

নবীগঞ্জের সিএনজি পাম্পের অগ্নিকান্ডের কারণ নিয়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লোকজন বাসের কীট থেকে অগ্নিকান্ডের সুত্রপাত বললেও, বাস পরিবহন শ্রমিক পরিষদ সেটি মেনে নেয়নি। তারা পাম্প কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে তাদের বিচার দাবি করছেন।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক বলেছেন, তাদের তদন্তে প্রমান হলে বাস মালিককে ক্ষতিপুরন দিতে হবে সিএনজি পাম্পকে। দুইদিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট বিস্ফোরক অধিদপ্তরের জমা দেয়া হবে। তখন সিএনজি পাম্পকে কারন দর্শানোর নোটিশ করা হবে।
নবীগঞ্জ উপজেলার আউশকান্দি এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে অবস্থিত ‘মেসার্স আউশকান্দি সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন-এ ভয়াবহ অগ্নিকাÐের ঘটনায় বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক মোস্তফা ফারুক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি শনিবার পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমকে জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বাসের মধ্যে নিম্নমানের কীট ব্যবহারের কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটে। তিনি পরিদর্শন শেষে ঘটনার রহস্য উদঘাটন নিয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন।
বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক মোস্তফা ফারুক বলেন, “২১ আগস্ট ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে ‘হোসেন এন্টারপ্রাইজ’ নামক একটি যাত্রীবাহী বাসে সিএনজি ভরার সময় সিলিন্ডার থেকে গ্যাস লিকেজ হয়ে যায়। এতে পুরো স্টেশন প্রাঙ্গণে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে এবং সাদা মেঘের মতো আবরণ তৈরি হয়। এ সময় স্টেশনে থাকা অটোরিকশা বা গাড়ির ইঞ্জিনের স্পার্ক থেকে আগুনের সুত্রপাত হয়ে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতীয়মান হয়।”
তিনি আরও জানান, দেশে ২০০১ সাল থেকে সিএনজি ব্যবহার শুরু হয়। সিএনজি সিলিন্ডারের মেয়াদকাল ২৫ বছর হলেও প্রতি ৫ বছর অন্তর রি-টেস্ট করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সিলিন্ডার রূপান্তরের পর অধিকাংশ গাড়ি মালিক সিলিন্ডারের রি-টেস্ট বা সার্ভিসিং করেন না। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে এবং জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটছে।
প্রতিকার ব্যবস্থা হিসেবে তিনি প্রস্তাব করেন- মোটরযানের ফিটনেস সনদ গ্রহণের সময় সিলিন্ডারের রি-টেস্ট সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করতে হবে। সিএনজি বিধিমালা ২০০৫ এর ৭৮ নং বিধি অনুসারে প্রতি তিন মাস অন্তর স্টেশনের সরঞ্জামাদি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। একই বিধিমালার ৭৯ নং বিধি অনুযায়ী রিফুয়েলিং স্টেশন নিরাপত্তা বিষয়ক বার্ষিক জরিপ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এসব নিয়ম-কানুন কঠোরভাবে কার্যকর করা গেলে এ ধরনের দুর্ঘটনা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য যে, “২১ আগস্ট ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে দিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে আউশকান্দি সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনে পুরোনো ফিটনেসবিহীন বাসে গ্যাস ভরার সময় হঠাৎ বিস্ফোরণে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই র্তা আশপাশে রাখা গাড়িতে ছড়িয়ে যায়। খবর পেয়ে নবীগঞ্জ, বাহুবল ও ওসমানীনগর থেকে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট এক ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে সকাল ৭টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ দুর্ঘটনায় ৯টি অটোরিকশা, একটি বাস, দুটি মোটরসাইকেলসহ পাম্প পুড়ে যায়। গুরুতর আহত হন ৬জন। তাদের সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছে। আগুনে প্রায় কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন পাম্প কর্তৃপক্ষ।
বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক মোস্তফা ফারুক এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমরা সিএনজি ষ্টেশনের কাগজ পত্র পরীক্ষা করছি। তাদের তিন মাস পরপর গ্যাস ষ্টেশনের সার্ভিসিং করার কথা কিন্তু তারা ২০ দিন আগে তারা দেশের শীর্ষ গ্যাস সার্ভিসিং প্রতিষ্ঠান নাভানা গ্যাস ফিলিং ষ্টেশন সাভিসিং এর লোকজন সাভিসিং করে গেছেন। তবুও আমরা এদের কাগজ পত্র সঠিক কিনা পরীক্ষা নিরিক্ষা করে রিপোর্ট দিলে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক তাদেরকে শোকজ করবেন। বাসের লোকজন এখনও কোন কাগজ পত্র দেখাতে পারেননি। তবে যেহেতু সিএনজি ষ্টেশনে ঘটনা হয়েছে, আমরা পরীক্ষা নিরিক্ষা করে তাদেরকে পরবর্তী কি করা যায় সেটা আমাদের প্রধান অফিস ব্যবস্থা নিবেন। আমি দুইদিনের ভিতর তদন্ত রিপোর্ট পাটাবো।
বাসের কীট গুলো তিন মাস অন্তর অন্তর সাভিসিং করার কথা থাকলেও তারা সার্ভিসিং করেছি কিনা এখনও কিছুই দেখাননি। তিনি আরও বলেন, তাদের তদন্তে প্রমান হলে বাস মালিক ক্ষতিপুরন দিতে হবে সিএনজি পাম্পকে।
বাসের চালক ও মালিক শহিদ মিয়া জানান, তিনি বাসের বাম পাশে নজেল আগুন লাগছে ডান পাশে সিএনজি থেকে। আমি তাৎক্ষনিকভাবে আগুন দেখে বাসটি পাম্প থেকে বাহির করার চেষ্টা করা হয় কিন্তু আমি বাহির করতে পারি নাই। আমি দুই বছর আগে বাসটি ক্রয় করি। এক বছর আগে গ্যাসে রপান্তর করি। এরপর একবার একমাস আগে মৌলভীবাজার কীট নজেল পরীক্ষা করেছি। কিন্তু কোথায় করেছি সেটির নাম মনে নেই সরাসরি দেখলে বলতে পারবো। তিনি আর জানান গাড়ির সব কাগজ পত্র পুড়ে গেছে এখন দেখানো সম্ভব নয়।
হবিগঞ্জ মোটর মালিক বাস ও মাইক্রোবাস শ্রমিক পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো সাইদুর রহমান বলেন, আমরা সরজমিন দেখেছি আমাদের বাসের নজেল সিলিন্ডার বা কিট থেকে আগুনের সুত্রপাত হয়নি। বাসের পাশে ইঞ্জিন থেকে আগুনের সুত্রপাত হয়েছে। তিনি বলেন, বাসের মালিক অত্যান্ত গরীব মানুষ বাড়ির ৮ শতক জায়গা বিক্রি করে ১৫ লাখ টাকা দিয়ে বাসটি ক্রয় করেছিল। তিনি বলেন, বাসের ফিটনেস নেই বললেও সেটা সঠিক, গাড়ির ফিটনেস ও অন্যান্য কাগজ পুড়ে গেছে তাই এখন দেখানো সম্ভব হচ্ছে না। আমরা পাম্পের মালিকের কাছে বিচারের তারিখ চেয়েছি। তারা বলছেন পরবর্তীতে বিচারে তারিখ দিবেন।
নবীগঞ্জ পরিবহন বাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ছামাদুল হক বলেন, আমরা সরজমিন দেখেছি আমাদের বাসের নজেল সিলিন্ডার বা কিট থেকে আগুনের সুত্রপাত হয়নি এখন আমাদের বাসের উপর দোষ ছাপানো হচ্ছে। বাসের কীট বা নজেল থেকে আগনে পুড়ে নাই এখন বাসের মধ্যে নজেল কে খুলে নিয়ে গেছে সেটা পাওয়া যাচ্ছে না। বাসের বাম পাশে নজেল আগুন লাগছে ডান পাশে এটাই রহস্য।