বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:৫০ পূর্বাহ্ন

বিলেতে বাঙালির জীবনের গল্প

ইমিগ্র‍্যান্ট লাইফ- পর্ব ১

সাঈম চৌধুরী
  • খবর আপডেট সময় : রবিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৮২ এই পর্যন্ত দেখেছেন

আমি খুব দরিদ্র পরিবারের একটি ছেলে। আমার বাবা ছিলেন একজন সামান্য কৃষক। সেই কৃষক পিতার সন্তান এখন বিলেতের ব্যবসায়ী। প্রচুর আয়। আজ আর অভাবের কষ্ট আমার নেই। দেশে থাকলে হয়তো ক্ষেতে খামারের কাজে জীবন কেটে যেতো। কৃষকের ছেলে কৃষক হওয়াটাই তো ছিল যুক্তিযুক্ত। আমি সে যুক্তিকে জয় করেছি। এককালে আমার বাবা যে জমিতে তার ঘাম ঝরিয়েছেন সেই জমির ফসল দেখাশোনার জন্য এখন দু’চারজন কাজের লোক রাখা হয়েছে। গেলো বছর বাবা-মা দু’জনেই হজ করেছেন। বড় ভাইয়া দেশে একটি প্রাইমারি স্কুলের সহকারি প্রধান শিক্ষক। সবচে ছোটভাইটি পড়াশোনা করছে। বাড়ি থেকে সে কলেজ যায় মোটর সাইকেলের সাওয়ার হয়ে। আমাদের এই ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে সবচে বেশি যার অবদান তিনি বড় ফুফু ।

সেই ১৯৭৯ সালের ২৫ জানুয়ারি তাঁর হাত চেপে ধরে আমি বিলেতে প্রথম পা রাখি। কাগজপত্রের সূত্রে তিনি আমার মা। আর ফুপা আমার বাবা। আমি তাদের চার সন্তানের ছোট ছেলে। ফুপা প্রথমে এই প্রস্তাবে রাজি হননি। বাবার কাকুতি মিনতি তিনি নিষ্ঠুরের মতো উপেক্ষা করে গেছেন। শেষে ফুফু বেঁকে বসেন। তিনি বলেন, ‘আমি আমার ভাইয়ের ছেলে ছাড়া লন্ডনে যাবো না।’ তার এ ঘোষণায় ফুপা বেকায়দায় পড়েন। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হন আমাকে তার কাগজের পুত্র হিসেবে মেনে নিতে। ব্যস তারপর আর কোন সমস্যা থাকে না। আমার তেরো বছর বয়েসে বাবা-মা, ভাই-বোন ছেড়ে একা ফুফুর পরিবারের সঙ্গী হই। তখন আমি ক্লাস সেভেনে। আহা! কি সেই চমৎকার দিন।  স্কুল শেষে কালা পাথর মাঠে ফুটবল খেলা, সংক্রান্তির সময়ে লাল, নীল রঙের ঘুড়ি আকাশে উড়িয়ে জীবনের উদযাপন। ছেলেবেলা এমন একটা নাটাই, যার সূতোয় কোনো সীমানা থাকে না। মনে পড়ে, প্রতি বিকেলে চলে যেতাম দুই নম্বর টিলায়। সন্ধ্যা নামলে গা ছমছম, ভূতের ভয়।
দেশ ছেড়ে চলে আসার সময় বন্ধুদের কান্না, নিজের ঝাপসা হয়ে ওঠা চোখের সেই স্মৃতি দিনে দিনে আরও যেনো ফ্যাকাসে। জানি না সেই বন্ধুরা আজ কোথায়, তাদের সাথে আর কখনও দেখা হয় নি, দুই একজনের নাম পর্যন্ত ভুলে গেছি। স্মৃতি যেনো লোহার কারখানা, মরচে ধরার জন্য ওত পেতে থাকে।

