

মোঃ শাহজাহান মিয়া, ঢাকা: ভূমিকম্পের বড় ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ও আশপাশ অঞ্চলকে যেকোন সময়ই কাঁপিয়ে তুলতে পারে শক্তিশালী ভূমিকম্প। গত শনিবার সিলেটে তুলনামূলক কম মাত্রার ৭টি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। রোববার ভোরে অল্প মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে বলে জানায় আবহাওয়া অধিদফতরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, ভূতাত্ত্বিক বা ভূস্তরের পরিস্থিতি ও আলামত জানান দিচ্ছে অশনি সঙ্কেত। বাংলাদেশ ও আশপাশ অঞ্চলে প্রবল মাত্রায় ভূমিকম্পের সম্ভাব্য আঘাতে ভয়াল দুর্যোগ এমনকি মানবিক বিপর্যয়ও সৃষ্টি হতে পারে। অথচ ভূমিকম্প নিয়ে যতটা ভয়-আতঙ্ক সেই তুলনায় ব্যক্তি-পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই দুর্যোগের ব্যাপারে আগাম সতর্কতা ও প্রস্তুতির ক্ষেত্রে অনেক পেছনেই পড়ে আছে বাংলাদেশ। এখন পর্যন্ত ভূমিকম্পজনিত দুর্যোগ মোকাবেলায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে ভূমিকম্পের মতো জটিল প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রস্তুতি-সতর্কতার জরুরী বিষয়টি নিয়েই নির্বিকার থাকেন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরাও। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পৃথিবীর কোনো দেশই ভূমিকম্পের ঝুঁকিমুক্ত নয়। তবে ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বেশি। একই কারণে রাজধানী ঢাকা থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে রিখটার স্কেলে সাড়ে ৭ থেকে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তা যদি হয়, তাহলে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে ঢাকা হবে কংক্রিকেটর স্তূপ। কারণ ৭০ শতাংশ বহুতল ভবনই ভূমিকম্পসহনীয় নয়। রোববার ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মমিনুল ইসলাম বলেন, সিলেটে ছোট ছোট ভূমিকম্প ইন্ডিকেট (নির্দেশ) করছে যে, এখানে তীব্র মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে। ভূমিকম্প কখন হবে, সেটা ধারণা করা সম্ভব নয়।তিনি আরো বলেন, ঝুঁকিটা হলো-কম মাত্রার বা ছোট ছোট ভূমিকম্পের পরে একটা বড় ভূমিকম্প হয়ে যেতে পারে। এই ঝুঁকি সেখানে রয়েছে। এর মানে এই নয় যে, সেটা ছয় মাস বা এক বছর পর হবে। এটা ২০ বছর পরেও হতে পারে। তিনি আরো বলেন, এটা ইন্ডিকেট করছে, ওই জায়গাটা (সিলেট) স্ট্রেচফুল (চাপে আছে)। ওই অঞ্চলটা ভূমিকম্পের জন্য পটেনশিয়াল অর্থাৎ ঝুঁকিপূর্ণ। যেহেতু কম মাত্রার কম্পন প্রায়ই অনুভূত হচ্ছে, এখন থেকে সতর্কতামূলক অবস্থানে যেতে হবে। আশপাশে যেসব ভবন তৈরি করা হচ্ছে, বিষয়গুলো করার সময় এ ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে।ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের তথ্যমতে, গত শনিবার সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে রিখটার স্কেলে ৩ মাত্রার, সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে ৫৩ সেকেন্ডে রিখটার স্কেলে ৪ দশমিক ১ মাত্রার, ১১টা ২৯ মিনিট ৫১ সেকেন্ডে রিখটার স্কেলে ২ দশমিক ৮ মাত্রার এবং ১টা ৫৮ মিনিটে ৪ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। গতকাল রোববার সিলেটে খুবই কম মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে, রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ২ দশমিক ৮।