তা সংস্থা” (ফরেন ইনভেষ্টার সিকিউরিটি ফোরাম)।” এই কমিটির দায়িত্ব হবে প্রবাস থেকে যারা দেশে গিয়ে বিনিয়োগ করতে যাবেন, তারা প্রথমেই এই কমিটির সাথে যোগাযোগ করবেন। ব্যবসা শুরু করার সময় থেকে চালূ হওয়া পর্য্যন্ত সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকবে এই কমিটির উপর। ব্যবসা শুরু হওয়ার পর তারা দেখভাল করবেন এবং যে কোন অসুবিধার সম্মুখীন হলে তা দূর করতে সরকার তথা প্রয়োজনে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাহায্য এবং সহযোগিতা নেবেন। অন্যদিকে, এই কমিটির সদস্যদের কাজে অবহেলা অথবা কোন ব্যাপারে গাফিলতি করলে ব্যবসায়ীরা সরকারের উচ্চ পর্য্যায়ের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে নির্ভয়ে অভিযোগ করার অধিকার থাকতে হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সমীপে আমি বলতে চাই যে, আপনার আহ্বানে প্রবাসী ব্যবসায়ীরা আনন্দিত হয়েছেন, স্বাগত জানিয়েছেন। কয়েকজন ব্যবসায়ীর সাথে আলাপ করে আমি তা বুঝতে পারলাম প্রবাসীরা দেশে গিয়ে বিনিয়োগ করতে উৎসাহবোধ করছেন। সুতরাং প্রবাসীদের দেশে গিয়ে বিনিয়োগের ব্যাপারে সব ধরণের জটিলতা দূর করে কিভাবে তাদেরকে নির্ভয়ে বিনিয়োগে উদ্ভুদ্ধ করা যায় তার ব্যবস্থা করুন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত নিন। কথায় আছে, ভালো কাজে “যতো শীঘ্র ততই মঙ্গল”। বাংলাদেশকে উন্ননের দিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য আপনার আন্তরিকতা এবং পরিশ্রম সার্থক হোক এই আমার প্রার্থনা।

লেখকঃ রফিকুল হায়দার ( দেওয়ান ফয়ছল) সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিষ্ট