দেশত্যাগের মুহূর্তে বন্ধুদের বলেছিলাম, প্রতি সপ্তাহে চিঠি দেবো। সময়ের স্রোতে ভেসে গেছে সেই প্রতিশ্রুতি । ওদের কথা আমি একদম ভুলে গেছি। আজ নিজের পেছনে তাকাতে গিয়ে ওদের জন্য চোখের কোণে একটু জল জমে।
তাদের ফেলে রেখে, আমার সোনাঝরা সেই বালক বেলাকে অবহেলা করে আমি বিলেতের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যাই। এদেশে পৌঁছার আগে বুঝে নিতে পারিনি আমার জন্য কতোটা একাকীত্ব অপেক্ষা করে আছে। বরং বিলেত যাত্রার সংবাদে বালক মনে অদ্ভুত একটা আনন্দের দোলা দেয়। নিজেকে বিরাট কিছু বলে মনে হয়। মা তখন বেশি যত্ন‌ করতেন। রাতের বেলা তার সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমাতাম। তিনি তখন‌ মাথায় বিলি কেটে দিতেন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন। আর আমি তখন অন্য সব ভাই বোনের চাইতে বেশি আদর পাচ্ছি সেই আনন্দে আত্মহারা হতাম। বিলেত পৌঁছার পর বুঝতে পারি, জীবনের সব আদর মা কয়েক রাতেই পূর্ণ করে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, এরপর তার ছেলে আদরের কাঙাল হয়ে চিরকাল কাটিয়ে দেবে কিন্তু কোথাও আর খুঁজে পাবে না আদর বেলা। এখনো যেনো আমার গায়ে মায়ের সেই আদরের গন্ধ লেগে আছে।

বিলেত পৌঁছার পর প্রথম প্রথম বাবা-মায়ের প্রতি আমার প্রবল টান একটা অভিমানের তৈরি করে। তেরো বছর বয়েসে জীবন আর কতটুকু পাঠ করা যায়। অভাবের সাথেও গাঢ় পরিচয় হয়নি। আমার মনে হত, বাবা-মা এই কান্ডটি ইচ্ছে করেই করেছেন। তারা আমাকে ভালোবাসেন না বলেই দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। মায়ের আদর আর ফুফুর আদরের ভেতরে যে একটা তফাৎ আছে সেটি সেই তেরো বছর বয়েসেই অনুধাবন করে নিতে পারি। ফুফু যথেষ্ট আদর করতেন বটে কিন্তু এরমাঝে তুমুল টান ছিলো না। দেখতাম, ফুফু তার ছেলেমেয়েদের প্রতি যতোটা যত্নশীল আমার বেলায় সেটার ঘাটতি আছে।

অল্পবয়সে এমন জটিল আবিস্কার নিজের ভূবনকে কেমন যেনো অন্যরকম করে দেয়। ঘরে আমি যাই করি না কেন, ঠিক যেনো স্বাধীনতা ছিলো না। কীসের একটা ভয় কাজ করতো সব সময়। ফুপা প্রথম থেকেই আমার প্রতি খানিকটা বিরূপ ছিলেন। সেটা আর কাটে নি কখনো।‌ মাঝে মাঝে ফুফুতো ভাইবোনের সাথে একটু আধটু ঝগড়া বাঁধলে ফুপা তাদের পক্ষ নিয়ে নিতেন। ওদের জন্য তিনি যে জিনিসগুলো কিনে আনতেন সেটি আমার ভাগ্যে জুটতো না। ওরা রাজার হালে থাকতো। আর আমি কেমন যেন গুটিয়ে থাকতাম। সেই সময়েই আমি জেনে নেই, বাবা-মায়ের ভালোবাসার কোন বিকল্প নেই। এখানে কাগজপত্রে আমার বাবা-মা আছেন, কিন্তু কখনোই নিজের আসল বাবা-মায়ের জন্য প্রতিনিয়ত যে শূণ্যতা অনুভব করি সেটি তারা পূরণ করতে পারবেন না। মনে আছে বিছানায় গিয়ে প্রতি রাতে কেঁদে বালিশ ভেজাতাম। কান্নার শব্দ খুব প্রবল হলে সমস্যা ফুফা বিগড়ে যাবেন। অর্থাৎ সেই বয়েসে গলা ছেড়ে কান্নার স্বাধীনতাও আমার ছিলো না। ফুফুকে মাঝে মাঝে বলতাম, ফুফুগো মায়ের কাছে যাবো, বাংলাদেশে যাবো। ফুফু বলতেন, যখন বড় হবো তখন দেশে ফিরে যেতে পারবো। ফুফুর এ কথায় বড় হয়ে উঠার জন্য আমার কি তোড়জোড়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন দেখতাম কতোটা লম্বা হলাম আজ।