স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্প সিলেটবাসী অনুভূত করার দু’টি কারণ উল্লেখ করে মমিনুল ইসলাম বলেন, মাত্র ২ দশমিক ৮ মাত্রার মতো খুবই স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্প অনুভব করার কারণ হলো অল্প গভীরে ভূমিকম্প হওয়া। এ জন্য মানুষ বুঝতে পারছে। যেখানকার মানুষ ভূমিকম্প বুঝতে পারছে, তাদের খুব কাছে ইপি সেন্টার বা উৎপত্তিস্থল। উৎপত্তিস্থল মানে হলো যেখানে ভূমিকম্প হয় তার মাটির নিচের যে জায়গাটা সেটাকে বলা হয় ফোকাস। সেই ফোকাস থেকে লম্ব বরাবর বা সোজা উপরের ভূমিকে বলা হয় ইপি সেন্টার।তিনি বলেন, ভূমিকম্পের কোনো পূর্বাভাস দেয়া যায় না। তবে দু’টি বিষয় আছে। একটি হলো বিফোর শক। মানে হলো ছোট ছোট ভূমিকম্প হবে, তারপর একদম মেইন শক (বড় ভূমিকম্প) হবে। দ্বিতীয়টি হলো মেইন শকের (বড় ভূমিকম্প) তারপর আস্তে আস্তে আফটার শক হচ্ছে। অর্থাৎ মূল ভূমিকম্পের চেয়ে ছোট ছোট ভূমিকম্প হচ্ছে।আশার বাণী শুনিয়ে মমিনুল ইসলাম বলেন, এই দু’টি বিষয়ের বাইরে আরেকটা লক্ষণ হলো, ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়ে শক্তি ছেড়ে দিচ্ছে, সেটা ভালো। তখন আর বড় ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। সিলেটের ক্ষেত্রেও ছোট ছোট ভূমিকম্পের মাধ্যমে শক্তি ছেড়ে দিচ্ছে, এমনও হতে পারে। তবে এখন ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।জানা গেছে, সাধারণত ১০০ বছর পরপর বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে। সর্বশেষ ১৮৯৭ সালে ৮ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল গোটা সিলেট। সেই ঘটনার ১০০ বছর অতিক্রম হওয়ায় আবারও সিলেট অঞ্চলে ভূমিকম্পের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট-বড় অনেকগুলো প্লেট টেকটোনিকের ওপর পৃথিবীর অবস্থান। ইন্দো-অস্ট্রেলিয়ান ও ইউরোশিয়ান এই বড় প্লেটে দুটির সংযোগস্থল সিলেটের কাছাকাছি অবস্থিত।এই প্লেট দুটির ঘর্ষণের ফলে প্রায়ই সিলেট অঞ্চলে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্প সিলেটে ‘বড় ভূইছাল’ নামে পরিচিত। সে সময় মারা যান সিলেটে দেড় লাখেরও বেশি মানুষ। বর্তমানে এই অঞ্চলে হওয়া ঘন ঘন ছোট ভূমিকম্পগুলো বড় ভূমিকম্পের আগাম সংকেত বলেও মন্তব্য করেন বিশেষজ্ঞরা।অপরদিকে, নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবীব দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় বহুতল ভবন নির্মাণসংক্রান্ত ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা করছেন। ঢাকাকে ঝুঁকিমুক্ত করার নাগরিক আন্দোলনেও সক্রিয় রয়েছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভূমিকম্পের বড় ঝুঁকিতে আছে-এটি একাধিক গবেষণা থেকে বারবার প্রমাণিত হয়েছে। এ ধরনের ঝুঁকিতে যে সব দেশ থাকে, সেসব দেশকে ঝুঁকি মোকাবেলায় অনেক বেশি সচেতন থাকতে হয় বহুতল ভবন নির্মাণ এবং নগর ব্যবস্থাপনা বিষয়ে। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য বাংলাদেশে বিশেষত ঢাকার ক্ষেত্রে এটি একেবারেই গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।