শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০০ অপরাহ্ন

দ্বাদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠে গড়াল আ‘লীগ-বিএনপির বাগযুদ্ধ

ফের উত্তপ্ত হচ্ছে দেশের রাজনীতি

সফিকুল ইসলাম
  • খবর আপডেট সময় : রবিবার, ১১ জুন, ২০২৩
  • ১৮১ এই পর্যন্ত দেখেছেন

আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিত্যপণ্যে লাগাতার মূল্যবৃদ্ধি-গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটসহ নানাইস্যুকে কাজে লাগিয়ে মাঠ গরমের চেষ্টা করছে রাজপথের বিরোধী দল হিসেবে পরিচিত বিএনপি। সরকারকে বিভিন্নভাবে ব্যর্থ প্রমাণে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যবহার করে আন্দোলনে জনগণকে টানার চেষ্টা করছে টানা ১৬ বছরের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি। এজন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের বিষয়টিকে কাজে লাগাতে চাচ্ছে তারা।

বিপরীতে আওয়ামী লীগও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সভা-সমাবেশ করে জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি বিএনপি আমলের নানা দুর্নীতি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে তাদের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরছে। মূলত দ্বাদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে পরস্পরকে দোষারোপ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা বাগ্যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন। এতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতির মাঠ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ গত শনিবার ১০ বছর পর রাজধানীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সমাবেশ করেছে। আওয়ামী লীগের দাবি, বিএনপি জ্বালাও-পোড়াও রাজনীতির প্রস্তুতি হিসেবে তাদের সঙ্গী জামায়াতকে মাঠে নামিয়েছে।

শনিবার পৃথক কর্মসূচিতে নির্বাচন, সংলাপ ও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন দেশের দুটি রাজনৈতিক দলের নেতারা। রাজধানীর নিকুঞ্জে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। তাই কোনো ভয় নেই আমাদের। তবে অপকর্ম করলে বিএনপিকে মূল্য দিতে হবে। তিনি বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে আবারও দেশে জ্বালাও-পোড়াও এবং অগ্নিসন্ত্রাস চালানোর জন্য বিএনপি-জামায়াত জোট প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে জামায়াতকে মাঠে নামিয়েছে বিএনপি, তারা নিজে নামেনি। এর মধ্যদিয়ে তারা আবারও আগুন সন্ত্রাসের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে বিরোধীদের যেকোনো অপকর্ম রুখে দিতে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, বিএনপি খেলার মাঠে না এসে লাফালাফি শুরু করেছে।

আওয়ামী লীগ যখন খেলার মতো খেলতে নামবে, তখন বিএনপি পালানোর সুযোগ পাবে না। বিএনপির আন্দোলন করার মতো কোনো নেতা নেই। তাদের দলের শীর্ষ এক নেতা হাসপাতালে, আরেক নেতা মুচলেকা দিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার দেশের সব ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। জিনিসপত্রের মূল্য, বিদ্যুৎ সমস্যাসহ দেশে কিছু সমস্যা রয়েছে। তবে পরিকল্পিতভাবে এসব সমস্যা সমাধানে চেষ্টা করে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসব বিষয় নিয়ে বিএনপির মিথ্যা প্রচারণা এবং আন্দোলনের চেষ্টার সমালোচনা করেন কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়েছে। তিনি বলেন, একাত্তরের ঘাতক এবং ৭৫ এর ঘাতকরা একত্রিত হয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। বিএনপি-জামায়াত দেশকে পেছনে ঠেলে দিতেই এ রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র করছে।

তিনি আরও বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কনসেপ্ট এখন মৃত। সংবিধানের বাইরে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। নির্বাচনকালীন সরকার, নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালন করবে এবং এই সরকারই নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সার্বিক সহযোগিতা করবে। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, দয়া করে নির্বাচনের খেলা থেকে পালিয়ে যাবেন না। নির্বাচনে আসুন, আওয়ামী লীগ খেলে গোল দিতে চায় কিন্তু বিএনপি চায় খেলা থেকে পালিয়ে যেতে। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে আমরা ওয়াকওভার চাই না। আপনারা নির্বাচনী খেলায় আসুন, আমরা খেলে বিজয় লাভ করতে চাই। নির্বাচনে অংশ নিয়ে আপনাদের জনপ্রিয়তা যাচাই করুন, দশ শতাংশ ভোট পান কিনা সেটি পরখ করে দেখুন। তিনি আরও বলেন, বিএনপির এখন দুই ভীতি।

একটা হচ্ছে নির্বাচন, আরেকটা হচ্ছে মানুষ। সেজন্য বিএনপি মহাসচিবসহ তাদের নেতাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। বিশেষ করে নতুন মার্কিন ভিসানীতি ঘোষণার পর বিএনপির মাথা আরও বেশি খারাপ হয়ে গেছে। কারণ এখন বিএনপি আর নির্বাচন প্রতিহত এবং বর্জন করার কথা বলতে পারবে না, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, ইদানিং কিছু কিছু বিএনপি নেতা ও ছোট ছোট কয়েকটি দল লাফালাফি করে বক্তব্য দিচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন, বিদেশি প্রভুরা তাদের ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। এ বাংলার গ্রাম-গঞ্জের মানুষ শেখ হাসিনার পক্ষে, আওয়ামী লীগের পক্ষে। দেশের মানুষ উন্নয়ন, শান্তি চায়। কোনো দুর্বৃত্তের পক্ষে থাকতে পারে না। তিনি বলেন, লাফালাফি বন্ধ করে নির্বাচনে আসুন। সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে।

শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন করবে। সেই নির্বাচনে অংশ নিয়ে জনপ্রিয়তা যাচাই করুন। তবে সংলাপের নামে বিএনপি দুইবার প্রতারিত হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাজধানীর ডিআরইউতে সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট গৌতম চক্রবর্তীর ১ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়েজিত স্মরণ সভায় মির্জা ফখরুল বলেন, সরকারে কোনো ফাঁদে বিএনপি পা দেবে না। তাদের সঙ্গে আর কোনো আলোচনা নয়, অতীতের মতো আর প্রতারিত হতে চায় না বিএনপি। তিনি বলেন, ২০১৪-১৮ এর মতো আবারও আলোচনার পথে যেতে চায় সরকার, প্রশ্নই উঠে না, জনগণ সেদিকে যাবে না। ২০১৪-১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে আলোচনায় গিয়ে কোনো সুফল আসেনি। বাঘ আর রাখাল বালকের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর ঘটবে না।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, দুইবার সরকারের প্রতারণার শিকার হয়েছে বিএনপি। তৃতীয়বার আর প্রতারণার ফাঁদে পা দেবে না তারা। কোনো কথা শুনতে রাজি নয় বিএনপি, সরকারকে পদত্যাগ করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে, যাদের অধীনে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা হবে। তিনি বলেন, এ সরকারের থাকার আর কোনো কারণ নেই। ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও মন্ত্রী-এমপিরা বলছেন তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু ডেড ইস্যু। তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু ডেড ইস্যু হবে কেন, এটাই সবচেয়ে লাইফ ইস্যু।

তিনি অভিযোগ করেন, ভোট ও নির্বাচনের ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। কারণ তারা জানে যে, তারা এত চুরি-দখল করেছে সাধারণভাবে বা সুষ্ঠুভাবে যদি নির্বাচন হয়; তাহলে তারা ক্ষমতায় ফিরে আসা তো দূরে থাকুক, ১০ ভাগেরও বেশি ভোট তারা পাবে না। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে যখন বিশ্ব পরিস্থিতি টালমাটাল, তখন বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলো জ্বালানির সংকটে পড়েছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এই ধারাবাহিকতায় গত কিছুদিন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিয়ে সংকট দেখা দেয়। শুরু হয় লোডশেডিং।

তবে সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতির উন্নতিতে কাজ করছে। যে কারণে ৮ জুনের পর বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। এরই মধ্যে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা দেশে পৌঁছেছে। পায়রা ও বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্যও কয়লা চলে আসবে শিগগিরই। তবে সাময়িক সমস্যাকে ইস্যু বানিয়ে আন্দোলনে বেগ আনতে চেয়েছিল বিএনপি। সম্প্রতি তারা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সামনে অবস্থান কর্মসূচিও পালন করেন। এ ছাড়া সড়কবাতির নিচে হারিকেন নিয়ে মিছিল করে হাস্যরসেরও জন্ম দেন বিএনপি নেতারা। বিদ্যুৎ নিয়ে বিএনপির আন্দোলনকে এক ধরনের প্রহসন বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।

তারা সমালোচনা করে বলেন, বিএনপির রেখে যাওয়া সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎকে আওয়ামী লীগ ২৫ হাজার মেগাওয়াটে নিয়ে গেছে। সর্বশেষ ৯ জুনও দেশে সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। এসবের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর জন্য জ্বালানি সংগ্রহেও সরকার কাজ করছে। এ অবস্থায় নিজেদের সময়ের চরম খারাপ পরিস্থিতির কথা চিন্তা না করে বর্তমানের সাময়িক অসুবিধা নিয়ে আন্দোলন করা বিএনপির দ্বিচারিতা।

জনগণের সঙ্গে এ ধরনের প্রতারণা বন্ধ করে সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে এসে বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা যাচাই করতে পরামর্শ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। এদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতের সক্রিয় হওয়ার বিষয়টি রাজনীতির মাঠে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘ ১০ বছর পর অনুমতি নিয়ে রাজধানীতে সমাবেশ করেছে জামায়াত। বিষয়টি নিয়ে অনলাইন ও অফলাইনে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চসহ বিভিন্ন সামজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন ২০১২-১৩ সালে আগুন সন্ত্রাসে নেতৃত্ব দেয়া সংগঠনটিকে মুক্তিযুদ্ধ সময়ের কর্মকাণ্ডের জন্য নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছে। সব মিলিয়ে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বাগযুদ্ধ তীব্র হচ্ছে।

নিউজ/এম.এস.এম

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102