

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্প্রতি ঢাকা সফর করে যাওয়া মার্কিন প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলটি পাঁচটি সুপারিশ করেছে। গত ১৪ অক্টোবর ওয়াশিংটন থেকে প্রচারিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলের এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। এই ৫টি সুপারিশ হলো (১) নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হতে পারে উদার কথাবার্তা, উন্মুক্ত এবং গঠনমূলক সংলাপ। (২) মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিক সমাজের কথা বলার স্থান নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে ভিন্ন মতালম্বিদের প্রতি সম্মান দেখানো হবে। (৩) অহিংস থাকার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে এবং রাজনৈতিক সহিংসতাকারীদের জবাবদিহিতায় আনতে হবে। (৪) সব দলকে অর্থবহ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এর মধ্যে থাকবে স্বাধীন নির্বাচন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং (৫) নাগরিকদের মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সক্রিয় নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ গ্রহণের সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলের এই ৫টি সুপারিশ এর উত্তরে বলা যায়, ১নং বাংলাদেশে যখন প্রথম দিকেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রক্রিয়া শুরু হয় তখনই আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে বসার জন্য আমন্ত্রণ জানান। এই সংলাপের উদ্দেশ্যই ছিলো বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে তাদের মতামতের উপর ভিত্তি করে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রেখে সুন্দর পরিবেশে একটি অর্থবহ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। প্রধানমন্ত্রীর এই ডাকে সাড়া দিয়ে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ সংলাপে অংশ গ্রহণ করেন এবং তাদের মতামত প্রদান করেন। তাদের এই মতামতগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করা হয় অথচ বিএনপি এই সংলাপে আসেনি। বিএনপি’কে সংলাপে বসার জন্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চা-পানের দাওয়াত দিয়ে বলেছেন, আপনারা আমাদের সাথে বসেন, আপনাদের মতামত আমাদের জানান, আমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে অমত থাকলে তা কিভাবে দূর করা যায়, তা আলোচনার মাধ্যমেই আমরা ঠিক করে নেবো। কিন্তু বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানকে প্রত্যাখান করে। এর চেয়ে উদার আহ্বান আর কি হতে পারে? আর তারা যখন সংলাপেই বসেনি তাহলে গঠনমূলক সংলাপ কার সাথে হবে? এখানে যদি পর্যবেক্ষক দলকে আমি প্রশ্ন করি, আপনারা যখন বাংলাদেশে আসলেন তখন আপনারা কি বিএনপি নেতাদের সরকারের সাথে সংলাপে বসার কথা বলেছেন? আপনারা তো শুধু তাদের কথার উপরই আপনাদের মতামত দিয়েছেন।
২নং- আপনারা মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলেছেন। বাংলাদেশের সকল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো স্বাধীন ভাবে সভা সমিতি করছে, মিছিল সমাবেশ করছে এবং তাদের ইচ্ছামতো বক্তৃতা বিবৃতি দিচ্ছে সরকারতো কোন বাধা প্রদান বা ভয়ভীতি দেখাচ্ছে না। এ রকম কোন অভিযোগ তো সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে না। তাহলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা আর কি ভাবে হতে পারে?
৩নং -আওয়ামী লীগ সরকারতো সব সময়ই অহিংশ আছে। সম্প্রতি বিএনপি এবং তার অঙ্গসংগঠনগুলো বিভিন্ন সভা সমাবেশের মাধ্যমে যে গোলযোগ সৃষ্টি করার পায়তারা করছে, তাদের বিরুদ্ধে তো সরকার আ্ইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লেলিয়ে দিচ্ছে না বরং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলছেন, সভা সমাবেশ করা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার, তাদেরকে শান্তিপূর্ণ ভাবে তা করতে দাও। এর চেয়ে বেশী সম্মান আর কিভাবে দেয়া যায়? তা কি পর্যবেক্ষক দল বলে দেবেন? এরপর তারা বলেছেন, রাজনৈতিক সহিংসতাকারীদের জবাবদিহিতায় আনতে হবে। ইহা খুবই চমকপ্রদ এবং যুক্তিগঙ্গত একটি সুপারিশ। দেশের সাধারণ মানুষেরও বক্তব্যও তা-ই। যারা বর্তমানে রাজনৈতিক সহিংতায় জড়িত সরকার ইচ্ছা করলে তাদেরকে আইনের আওতায় এনে জবাবদিহিতার জন্য দাঁড় করাতে পারে কিন্তু যেহেতু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের একজন অতন্দ্র প্রহরী, সেজন্য তিনি এ পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। এজন্য পর্যবেক্ষক দলের উচিৎ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানানো।
