

শেখর ভট্টাচার্য: মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা কি খুব সহজ? স্বাধীনতার জন্য দেশপ্রেমের আবেগ যখন দুর্দমনীয় হয়ে ওঠে মানুষের তখন ‘জীবন-মৃত্যু’ পায়ের ভূত্যে পরিণত করে ফেলে। পৃথিবীর কোনো আধুনিক মারণাস্ত্র দেশপ্রেমিকের আবেগের সামনে দাঁড়াতে পারে না। পাকিস্তানিরা সারা বিশ্বে প্রচার করত বাঙালি ভীরু, অলস, কর্মবিমুখ, কাপুরুষ, যুদ্ধবিদ্যা তাদের কাজ নয়। এই ভিতো ও ভীরু বাঙালি মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে আধুনিক যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী একটি সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করে।
সারা পৃথিবী অবাক হয়ে লক্ষ করল নিরস্ত্র, নিরীহ একটি জাতি কী করে দেশপ্রেমকে হাতিয়ার করে একটি আধুনিক বাহিনীর সঙ্গে সমানে সমানে যুদ্ধ পরিচালনা করে যেতে পারে। একটি জাতি যখন স্বাধীনতার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়, নিজেদের সংহত করে, তখন তাদের স্বাধীনতার ইচ্ছা থেকে দূরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে ।
তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর পরাজয় দেখে। প্রমাণ রেখেছে বাঙালিরা ১৯৭১ সালে প্রত্যক্ষভাবে পাকিস্তানকে পরাজিত করে।
বাঙালির প্রকৃতি বর্ষাকালের নরম কাদামাটির মতো। আপাত নিরীহ বাঙালিকে যারা ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ফুঁসে উঠতে দেখেনি, তারা জানে না গ্রীষ্মের কালবৈশাখীর মতো কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে বাঙালি, যখন দেশজননীর ডাক এসে পৌঁছে অন্তরের গহিনে।
১৯৭১ সালে কিছুসংখ্যক কুলাঙ্গার ছাড়া সবাই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। কোনো আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক সামরিক প্রশিক্ষণ নেই, কোনো প্রস্তুতি নেই, শুধু দেশমাতৃকার লাঞ্ছনা ও গ্লানি মোচন করতে তারা মরণপণ লড়াইয়ে নেমেছিলেন। যুদ্ধটি ছিল কতটা অসম। একদিকে একটি আনুষ্ঠানিক, প্রশিক্ষিত, নৃশংস, বর্বর বাহিনী আর অন্যদিকে এই বাংলার অতি সাধারণ কৃষক, জেলে, শ্রমিক, কামার, কুমার, নৌকার মাঝি থেকে শুরু করে সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের সমন্বয়ে মুক্তিবাহিনী।
হাজার বছরে কোনো জাতি এভাবে জেগে উঠতে পারে না। এ রকম ঐক্যবদ্ধ হওয়া বড় কঠিন। ওই যে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা, আমাদের নেতা ও পিতা, তাঁর সাহসী তর্জনী উঁচিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি যদি হুকুম দেবার না-ও পারি, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।’ ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব; এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।’ একাত্তরের আগেই বাঙালি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে।
কোনো রণকৌশল না জেনে শত্রুর আধুনিক অস্ত্রের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। বায়ান্ন থেকে মৃত্যুকে মুঠোয় ভরেছে। বাঙালি, সে ধারায় ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে এসে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত ‘মঞ্চ মহড়া’ করে দেখিয়েছে বাঙালি। যুগে যুগে শোষণ-নিপীড়নের শিকার বাঙালি জাতি প্রতিবারই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। সৃষ্টি করেছে অমর ইতিহাস। পৃথিবীর মানচিত্রে মাথা উঁচু করে অবাক করেছে সারা বিশ্বকে। দেশ ও জাতির অবমাননার প্রশ্নে বাঙালি কোনোকালেই মাথা নোয়ানোর মতো অপমানজনক কাজ করেনি, আত্মসমর্পণ বাঙালির ধাতে নেই।
বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীর মাসের আগে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির আস্ফালন দেখে অনেকেই হতাশ হয়েছেন। যারা বাঙালি চরিত্রের হাজার বছরের প্রবণতা সম্পর্কে ধারণা রাখেন তারা ঠিক ততটা হতাশ নন। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে মিরপুর স্টেডিয়ামে যারা কিছু তরুণ যুবককে দিয়ে পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়েছে, পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলে শ্লোগান দেওয়ানোর কাজ করিয়েছে, তারা কিন্তু আমাদের সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি নয়। তারা পুতুলনাচের পুতুল।
তারা যতটুকু সাহস দেখিয়েছে, তাদের থেকে বেশি সাহস দেখিয়েছে পুতুলদের পেছন থেকে যারা সুতা ধরে রেখেছিল, সেসব একাত্তরের বিভীষণদের প্রেতাত্মারা। তারা সংখ্যায় যে খুব বেশি তা কিন্তু নয়। আমাদের বিশ্বাস আছে সাধারণ বাঙালিদের প্রতি যারা একাত্তরে জনযুদ্ধে শামিল হয়েছিল। সাধারণ বাঙালি ধর্মকে অন্তর দিয়ে ধারণ করে, কিন্তু তারা উদার, মানবিক । হৃদয় ভালোবাসায় পরিপূর্ণ।