বিলেত বন্দি জীবন আমার কাছে অল্পদিনেই অসহ্যবোধ হয়। ফুফু আমাকে স্কুলে ভর্তি করে দেন। কিন্তু দেশের স্কুলের মতো এখানে আমি সেই সুখ খুঁজে পাইনা। আমার হৃদয় জুড়ে তখন কেবল দেশের বসবাস। ফুপা সিদ্ধান্ত নিলেন রাতের বেলা তার সাথে আমি প্রতিদিন রেষ্টুরেন্টে কাজ করবো। রেষ্টুরেন্টটা ছিল তাঁর নিজস্ব। প্রতি সন্ধ্যাবেলা আমি রেষ্টুরেন্টে চলে যেতাম। প্রথম প্রথম কাজ ছিল, বাসনপাতি ধোয়া। বয়সের কারণে উচ্চতা ছিল অল্প। মাটি থেকে বেসিন নাগাল পেতাম না। বিকল্প হিসেবে তাই বড় তেলের টিন নিচে রেখে আমি তার উপর দাঁড়িয়ে কোনরকমে কাজ সারতাম। মাঝে মধ্যে তাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে পড়ে যেতাম। রাত একটু গভীর হলে ঘুমে চোখের পাতা ভারি হয়ে আসতো।

রেষ্টুরেন্টের শেফ ইংরেজের বাপ (তিনি বিয়ে করেছিলেন একজন ইংরেজ মহিলাকে, তাদের ঘরে এক সন্তান। ইংরেজ সন্তানের কারণে সবাই তাকে ইংরেজের বাপ বলে ডাকতো) ঘুম তাড়াতে একটা কৌশল শিখিয়ে দিলেন, ঘুম পেলেই চা খাবে বাপজান। তার কথামতোই ঘুম তাড়াতে চায়ের অভ্যেস রপ্ত করি। সেই অভ্যেসটা এখনো আমার থেকে গেছে। আমি যখন রেষ্টুরেন্টে কাজে ব্যস্ত, তখন আমার ফুফাতো ভাইবোনেরা হয়তো ঘুমের রাজ্যে স্বপ্নের দেশে বিচরণ করে। আমি জেনে নেই, এক পরিবারের সদস্য হয়েও আমাদের মাঝে বিস্তর ফারাক। তাদের মতো সৌভাগ্য আমার নেই।

আমার ছেলেবেলার রোজগারে দেশে বাবা-মা, ভাইবোনের পাতে আহার জুটে। তেরো বছর বয়স থেকেই আমি আমার পরিবারের ভার গ্রহণ করি। নিজের সুখ বিসর্জন দিতে শিখি। দিনে স্কুল আর রাতে রেষ্টুরেন্ট এই চক্রে জীবন বাঁধা পড়ে। ছেলেবেলার সোনারাঙা সময় আমাকে বিদায় জানায়। এভাবে জিসিএই করার পর পড়ার পাঠ চিরতরে চুকিয়ে দেই। ফুপার রেষ্টুরেন্টে তখন আমার অবস্থান কুক হিসেবে। দেশে আর ফেরা হয় না। একসময় দেশের প্রতি সকল টান হারিয়ে ফেলি। বাংলাদেশ আমার কাছে খুব দূরের অতীত হয়ে যায়। বাবা-মায়ের কথা তেমন মনে পড়ে না। মনে পড়লে বরং তাদের প্রতি অভিমান বুকের ভেতরে উথলে উঠে। মনে হয় তারা হাত পা বেঁধে আমাকে বিলেত পাঠিয়েছেন কেবল তাদের ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার কথা ভেবে। দেশের স্মৃতি ফিকে হয়ে এলে বাবা মায়ের কাছে টাকা পাঠানোর প্রতিও আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। এক পর্যায়ে এসে দেশের সাথে সকল যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়।

