

দেওয়ান রফিকুল হায়দারঃ বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে আন্দোলনের বিভিন্ন ধরণের কর্মসূচী নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সে আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য হলো, বিএনপি’র রাজনীতি টিকিয়ে রাখতে হলে তাদের আগামী নির্বাচনে যেভাবেই হোক জয়ী হতে হবে। তাদের নেতারা ভালো করেই এবার বুঝে নিয়েছেন যে, আগামী নির্বাচনে জয়ী না হলে দলকে আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়, তাই তারা “মারো অথবা মরো” এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে তাদের আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। তাদের ভয়, এবার যদি আওয়ামী লীগ কোন ভাবে জয়ী হয়, তাহলে বিএনপি’র অস্থিত্ব আর থাকবে না।
কথা হচ্ছে, ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে বিএনপি জামায়াতের সাথে মিলে জোট সরকার নিয়ে মন্ত্রী সভা গঠন করে। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পরপরই তারা হাওয়া ভবনকে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে। দুর্নীতি, লুটপাট, হত্যা, গুম ইত্যাদির কারণে তারা জনগণের আস্থা হারাতে থাকে। ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখার জন্য তারা নীলনকশা তৈরী করে এবং সেই নীলনকশার মাধ্যমেই ইয়াজ উদ্দীন আহমেদকে তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা হয়। সে সময় তার তত্বাবধানেই একটি নির্বাচনের আয়োজন করা হয়।
এরপর ২০০৭ সালের জানুয়ারী মাসে ওয়ান ইলেভেনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতাচ্যুত হয়। সে সময় শেখ হাসিনা এবং পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু প্রায় দু’বছর সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব পালন করার পর জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তাদের নির্বাচন দিতে বাধ্য করা হয়। সেই নির্বাচনে তিন চতুর্থাংশেরও বেশি আসন পেয়ে আওয়ামী লীগের মহাজোট বিজয় লাভ করে।
এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ গ্রহণ করেনি। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে তারা ভোট বর্জন করে। সেই সময় তাদের সেই আন্দোলনও ব্যর্থ হয়। এরপর থেকে এখন পর্য্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তারা সেই তত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে আন্দোলন করে যাচ্ছে কিন্তু সবগুলো আন্দোলনই ব্যর্থতায় পরিণত হয়েছে এবং এবারও যে তারা ব্যর্থ হবে তাও তারা জানে।
বিএনপি ক্ষমতা হারানোর পর থেকে তত্বাবধায়ক সরকার গঠনের যে দাবী জানিয়ে আসছে এবং প্রতিবারই জনগণের কাছে যা গ্রহণযোগ্য নয় তাদের সে দাবী নিয়ে আবারও শুরু করেছে আন্দোলন, সুতরাং এই আন্দোলনও যে কার্য্যকর ভুমিকা রাখতে পারবেনা তা তাদের নেতৃবৃন্দ ভালো করেই বুঝতে পারছেন। এ কারণেই তারা শঙ্কিত। তাদের এই আন্দোলনের মুল উদ্দেশ্যই হচ্ছে, দলের যে নেতা কর্মীরা আছেন, তাদের বোঝানো যে আমাদের দল এখনও বেঁচে আছে! তোমরা ভয় করো না।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব ওয়ায়দুল কাদের বলেছেন, তত্বাবধায়ক সরকারের কোন প্রশ্নই ওঠেনা। কারণ বর্তমানে একটি গণতান্ত্রিক সরকার দেশ পরিচালনা করছে। সুতরাং বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা সব দলকেই আলোচনায় বসার আমন্ত্রণ জানিয়েছি এবং অনেক দলই তাদের মতামত আমাদের কাছে দিয়েছেন কি ভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন করা যায়, আমরা সে ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করছি। বিএনপি’কেও আমরা আমন্ত্রণ জানিয়েছি কিন্তু তারা আমাদের সাথে আলোচনায় বসতে রাজি নয়। তারা যদি না আসে তাহলে আমাদের করার কিছু নেই।
অন্যদিকে, লন্ডন থেকে বিএনপি নেতা তারেক জিয়ার নির্দেশে সুশীল সমাজের কয়েকজনকে নিয়ে বাংলাদেশের সংবিধান রদবদলের কাজ তারা চালিয়ে যাচ্ছে বলে বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা গেছে। অর্থাৎ ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই তারা ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে সংবিধানে তত্বাবধায়ক সরকারের বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে চায়। বর্তমান সংবিধানে যদি তত্বাবধায়ক সরকারের সংশোধনী আনা না যায়, তাহলে নতুন একটি সংবিধান প্রণয়নের জন্য যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক এবং তারেক জিয়ার একজন ঘনিষ্ঠ মানুষ ড. আসিফ নজরুল, ড. বদিউল আলম মজুমদার, এডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, এডভোকেট ড. শাহদীন মালিক এবং ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য’কে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধর্মনিরপেক্ষতা প্রাধান্য দিয়ে অর্থাৎ আমাদের দেশে যে সকল ভিন্ন ধর্মালম্বী রয়েছে তাদের মূল্যায়ন করে যে সংবিধান রচনা করা হয়েছে তা যদি বিএনপি পরিবর্তন করে তা কি বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে?
অভিজ্ঞ মহলের মতে, তারা যদি নতুন সংবিধান রচনা করে তাহলে তা হবে জামায়াতে ইসলামীর মতামলম্বনে, তাদেরকে সঙ্গে নিয়েই তো বিএনপি’র আন্দোলন। তাহলে স্পষ্টই বুঝা যায়, নতুন সংবিধান রচনা হলে তাতে ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি উঠিয়ে দেয়া হবে। তাহলে লক্ষ শহীদের রক্ত আর ত্রিশ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে কি তারা পদলুন্ঠিত করতে চায়?
পাকিস্তানী মনোভাব সম্পন্ন সুশীল সমাজ এবং বিদেশী চরদের প্ররোরচনায় যদি বিএনপি এমন সংঘাতপূর্ণ কাজে হাত দেয় তাহলে আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের জনগণ বিএনপি’র রাজনীতিকে চিরতরে প্রত্যাখান করবে। অর্থাৎ বিএনপি নিজেদের ধ্বংস নিজেরাই ডেকে আনছে।
সুতরাং বাংলাদেশের জনগণকে আমি আহ্বান জানাবো, আপনারা দেশের স্বাধীনতা রক্ষার স্বার্থে আগামী নির্বাচনে দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলকে প্রতিহত করুন, যে ভাবে বঙ্গন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন দেশের স্বাধীনতা আদায়ের লক্ষ্যে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়া বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে তাঁর হাতকে আরও শক্তিশালী করুন। আমাদের মনে রাখা উচিৎ, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে।
ডকিছু দিন আগে জাতিসংঘের মহসচিব বলেছেন, বিশ্বের মধ্যে যে কয়েকজন ভালো নেতা দেশ পরিচালনা করছেন তাদের মধ্যে ২য় স্থানে আছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর চেয়ে গর্বের বিষয় আমাদের জন্য আর কি হতে পারে। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করে দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে, এই হোক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের জনগণের অঙ্গীকার।
লেখকঃ দেওয়ান রফিকুল হায়দার , সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সদস্য লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব.