

মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, গ্লাসগো, স্কটল্যান্ড থেকে: পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ শাহাব উদ্দিন এমপি বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা সত্ত্বেও পরিবেশ দূষণ রোধে বাংলাদেশ সোচ্চার রয়েছে। এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা।
যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ডের গ্ল্যাসগোয় অনুষ্ঠেয় বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে (কপ-২৬) ফাঁকে এ প্রতিবেদকের সাথে একান্ত আলাপচারিতায় মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, গত আগস্টে বাংলাদেশ আপডেটেড এনডিসি (ন্যাশনাল ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন) সাবমিট করেছে। এ অনুযায়ী আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে গৃহস্থালী এনার্জি খাতের দূষণ শতকরা ১৮.৫৫ ভাগ, ইটভাটার দূষণ ৪৬.৫৪ ও পৌরসভার সলিড ওয়াস্ট ও বর্জ্যপানির দূষণ ৭.৯৩ ভাগে নামিয়ে আনতে চাই।
মন্ত্রী বলেন,২০৪০ সালের মধ্যে ন্যাপ-এসএলসিপি (শর্ট লিভড ক্লাইমেট পলিউট্যান্ট) বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে ১৬ হাজার ৩শ’ অকাল মৃত্যু, কালো ধোঁয়ার দূষণ ৭২ ভাগ এবং মিথেন দূষণ শতকরা ৭২ ভাগে নামিয়ে আনা যাবে।
তবে, ন্যাপ-এলপিসির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা, বায়ুদূষণ রোধ ও সাসটেইন ডেভেলপম্যান্ট গোল (এসডিজি) বাস্তবায়নে বিশ্ব সম্প্রদায়কে একযোগে কাজ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন পরিবেশমন্ত্রী।
পরিবেশমন্ত্রী বলেন, বন ও ভূমি ব্যবহার বিষয়ে কপ-২৬ এর লিডারস ডিক্লারেশনে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে।
এতে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে বৃক্ষনিধন (ডিফরেস্টেশন) বন্ধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। এরই মধ্যে ইউনাইটেড ন্যাশনস ফ্রেইম ওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ তাদের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের অনুমোদন সংক্রান্ত চিঠি আপলোড করেছে।
পরিবেশমন্ত্রী বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বৃক্ষ আচ্ছাদন (ট্রি কভার) ২৫ ভাগ ও বন আচ্ছাদন ১৬ ভাগে নিয়ে যেতে চাই। বর্তমানে আমাদের দেশে বৃক্ষ আচ্ছাদন ২২ ভাগ ও বন আচ্ছাদন ১৪ ভাগ রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা বৃক্ষ নিধন বন্ধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মন্ত্রী বলেন, ২০৩০ সাল পর্যন্ত আমাদের এসডিজি টার্গেট আছে। এখন অষ্টম পঞ্চম বার্ষিকী পরিকল্পনার আওতায় কাজ চলছে। ২০২৬ সাল থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা চলবে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সারাদেশে কি পরিমাণ ফরেস্ট বৃদ্ধি করবো, সেই পরিকল্পনা আছে।
তিনি বলেন, মূলত পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকল্প নেয়া হয়-সেটা যেমন বিদেশী সহায়তা হতে পারে, দেশীয় সম্পদ থেকে হতে পারে আবার বিদেশী লোন থেকেও হতে পারে।
পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা থেকে আমাদের প্ল্যান্টেশনের টার্গেট রয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। কাজেই, জনগণকে সম্পৃক্ত করে ডিফরেস্টেশন বন্ধ করতে হবে। লাইভলিহুড সাপোর্ট পেলে জনগণের মধ্যে গাছ কাটার প্রবণতা কমে আসবে বলে মন্তব্য তাঁর।
স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে গত ৩১ অক্টোবর থেকে দুই সপ্তাহের এই সম্মেলন শুরু হয়। গতকাল ১২ নভেম্বর শুক্রবার এ সম্মেলন শেষ হয়। এতে ২৫ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন।
সম্মেলন থেকে প্রায় দুইশর বেশি দেশকে কার্বন নিঃসরণে আরও উচ্চাকাক্সক্ষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সম্মেলনে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি, কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করা, যতটা সম্ভব কম গাছ কাটা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে যত বেশি সম্ভব মানুষকে রক্ষার বিষয়ে ঘোষণা এসেছে।
গত ২ নভেম্বর জলবায়ু সম্মেলনের (কপ-২৬) লিডার সামিটে জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে সোচ্চার ‘ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম-সিভিএফ’-এর সভাপতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বিশ্বনেতাদের সামনে চারটি দাবি তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রীর দাবির মধ্যে ছিল, প্রধান কার্বন নিঃসরণকারীদের অবশ্যই উচ্চাভিলাষী জাতীয় পরিকল্পনা (এনডিসি) দাখিল এবং তা বাস্তবায়ন, উন্নত দেশগুলোকে অভিযোজন এবং প্রশমনে অর্ধেক অর্ধেক (৫০ঃ৫০) ভিত্তিতে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি পূরণ, উন্নত দেশগুলোকে স্বল্প খরচে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি সরবরাহ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, বন্যা ও খরার মতো দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুত জলবায়ু অভিবাসীদের দায়িত্ব নেওয়াসহ জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে ক্ষতি ও ধ্বংস মোকাবেলা।