বাংলাদেশের মানুষের জীবনধারা ও সংস্কৃতির মধ্যে এমন কিছু দিক আছে, যেগুলো আমাদের স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাঙালি চিরদিন ভাবপ্রবণ জাতি। এ দেশে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতা কখনো মানুষের মনে স্থান করে নিতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছেন, ১মানবপন্থী বাংলাদেশ প্রাচীন কালেও ভারতের শাস্ত্রপন্থী সমাজনেতাদের কাছে নিন্দনীয় ছিল’। তার মানে, বাংলাদেশ চিরদিনই শাস্ত্রগত সংস্কারমুক্ত। বৌদ্ধ, জৈন প্রভৃতি মত এ দেশে বা তার আশপাশে চিরদিন প্রবল ছিল।
বাংলার মাটি যেমন বঙ্গপোসাগরের প্রবল ঢেউ, জলোচ্ছাস সহ্য করে পলিকে বুকে ধারণ করতে পারে, বাঙালি তেমনই চরম নির্যাতন, নিষ্পেষণ, শোষণের জাঁতাকল থেকে মুক্ত হয়ে স্বপ্নের স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে আনতে পারে।
শুভ শক্তিসম্পন্ন মানুষের থেকে অন্ধকারের কুশীলব স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের ভয় বেশি। কেন এত ভয়? তাদের ভয়ের মূল কারণ হলো, স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি দেশ পরিচালনা করছে, এই কারণে। এ ছাড়া তাদের সবচেয়ে বড় ভয় হলো বাহাত্তরের সংবিধান। যে সংবিধান ১৯৬৬ সালের ছয় দফা থেকে উঠে এসেছিল। যে সংবিধান আমাদের ৩০ লাখ শহীদের রক্তস্নাত, ২৪ বছরের শোষণ, নির্যাতন, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলনের ফসল।
বাহাত্তরের সংবিধানে কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা নেই। বাহাত্তরের ৪ নভেম্বর আমরা যে শ্রেষ্ঠ সংবিধানটি পাই তাতে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের চার মৌলনীতি ছিল গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র । এই সংবিধানে এমন কিছু কথা ছিল না, যা দ্বারা স্বাধীনতা বিরোধীরা উৎসাহিত হতে পারে। বাহাত্তরের সংবিধান শত্রুদের অবস্থান দুর্বল করে দিয়েছিল। ওই সংবিধানে না ছিল ধর্মাশ্রয়ী দলগুলোর বৈধতার সামান্যতম স্বীকৃতি, না ছিল রাষ্ট্রধর্ম।
পাকিস্তানের ২৩ বছর ধর্মকে আশ্রয় করে যারা রাজনীতি করেছে, তারা তাদের আশ্রয় হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছিল।
এ কারণেই বাহাত্তরের সংবিধানকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি। ধর্ম ব্যবসায়ীরা এ কারণেই তাদের সর্বশক্তি দিয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করেছিল বারবার। স্বাধীনতার পর, এমনকি সাম্প্রতিককালে একটি অপশক্তি রাষ্ট্র ও তার মৌলনীতির বিরুদ্ধে বিরামহীন বক্তব্য দিয়ে মানুষকে খেপিয়ে তুলতে বিরামহীন অপচেষ্টা করেছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে আদর্শহারা করার জন্য আদর্শ ও পাকিস্তানি ভাবাদর্শের মধ্যে দাঁড়িয়েছিলেন হিমালয়সম একজন মানুষ। তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। তাই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে পেছন ফিরিয়ে নিতে তারা ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে সবার আগে হত্যা করল বঙ্গবন্ধুকে।
জাতির পিতাকে হত্যা করে তারা বাংলাদেশকে পাকিস্তান অভিমুখী করার চেষ্টা করল। কিন্তু বাঙালি আবার ফিরে এসেছে বঙ্গবন্ধুর দলকে নিয়ে বাহাত্তরের সংবিধানকে আদর্শ করে।
কুচক্রীদের চক্রান্ত এবং এর প্রভাব খুব সাময়িক। বারবার আত্মসমর্পণ করতে হয় কুচক্রীদের। আবারও তাদের আত্মসমর্পণ করতে হবে পাকিস্তানি সেনা অধিনায়ক জেনারেল নিয়াজির মতো। শুভশক্তির বিজয় নিয়ে কোনো দুর্ভাবনা নেই, তবে সতর্ক হতে হবে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের মতো রেসকোর্সে বিজয়ী মুক্তিসেনার বিজয় দেখার জন্য মানুষের ঢল নেমেছিল।
আমাদের অনেকেরই স্মৃতির পাতায় মানুষের এই ঢলের চিত্র উজ্জ্বল হয়ে আছে। সাদামাটা একটা টেবিল ও দুটি চেয়ারে পাকিস্তানি সেনা অধিনায়ক জেনারেল নিয়াজি ও ভারত-বাংলাদেশ যৌথ কমান্ডের প্রতিনিধি জেনারেল অরোরা।
ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে। তাই ভয় নেই শুভশক্তিসম্পন্ন মানুষের। বাঙালি তার আপন চরিত্র দিয়ে এগিয়ে যাবে, যেমন এগিয়ে যাচ্ছে অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রে বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীর এই মহার্ঘ কালে।
লেখক : কলামিস্ট ও উন্নয়ন গবেষক।শেয়ার করুন