সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:০৯ অপরাহ্ন

সুস্থ শরীর গঠনে ডিমের ভূমিকা

সংবাদদাতার নাম :
  • খবর আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২১
  • ২২৯ এই পর্যন্ত দেখেছেন

মোঃ জহিরুল আলম শাহীন: একটি আদর্শ পরিপূর্ণ পুষ্টিকর খাবার ডিম। এই ডিম আমাদের দেহের গঠন সুস্থতায় ও নানা রোগ নিরাময়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। এটি দামেও সস্তা এবং সহজ লভ্য। ডিমের উপকারিতা সম্পর্কে আমাদের জানা খুবই প্রয়োজন। কারণ খাওয়ার ব্যাপারে আমাদের মাঝে নানা ভুল ধারণা ও রয়েছে।

আমরা না জেনে শুনেই বিনা দোষে ডিমকে দোষী করে ডিম গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। যেমন ডিম খেলে প্রেসার বাড়ে, হার্ট অ্যাটাক হয়, অ্যালার্জি বাড়ে, পেটে গ্যাস হয় ইত্যাদি। আবার কেউ বলেন হাঁসের ডিমের চেয়ে মুরগির ডিম বেশি উপকারী। আবার কেউ বলে, কুসুম বাদ দিয়ে শুধু সাদা অংশ খাব না পুরো ডিম খাব। এ ধরনের প্রশ্নই আমাদের মনে ঘুরপাক খায়। তবে হ্যাঁ কোনো মানুষ যদি তার চিকিৎসকের পরামর্শ মতো তিনি যদি নিষেধ করেন। তবে তা মেনে চলবেন। অন্যতায় ডিম খাওয়া ছাড়বেন না। প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তর ২০২১ এর তথ্য মতে বাংলাদেশের ১জন মানুষ বর্তমানে বছরে ১২১টি ডিম খেয়ে থাকে। পুষ্টিবিদগণের মতে শরীর সুস্থ রাখার জন্য বছরে একজন মানুষ ১৮০টি ডিম খাওয়া উচিত।

সুতরাং এদিক থেকে আমরা পিছিয়ে। ১৯৯৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক এগ কমিশনের কনফারেন্সে প্রতি বছর অক্টোবর মাসে দ্বিতীয় শুক্রবার বিশ্ব ডিম দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। বাংলাদেশে জনগণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে। এ বছরের ডিম দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো প্রতিদিন ডিম খাই , রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াই”। সুতরাং ডিম আমাদের সুস্থ দেহের জন্য খুবই সহায়ককারী। ডিমে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, চর্বি, ভিটামিন, শর্করা, জিঙ্ক, ক্যালসিয়াম, আয়রন ফলেট, কোলেস্টরল, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ফসফরাস, সেলেনিয়াম ও ওমোগা-৩, ফ্যাটি এসিড ইত্যাদি খাদ্য উপাদান বিদ্যমান থাকে।


উপকারিতা: একটি ডিমে সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ ১.৮৬ গ্রাম অসম্পৃক্তির চর্বির পরিমাণ ৩.১২ গ্রাম এবং কোলেস্টেরলের পরিমাণ ২২৫ গ্রাম, উচ্চ মাত্রার কোলেস্টেরলের সাথে সম্পৃক্ত চর্বি খাদ্যে মিলিত হয়ে মানব দেহে হৃদরোগের সৃষ্টি করতে পারে তা সত্য। কিন্তু ডিমে সম্পৃক্ত চর্বির চেয়ে মানব দেহের জন্য উপকারী অসম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ। তাই আমাদের দেহের তেমন ক্ষতি করতে পারেনা। মানব শরীরের জন্য কোলেস্টেরল খুবই প্রয়োজন। আসলে এই কোলেস্টেরলের ভয়ে কেউ ডিম খায় না এটি ভুল ধারণা। মানব শরীরের জন্য কোলেস্টেরেল খুবই দরকারী।

নারী- পুরুষে সেক্স হরমোন তৈরীর জন্য এই উপাদানটি খুবই প্রয়োজন। দেহের সেক্স হরমোন কম উৎপন্ন হলে শরীর দুর্বল হয়ে স্বাস্থ্য ভেঙ্গে যায়, সন্তান জন্ম দান ব্যাহত হয়। এই কলোস্টেরল পুরুষের সেক্স হরমোন টেস্টোস্টেবন আর মহিলাদের ইস্ট্রোজেন দেহে তৈরী করে। তাছাড়া ভিটামিন ডি ও যকৃতে বাইল এসিডের প্রথমিক উৎস কলোস্টেরল। ডিমে প্রচুর পরিমাণে ও মেগা ৩ ফ্যাটি এসিড থাকে।

যা শরীরের সাইকোটাইসিস নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। এ উপাদানটি রক্তের প্লাজমার ট্রাইগিøসারিডের পরিমাণ কমিয়ে হার্ট আ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়। এছাড়া এ উপাদানটি চোখের দৃষ্টিশক্তি বাড়ায়। স্তন ক্যাসার প্রতিরোধ করে, ডিমের প্রোটিন শরীরে খুব সহজেই শোষিত হয়। এ উপাদানটি শরীর গঠনে বড় ধরণের কাজ করে।

তাছাড়া ডিমের খাদ্য উপাদান আমাদের যে সব রোগ নিরাময়ে কাজ করে তা নিম্ন রূপঃ

রক্ত শূন্যতা ঃ রক্ত স্বল্পতা সুস্বাস্থ্য গঠনে বড় বাধা। রক্ত গঠনের জন্য প্রয়োজন আয়রণ সমৃদ্ধ খাবার। ডিমে ভালো আয়রণ পাওয়া যায়, যা দেহের রক্ত গঠনে কাজ করে রক্ত শূন্যতা দূর করে, এ উপাদানটি শরীরের বিভিন্ন কোষে অক্সিজেন সরবরাহ করে দেহকে সুস্থ রাখে।


শিশুদের পরিপক্ক করে ঃ ডিমে কোলিন নামে যে উপাদান থাকে তা শিশুর মস্তিস্ক গঠন করে সুস্থ সবল রাখে। শিশুদের ¯œায়ু কোষ বা নিউরণ তৈরীতে সাহায্য করে। গর্ভবতী মহিলাদের প্রতিদিন একটি করে ডিম খেলে গর্ভের বাচ্চার উন্নত স্মৃতিশক্তি তৈরী হয়। শিশুদের প্রথম সর্বোচ্চ মানের প্রোটিন মায়ের দুধে আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মানের প্রোটিন হলো ডিম। সুতরাং মা এবং শিশুদের খাদ্য তালিকায় প্রতিদিন একটি করে ডিম রাখুন।


ডায়াবেটিস রোগ নিয়ন্ত্রণে ঃ ডিমে জৈব ক্রোমিয়ায় ইনসুলিম উৎপাদনের মাধ্যমে রক্তের শর্করার পরিমাণ বা চিনির পরিমাণে সমতা বজায় রাখে। ডিম এ রোগের রোগীদের কোনো ক্ষতি করে না। অন্তত প্রতিদিন একটি ডিম খান।


গর্ভবতীদের জন্য ঃ গর্ভবর্তী নারীদের জন্য ডিম একটি আদর্শ খাদ্য। একটি ডিম থেকে ৭৫-৮০ ক্যালোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। এ সময়ে প্রতিদিন একটি ডিম খেলে দেহের মোট শক্তি চাহিদার প্রায় ২৫% পূরণ হয়। যা মা ও গর্ভের শিশুর জন্য খুবই উপকারি, একটি ডিমে ৩২৮ মিলিগ্রাম কোলিন উপাদান পাওয়া যায় যা মায়ের গর্ভের ভ্রæণের সুন্দর ও সু-স্বাস্থ্য গঠন করে।
চোখের দৃষ্টিশক্তি বাড়ায় ঃ ডিমের ভিটামিন এ রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে। ডিমে আছে লুটেইন ও জিয়াজেন্থিন যা চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে কাজ করে। সমগ্র চোখকে সুস্থ সবল রাখে। ডিমের কোলিন উপাদান চোখের ছানি পড়া রোগ প্রতিরোধ করে। ডিমের বিদ্যমান অ্যান্টি অক্সিডেন্ট লিউটিইন ও জিয়া জ্যানথিন চোখের নানা রোগ প্রতিরোধ করে।

হৃদরোগ ঃ ডিম হৃদরোগ প্রতিরোধ করে। ডিমের কুসুমে থাকা ট্রিপটোফেন, টাইরোসিন ও অ্যামাইনো এসিড হৃদ রোগের ঝুঁকি কমায়।


উচ্চ রক্তচাপ ঃ উচ্চ রক্তচাপ হলেই ডিম খাওয়া বাদ দিবেন না। চিকিৎসকের পরামর্শ মতে খাবেন। একটি ডিমে প্রায় ১৮০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকে। কিন্তু আমাদের প্রতিদিন শরীরের জন্য ৩০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল নিরাপদ। সুতরাং প্রতিদিন একটি ডিম খেলে শরীরে কোলেস্টোরল জমা হওয়ার কোন সম্ভবনা নেই। সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিদিন একটি ডিম খান।


মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় ঃ মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখা সুস্থ জীবনের জন্য খুবই প্রয়োজন। মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় ডিম খুবই ভালো কাজ করে। ডিমে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি-২, বি-১২, কোলিন এবং আয়রণের সাথে ট্রিপ্টোফেন থাকে। যা আমাদের মনের হতাশা, মানসিক অস্তিরতা এবং দুশ্চিন্তা দূর করে। রাতে ভালো ঘুম হয়। অপর দিকে আমাদের শরীরে কোলিনের অভাব হলে লিভার বা যকৃতের সমস্যা হয়। সুতরাং সুস্থ লিভারের কাজ করার জন্য ডিম খাওয়া প্রয়োজন।


চামড়া এবং ত্বকের উপকারে ঃ ডিমে প্রচুর পরিমাণে ডি, ই ক্যালসিয়াম ও সেলেনিয়াম থাকে। যা আমাদের শরীরের চামড়া ও চুল সতেজ, সজিব, পরিপক্ক রাখে। আর ভিটামিন ই চুল ঝড়ে পড়া প্রতিরোধ করে। চামড়ার সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করে। শুক্রাণু এবং ডিম্বানু সতেজ রাখে।


পাকস্থলি সুস্থ্য রাখে ঃ ডিমে প্রচুর পরিমাণে অ্যালবুমিন থাকে। এ অ্যালবুমিন মিউকাস মেমব্রেনকে সুরক্ষা করে পাকস্থলির প্রদাহ, আলসার ও ডায়রিয়া প্রতিরোধ করে এবং পরিপাকে সহায়তা করে।


রোগ প্রতিরোধে ঃ ডিম এন্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার। তাছাড়া ডিমে ১.২৯ মিলিগ্রাম জিংক ও সেলেনিয়াম, ভিটামিন ই থাকে। যা আমাদের দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, আর এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট তারুণ্যকে ধরে রাখে। দেহে ক্যান্সার কোষ জন্মাতে দেয় না।


সতর্কতা ঃ ডিম বেশি সিদ্ধ করে বা ভেজে খাবেন না এতে পুষ্টিমান কমে যায়। কাঁচা ডিম হতে সালমোনেলা সিগেলা নামক জীবাণুর সংক্রমণ হতে পারে। তাই কাঁচা ডিম খাবেন না। ডিম খেলে যদি কারো শরীরে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় তাহলে আর খাবেন না। বিভিন্ন চিকিৎসাধীন রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ডিম খাবেন না।

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102