মা কখনো কেঁদেকুটে ফোন করেন। সেটি আমাকে তেমন ভাবে স্পর্শ করে না। আমি একদম অন্যরকম হয়ে যাই। এভাবে সময় যেতে থাকে। চলতে চলতে একদিন ফুপার রেষ্টুরেন্টটাই আমি কিনে নেই। তার বয়স হয়েছে দুই ছেলের কেউই এই ব্যবসার প্রতি আগ্রহী নয়। ম্যানেজমেন্টের সমস্যার কারণে রেষ্টুরেন্টের ব্যবসায় দিনে দিনে ধস নামে। বাধ্য হয়ে ফুপা তার প্রিয় ‘এশিয়া রেষ্টুরেন্ট’ বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন। ব্যবসা না থাকায় কেউ এটি কেনার প্রতি কোন আগ্রহ প্রকাশ করে না। শেষে আমি নিজেই কিনে নেই। ভাগ্য আমার অনুকূলে ছিল, কিছুদিনের মধ্যে ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠে। আমার কোন পিছুটান ছিলনা। তাই সকল টান ‘এশিয়া’কে নিয়েই।

আমার এখন অভাব বলে কিছু নেই। স্বচ্ছল। স্বচ্ছন্দ জীবন।‌ এদিকে দেশে বাবা অসুস্থ। তার হার্টে সমস্যা দেখা দিয়েছে। তিনি ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারছেন না কেবল টাকার অভাবে। ফুফুর কাছ থেকে এই সংবাদ শুনে আমার কোন ভাবান্তর হয়না। ফুফু বলেন, তুই মানুষ না পাথর? একদিন বাবা নিজে ফোন করেন। তিনি তখন ভীষণ অসুস্থ। কোনরকমে আমাকে বলেন, ”বাবারে রাইত ঘুমাইতে পারিনা। বুকও বড় বেদনা। যুুদি আল্লার রাস্তে তুই কিছু টেকা দিতে তাইলে কলিকাতা গিয়া একবার ডাক্তার দেখাইতাম”। বাবা তার ছেলের কাছে সাহায্য চাইছেন। বাবার এই কথায় আমি যেনো সেই তেরো বছর বয়েসে ফিরে যাই। আমার ভেতরের সকল অভিমান জল হয়ে আসে। নিজের ভেতরের কান্নাকে তখন আর বেঁধে রাখতে পারিনা। আমার এত অর্থবিত্ত কিসের জন্য, কার জন্য? যদি চিকিৎসার অভাবে বাবার কিছু হয়ে যায় তবে আমি নিজেকে ক্ষমা করে দিতে পারবো না। এই দিনটায় যেনো আমি আবার নতুন করে জন্ম নেই। সে দিনই আমি দেশে ফিরে যাবার জন্য বিমানের টিকেট কাটি।

১৯৯৯ সালে দীর্ঘ ২০ বছর পর আমি দেশে ফিরি। সেই ছেলেবেলার প্রিয় সিলেট শহর। বাবাকে নিয়ে নিজে ইন্ডিয়া যাই। আসলে আমাকে আবার ফিরে পেয়ে বাবার অসুস্থতা এমনিতেই অনেকটা কেটে যায়। আমাকে জড়িয়ে ধরে মায়ের সেকি কান্না! আমি সেদিনই জানলাম ভালোবাসা হারিয়ে যাবার নয়। দরিদ্র একটা দেশে জন্ম বলে বুকে পাথর বেঁধে সন্তানকে চোখের আড়াল করেছিলেন কিন্তু বুকের আড়াল কখনোই করেননি। আমি তাদের কাছে এখনো সেই তেরো বছর বয়েসি বালক থেকে গেছি। দেশে ফিরে বাবা-মায়ের মমতায় সিক্ত হয়ে আমি জানলাম, পৃথিবীতে এ বড় দুর্লভ ভালোবাসা! মিছে অভিমানে দীর্ঘদিন আমি নিজেকে এই ভালোবাসা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলাম। সেটিতে মূলত আমারই বিরাট ক্ষতি হয়ে গেলো। আহা! কেন আমি আরো আগে ফিরে গেলাম না!!

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102