৪নং- নির্বাচনে অংশ করার জন্য বারবারই সরকার থেকে বিএনপি এবং তার অঙ্গ সংগঠনগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে কিন্তু এরপরও যদি কেউ না আসে, তাহলে সরকারের কি করার আছে? যদি বলেন নির্বচনের পরিবেশ নেই, তাহলে বলতে হয় ওরা-ই তো পরিবেশ নষ্ট করছে। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন এখন স্বাধীন ভাবে কাজ করছে এবং তার প্রমাণ দেশে অনুষ্ঠিত গত কয়েকটি উপ-নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী বলেই তা সম্ভব হয়েছে।
৫নং-গত যে কয়টি উপ-নির্বাচন হয়েছে তাতে প্রমাণিত হয়েছে যে, জনগণ সক্রিয় নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ গ্রহণের সংস্কৃতিতে উৎসাহিত হয়ে স্বত:স্ফ‚র্তভাবেই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। কোন ভয়ভীতি তাদের মধ্যে ছিল না। তাতে এটাই প্রমাণ করে, গ্রামে-গঞ্জের মানুষ যারা তারাই প্রকৃত ভোটার এবং তারাই যদি নির্ভিঘ্নে ভোট প্রদান করতে পারে, তাহলে গুটি কয়েক রাজনৈতিক দলের কথা তো দেশবাসী মেনে নিতে পারেনা।
গত সোমবার (১৬ অক্টোবর) বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নিজেদের নিজেদের অবস্থান স্পস্ট করেছে জাতিসংঘ। এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তেনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিক বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জাতিসংঘের অবস্থান স্পস্ট করেন। মি: ডুজাররিক সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমরা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান জেনেছি, ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের অবস্থান সম্পর্কে জেনেছি। বর্তমানে এই নিষ্পেষণমূলক ব্যবস্থায় বাংলাদেশ ইস্যুতে জাতিসংঘের সর্বশেষ অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। জবাবে স্টিফেন ডুজাররিক বলেন, বাংলাদেশে নির্বাচন ইস্যুতে অবস্থানের কোনো পরিবর্তন করেনি জাতিসংঘ। বাংলাদেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চাই আমরা। একই সঙ্গে এমন একটি পরিবেশ দেখতে চাই, যেখানে মানুষজন যে কোনো পক্ষে কথা বলতে পারবে প্রতিশোধের ভয় ছাড়া। এ ছাড়া ম্যান্ডেট না পাওয়া পর্য্যন্ত নির্বাচন পর্যবেক্ষন করবে না জাতিসংঘ।
জাতিসংঘ প্রধানের পক্ষ থেকে এই বিবৃতি আমার কাছে মনে হচ্ছে যেন ইহা মি: বাইডেনের দেয়া শেখানো বুলি। জাতিসংঘ হচ্ছে সারা বিশ্বের যেসব দেশগুলোতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার বিষয়ে ন্যায় অন্যায়ের বিচার করে তারপর তিনি ন্যায়ের পক্ষে তার বক্তব্য প্রদান করা। তিনি হচ্ছেন সারা বিশ্বের নেতা। বাংলাদেশের ব্যাপারে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন তার সত্য মিথ্যা যাচাই না করেই, তদন্ত না করেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিগুলোর পক্ষ নিয়ে বক্তব্য দেওয়ায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রিয় জনগন খুবই মর্মাহত হয়েছেন।
অবশ্য শুধু দেশবাসী নয়, সারা বিশ্বের মানুষ জানে জাতিসংঘ হচ্ছে আমেরিকা এবং ইউরোপের একজন মুখপাত্র মাত্র। অসহায় নিপীড়িত মানুষের পক্ষে তারা কথা না বলে বরং তাদের পক্ষেই কথা বলে।
গত ১৭ অক্টোবর ’সংবাদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে, চীন সফরে গেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। সফরে আসন্ন ’বেল্ট এন্ড রোড ফোরামের’ শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেয়ার পাশাপাশি পুতিন তার ’প্রিয় বন্ধু শি জিনপিংয়ের সঙ্গেও দেখা করবেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন মঙ্গলবার তার ’প্রিয় বন্ধু’ শি জিনপিংয়ের সাথে দেখা করতে চীনে পৌঁছেছেন। ১৭-১৮ অক্টোবর বেইজিংয়ে ’বেল্ট এন্ড রোড ফোরামের’ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে এবং পুতিন এই সম্মেলনেও অংশ নেবেন। এএফপি’র খবরে প্রকাশ, মঙ্গলবার হতে শুরু হতে যাওয়া বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ ফোরামে অংশ নিতে চীন ১৩০টি দেশের প্রতিনিধদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এশিয়া পরাশক্তির এই দেশটির আশা, এই সম্মেলন বেইজিংয়ের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করবে।
রাশিয়া এবং চীনের মধ্যে যে ভাবে তাদের সম্পর্ক দিন দিন গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে তারা অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীর একটি অংশের নেতৃত্ব দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং এই শিক্ষা পাচ্ছে জাতিসংঘের কাছ থেকে। এক দিন যদি রাশিয়া-চীনের নেতৃত্বে সৌদি আরব, ইরান, ইরাক সহ সকল মুসলিম দেশগুলো এবং এশিয়ার দেশগুলোকে একত্রিত করে তারাও যদি জাতিসংঘের মতো একটি ’সংঘ’ গড়ে তোলতে সক্ষম হয় এবং তারা সত্য এবং ন্যায়ের পক্ষে থাকে তাহলে আমার বিশ্বাস, জাতিসংঘকে ব্যবহার করে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয়ান ই্উনিয়ন বিশ্বের নিপীড়িত, অসহায় মানুষকে নিয়ে যে, পুতুল খেলা খেলছে তার খেসারত তাদেরকে একদিন দিতেই হবে।
লেখকঃ দেওয়ান ফয়সল, কলামিষ্ট, সিনিয়র সাংবাদিক ও সদস্য লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব